রাঙামাটিতে দুস্থদের জন্য এক মিনিটের বাজার

আগের সংবাদ

ঈদে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ান

পরের সংবাদ

সুন্দরবন আবারো বাঁচাল স্বদেশ

পাভেল পার্থ

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২২, ২০২০ , ১০:২৭ অপরাহ্ণ

ঘূর্ণিঝড় আম্ফান থেকে দেশকে বাঁচাতে সুন্দরবনই নিজের জীবন দিয়ে লড়েছে ২০ মে সারারাত। কেবল সিডর বা আম্ফান নয়, আইলা কি মহাসেন, ফণী কি বুলবুলেও সুন্দরবনই ছিল উপক‚লের সুরক্ষা প্রহরী। কিন্তু প্রজাতি হিসেবে মানুষ এমনই স্মৃতিবিমুখ যে, বাদাবনের এই বীরগাঁথা কিছুদিনের ভেতর বেমালুম ভুলে যায়। একের পর এক জাহাজ ডুবে তেল কী রাসায়নিক ছড়াচ্ছে সুন্দরবনে। কোনো বিচার নেই। একের পর এক বিনাশী উন্নয়ন প্রকল্পে দম আটকে আসে বাদাবনের। দিনে দিনে কমতে থাকে বাঘের পরিসংখ্যান। অথচ সুন্দরবনের চারধারে বাড়তে থাকে মানুষের বসতি আর কারখানা। বাঘের শরীর বিক্রি হয়ে যায় বহুজাতিক বাজারে আর বিশ্বসেরা ক্রিকেটাররা হরিণের চামড়ায় বসে বিয়ের কৃত্য সাজান। কোনো রা নেই। কেবল ঘূর্ণিঝড় এলেই আমরা হাঁ করে চেয়ে থাকি রক্তলাগা এই বনের দিকে।
বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৪.২ ভাগ এবং দেশের মোট বনভ‚মির ৪৪ ভাগজুড়ে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সুন্দরবন। স্থানীয়ভাবে বাদাবন, প্যারাবন হিসেবে পরিচিত দুনিয়ার সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ বনকে ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা-বিজ্ঞান ও সংস্থা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশ ২১ মে ১৯৯২ সালে সুন্দরবনকে দেশের প্রথম রামসার এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। সুন্দরবনের ৬,০১,৭০০ হেক্টর বনভ‚মি এই আন্তজার্তিক সনদের সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। সিডরে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর এবং পশ্চিম সুন্দরবনের ২০ হাজার হেক্টর এলাকা ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। এরপর থেকে প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়েই আঘাত পেয়েছে সুন্দরবন। কিন্তু সেইসব ক্ষতের জনদলিলগুলো আমরা দেখতে পাইনি। আম্ফানে সুন্দরবনের কতটুকু এবং কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে এবং এই ক্ষতি আগামীদিন কীভাবে সামাল দেয়া যায় তা এখনই আমাদের ঠিক করতে হবে।
সিডর থেকে বুলবুল একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত থেকে দেশকে বাঁচাতে সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান এবং খাদ্যশৃঙ্খল চক্রেও পরিবর্তন ঘটছে। ঘূর্ণিঝড়ের জখম কাটিয়ে উঠতে সময় লাগছে। অনেক প্রাণীরই খাদ্য ঘাটতি এবং বিচরণ সীমানার সংকট দেখা দিচ্ছে। জলোচ্ছ্বাসে বনের ভেতর মিঠা পানির সঙ্গে লবণ পানির মিশ্রণ ঘটে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীদের ক্ষেত্রে পানির সমস্যাও প্রকট হয়ে উঠবে। পানির লবণ অনুপাতে হঠাৎ তারতম্য ঘটায় সংবেদনশীল জীবের ক্ষেত্রে ভিন্ন লবণ ঘনত্বের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সময় লাগবে। মাটির আর্দ্রতা, পুষ্টি ও ধরনে এক ধরনের পরিবর্তন আসবে। যা সুন্দরবনের উদ্ভিদ সংসারে বয়ে আনতে পারে দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ। প্রাকৃতিক পরাগায়ন, বীজ বিসরন, জরায়ুজ অঙ্কুরোদগমসহ উদ্ভিদ জীবনচক্রে তৈরি হবে ধীরগতির পরিবর্তনশীলতা। সুন্দরবনের গাছরা তাদের বর্ষবলয়ে প্রমাণ রাখবে আম্ফানের স্মৃতি। সুন্দরবনের উদ্ভিদগুলোর বিশেষবৈশিষ্ট্য এর শ্বাসমূল, যা ঘূর্ণিঝড়ের ভেতর নানাভাবেই আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। এর আগের ঘূর্ণিঝড়ের অভিজ্ঞতায় দেখেছি সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে বনতলের। এবারো এ রকম ঘটলে সহজাত অঙ্কুরোদগমের মাধ্যমে প্রাকৃতিক বনবিস্তারে মুমূর্ষু বনতলকে লড়াই করতে হবে আরো প্রতিবন্ধকতার।
আমাদের চিন্তা করতে হবে আমরা এই বনের অংশ। কারণ প্রাণসম্পদ, পরিচয় কী সুরক্ষাবলয় কোনো না কোনোভাবে আমরা দুনিয়ার এই বৃহত্তম বাদাবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছি। এই বন না থাকলে কে আমাদের একের পর এক সুরক্ষা দেবে? আমাদের নিশ্চয়ই ১৯৯১ সালের জলোচ্ছ্বাসের কথা মনে আছে? মহেশখালীর মূলভূখণ্ডকে সে সময় বাঁচিয়েছিল সোনাদিয়া ম্যানগ্রোভ বন। কিন্তু সেই বনকে আমরা আস্ত রাখিনি। ২০০২ সালের জুন মাসে স্থানীয় প্রভাবশালীরা সোনাদিয়ার বন পেট্রল দিয়ে পুড়িয়ে তৈরি করে বাণিজ্যিক চিংড়ি ঘের। যদিও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এই এলাকাকে ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে। আমরা কি এমন কোনো শ্যামনগর, শরণখোলা, কয়রা, দাকোপ, মোংলা চিন্তা করতে পারি যেখানে বাদাবন নেই। আমরা কি সুন্দরবন ছাড়া বাংলাদেশ কী বিশ্ব কল্পনা করতে পারি? তাহলে এই বনের প্রতি আমাদের আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। এই বনের প্রাকৃতিক বিকাশকে নানাভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে, এই বনই তো ঘূর্ণিঝড়ে আমাদের একমাত্র সুরক্ষা প্রহরী। পরনির্ভরশীল প্রজাতি হিসেবে এই দুনিয়ায় মানুষকে প্রকৃতির ওপর বাহাদুরি থামাতে হবে। সুন্দরবনকে সুরক্ষিত করার ভেতর দিয়ে এই চর্চা আমরা অব্যাহত রাখতে পারি। ঘূর্ণিঝড় আম্ফান আবারো এর জরুরিত্ব সারারাতভর ঝড়ের আওয়াজে আমাদের জানিয়ে দিয়ে গেল।
লেখক ও গবেষক।
[email protected]

ডিসি