মানুষের পাশে সাংসদ চুমকি

আগের সংবাদ

সহমর্মিতা জানাতে মমতাকে প্রধানমন্ত্রীর ফোন

পরের সংবাদ

মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই

শরীফা বুলবুল

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২২, ২০২০ , ১২:৪৮ অপরাহ্ণ

বিশেষ সাক্ষাৎকার
আবুল কাশেম ফজলুল হক
সমাজবিশ্লেষক

আবুল কাশেম ফজলুল হক। প্রাবন্ধিক, লেখক, গবেষক, ঐতিহাসিক, অনুবাদক, সমাজবিশ্লেষক, সাহিত্য সমালোচক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ। তিনি নিরপেক্ষ রাজনৈতিক চিন্তা ও তত্তে¡র জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তার রচনা স্বদেশ ভাবনা ও রাজনৈতিক চিন্তায় ঋদ্ধ। প্রগতিপ্রয়াসী মন নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে মত প্রকাশ করেন।  সেসব লেখা ও কথায় জনগণের মাঝে সৎ চিন্তা উসকে দিতে চান। রাজনীতি, সমাজ সংস্কৃতির ওপরও তীক্ষè নজর রাখেন সব সময়। বাস্তবতার নিখুঁত পর্যালোচনা করেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে সব সময়ই অগ্রগণ্য দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন লেখায়। মানুষের মধ্যে শুভবোধের জাগরণ কামনা করেন। আবুল কাশেম ফজলুল হক জনগণকে শ্রদ্ধা করেন এবং তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন না। তিনি এরকম মতপ্রকাশ করেন যে, যেহেতু দেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষই ধর্মানুগত, তাই তাদের বিশ্বাসে সরাসরি আঘাত দিলে তাদের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা হারাতে হয়, সমাজ পরিবর্তনের কাজ হয় বিঘ্নিত। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দীর্ঘ চার দশক অধ্যাপনা শেষ করে লেখালেখিতেই ব্যস্ত রেখেছেন নিজেকে।

এই সমাজ চিন্তকের করোনাকাল কেমন কাটছে ভোরের কাগজের এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সারা জীবনই আমি শিক্ষকতা করেছি এবং লিখেছি। লেখালেখির বিষয়টা আমি খুব সিরিয়াসলি নিয়েছিলাম। অনেক বইপত্র প্রকাশ করেছি। কিন্তু আমার চিন্তা চারপাশের অন্যদের চিন্তা থেকে অনেক ভিন্ন। আমি ভবিষ্যৎ চিন্তা করেছি, বর্তমান নয়। যার ফলে আমার লেখা ছাপাতে সমস্যা হয়েছে। মতের জন্য। সেরকম পত্রিকা পাইনি যেখানে মন খুলে লিখতে পারি। কোনো মাসিক পত্রিকা, ত্রৈমাসিক এমনকি দৈনিক পত্রিকায়।

১৯৯১ সালের পর থেকে প্রচুর পত্রিকা প্রকাশ হয়েছে। তাও কিছু কিছু লেখা ফেরত দিয়ে দিত। পত্রপত্রিকার লেখা ছাড়াও আমি অনুসন্ধান করে লিখেছি। এসব লেখা বই আকারে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ হয়েছে। ওসব লেখা পুনর্মুদ্রিতও হয়েছে। এরকম কিছু বইয়ের প্রুফ আমার হাতে আছে। এর মধ্য থেকে কোনো বই প্রকাশ করলে ভালো হয়। ওইসব বইয়ের প্রুফ দেখার কাজে আমি ব্যস্ত আছি। দ্বিতীয়ত, কিছু বই পড়ছি।

কি বই পড়ছেন জানতে চাইলে এই লেখক বলেন, বিশেষ করে মহিউদ্দিন আহমেদের লেখা ‘বেলা অবেলা’ নামে একটি বই। আমি আগ্রহ নিয়ে বইটা পড়ছি। এসব বইয়ের ঘটনা আমাদের জীবন দিয়ে দেখেছি। নানা দিক থেকে নানা অভিজ্ঞতার। লেখক এসব একত্র করে লিখতে চেষ্টা করেছেন। এই বইটা আনন্দের সঙ্গে পড়ছি। আওয়ামী লীগের এমপি মোহাইমেন কায়দে আজম জিন্নাহ নামে তার লেখা একটা বই দিয়েছিলেন। তার বইটা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়লাম। সেই ব্রিটিশ আমলের রাজনীতি, মুসলিম লীগ, কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা এসব নিয়ে অনেক কথা। পড়ছি কংগ্রেসের ইতিহাস। আমার পড়তে একটু সময় বেশি লাগে। একটু সিরিয়াস টাইপের, তুলনামূলকভাবে ভালো এবং গুরুত্বপূর্ণ বই বলে দ্রুত পড়ে ফেলা যায় না। পপুলার লেখা যেভাবে দ্রুত পড়ে ফেলা যায়, সিরিয়াস বই সেভাবে পড়া যায় না। নতুন তেমন লিখতে পারছি না কিছুই। তবে আগের কোনো বই পুনর্মুদ্রিত হবে এরকম বইয়ের প্রুফ দেখছি। এ সময় কোনো লেখা একটু পরিবর্তন করছি। লেখার ইচ্ছে মনে মনে হয়। কিন্তু নানা কারণে লিখছি না।

আপনার জীবনের এতদূর সময়ে এমন দুঃসময়ের মুখোমুখি হয়েছেন কী? উত্তরে এই সমাজবিশ্লেষক বলেন, করোনার মতো এমন ঘটনা পৃথিবীতে এর আগে ঘটেছে বলে কোথাও পাইনি, কেউ বলছেও না। আমার ৮০ বছর জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।

এ নিয়ে টেলিভিশনের পর্দায় অনেক কিছু প্রচার হচ্ছে। এ নিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে যারা করোনা নিয়ে গবেষণা করছেন তাদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যাচ্ছে। কিন্তু চীনে প্রথম ডিসেম্বর থেকে শুরু হলো করোনাকাল, প্রায় ছয় মাস হতে চলল। এই সময় থেকে সারা বিশ্বের মানুষ গৃহবন্দি এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা থেকেও বলা হচ্ছে এরকম কতকাল থাকতে হবে বলা মুশকিল। এখন করোনা নিয়েই জীবনযাপনের উপায় বের করতে হবে। একসময় ইতালি এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে প্লেগে এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা গিয়েছিল। আমাদের দেশেও প্লেগের হুমকি ছিল। ইউরোপে বেশি আতঙ্ক ছিল। এছাড়া কলেরা ছিল। এক বাড়িতে কলেরা হলে সবাই আক্রান্ত হত। পরে দেখা গেল কলেরা সহজে চিকিৎসা সহজ হয়ে যায়। এরপর ছিল বসন্ত। এক বাড়িতে হলে সবার মধ্যে ছড়াত। কিন্তু করোনা মারাত্মক। কেউ বলছেন আল্লাহর গজব। এটা আসলে ভাইরাস।

একসময় এই ভাইরাস মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। অবশ্যই এর রহস্য বের হবে। যারা ভাইরোলজি, জার্ম, ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করছেন তাদের গবেষণা সফল হবে। আরো নানা পদ্ধতিতে বিজ্ঞান এই ভাইরাসকে প্রতিরোধ করার মতো নানা উপায় বের করবে। মানুষ অনেক বিপদ-আপদ অতিক্রম করে টিকে আছে। টিকে থাকবে এবং মানুষ সৎ বুদ্ধি নিয়ে চললে সম্মিলিতভাবে গোটা পৃথিবীতে অনেক কিছু করতে পারবে। মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই।

বাংলাদেশ কি ঘুরে দঁড়াতে পারবে বলে মনে করেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে এই চিন্তাবিদ বলেন, যেভাবে চলছে এভাবে চললে মানুষ কিছুকাল কন্টিনিউ করতে পারবে। সরকার গরিবদের ত্রাণও দিচ্ছে। কলকারখানা বন্ধ রেখে আর হয়তো দুচার মাস চলবে। কিন্তু একটা সময়ের পরে সরকার এত টাকা পাবে কোথায়? সরকারেরও তো আয় কমে যাচ্ছে। এখন উন্নয়ন ফান্ডের টাকা সরকার ব্যয় করছে। কাজেই এইভাবে চলতে পারবে কিছু সময়। কিন্তু একসময় লক ডাউন তুলে নিতে হবে। কাজ আরম্ভ করতে হবে। অনেকটা এভাবে বলা যায়- আমরা ভাতে মরব, না করোনায় মরব? এই প্রশ্ন অলরেডি সামনে এসে গেছে। এইভাবে চলবে না। না বাংলাদেশ না পৃথিবী। অন্য কিছু ভাবতে হবে।

আপনি যে বললেন অন্য কিছু কি ভাবতে হবে? অন্য কিছুটা কি? তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ে বলেন, লকডাউন তুলে দিতে হবে, কলকারখানা খুলে দিতে হবে। তাতে হয়তো কিছু লোক মারা যাবে। কিন্তু তারপরেও …। ভাতে মরবো নাকি করোনায় মরবো। এই প্রশ্নটা যখন সামনে চলে আসবে। করোনার চাইতেও ভাতটা বড় হয়ে ওঠে।

এসআর