চ্যাম্পিয়ন কলম্বিয়ার সারা লোপেজ

আগের সংবাদ

পাখিপুরাণ : ফরিদ আহমদ দুলাল

পরের সংবাদ

গ্রহে আজ শনিসংকেত

তাহমিনা কোরাইশী

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২১, ২০২০ , ১০:৫৬ অপরাহ্ণ

হঠাৎ বুকে চাপ চাপ ব্যথা অনুভব করছেন মতিন সাহেব। দুচোখ জুড়ে শর্ষে ফুলে সূর্যের আলোয় মরীচিকা যেন জ্বলজ্বল করছে। চোখে ধাঁধা লেগে যায়। পরক্ষণেই রঙ বদলে মাঠজুড়ে হাজার হাজার সাদা সাদা ঢেউ। ঐগুলো কি মানুষের কফিন? বুঝতে পারে না মতিন সাহেব। বিছানা থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়ে। এ কি দেখলো ভরদুপুরে ভাতঘুম ঘোরে! রীতিমতো শরীর কাঁপছে। গলা শুকিয়ে একেবারে কাঠ। জল জল বলে কিছুক্ষণ চিৎকার করলো। কে দেবে জল, কে শুনবে তার স্বপ্নের বৃত্তান্ত? কে দেবে বাড়িয়ে হাত? আদর সোহাগে জড়িয়ে ধরে কে দেবে সান্ত¡না। নেই তো ধারেকাছে কেউ। কোনো আপনজন। বতর্মানে এই এপার্টমেন্টের সে একলা বসবাস করছে। যদিও এখন লকডাউনে আটকা পড়ে আছে ঘরে। নতুবা দিব্যি অফিস, বাসা আর সন্ধ্যায় ছুটা বুয়া এসে রান্না আর ঘর পরিষ্কার করে যাচ্ছিল দায়সারাভাবে। সময় ভালোই কাটছিল। কিন্তু মহামারি করোনার ভয়ে বাড়িওয়ালা বলেছেন নো ছুটা বুয়া, পেপারওয়ালা, তরকারিওয়ালা, মাছওয়ালা, ময়লাওয়ালা সব ওয়ালা বন্ধ। যার প্রয়োজন সে গেট থেকে নিয়ে যাবে। এরা লিফট বা সিঁড়ি ব্যবহার করতে পারবে না। মতিন সাহেব পড়েছে মহাঝামেলায়। অফিসে প্রচণ্ড কাজের চাপ আছে বলে স্ত্রী রুমানাকে একলাই পাঠিয়ে দিল অন্তঃসত্ত্বা মেয়ের কাছে। কি এমন মহাভারত অসুদ্ধ হয়ে যেতো দুজন এক সাথে অস্ট্রেলিয়া মেয়ের কাছে গেলে? রুমানা কতবার কান্নাকাটি করে বলেছে আমি কি কখনো তোমাকে ছেড়ে কোথাও একলা গেছি বা একলা থেকেছি এ জীবনে? মতিন সাহেব বলেছে মেয়ের কাছেই তো যাবে আর আমি দশ বার দিন বাদেই আসছি। আমার টিকেট ও ভিসা সবই তো আছে লক্ষীটি চিন্তা করো না। তাদের মেয়ে তিতলীও কখনো চায়নি মা একলা আসুক বাবাকে দেখবার কেউ তো নেই। দুবছর যাবত তিতলী স্বামীর সাথে বিদেশে। কতবার বলেছে যেতে বাবা মাকে। বাবার সময় হয়না। মা বাবাকে ছেড়ে যেতে চায়নি তাই আর যাওয়া হয়নি। সবেধন নীলমণি একটি মাত্র সন্তান তিতলি। আদরের ধন তার প্রথম সন্তান জন্মাবে আর মা পাশে থাকবে না তা কি হয়। ভীষণ দুশ্চিন্তায় কাটে সময় রুমানার। নাতনির জন্ম হয়। নানা কে ভিডিও কলে নাতনির ছবি দেখানো হয়। নানা এতেই খুশি। ওদের বুঝতে দেয়া তার মনের জ্বলাপোড়া আর ক্ষত। লকডাউনের মাঝে মতিন সাহেবের যাওয়া আর হলো না। ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেছে করোনার প্রকটে পেরেশান অবস্থা। নিজের হাতে রান্না, ঘরের কাজ, বাজার, দোকান কি নেই যে তাকে করতে হচ্ছে না? বাড়িওয়ালি দায়াপরবশ হয়ে মাঝে মধ্যে খাবার পাঠাতেন। এখন এই এপার্টমেন্টের মধ্যেও যাওয়া আসা বন্ধ। ফোনই ভরসা রুমানা কিছু রান্না শিখিয়ে দেয় আর আঁচলে লুকিয়ে রাখে যত কান্নার জল। ভীষণ আন্তর দহনে দাহ্য হয়ে চলেছে দুই প্রান্তরে দুটো মানুষ। হাত পা যে বাঁধা। কোনোভাবে মনকে সান্ত্বনা দেয় যায় না। কোনো দিক থেকেই জ্বালা প্রশমিত হয় না। কে জানে এমন এক মহাবিপদে পড়বে ওরা? মতিন সাহেব ভেবেছিলেন আদরের একমাত্র কন্যা সন্তান তিতলি কে সারপ্রাইজ দেবে এখন নিজেই সারপ্রাইজড্ হয়ে বসে আছেন। ভালো লাগছে না মতিন সাহেবের। একঘেয়েমি কষ্টকর এ জীবন। খেতেও ইচ্ছা হয় না। কখনো ডিম পাউরুটির দিয়ে চালিয়ে দেয়। কখনো না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। ওষুধ, খাওয়া-দাওয়া সবই লাগামহীন। শরীর ভালো যাচ্ছে না কয়েকদিন ধরে। স্ত্রী কন্যাকে বুঝতে দেয় না।শরীর এতোটা দুর্বল হয়ে পরে যে কোন কাজ হাতে ওঠে না। মোবাইলেও চার্জ দিতে ইচ্ছে হয় না। বিছানা ছেড়ে উঠে কিছু নিতে পারছে না। মোবাইল চার্জ দেবে আর বাথরুমের উদ্দেশ্যে একটু জোর করেই উঠতে হলো। বাথরুমের কাছাকাছি আসতেই হাত থেকে সেট পরে গেলো নিজেও বাথরুমের বেসিনে প্রচণ্ডভাবে মাথায় বাড়ি খেয়ে পড়ে রইলো।
অন্যদিকে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেই চলেছে রুমানা তিতলিরা। অবশেষে বাড়িওয়ালার দারস্থ হলো ফোনে। তিনিও গড়িমসি করে চার তলার এপার্টমেন্টের দরজায় টোকা এবং কলিংবেল বাজিয়ে চলেছেন প্রায় ঘণ্টাখানেক। সাড়া শব্দ নেই। তিনিও ভয় পেয়ে গেলেন যথারীতি জানানো হলো রুমানা আর তিতলিকে। সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় পাগল প্রায় স্ত্রী সন্তান। ক‚লের সন্ধান দেবার কেউ নেই। চিৎকার করে রুমানা আল্লাহ্ তায়ালা কে বলে এ কেমন দিন দেখালে খোদা! কান্নার রোল কম্পিত করে চলেছে।
অবশেষে বাড়িওয়ালা পুলিশের আশ্রয় নেন। তারা এসে ঘরের দরজা ভেঙে বাথরুমে পড়ে থাকা বীভৎস ঠাণ্ডা কঠিন এক শবদেহ উদ্ধার করে। পাশেই পড়ে আছে দমবন্ধ মৃত সেল ফোনটি। এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে লাশ বহন করার এক দল সেবক খাঁটিয়াসহ অ্যাম্বুলেন্স।
নিঃসঙ্গ একলা একাকী এই শবযাত্রায় নেই আত্মার আত্মীয়। মর্মান্তিক মর্মাহত আর্তনাদে আকাশ বাতাস ক্রন্দনরত। বাইরে তখন বিপুল মাতমে বর্ষণ।

ডিসি