প্রকৌশলী দেলোয়ার হত্যায় দুই জনের স্বীকারোক্তি

আগের সংবাদ

এখনো গেল না আঁধার

পরের সংবাদ

এটাই যেন শেষ শপিং না হয়

প্রভাষ আমিন

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২১, ২০২০ , ১০:২১ অপরাহ্ণ

‘সাধারণ ছুটি’ বহাল থাকলেও ঈদকে সামনে রেখে গত ১০ মে থেকে সরকার শপিং মল খুলে দিয়েছে। এর আগেই খুলে দিয়েছে গার্মেন্টস এবং মসজিদ। আমি ভেবেছিলাম সরকার ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে শপিং মল খুলে দিলেও সেখানে মানুষ যাবে না। যার মাথার ওপর করোনা আতঙ্ক ঝুলে আছে, তার মাথায় শপিংয়ের ভাবনা আসতে পারে, এটা আমি বুঝিইনি। কিন্তু আমি বুঝলাম, বাঙালি আসলে বীরের জাতি। তারা করোনাকে ভয় পায় না। ওবায়দুল কাদেরের ভাষায় বলতে হয়, আমরা করোনার চেয়ে শক্তিশালী। সরকার শপিং মল খুলেছিল ব্যবসায়ীদের কথা ভেবে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বরং সংবেদনশীল আচরণ করলেন। দেশের অধিকাংশ বড় শপিং মল বন্ধই রাখলেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু গণআত্মহত্যায় মেতে উঠলেন যেন সাধারণ মানুষ। যেসব দোকান খুলেছে, সেসব মার্কেটে উপচেপড়া ভিড়। নিজের ভালোটা মানুষ বুঝবে না, এটা আমার বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
শপিং মল খোলার সিদ্ধান্তের তিন দিন পর মানে ১৩ মে দেশে তিনটি রেকর্ড হয়েছে। প্রথম দুটি রেকর্ড অবশ্য খুবই ক্ষণস্থায়ী। ক্ষণস্থায়ী রেকর্ড দুটির কথাই আগে বলি। সেদিন দেশে করোনা ভাইরাসের আঘাতে সর্বোচ্চ ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল, সেদিনের বিবেচনায় আক্রান্তের রেকর্ড হয়েছিল সর্বোচ্চ ১ হাজার ১৬২ জন। এ দুটি রেকর্ডের ভাঙা-গড়ার খেলা আপনাদের সবারই জানা। তৃতীয় রেকর্ডটি হয়তো আপনাদের অনেকেরই চোখ এড়িয়ে গেছে। ভিড় সামলাতে না পেরে বগুড়া নিউমার্কেট বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। শপিং মল বা দোকান খোলাই হয় যাতে বেশি করে মানুষ আসে, বেশি বিক্রি হয়। কিন্তু ভিড় ঠেকাতে বিশ্বে আগে কখনো কোনো মার্কেট বন্ধ করা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। পরে জানা গেল, শুধু বগুড়ায় নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভিড় ঠেকাতে না পেরে একের পর এক মার্কেট-শপিং মল বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু ভিড় ঠেকানো যায়নি। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে চুরি করে শপিংয়ে যাচ্ছে মানুষ। খবরে দেখলাম কোন এলাকায় যেন মার্কেটের টয়লেটে লুকিয়ে থাকা নারী-পুরুষ-শিশুসহ ২০ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
১৮ মে সোমবার আবার করোনা নতুন রেকর্ড গড়েছে। সেদিন আক্রান্ত ছিল সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬০২ জন, মৃত্যুও সর্বোচ্চ ২১ জনের। নতুন রেকর্ডের দিনের দুপুরে বিশিষ্ট আলোকচিত্রী রফিকুর রহমান রেকু ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করেন। তাতে দেখা যায়, উত্তরায় রাস্তার দুই পাশে বাম্পার টু বাম্পার জ্যাম। করোনা আসার পর একটা শব্দ অনেকবার শুনেছি লকডাউন। অবশ্য বাংলাদেশে লকডাউনের কোনো প্রয়োগ দেখিনি কখনো। কিন্তু রেকু ভাইয়ের তোলা উত্তরার ছবিটি দেখে আমার সেই শব্দটিই মনে পড়ল। উত্তরার রাস্তায় আসলেই লকডাউন পরিস্থিতি। অত দূর যেতে হবে কেন। আমার অফিস কারওয়ানবাজারে। আট তলা থেকে তাকালে বাংলা মোটর পর্যন্ত দেখা যায়। এই লেখা যখন লিখছি, তখন বাংলা মোটর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত গাড়িতে লকডাউন অবস্থা। অথচ দেশে বিশেষ ‘সাধারণ ছুটি’ চলছে। সাধারণ সময়ে ছুটির দিনে রাস্তায় এর চেয়ে কম লোক থাকে। সরকার ছুটি দিয়েছে মানুষকে ঘরে থাকার জন্য। তাহলে এত লোক রাস্তায় কী করছে? জিজ্ঞাসা করে দেখেন, এদের সবার মুখেই শক্ত যুক্তি শুনবেন। এটা আসলে যুক্তি নয়, অজুহাত। সরকার আপনাকে সবেতন ছুটি দিয়েছে, বাসায় থাকতে, সেটাও আপনার নিরাপত্তার জন্য। আর আমরা হাজারটা অজুহাত পকেটে নিয়ে, পুলিশের কাছে মিখ্যা বলে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর করোনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বাইরে যাওয়ার বিরোধিতা করলেই অনেকে দিন আনি দিন খাওয়া মানুষদের জীবিকার প্রশ্নটি সামনে আনেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন-ভাতার কথা টানেন। মজাটা হলো রাস্তায় কিন্তু অধিকাংশই প্রাইভেট কার। পছন্দের দোকানের জিলাপি কিনতে যাওয়াটা বা পুরান ঢাকার বিশেষ ইফতার কিনতে যাওয়াটা যদি আপনার কাছে জীবনের চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়, তাহলে কারোই কিছু করার নেই।
বেসরকার সাহায্য সংস্থা ব্র্যাক করোনায় দুগর্তদের জন্য অর্থসাহায্য তুলছে। সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছে, দুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে। আবার অধিকাংশ বড় শপিং মল বন্ধ থাকলেও ব্র্যাকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আড়ং কিন্তু খুলেছে। শুরুতে স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা বলা হলেও এখন আর সেসবের বালাই নেই। অধিকাংশ বড় শপিং মল বন্ধ থাকায় আড়ংই এখন সবার শেষ ভরসা যেন। সেখানে উপচেপড়া ভিড়। ব্র্যাক একদিকে দুর্গতদের জন্য টাকা তুলবে আর আড়ং করোনা বিস্তারের উর্বর ক্ষেত্র হবে; এটা স্ববিরোধিতার সর্বশেষ উদাহরণ। শুধু অভিজাত আড়ং নয়, ফুটপাতের বাজারেও উপচেপড়া ভিড়। শিশুদের নিয়ে সপরিবারে শপিং করতে বেড়িয়েছেন অনেকেই। কারো মুখেই মাস্ক নেই। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার ভাবনা তো অনেক দূরে। তাদের ছবি দেখলে বোঝার উপায় নেই, বিশ্বে মহামারি চলছে, বাংলাদেশেও প্রতিদিন গড়ে ২০ জন করে মারা যাচ্ছে এবং এখন পর্যন্ত ঘরে থাকা ছাড়া করোনা ঠেকানোর আর কোনো ব্যবস্থা আবিষ্কার হয়নি। শিশুদের নিয়ে শপিংয়ে যারা শপিংয়ে গেছেন, আমার খুব ইচ্ছা তাদের সঙ্গে কথা বলার। জানতে চাইতাম, ভাই, আপনি কি আপনার সন্তানকে ভালোবাসেন? আপনি কি কখনো আপনার সন্তানকে নিয়ে আগুনে ঝাঁপ দিতেন? ভাই, আপনি কি জানেন করোনা আগুনের চেয়েও ভয়ঙ্কর? ভাই, আপনি কি জানেন না করোনা আক্রান্ত হলে টেস্ট করানো অনেক কঠিন, তার চেয়ে কঠিন ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই? সব কিছু জেনেশুনে কেন আপনি আপনার সন্তানকে এত বড় ঝুঁকিতে ঠেলে দিলেন। সে তো শিশু কিছু বোঝে না। আপনিও তার মতো অবুঝ হয়ে গেলেন?
সরকার সাধারণ ছুটি দিয়ে অর্থনীতিকে অচল করে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটা নিয়ে ফেলেছে। অর্থনীতির বিনিময়ে সরকার জীবন কিনতে চেয়েছে। কিন্তু শুরু থেকেই সরকার ‘সাধারণ ছুটি’র ব্যাপারে বেশ নমনীয় ছিল। প্রথম কথা হলো, ‘সাধারণ ছুটি’ এই সফট টার্মটাই বিভ্রান্তিকর ছিল। ছুটিকে মানুষ ছুটির আমেজেই নিয়েছে। ইচ্ছামতো বাড়িতে যাওয়া-আসা করেছে। এখন আবার ঈদের আগে বাড়ির ফেরার দীর্ঘ জট। সাধারণ ছুটিতে মানুষ প্রতিদিন বাজার থেকে টাটকা মাছ-মাংস-সবজি কিনে এনেছে। এটা যে সাধারণ ‘সাধারণ ছুটি’ নয়, এটা বিপর্যয় ঠেকাতে অসাধারণ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য দেয়া; সেটাই মানুষ বুঝতেই পারেনি যেন। শপিং করা, ঘুরতে যাওয়া, বাড়ি যাওয়া, বাজারে যাওয়া দেখে মনে হয়েছে মানুষ এটাকে ছুটি হিসেবেই নিয়েছে। আসলে পরিস্থিতি বোঝাতে লকডাউন, জরুরি অবস্থা, কারফিউ এমন কোনো শব্দ প্রয়োগ করা উচিত ছিল। মিষ্টি কথায় বাঙালি কোনোদিনই বোঝেনি।
পুলিশকে আমি দোষ দেই না। বরং এই করোনাকালে সবচেয়ে কম ধন্যবাদে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছে পুলিশ বাহিনী। সত্যিকার অর্থেই তারা রাস্তায় বিনিদ্র রাত্রিযাপন করছে। সন্তান মাকে ফেলে দিলেও পুলিশ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। সার্বক্ষণিক কাজ করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭ জন পুলিশ জীবন দিয়েছে, আক্রান্তের সংখ্যাও প্রায় তিন হাজার। তারপরও পুলিশ কিন্তু রাস্তায়ই আছে। হয় রাস্তায়, নয় হাসপাতালে। পুলিশের আইজি বেনজীর আহমেদ যারা শপিংয়ে যাচ্ছেন, তাদের উদ্দেশে বলেছিলেন, দেখুন এই শপিংই যেন আপনার শেষ শপিং না হয়। বেনজীর আহমেদ সত্যি বিপদটা বুঝতে পারছেন। কিন্তু সেটা মানুষকে বোঝাতে পারছেন না। মানুষ না বুঝলে তাদেরই স্বার্থে জোর করে হলেও তাদের বোঝাতে হবে। ‘সাধারণ ছুটি’র বিলাসিতা প্রায় দুই মাস হলো। অনেকে নিশ্চয়ই ভাবছেন, আস্তে আস্তে সবই খুলে দিতে হবে। কিন্তু সবকিছুর আগে জীবন। আর আমাদের জীবন এখন ঝুঁকির মুখে। এখনো প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। তাই রিলাক্স করার কোনো সুযোগ নেই। বরং বাঁচতে হলে এখনই নিছক ‘সাধারণ ছুটি’ নয়, লকডাউন বা জরুরি অবস্থা বা কারফিউ দিতে হবে। আর সেটা কার্যকরে আইন প্রয়োগ পাশাপাশি কিছুটা বলপ্রয়োগও করতে হবে। মানুষকে বাঁচাতে হলে তাদের জোর করে হলেও ঘরে রাখতে হবে।

প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক ও কলাম লেখক; হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।
[email protected]