আমফানেরও তাণ্ডব ঠেকালো সুন্দরবন

আগের সংবাদ
মাইকের হোল্ডিং

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের গোপন লেনদেন

পরের সংবাদ

করোনায় অন্নসংস্থানের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে

শরীফা বুলবুল

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২১, ২০২০ , ১:১১ অপরাহ্ণ

বুলবুল চৌধুরী। কথাসাহিত্যিক। জীবনকে শিল্পের কাছে সমর্পণ করেছেন তিনি। সমাজের নিম্ন শ্রেণির নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষদের ভেতরের কথকতাকে ঠাঁই দিয়েছেন তার সাহিত্যে। যে সাহিত্যের ভাষাবোধ অত্যন্ত শক্তিশালী। তার বিষয়বস্তুর ভেতরেও প্রোথিত হয়েছে সমকালীন ভাবনা। কথ্যভাষ্য সাহিত্যে রূপদানকারী হিসেবেও তিনি অত্যুজ্জ্বল এক কারিগর। কথ্যভাষায় রং এবং উপমায় তিনি স্বতন্ত্র। বুলবুল চৌধুরী তার দরদি এবং মায়াভরা আঙুল দিয়ে লালন করে চলছেন শিল্পসাহিত্য। নগরের নানা রেখা-উপরেখা ছুঁয়ে গেলেও গ্রামীণ অভিজ্ঞতায় তার প্রধান অবলম্বন খোলা চোখে প্রবহমান জীবন দেখা। সেই জীবনের ভেতর দিয়ে বুলবুল চৌধুরী ঢুকে পড়েছেন মানুষের অন্দর মহলে। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে লেখালেখিতে থাকলেও সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে খুব কমই লিখেছেন তিনি। তবে যা লিখেছেন তাই হয়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্যের অনন্য সম্পদ।

বিশিষ্ট এই কথাসাহিত্যিকের করোনাকাল কেমন কাটছে জানতে চাইলে ভোরের কাগজকে তিনি বলেন, মন্দ নেই। বেঁচে থাকাটাই তো মজার। ভালো থাকি আর মন্দ থাকি, বিস্ময়ের ঘোর নিয়ে থাকি। যে অবস্থায়ই থাকি না কেন জীবনকে অনুভব করি। কিন্তু করোনা এমন এক দুর্যোগ যা অনুভব করার মতো নয়। একেবারে ভয়ংকর। এর থেকে বাঁচতে সবার মতো আমিও ঘরবন্দি। আমি তো লেখালেখি করেই জীবন চালাই। লেখালেখিটাই আমার অন্নসংস্থানের একমাত্র রাস্তা। করোনার কারণে অন্নসংস্থানের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। এক সময় আমি সমকালে চাকরি করতাম। আমার বন্ধু ছিলেন সম্পাদক গোলাম সারোয়ার। তিনি আমাকে বেশ পছন্দ করতেন। একদিন তাকে গিয়ে বললাম, আমি আর চাকরি করব না। তিনি বললেন, চাকরি করবেন না কেন? আমি বললাম, লেখালেখি করব। তিনি আর কিছু বললেন না। আমারও কেনজানি মনে হচ্ছিল ভালো লিখতে হলে বয়স লাগে, জীবন বোধ লাগে। আমার আরো মনে হয়েছিল, সেটা আমার হয়েছে। সেই অর্থেই চাকরি-বাকরি ছেড়ে, ভালো পয়সার লোভ ছেড়ে লেখালেখিতে চলে আসি। আমার বইয়ের তেমন বিক্রি কিংবা প্রচার প্রসারও নেই। তবু যাই হোক এটাই আমার অন্নসংস্থানের রাস্তা। পাণ্ডুলিপি দিলে টাকা পাই বাংলাবাজারের প্রকাশকদের কাছ থেকে। এছাড়া আমার গোটা বিশেক বই আছে, সেসব থেকে রয়্যালিটিও পাই। ঈদ সংখ্যায় লিখে এবং কিছু সম্পাদনার কাজ করেও টাকা পাই।

বয়স নিয়ে একটা উপন্যাস লিখছি। এর নামই রেখেছি ‘বয়স’। আমার তো তিয়াত্তর বছর বয়স। আমার বাড়িটা হাউজিংয়ে দিয়ে একটা বাসা ভাড়া নিয়েছি। সেখানে আশপাশে দু-তিনটা মসজিদ আছে। লেখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সে কারণেই বলছি। সেসব মসজিদ থেকে মাঝে মধ্যে শুনি একটি দুঃসংবাদ, অমুক মারা গিয়েছেন জানাজা হবে। আমি নামাজ রোজা করি না। তবে ঈশ্বর বিশ্বাস করি। তো ওইসব কথা আত্মার মধ্যে ঘোরাঘুরি করে, কথা বলি, এটা আমি নয়, হয়তো তা আমাকে দিয়ে কেউ না কেউ করিয়ে নিচ্ছেন। এমনও ভাবি, আমরা তো পরিষ্কারভাবেই দেখি ঈশ্বর জীবনতরী, পৃথিবী বানিয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি তো মহাশক্তি। ভাবছি, নিজের বয়স হয়ে গেছে, এই বোধগুলো নিয়েই লেখাটা এগুচ্ছে। পরে দেখি করোনা এসে হাজির। এর মধ্যে বয়স আর করোনা একীভ‚ত করে ফেলেছি। ভাবছি, লেখার নায়ক অর্থাৎ লোকটার চারপাশের ছেলেমেয়ে, সংসারের জটাজাল, তার চারপাশের অবস্থাগুলো, বোধগুলো নিয়ে একটা ঘোর তৈরি করব। করোনার ঘোর। এমন একটা অবস্থা তার স্বপ্নে ঘটে যাবে।

বুলবুল চৌধুরীর গ্রন্থ

করোনা তাহলে উপন্যাসের প্লটই বদলে দিল? বুলবুল চৌধুরী বলেন, তাই তো হলো। আমি বিশ্বাস করি, মানুষ অপরিসীম শক্তির অধিকারী। যাই হোক না কেন মানুষ এর একটা বিহীত বের করতে পারবে। কিন্তু সময় লাগবে। মানুষের বোধগুলো নতুন করে জাগ্রত হবে। মানুষ আরো সাবধান হবে, সজাগ হবে। এর মধ্য দিয়ে মানুষের শেখা উচিত। আবহাওয়া, প্রকৃতি, মানুষ সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবা উচিত। আমার বাসার সামনে কিছু গাছপালা আছে। সেগুলো দূষণ থেকে মুক্তি পেয়ে এত সবুজ হয়ে উঠেছে! যা কখনো দেখিনি। গাছেরও তো প্রাণ আছে, তারাও মনে হচ্ছে বহুদিন পর নিঃশ্বাস নিচ্ছে।

আপনি তো বললেন, মানুষ অপরিসীম শক্তির অধিকারী, তো এই বিপর্যয় মানুষ কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে মনে করেন? বুলবুল চৌধুরী বলেন, কিছু না কিছু প্রতিষেধক তৈরি হচ্ছে, এটা বেরুবেই। মানুষ তা সম্ভব করতে পারবেই। যে মানুষ আকাশে উড়ছে, কতো কিছুই করছে তা তো ভাবাই যায় না।

করোনা আপনার চেনা পৃথিবীটাকে বদলে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেবল বদল নয়, করোনা নাড়া দিয়ে যাচ্ছে একেবারে। এটা আমার কেন কারো কল্পনায়ই ছিল না। এই নাড়াটা একেবারে প্রবল। আগেও হয়েছে এমন ঘটনা, এটার ব্যাপকতা বা প্রসারতা প্রবল। কি পড়ছেন জানতে চাইলে এই কথাসাহিত্যিক বলেন, জীবনানন্দ দাশ, আবুল হাসান আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাদের লেখা পড়ছি এখন। জীবনানন্দের কবিতা আমি মনে মনে পড়ি। এখনো পড়ছি। সবসময়ই পড়ি।

এসআর