নির্দেশ অমান্য করায় ৩ মোটরসাইকেল শোরুমে জরিমানা

আগের সংবাদ

শিক্ষাগুরু আনিসুজ্জামান

পরের সংবাদ

দেবদাসের জন্য দুঃখগাথা

শ্যামল দত্ত

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২১, ২০২০ , ১১:০৪ অপরাহ্ণ

বাংলা সাহিত্যের এক ট্র্যাজিক হিরোর নাম দেবদাস। বাঙালির মধ্যবিত্ত মানসে দেবদাস নামটি এক প্রেমিক চরিত্র হিসেবে দখল করে আছে। এক করুণ ও বিরহী মানুষ দেবদাস যে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছে প্রেমিকা পার্বতী তথা পারুকে পাওয়ার প্রত্যাশায়। শরৎচন্দ্র ১৯১৭ সালে যখন উপন্যাসটি লেখেন, তখন এ নিয়ে খুব বেশি হইচই হয়নি। সে সময়টা মূলত সাহিত্যের আকাশে আলোকোজ্জ্বল ও দেদীপ্যমান এক সাহিত্যিকের নাম কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরবর্তী কয়েক দশক পুরো বাংলা সাহিত্যের পুরোধায় ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু রবীন্দ্র বলয়ের বাইরেও বাংলা সাহিত্যের এই রেনেসাঁর যুগে কাজী নজরুল ইসলাম ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ অনেক সাহিত্যিক নিজস্ব প্রতিভায় বিকশিত হয়েছেন বাঙালি পাঠক সমাজে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের নানা বিষয় তুলে এনেছেন তার চরিত্রহীন, পথের দাবি, পরিণীতা, দত্তা, বৈকুণ্ঠের উইল, শ্রীকান্ত কিংবা সবচেয়ে আলোচিত দেবদাস উপন্যাসে। তার বহুল আলোচিত দেবদাস উপন্যাস নিয়ে বিভিন্ন সময় বাংলাসহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের ১৭টি ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, যার কোনো দ্বিতীয় নজির নেই। এক ভাষাতেই কয়েকবার চলচ্চিত্র তৈরি হওয়ায় রেকর্ডও একমাত্র দেবদাস উপন্যাসের। এর মূল কারণ, বাঙালি মূলত বিরহী প্রেমিক চরিত্রটি হৃদয়ের ভেতরে পুষে রাখে এবং যে চরিত্রের মাঝে আবিষ্কার করতে চায় নিজেকেই। তাই দেবদাসের ভ‚মিকায় নিজেকে কল্পনা করেনি এমন বাঙালি বোধহয় খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন।
তবে আমি এক ভিন্ন দেবদাসের কথা তুলে ধরতে চাই আজ, যে দেবদাস একেবারেই সাদামাটা চরিত্রের এক নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ। যার সঙ্গে তুলনা হবে না শরৎচন্দ্রের দেবদাস চরিত্রের। সমাজ, পরিবার অর্থ-বিত্ত কোনো কিছুতেই মিলবে না এই দেবদাস, শরৎচন্দ্রের দেবদাসের সাথে কিন্তু তারপরও প্রশ্ন উঠতে পারে কেন এই দেবদাসের কথা আমি বলছি। আমার কাছে মনে হয়েছে এই দেবদাসের করুণ মৃত্যু ট্র্যাজেডির দিক থেকে কোনো অংশে কম হৃদয়গ্রাহী নয়। এই দেবদাসের অসহায় মৃত্যু কাহিনী শুনলে আপনারও হৃদয়ে জমা হবে করুণ অনুভূতি। চোখের কোণে দুফোঁটা অশ্রুজল জমলেও জমতে পারে। শরৎচন্দ্রের দেবদাস তৎকালীন রক্ষণশীল বাঙালি সমাজের মনোজগত ও অনুশাসনের শিকার। আর এই দেবদাস আমাদের রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও স্বাস্থ্যের অব্যবস্থাপনার বলি। দুটো মৃত্যুর ভিন্ন কারণ ও ভিন্ন প্রেক্ষিত হলে যে মৃত্যু মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন তোলে তাতে মিল খুঁজে পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। মিল খুঁজতে যাওয়াও অযৌক্তিক নয়।
এই দেবদাস অর্থাৎ দেবদাস বাড়ৈ ভোরের কাগজের বিজ্ঞাপন বিভাগের একজন নির্বাহী, মারা গেছে গত ৪ মে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। করোনার এই দুর্যোগে কত মানুষই তো মারা যাচ্ছে। একজন দেবদাস বাড়ৈর মৃত্যুতে কি আসে যায়? কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, দেবদাস করোনায় মারা যায়নি। মারা গেছে, করোনার এই সময়ে পুরো স্বাস্থ্য বিভাগের যে অব্যবস্থাপনা তার ভিকটিম হিসেবে। তাই তার এই অস্বাভাবিক মৃত্যু মেনে নেয়াটাই অন্যায়। মেনে নিতে পারছি না আমরা তার সহকর্মীরা। প্রায় কয়েক সপ্তাহ ধরেই জ্বরে ভুগছিলেন দেবদাস। যেহেতু আমাদের অধিকাংশ সহকর্মী বাসা থেকেই কাজ করছে, তাই খুব বেশি খবর নেয়া হয়নি। শুধু এটুকু শুনেছি, যে অসুস্থ, হালকা জ্বর। আর আগে থেকেই তার ছিল উচ্চ রক্তচাপের রোগ। দেবদাসের স্ত্রী একজন সিনিয়র নার্স। চাকরি করেন ল্যাবএইডে। স্বাস্থ্য বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা আছে। জ্বর না কমায় তিনি দেবদাসকে ভর্তি করিয়েছেন ঢাকা মেডিকেলে। বাসায় দেখাশোনা করার লোক না থাকায় ১২ বছরের মেয়ে দরিয়া বাড়ৈ আর ৯ বছরের ছেলে রুদ্র বাড়ৈকে পাঠিয়ে দিয়েছেন গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের ডাসারে। ঢাকা মেডিকেলে করোনা পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ, তারপরও সুস্থ হয় না দেবদাস। ডাক্তার একপর্যায়ে তার রোগ চিহ্নিত করল টাইফয়েড। কয়েকটি ইনজেকশন ও নানা ওষুধ দেয়া হলো। কিন্তু দেবদাসের শারীরিক অবস্থা আরো খারাপ হতে লাগল। ৪ মে দুপুরে অবস্থা এতটাই খারাপ যে তার আইসিইউ দরকার। কিন্তু ঢাকা মেডিকেলে সাধারণ রোগীর জন্যে আইসিইউ পাওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। দুপুর ২টায় হাসপাতালের বেড থেকে দেবদাস ফোন করলেন আমাকে। অনুরোধ “দাদা একটা আইসিইউ কোনোভাবে ব্যবস্থা করা যায় কিনা”। ফোন করলাম অফিসে, আমাদের মেডিকেল প্রতিনিধি হায়দারকে, আমাদের স্বাস্থ্য বিটের রিপোর্টার সেবিকাকে। চেষ্টা তদবির করে একটি আইসিইউ লেখানো হলো দেবদাসের জন্য। এর মধ্যে তিনঘণ্টা পার হয়ে গেলো এবং দেবদাসের অবস্থা আরো খারাপ। করোনা রোগী না হয়েও করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসা হচ্ছিল দেবদাসের। বিকেল ৫টা, ওয়ার্ড থেকে আইসিইউ পর্যন্ত নেয়ার কোনো ওয়ার্ড বয় পাওয়া গেলো না ঢাকা মেডিকেলে। দেবদাস বুঝতে পারছেন মৃত্যু তার ঘনিয়ে এসেছে। স্ত্রীকে বললেন, আইসিইউর চিন্তা এখন বাদ দাও। বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের কাছে ফোন করে মাফ চাইলেন যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন। ভাইকে অনুরোধ করলেন তোর বৌদির সাথে আমার একটি ছবি তুলে দে। দেবদাসের নিজের মোবাইলে তোলা ছবিটা দেখতে দেখতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন দেবদাস।
মৃত্যুর পর ঢাকা মেডিকেলের তৎপরতা ছিল দেখার মতো। করোনা ওয়ার্ডে মৃত্যু। তাই করোনা পরীক্ষা ছাড়া এখন লাশ ছাড়বে না ঢাকা মেডিকেল কর্তৃপক্ষ। পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে পেতে রাত প্রায় শেষ। প্রায় ভোর রাতের দিকে কিছু স্বেচ্ছাসেবকের সহযোগিতায় করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়ে দেবদাসের স্ত্রী লাশ নিয়ে রওনা হলেন পোস্তগোলা শ্মশানের দিকে। ওদিকে গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের ডাসারে মৃত পিতার কল্পিত চেহারা আঁকতে আঁকতে কেঁদে বুক ভাসাছে দুই কিশোর-কিশোরী। ১২ বছরের মেয়ে দরিয়া আর ৯ বছরের ছেলে রুদ্র। পোস্তগোলার শ্মশানে দেবদাসের শেষকৃত্য যখন শেষ তখন ভোরের সূর্য উঠছে আকাশে। চুলার শেষ আগুনে কলসির পানি ঢেলে চিতা নেভালেন তার স্ত্রী।
শরৎচন্দ্রের দেবদাস মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে ফিরে এসেছিলেন হাতিপোতার জমিদার বাড়িতে পার্বতীর কাছে। ভোরের সূর্য ওঠার সময় পার্বতী স্নান সেরে পূজায় বসার আগে হৈ চৈ শুনে পার্বতীর সৎপুত্র মহেন্দ্রর কাছে শুনলেন জমিদার বাড়ির সামনে বটতলায় যে লাশটি পড়ে আছে, তা আর কেউ নয়, তার প্রিয় দেবদার। দেবদাসের পকেটে পাওয়া দুটি চিঠির কথা জানতেই পার্বতী বুঝলো মৃত্যুর আগে দেবদাস আবার ফিরে এসেছিল পার্বতীর কাছে। কিন্তু দেবদাসের মৃতদেহের কাছে পৌঁছানোর জন্য জমিদার বাড়ির দরজাটি ছিল পার্বতীর জন্য চিরতরে বন্ধ। দেবদাস আর পার্বতীর মাঝখানে জমিদার বাড়ির অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর ভাঙার অসম্ভব কল্পনায় বাঙালি অঝরে চোখের জল ফেলেছে দেবদাসের জন্য। দেবদাসের জন্য প্রবহমান সেই চোখের জল এখনো ঝরছে কোথাও না কোথাও। সেটা অস্বীকার করার উপায় যেমন নেই, আবার এই সমাজে কত দেবদাস যে কতভাবে করুণ মৃত্যুর শিকার হচ্ছে তার হিসাবটাই বা কে রাখছে।

ডিসি