রাজিন তার কাক্কা এবং আমি

আগের সংবাদ

জীবন এত ছোট ক্যানে

পরের সংবাদ

করোনাকালের রোমিও ও জুলিয়েট

আন্দালিব রাশদী

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৩, ২০২০ , ৫:২৪ অপরাহ্ণ

বাঞ্ছারামপুর থানার সাড়ে তিন মাইল দীর্ঘ গ্রামটির নাম ফরদাবাদ। পশ্চিমে বাইরাধরের বিল, পূর্বে তিতাসের একটি শাখা নদী, এককালে এই নদীপথে নারায়ণগঞ্জ থেকে লঞ্চ আসত, রামকৃষ্ণপুরের পরের ঘাটই ফরদাবাদ। এটাই শেষ স্টেশন। বর্ষায় বাইরাধরের বিল অকাতরে মাছের জোগান দিত। পানি নেমে গেলেই সবুজ বিপ্লবের সাফল্য দেখার জন্য বিলের বিস্তীর্ণ ইরি ধান ক্ষেতে আসতে হতো।
ইরি জমি দখল নিয়েই মারামারির সূত্রপাত। সৈয়দদের বল্লম নুরু আনসারি বুক ভেদে করে পিঠ দিয়ে ফালাটা বেরোয়। পুরো বল্লমটা বের করতে যথেষ্ট টানাটানিতে বেশ রক্তক্ষরণ হয়, ঘটনাস্থলেই নুরু আনসারি চিরদিনের জন্য নিথর হয়ে যায়। প্রতিশোধ পুরোটা নেয়া সম্ভব হয়নি কারণ নিজেদের কারো হাতের খোঁচায় ফজলে আনসারির হাতের নিশানা এদিক-ওদিক হয়ে যায়, ফলে বল্লমের ফালা সরাসরি মাথায় না ঢুকে কাঁধ ও গলার পাশ দিয়ে ঢুকে সৈয়দ আফজালকে প্রাণ বাঁচিয়ে দেয়। পুরো প্রতিশোধ নিতে না পারার ব্যর্থতা এই পরিবারের মধ্যে স্থায়ী শত্রুতা সৃষ্টি করে। একটি আনসারি পরিবার, একটি সৈয়দ পরিবার তারা অবশ্য বংশ বলে। আনসারি বংশ, সৈয়দ বংশ।
এই পরিবারের খান্দানের ইতিহাস প্রায় একই সময়ের। আনসার আলী মূলত ছিঁচকে চোর থেকে বড় চোর এবং বার দুয়েক জেল খেটে সারের ডিলার হয়ে একবার ওমরাহ পালন করে ফেরার পথে কিছু সোনাদানাও নিয়ে আসে। বাড়িটা পাকা করার পর জাতে উঠে এবং তার পুত্র ফজল আলী নামের আলীটুকু ছেঁটে দিয়ে আনসারি যোগ করে এবং বাড়ির সামনের দরজা বরাবর সাইনবোর্ড লাগায় ‘আনসারি ভবন’। বাড়ির দেয়ালে উজ্জ্বল হলুদ রং লাগানো হয়। সৈয়দ আফজালের একটিই ছেলে, সৈয়দ রোমিও আঠারোতে পড়ার আগেই নিহত নুরু আনসারির চৌদ্দ কি পনেরো বছর বয়সী দ্বিতীয় কন্যা জুলিয়েট আনসারির প্রতি আকৃষ্ট হয়, স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে অনুসরণ করে। এই সুদর্শন অনুসরণকারীকে কখনো না দেখতে পেলে জুলিয়েটের মনই খারাপ হয়ে যায়। রোমিও নতুন কেনা সাইকেল নিয়ে তার সামনে ঘুড়ির মতো গোত্তা খায়, বাহাদুরি প্রতিষ্ঠা করতে হাত ছেড়ে, কখনো হাত ঈগলের ডানার মতো উঠিয়ে-নামিয়ে তাকে মুগ্ধ করে। জুলিয়েটের বান্ধবীরা তাকে দেখলে খিলখিল করে হাসে। প্রথম দিন একটি সুন্দর রুমালে কিছু চকোলেট বেঁধে তার হাতে দিয়ে সাইকেল চালিয়ে দূরে কোথাও চলে যায়। জুলিয়েট কিছু বলার সুযোগ পায় না।
একদিন বিরতি দিয়ে আবার দুরন্ত সাইকেল চালক তার সামনে দিয়ে চলে যায়। ফুল না দিলে প্রেম হয় না এমন আজগুবি কথা শোনার পর রোমিও পঁয়ত্রিশ মাইল সাইকেল চালিয়ে জেলা শহরের একমাত্র ফুলের দোকান থেকে একগুচ্ছ ফুল কিনে গিফট র‌্যাপারে পেঁচিয়ে গার্লস স্কুলের ছুটির প্রতীক্ষায় গেট থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। জুলিয়েট বেরোয় না। পরদিনও না, পরদিনও না। ফুল নেতিয়ে পড়ে এবং এক সময় শুকিয়ে যায়, রোমিওর ওজন কমতে থাকে। মুখে ভ্রণ দেখা দেয়। পাঁচ কি ছ’দিন পর যখন দেখা পেল জুলিয়েটের পথ আগলে দাঁড়ায়। জিজ্ঞেস করল, তুমি এই ক’দিন আসোনি কেন,?
অসুখ ছিল।
কিসের অসুখ?
পেট ব্যথা, আর একটা ব্যাপার বলা যাবে না।
আমাকেও না?
এখন না। বলা যাবে আরো অনেক পরে।

রোমিও আবারও পঁয়ত্রিশ মাইল সাইকেল চালিয়ে জেলা শহরের মেয়েদের কাপড়ের দোকানে ঢুকে। এবার যা কিনবে সাত দিন না এলেও তা শুকোবে না।
এমনিতে যথেষ্ট দুঃসাহসী হলেও কি কিনতে চায় দোকানদারকে সাহস করে বলতে পারছে না। ইশারা দিয়ে ব্রাশিয়ারের প্যাকেট দেখায়।
দোকানদার জিজ্ঞেস করে সাইজ কত?
এর যে আবার সাইজ থাকে এটা তো তার জানা নেই। সে নিজের দু’হাতের তালু গুটিয়ে এনে কাপের মতো করে দোকানদারকে দেখায়, এমন।
দোকানদার হেসে উঠে তাকে বলে তুমি পোলাপাইন মানুষ বুঝবা না, যার জন্য কিনবা তারে জিগাইয়া আসো।
প্রশ্নই আসে না, জিজ্ঞেস করতে যে সাহস লাগে তা অর্জন করতে সময় লাগবে। সে তো কেবল মেয়েটির মুখে দিকে তাকিয়েছে, বুকের দিকে নয়। যেটুকু আকৃতি অনুমান করেছে সঠিক নাও হতে পারে। দোকানদারকে বলল ক্লাস টেনে উঠেছে।
দোকানদার বলে, ক্লাসের সাথে সাইজের সম্পর্ক নাই। দুই করতল একত্র বলে এক একটা এত বড় হইতে পারে। আবার এক হাত গুটিয়ে এনে দেখায় এতটুকুও হইতে পারে। কিন্তু সে কিনবেই। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দোকান বরাবর রাস্তার উল্টোদিকে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্লিম ফিগারের একটি মেয়েকে দেখিয়ে বলে, ঐ রকম। দোকানদার আবারও পেঁচায় একই রকম ফিগারের কারোটা দেখলে মাথা ঘুইরা যায়। কারোটা দেখলে মায়া লাগে।
দোকানি বলল- শাড়ি, ফ্রক এসব না লাগলে ফেরত দেয়া যায় কিন্তু এই জিনিস আমরা ফেরত নিই না। তার শর্ত মেনেই গোলাপি রঙের ব্রাশিয়ার নিয়ে আসা-যাওয়ার সত্তর মাইল পথ পাড়ি দেয়া ক্লান্ত এই প্রেমিক মেয়েটিকে বলল, আমার সাইকেলের হ্যান্ডেলে বসো, বাসার কাছে নামিয়ে দেব।তাকে অবাক করে সত্যিই সে তার সাইকেলে উঠল এবং বলল, বাড়ির কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ হবে। নামার সময় তার উপহারের প্যাকেট মেয়েটির ঝোলা ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, বাসায় গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেখবে। তারপর দ্রুত সরে পড়ল। আনসারিদের কেউ দেখুক এটা তারও চাওয়া নয়। কিন্তু ফজলে আনসারির বড় ছেলে দূর থেকে ব্যাপারটা লক্ষ্য করে। সম্মিলিতভাবে ক্লাস নাইন থেকে টেনে ওঠা মেয়েটিকে চার্জ করে, তার ব্যাগ সার্চ করে একটি প্যাকেটের ভেতর ভয়ঙ্কর আপত্তিকর গোলাপি রঙের ব্রাশিয়ার বের করে নিয়ে আসে। জুলিয়েট ভীষণ মার খায়। কিন্তু রোমিওর ব্যাপারে একটি প্রশ্নের জবাবও দেয়নি। তাকে মনে করিয়ে দেয় এই বদমাশটার বাপ তোর বাপের খুনি।
বাবার খুনের ঘটনাটি একেবারেই শৈশবের, কিছুই মনে নেই। বাবার কথাও না। কিন্তু যখন শুনল আনসারি বাড়ির লোকজন রোমিওর হৃদপিণ্ড দিয়ে ফালা ঢুকিয়ে হত্যা করে তাদের মেয়েকে স্তনবন্ধনী দেবার প্রতিশোধ নেবে, জুলিয়েট কাঁদতে শুরু করল। শুধু তাকে সাবধান করার জন্য জুলিয়েট রাস্তার পাশের একটি গাছের আড়ালে অপেক্ষা করতে থাকে দুরন্ত সাইকেলচালককে থামায় এবং কথাটা বলার জন্য তাকে যখন আড়ালে নিয়ে আসে রোমিও তাকে জাপটে ধরে, চুমো খায় এবং সেও তার গা এলিয়ে দেয় তার ওপর। জুলিয়েট বুঝতে পারেনি তার বাড়ির ছেলেরা তাকে অনুসরণ করছিল।
সৈয়দদের শিক্ষা দেবার এই মোক্ষম সুযোগটা তারা হাতছাড়া করেনি। থানাকে মাল খাইয়ে কব্জা করে এবং রোমিওর বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দেয়। থানার নতুন দারোগা সাদুল্লাহ প্যারিস (তার বড় ভাইয়ের নাম আমানুল্লাহ লন্ডন এবং ছোটটির নাম ফসিউল্লাহ টোকিও) ধর্ষণের অশ্লীল বিবরণ লিখে জুলিয়েটকে দিয়ে একটি স্টেটমেন্ট সই করায়। বাধ্য করে। জুলিয়েটে বারবার বলে আমাকে কিছু করেনি।
সে রাতেই সৈয়দ আফজাল গ্রেপ্তার ঠেকাতে ছেলেকে ঢাকায় বোনের বাসায় পাঠিয়ে তার বিদেশ যাত্রার আয়োজন করে। এক সপ্তাহের মধ্যে আর্জেন্ট পাসপোর্ট করিয়ে দ্বিতীয় সপ্তাহে ভিসা জোগাড় করে রোমিও ইতালি রওনা হয়। রোমের একটি বাঙালি মেসে দু’রাত কাটিয়ে চাকরির নিশ্চয়তা নিয়ে ট্রেনে চলে আসে ভেরোনা শহরে। তার কাজ জুতোর কারখানায়, মূলত শ্রমিকের কাজ। শিফটিং টিউটি। কোনো সপ্তাহ দিনে হলে পরের সপ্তাহ রাতে। অনেকেই ওভারটাইম করে। সে চিৎ হয়ে বিছানায় শুয়ে কেবলই যন্ত্রণাকাতর জুলিয়েটের মুখটি দেখে। একদিন কেবল এই ভেরোনাতেই শেক্সপিয়রের জুলিয়েটের বারান্দা দেখতে গিয়েছিল। গ্রামের আবদুস সোবহান মাওলানা দুই পরিবারের কাছেই কাতর আবেদন করেছেন, শত্রæতার কোনো শেষ নেই। ছেলে-মেয়ে দুটোর বিয়েটা করিয়ে দিই, গ্রামে শান্তি আসবে, আপনারাও ভালো থাকবেন। এর মধ্যে দারোগা সাদুল্লাহ প্যারিসের নজর পড়ে এই কথিত ধর্ষিত মেয়েটির ওপর। বিয়ের প্রস্তাব দিলে ফজল আনসারি সাথে সাথে রাজি হয়। তার বাড়তি লাভ হাতে একজন পুলিশ তো পাওয়া গেল। মেয়েটির অন্তরে কী যাতনা চলছে কেউ জানতে চেষ্টা করেনি।
আবদুস সোবহান মাওলানাই অনেক চেষ্টা করে রোমিওকে বার্তা পাঠান- জুলিয়েটের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এটুকু জানাই যথেষ্ট। প্রতিহত করতে হবে বিয়ে, নতুবা অর্থহীন তার জীবন। রোমিও ফেরার টিকেট কিনল। ততদিনে ইতালিতে ভয়ঙ্কর করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে, এই মৃত্যুপুরী বাঙ্গালিরা থেকে দেশে ফিরে যাবে। ১৪৭ জনের যে দলটি ঢাকায় নামল তাদের মাত্র একজনেরই সুনির্দিষ্ট লক্ষ আছে। আর চার দিন পর জুলিয়েটের বিয়ে। এটা ঠেকাতে হবে।

কিন্তু সে বেরোতে পারল না। এয়ারপোর্ট থেকে সোজা নিয়ে গেল হাজি ক্যাম্পে। ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে। তার চিৎকার, তার অনুনয় কোনো কাজে এলো না। যেদিন প্যারিসের সাথে জুলিয়েটের বিয়ে তার গলা ব্যথা, কাশি এবং শ্বাসকষ্ট। আরো দুদিন পর করোনা পজিটিভ নিশ্চিত হয়ে তাকে একটি হাসপাতালে পাঠানো হলো। তার নজর বেড়ের কাছাকাছি স্টোর রুমের ওপর। একবার স্টোর খোলা দেখে দ্রুত ভেতরে গিয়ে একটি পুরনো অ্যাপ্রন বের করে নিয়ে এলো। এটাই গায়ে চাপিয়ে পরদিন মধ্যদুপুরে তার স্যুটকেট, পাসপোর্ট সব ফেলে বেরিয়ে এলো। অ্যাপ্রোন থাকায় দারোয়ান তাকে রোগী সন্দেহ করেনি।
রোমিও জানে কোথায় সে যাবে, তার চাওয়াও স্পষ্ট, বিয়ে ঠেকাতে পারেনি, কিন্তু জুলিয়েটের শরীর আর প্যারিসকে স্পর্শ করতে দেবে না। উদভ্রান্ত রোমিও দেখে আনসারি বাড়িতে বিয়ের কিছু সাজ তখনো রয়ে গেছে। জুলিয়েটকে তখনো যে তুলে নেয়নি সোবহান মাওলানা তাকে বলেছেন। গায়ের জোরেই বাড়িতে ঢুকে জুলিয়েটকে ডাকতে থাকে, প্রতিহত করার মতো কেউ হয়তো তখন ছিল না। চিৎকার শুনে জুলিয়েট বেরোলে রোমিও তাকে জাপটে ধরে এবং বলে আমার শরীরে মৃত্যুর বিষ, তোমাকে শেষ দেখাই দেখতে এসেছি।
জুলিয়েট বলে, আমিও তোমার সাথেই যাব, কবরে হলেও নিয়ে যাও।
রোমিও বলল, আমার ছোঁয়া বৃথা যাবে না।
তাহলে আমাকে আর একটু শক্ত করে ধরো, আর একটু ছোঁও। হইচই শুনে তখনই আসে এ বাড়ির নতুন জামাই সাদুল্লাহ প্যারিস। রোমিও আলনার পেছনে সরে যায়। এলোমেলো, আলুথালু অবস্থায় দেখে প্যারিসও হুমড়ি খেয়ে পড়ে স্ত্রীর ওপর, বলো সোনা কী হয়েছে তোমার? সামনে এসে যায় রোমিও, শান্তকণ্ঠে বলে ধর্ষণ মামলার আসামি হাজির, আগে আমাকে ধরো প্যারিস।
প্যারিস স্ত্রীকে ছেড়ে চেঁচিয়ে ওঠে। পিস্তল, পিস্তল কোথায়? তারপর প্রশিক্ষিত অ্যালসেশিয়ানের মতো তার ওপর লাফিয়ে পড়ে গলা টিপে ধরে।
প্রতিহত করার শক্তি রোমিরও নেই। করোনা যন্ত্রণার মধ্যেও তার তৃপ্তির হাসি। করোনার বিষটা প্যারিসকে দিতে পেরেছে। গুলি করার প্রয়োজন ছিল না, মৃত্যু এমনি হতো। তবুও রিপোর্ট হলো, রাইট অব সেল্ফ ডিফেন্স প্রয়োগ করার সময় ধর্ষণ মামলার পলাতক আসামির গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু।
পরের একুশ দিনের মধ্যে আবদুস সোবহান মাওলানা আরো দুটো জানাজা পড়লেন। একজনের মৃত্যুর কারণ বলা হলো জটিল স্ত্রী রোগ, অন্যজনের হার্ট অ্যাটাক। করোনা মৃত্যুর সরকারি তালিকাটি আরো তিনটি নাম থেকে বঞ্চিত হলো। হবারই কথা, সরকারি মুখপাত্র তো বলেছেনই আমরা করোনার চেয়েও শক্তিশালী।
শক্তিশালী মানুষ শোক লুকিয়ে রাখতে জানে। আমিও বলি, তিনটা মানুষই তো। কত মানুষই মরে, তাতে আমার কী!

এসআর