সুন্দরবন আবারো বাঁচাল স্বদেশ

আগের সংবাদ

বুলবুলের বদান্যতা আম্ফানের আদিখ্যেতা

পরের সংবাদ

ঈদে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ান

আ য ম খোরশিদ আলম খান

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২২, ২০২০ , ১০:৩১ অপরাহ্ণ

দীর্ঘ মাসজুড়ে সিয়াম সাধনা ও কঠোর ইবাদত-আরাধনার পর বহুল প্রতীক্ষিত ঈদুল ফিতর দোরগোড়ায়। রোজার মাস সাঙ্গ হলো। এলো ঈদুল ফিতর তথা সর্বজনীন ঈদোৎসব। ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে অনাবিল আনন্দে গা ভাসিয়ে দেয়া। ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, বড়-ছোট ব্যবধান ভুলে ঈদুল ফিতর আসে সাম্য, ঐক্য, সম্প্রীতি ও মানুষে মানুষে মেলবন্ধনের বার্তা নিয়ে। এবার ভিন্ন পরিস্থিতি এবং প্রতিক‚ল করোনার অভিঘাতকালে এসেছে ঈদুল ফিতর। করোনা ভাইরাসের বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ও ভয়ঙ্কর থাবার মাঝে ঈদ এলেও মানুষ কিন্তু ঠিকই অনাড়ম্বরতায় ঈদ আনন্দে শামিল হবে। ঈদ অর্থনীতি বলতে যা বোঝায়, ঈদের বাজেট বলতে আমরা যা বুঝি এবার তা ওলট-পালট হয়ে গেল। ঈদ এসেছে, সময়ের আবর্তনে। কিন্তু করোনাকালে ঈদের আনন্দ কিছুটা হলেও ফিকে হয়ে আসছে তাতে সন্দেহ নেই। তবুও ঈদে মানুষের মন থাকবে চাঙ্গা। উৎফুল্লচিত্তে অনাড়ম্বরভাবে নীরবে মানুষ ঈদ আনন্দে শামিল হবে। ঈদুল ফিতর আমাদের মাঝে সাম্য, ঐক্য ও সম্প্রীতির বার্তাই নিয়ে আসে।
এবার ঈদুল ফিতর করোনাকালে আসায় সত্যিকার ঈদ আনন্দ হতে বঞ্চিত হবে আমাদের দেশসহ সারা বিশ্বের মুসলিম জনগোষ্ঠীর বড় অংশ। কোনো দেশ করোনার অভিঘাত কিংবা করোনার দংশন থেকে মুক্ত নয়। করোনা সব দেশকে প্রচÐ ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। মানুষের জীবনযাত্রা আজ লÐভÐ। মানুষের হাতে কাজ নেই। মুখে খাবার নেই। শিশু-নারী-পুরুষ বয়স্ক সবাই রোগে-শোকে কাতর হয়ে দিশাহারা। করোনার অভিঘাতে ঈদ আনন্দ যেন মাটি হয়ে যেতে বসেছে। তবুও করোনা ঈদোৎসবকে পুরোপুরি থামিয়ে রাখতে বা দমিয়ে রাখতে পারবে না। ঈদের সামাজিক উৎসব কিংবা ঈদের ধর্মীয় রীতি-নীতি ¤øান হতে বসলেও পুরোপুরিভাবে ঈদ আনন্দ হতে সবাই বঞ্চিত হবেন তা বলা যাবে না। ঘরোয়া পরিবেশে ঈদ চলবে ঘরে ঘরে। নীরবে-নিভৃতে। ৩০ মে পর্যন্ত লকডাউন বা সাধারণ ছুটি থাকলেও সামাজিক দূরত্ব মেনে ঘরে ঘরে চলবে ঈদের উৎসব। ঈদের আমেজ চলবে ছেলে-বুড়ো সবাইকে ঘিরে। করোনা পরিস্থিতির কারণে আনন্দের বৃহত্তর পরিসর কমবে, কিন্তু ঘরে ঘরে ঈদ আয়োজন চলবেই এটা কিছুতেই থামানো যাবে না। লকডাউনের ভেতর দিয়েও ভেতরে ভেতরে ঘরে ঘরে ক্ষুদ্র পরিসরে ঈদের আমেজের কিছুটাই কমতি হবে না।
ঈদুল ফিতরে দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকবে। এক জায়গার মানুষ আরেক জায়গায় যেতে পারবে না। যাতায়াতে বিধি-নিষেধ থাকবে। ফলে ঈদে শহর ছেড়ে মানুষ গ্রামে যেতে পারবে না। আবার গ্রামের মানুষও শহরে আসতে পারবে না। এই রোজা ও ঈদে সারাদেশে অধিকাংশ মার্কেট ও শপিংমল বন্ধ রয়েছে। বেশিরভাগ মানুষ আজ অসহায় ও কর্মহীন। শ্রমজীবী-কর্মজীবী নিম্ন আয়ের মানুষ যেখানে দুবেলা দুমুঠো খেতে পারছে না, সেখানে আবার কিসের ঈদ? মানুষের মুখে খাবার জোগানো, কর্মহীন অসহায় মানুষকে বাঁচিয়ে তোলাই এখন প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত। গরিব কর্মহীন মানুষের জন্য প্রধানমন্ত্রী যে সহায়তা দিচ্ছেন তা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। ৫০ লাখ গরিব কর্মহীন মানুষ আড়াই হাজার টাকা করে নগদ আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন, তা কম কিসের! সারাদেশে মসজিদের ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিন ও খাদেমরাও প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন। তবে সারাদেশে বেকার থাকা বেতন-ভাতা না পাওয়া বিয়ে-শাদিহীন অবস্থায় থাকা ৩০ হাজার নিকাহ রেজিস্ট্রারও যাতে প্রধানমন্ত্রীর নগদ সহায়তার আওতায় আসেন এ বিবেচনাও করতে হবে। এবার ঈদে গ্রামে যাওয়া যাবে না, তা ঠিক। এখন ডিজিটাল যুগ। চাইলেই গ্রামের গরিব মানুষকে সহায়তা করা যাবে। হাতের নাগালে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সুযোগ। গ্রামে কারা কষ্টে আছে, কারা অসহায় ও কর্মহীন, কাদের জীবনতরী চলছে না, কারা খুব আর্থিক কষ্টে জর্জরিত এমন মানুষগুলোকে বেছে বেছে মোবাইল ব্যাংকিং বা বিকাশ-রকেটের মাধ্যমে কিংবা ব্যাংকের মাধ্যমে আর্থিক সহযোগিতা করা যায়। এতে গরিব মানুষগুলো সরাসরি উপকৃত হবে আশা করা যায়। দরকার শুধু সদিচ্ছা ও একটু সহানুভ‚তি। এভাবে প্রান্তিক গরিব মানুষগুলোকে আর্থিকভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া যায়।
গরিব মানুষকে বাঁচানোই হবে এবার ঈদের আসল উপহার। এভাবে মানুষের মুখে হাসি ফোটানো যাবে। আশপাশের কেউ অভাবী-অভুক্ত থাকলে আল্লাহ পাকের দরবারে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে, এটা যেন আমরা মনে রাখি। এবার জনপ্রতি ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ টাকা। আর সর্বোচ্চ ২ হাজার ২শ টাকা। ঈদ জামাতে যাওয়ার আগেই ফিতরা দিয়ে দেয়া উচিত। জাকাত-ফিতরা গরিবের হক। তাই হিসাব করে জাকাত-ফিতরা দিতে হবে বিত্তবানদের। প্রতি লাখে আড়াই হাজার টাকা করে জাকাত দিতে হবে। আর কোনো ধনী ব্যক্তির কাছে যদি বছর শেষে এক কোটি টাকা জমা থাকে, তবে তাকে আড়াই লাখ টাকা জাকাত দিতে হবে। জাকাত মানে প্রবৃদ্ধি। জাকাত দিলে সম্পদ পবিত্র হয় এবং সম্পদ বেড়ে যায়। জাকাতের মাধ্যমে গরিবরা যেমন উপকৃত হয়, তেমনি জাকাতদাতা বিপদ-আপদ বালা মুসিবত কিংবা রোগ-শোক থেকে জাকাতের উসিলায় নিরাপদ থাকে। যারা জাকাত দেয় না সারা জীবন তারা নানাভাবে দুঃখ-দুর্দশায় জর্জরিত থাকে। এটা পরীক্ষিত সত্য। জাকাতের টাকার চেয়ে একশ গুণ টাকা নানামুখী বিপদ-আপদে চলে যায়। অথচ তা আমরা উপলব্ধি করতে পারি না। জাকাত না দিলে ধনীর টাকা-পয়সায় যে বরকত থাকে না, তাই প্রকৃত বাস্তবতা ইসলামী বিধানের আলোকে। এতিম, গরিব অভাবী-অসহায় মানুষের জীবনে সচ্ছলতা এনে দেয়াই জাকাত-ফিতরার মূল উদ্দেশ্য। ‘আকিমুস সালাত ওয়াতুজ্জাকাত’ তোমরা সালাত কায়েম করো এবং জাকাত প্রদান করো এভাবে কুরআন মজিদে নামাজের সঙ্গে ৮২ বার জাকাতের কথাও গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে। কেউ জাকাত না দিলে তার নামাজও কবুল হবে না। এই ঈদে আশপাশের কোনো গরিবই অভাবী, অভুক্ত, নিরন্ন থাকবে না এটাই আমাদের দেখতে হবে। জাকাত নিজ উদ্যোগেই গরিব খুঁজে খুঁজে বণ্টন করতে হবে।
ঈদের দিনে দান-সদকাহ করা এবং গরিবদের মাঝে খাবার বিতরণ খুবই উত্তম আমল। ঈদ নামাজ শেষে শুধু আত্মীয়স্বজন নয়, আশপাশের সব অসহায় গরিব প্রতিবেশীকে ঘরে ডেকে এনে সেমাই-হালুয়া খাওয়াবেন। পারলে ভাতও খাওয়াবেন। মাছ-মাংস দিয়ে আপনি যদি তৃপ্তিসহ একবেলা খাবার খাওয়ান, তাতে তারা খুবই খুশি হবেন। এতে আপনার প্রতি সদয় হবেন স্বয়ং আল্লাহ পাক। মানুষকে তৃপ্তিসহ খাওয়ানো অত্যন্ত পুণ্যময় আমল।
ঈদের জামাতে যাওয়ার সময় পকেটভর্তি টাকা নেবেন। অন্তত তিন-চার হাজার টাকা নিয়ে যাবেন। মসজিদের ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিন, খাদেমদের বখশিশ দেবেন। কেননা পুরো মাস ওরা মসজিদে আপনার পাশে ছিলেন। দ্বীনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ৫০ বা ১০০ টাকার নিচে কোনো গরিবকে টাকা দেবেন না। আর পারলে একেকজন ধনী একেকটি পরিবারের দায়িত্ব নিন। জনপ্রতি শ-দুইশ টাকা না দিয়ে একজন গরিব বাছাই করুন। লাখ দুই লাখ টাকা ওই একজন গরিবকে গছিয়ে দিয়ে তাকে স্থায়ীভাবে জাকাতের টাকায় সচ্ছল করে দিন। এ বছর জাকাতগ্রহীতা আগামী বছর যাতে আর জাকাত নিতে না আসেন। জাকাতের টাকায় গরিবের ভাগ্য বদলে দিন। করোনাকালে এই ঈদে সর্বশক্তি নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ান।

আ য ম খোরশিদ আলম খান
সাংবাদিক, ইসলামী চিন্তাবিদ।