দেবদাসের জন্য দুঃখগাথা

আগের সংবাদ

পিপিই সঙ্কটে উদ্বেগ, ডাক্তারকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি

পরের সংবাদ

শিক্ষাগুরু আনিসুজ্জামান

বিমল গুহ

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২১, ২০২০ , ১১:১১ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের এক কীর্তিমান মনীষীর নাম আনিসুজ্জামান। এই একটি শব্দে প্রকাশিত নামটিই যথেষ্ট তাঁর গুণাবলি প্রকাশের জন্য। যদিও তাঁর পুরো নাম ছিল এ টি এম আনিসুজ্জামান। পরিচিতির ক্ষেত্রে দীর্ঘনাম পরিত্যাগ করে ‘আনিসুজ্জামান’ এই একটি শব্দেই পরিচিত হন তিনি। হয়ে উঠেন সকল মানবিক গুণাবলির আধার। আমরা দেখেছি কখনো কখনো কোনো নাম আদর্শের প্রতীক হয়ে যায়। আনিসুজ্জামান তেমন এক নামের ধারক। জীবনকালে তিনি সমাজের সকলের মান্যতা পেয়েছেন, তাঁর প্রজ্ঞান ও সুবিবেচনাপ্রসূত মত প্রকাশের জন্য। আমাদের বিবেচনা মতো আর কোনো বিশেষণ বাকি নেই আজ নতুন করে বলার জন্য। তবুও বলছি, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন আমাদের মানবিক বটবৃক্ষ যার ছায়াতল ছিল আমাদের পরম আশ্রয়।
তিনি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জীবিত পণ্ডিতগণের প্রায় সকলের সরাসরি শিক্ষক। মাত্র ২২ বছর বয়সে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে শিক্ষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছিলেন। ব্যক্তিগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে তখন তিনি হয়ে ওঠেন সকলের প্রিয়জন। ছাত্র হিসেবে মেধাবী ও মনোযোগী ছিলেন বলে শিক্ষকদের প্রিয় ছিলেন। কর্মজীবনে সৎ, সুবিবেচক ও দৃঢ়চেতা হিসেবে পরিচিত হতে পেরেছিলেন বলে সকল পর্যায়ের ছাত্র-শিক্ষক ও অভিভাবকের আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। মানুষকে সম্মান দিতে জানতেন। ছাত্রছাত্রীদের ভালোবাসতে জানতেন, কাজে উৎসাহ দিতে কার্পণ্য করতেন না। এই হলো শিক্ষক আনিসুজ্জামানের প্রতিকৃতি।
আমরা কথায় কথায় বলি আনিস স্যার। সরাসরি না-হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের মান্যশিক্ষক হিসেবে এমনিতেই সকলের শিক্ষক ছিলেন তিনি। সমাজের আকাক্সক্ষা যখন কোনো মানুষের মধ্যে প্রতিফলিত হয়, সকলের বাসনাকে যখন সততা ও সাহসের সঙ্গে দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করতে পারেন কেউ তখন তিনি সমাজের প্রতিবিম্ব হয়ে দাঁড়ান, পরিগণিত হন মূল্যবোধের প্রতীক রূপে। তার জন্য দরকার সুবিবেচনাবোধ, সততা ও সাহসী মন। প্রকৃত অর্থেই ‘বুদ্ধিজীবী’ ছিলেন তিনি। আজকাল তেমন মানুষের অভাব এই সমাজে প্রকট। বুদ্ধিজীবীর নামে আজ দেখি চারদিকে বামনের আধিক্য! সমাজ তাই দিনদিন ছুটছে পেছনের পানে। এর কারণ দুটি এক. সুবিবেচনাবোধে উদ্বুদ্ধ হবে, তেমন শিক্ষার অভাব। দুই. সততাবর্জিত অর্থনৈতিক-কাঠামোর প্রভাব। সুবিবেচনাবোধ জাগানোর জন্য সমাজের প্রত্যাশিত আদর্শ-শিক্ষকের শূন্যতা পূরণ করতে শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানো দরকার। শিক্ষকের মর্যাদার স্থান নির্দিষ্ট করা উচিত, একই সাথে মানও। প্রাথমিক শিক্ষার দিকে নজর দিতে হবে সবার আগে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকতা পেশায় আমরা তেমন আগের দিনে দেখতাম মেধাবীদের স্থান। আজকের দিনে সেই স্থান করে দিতে হবে সকল সুযোগ-সুবিধা ও সম্মানসহ। এই পর্যায়ের শিক্ষকের বেলায় সমাজের মনোভাব ‘যার নাই চাকুরি, সে করে মাস্টারি’ ধারণা বড়বেশি পাল্টায়নি। এ থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে আমাদের।
উপরের স্তরের শিক্ষকদের মধ্যেও একজন আনিসুজ্জামানের মতো শিক্ষক খুঁজে পেতে কষ্ট হয় আমাদের। তার পেছনেও নানা কারণ নিহিত যার জন্য সমাজব্যবস্থা দায়ী। আনিসুজ্জামানের মতো এখনো যে-কজন শিক্ষক আছেন তাঁদের আদর্শ অনুসরণ করে এগোতে পারলে আগামীতে পরিবর্তন হবে আমাদের সমাজ। আমাদের সে প্রত্যাশা থাকতেই হবে। কারণ, ভবিষ্যৎ সব সময় সম্ভাবনার দ্বার খুলে রাখে আগামীর জন্য। আমরা মানি একজন শিক্ষক হচ্ছে ছাত্রের অভিভাবক। পৃথিবীর বহু দেশে এরকম উদাহরণ আছে। আগেকার দিনে গুরুগৃহ ছিল বিদ্যাশিক্ষার স্থান। এখন যে-আধুনিক শিক্ষালয় স্থাপিত হয়েছে, তা তো আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় অনেক উন্নত। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কেও সুন্দর হতে হবে আমাদেরকে। সমাজে প্রকৃত নাগরিক তৈরি করতে হলে প্রথমে তাকে মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। মানবিকবোধসম্পন্ন মানুষ।
শিক্ষক আনিসুজ্জামানের স্মৃতি বারবার সামনে চলে আসে, যখন শিক্ষক হিসেবে কীভাবে তাঁকে পেয়েছিলাম সেই কথা মনে পড়ে। ড. আনিসুজ্জামান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে রিডার হিসেবে যোগ দেন ১৯৬৯ সালে স্বাধীনতার ঠিক আগের বছর। আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই এর পরের বছর ১৯৭০ সালে গণিত বিভাগে প্রথম বর্ষ অনার্স কোর্সে। তখন গণিত বিভাগ ছিল কলাভবনের তিনতলায়। দোতলায় বাংলা বিভাগ। বিভাগের বারান্দা দিয়ে হেঁটে যেতেই বিভাগীয় প্রধানের পাশের কক্ষে ‘ড. আনিসুজ্জামান, রিডার’ এই নামফলক চোখে পড়তো। তখন থেকে তাঁর নামের সঙ্গে আমার পরিচয়। বিভাগের কৃতী-শিক্ষক হিসেবে সবাই তাঁকে জানে। তখন তাঁকে দেখেছি স্যুট-পরিহিত স্মার্ট এক মানুষ। কথাবার্তায় ব্যক্তিত্বের ছাপ। গ্রাম থেকে-আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নতুন ছাত্রের চোখে যেন একজন কাক্সিক্ষত শিক্ষকের প্রতিচ্ছবি। অবশ্য সেই সময়ে গণিত বিভাগের প্রধান ড. রাশীদুল হকের ব্যক্তিত্বও আমাকে আকর্ষণ করতো।
স্বাধীনতার পরের বছর আমি গণিত বিভাগ ছেড়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার জন্য বাংলা বিভাগের প্রধানের কাছে আবেদন করি। তখন বিভাগীয় প্রধান ড. আনিসুজ্জামান। গণিত বিভাগ থেকে বাংলা বিভাগে বদলি হয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই এই বলে আমার আবেদনের ওপর তিনি ইংরেজি বড় অক্ষরে ঘঙ লিখে অফিস সহকারীকে আমার আবেদনপত্রটা দিলেন। বাংলা বিভাগে আমার ভর্তির স্বপ্ন যেন শেষ হয়ে গেলো! দুদিন পর আবার গেলাম। বললাম আমি প্রথম বর্ষে ভর্তি হতে চাই। বললেন গণিত বিভাগ ছেড়ে আসবে কেন? আরো বুঝে দেখো। আমি দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেলাম। তখন প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। এরপর আবার গিয়ে দেখা করলাম একদিন। তখন আমাকে একটা প্রশ্নপত্র আর একটা খাতা দিয়ে বললেন, পাশের কক্ষে বসে পরীক্ষা দাও। পরীক্ষা দিলাম। আমার উত্তরপত্র দেখে বললেন ভর্তি হতে পারবে। অফিস সহকারীকে ডেকে আমার পুরানো আবেদনপত্রে যেখানে ঘঙ লিখেছিলেন, তার পাশে ইংরেজি বড় অক্ষরে আবার লিখে দিলেন ঙইঔঊঈঞওঙঘ; তার মানে দাঁড়ালো ভর্তিতে আপত্তি নেই। তখন বিভাগীয় প্রধানের সুপারিশের ভিত্তিতে ছাত্র ভর্তি করা হতো। অফিসের কাজকর্মও তখন ইংরেজিতে হতো। আমার আবেদন গৃহীত হয়ে গেলো। আমি বাংলা বিভাগের ছাত্র হলাম। শিক্ষক এখানে একজন ছাত্রের জীবনের কথা ভেবেছেন। একজন প্রকৃত শিক্ষক ছাত্রের জীবনের কথা ভাবেন তা বুঝতে পারেন।
আমি কবিতা লিখতাম। আমার কবিতা আনিসুজ্জামান স্যারের চোখে পড়লে দেখা হলেই বলতেন, উৎসাহ দিতেন। যখন থেকে আমি বাংলা বিভাগের ছাত্র, তখন থেকে আমি একজন আদর্শ শিক্ষককে এভাবে দেখে এসেছি। একজন মানুষকে প্রত্যক্ষ করেছি যিনি আমার দেখা পরিপূর্ণ মানুষ। উচ্চশিক্ষার দালিলিক প্রমাণ থাকা সতত্ত্বেও অনেককেই অর্ধ-মানুষ হিসেবে দেখি। একজন পূর্ণমানুষ সমাজকে, সমাজের মানুষকে দেখেন বৈষম্যহীন দৃষ্টিতে। এঁরা আগামীর সমাজকে দেখেন বর্তমানের নিরিখে। এঁরাই তো হতে পারেন সমাজের শিক্ষক, মহার্ঘ্য অর্থে জাতির শিক্ষক। এই শিক্ষকেরাই সমাজ গড়ার কারিগর। এটা কম কথা নয়। তেমন শিক্ষকের জন্য সমাজ যুগ যুগ অপেক্ষা করে।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আমার স্ত্রীরও সরাসরি শিক্ষক। আমার স্ত্রীর বেলায়ও তেমন মহানুভবতা দেখিয়েছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, যে-কারণে তারও উচ্চশিক্ষার পথ সুগম হয়েছিল। এই বিষয়গুলো অন্যদেরও জানা দরকার। তবেই দিকনির্দেশনা পাবে সমাজ, আগামী প্রজন্মের শিক্ষকেরা নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে চিন্তাশীল হবে। বিভিন্ন সময়ে আমার কন্যারাও পেয়েছে তাঁর শিক্ষা, কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলার মাধ্যমে। একবার আমার বড়মেয়ের অটোগ্রাফ খাতায় লিখে দিলেন ‘তোমার বাবা-মা আমার ছাত্র/ তুমি আমার প্রিয় পাত্র’। সত্যি আনিস স্যারের প্রিয় পাত্র ছিল আমাদের বড় মেয়ে। কচিকাঁচার ছোটদের অনুষ্ঠানের ক্ষুদে বক্তা ঈষিকা। বক্তৃতার পর তাকে ডেকে আদর করে দিলেন, আর শিখিয়ে দিলেন কিভাবে আরো ভালো বলা যায়! এ সবই তো শিক্ষা।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান জাতীয় অধ্যাপকের সম্মানে ভ‚ষিত। প্রকৃত অর্থেই এই পদের জন্য মান্যজন ছিলেন তিনি। তাঁর পাণ্ডিত্যও সর্বজনবিদিত। অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। জাতীয় ইতিহাসের সকল কার্যক্রমে যুক্ত থেকেছেন, অনন্যসাধারণ অবদান রেখেছেন। তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা তাঁকে পরিণত করেছে সমাজের শীর্ষ ব্যক্তিতে। জাতির শিক্ষক হিসেবেও মান্যতা পেয়েছেন তিনি। সমাজ তাঁকে নানা অভিধায় ভ‚ষিত করেছে তাঁর জীবতকালে জ্ঞানগুরু, বাতিঘর, জাতির বিবেক ইত্যাদি।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে আমি শিক্ষাগুরু হিসেবেই দেখি এবং মান্য করি। প্রকৃত গুরুর গুণাবলি আমি তাঁর মধ্যে দেখেছি। শিক্ষাগুরু শব্দবন্ধটি নতুন নয়। তিনি শিক্ষাগুরু এজন্য যে, তিনি তাঁর শিষ্যদের আদর্শপথের নির্দেশ দিতে পেরেছেন, তাদের মানুষ হওয়ার পথের অনুসারী করে তুলতে পেরেছেন। শিক্ষকের আদর্শের পথে শিষ্যদের অনুসারী করে তুলতে পারার মধ্যে ‘গুরু’ পদবাচ্যটির প্রকৃত মাহাত্ম্য নিহিত। আমি আজ এই মহৎ শিক্ষকের প্রতি আনত প্রণতি জানাই, তাঁর স্মৃতিকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।

ডিসি