সেই রুপার পরিবারের ঈদ সামগ্রী দিলেন চেয়ারম্যান

আগের সংবাদ

আরো সতর্ক থাকি কিছুদিন

পরের সংবাদ

রোজা-ঈদে সামাজিক অনাচার থামাতে হবে

আ য ম খোরশিদ আলম খান

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২০, ২০২০ , ১১:৩৩ অপরাহ্ণ

রোজার দিনগুলো কাটে বন্দেগিতে, সিয়াম সাধনায়, দান সদকায়, কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ পাঠ এবং অজিফাসহ জিকির আজকার পাঠের মাধ্যমে। প্রতিটি রোজাদার চান এই মাসকে ইবাদত বন্দেগিতে কাটিয়ে দিতে। রোজা কোনো পালা-পার্বণ নয়। অথচ রোজার মাসেই দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে যা চলে আসছে, সামাজিক যে কুপ্রথা এবং সামাজিক যে অনাচার আজ ঘরে ঘরে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছে, তাতে শত শত গরিব মধ্যবিত্ত নিস্নমধ্যবিত্ত পরিবারে নেমে এসেছে নানামুখী বিড়ম্বনা ও সীমাহীন নিপীড়ন। আমাদের দেশে যে সব পরিবারের ঘরে বিয়ে উপযুক্ত কন্যা আছে, রোজার আগে যাদের বিয়ে হয়েছে, এমন গরিব ঘরের পিতা মাতাদের যেন মাথায় বাজ পড়ার দশা। কন্যা সন্তান একটি হলে মোটামুটি ধকল হয়তো সওয়া যায়। আর যেসব পরিবারে ৪/৫ জন বিয়ে উপযোগী কন্যা আছে, এমনকি এদের সবার বিয়েও ইতিমধ্যে হয়ে গেছে, তাহলে পিতা মাতাদের ওপর যে তীব্র আর্থিক ধকল সইতে হয় তা এককথায় অবর্ণনীয়। রোজার মাসে প্রতিটি কন্যার শ্বশুর বাড়িতে নিশ্চিতভাবে ইফতার সামগ্রী উপহার (!) হিসেবে পাঠাতে হবে। যার ৫ জন কন্যা আছে ৫ হাজার টাকা করে ধরলেও ২৫ হাজার টাকার ইফতারি দিতে হবে কন্যার শ্বশুরালয়ে। এতেও বিষয়টি থেমে নেই। রোজার মাস তিনেক আগে যে সব কন্যা সন্তানের বিয়ে হয়েছে, ধকলটা ওই কন্যাদায়গ্রস্ত পরিবারকে একটু বেশি সইতে হয়। শুধু যে ইফতারি দিতে হবে তা তো নয়। রোজার শেষে আসে ঈদ। কন্যার শ্বশুর, শাশুড়ি, ভাসুর, দেবর, ননদ, ননাস তাদের স্বামী এবং সন্তান ছেলেমেয়ে সবার জন্য ঈদের নতুন জামা কাপড় উপহার স্বরূপ পাঠাতে হবে। সাধারণত, উপহার সামগ্রীর দাম একটু কম হয়। কিন্তু কন্যার শ্বশুরালয়ে যে ঈদের জামা কাপড় উপহার দিতে হবে, তার দাম হতে হবে বেশি। মানও হতে হবে উন্নত। দামি কাপড় চোপড় না হলে তাহলে কত কথা শুনতে হয় কন্যাসহ তার পিতা মাতা ও ভাই বোনদের। ঈদে গড়পড়তা সবাইকে দামি পোশাক দিতে হবে এই সামাজিক অনাচার এলো কোত্থেকে বলা মুশকিল! আবার অনেক কন্যার শ্বশুরালয় থেকে আগ বাড়িয়ে লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে বলা হয়, আপনারা ভালো উন্নতমানের কাপড় চোপড় চিনবেন না। তা আমাদের পছন্দ নাও হতে পারে। অতএব অন্তত ৫০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিন। আমরা মার্কেটে গিয়ে নিজস্ব পছন্দ মতো জামা কাপড় কিনে নেব। এই তো গেল একজন কন্যার কথা। আরো চার জনের বেলায়ও গল্প একই। ঘটনাগুলোর চালচিত্র প্রায় একই ধরনের। ঘটনা কী এখানেই শেষ, মেয়ের ঘরে সন্তান আসবে, ৫/৬ মাস চলছে গর্ভের বয়স। তখন গুরা পিঠা দিতে হবে অবশ্যই। না হয় নানা কথা শোনানো হবে কন্যাকে। কন্যার ঘরে সন্তান জন্মেছে, তবে তো বিশাল বাজেট নিয়ে নামতে হবে কনেপক্ষকে। কন্যার শ্বশুরালয়ের ভাসুর দেবর বা ননদ ননাসের ছেলে সন্তান হয়েছে, তখনো কাপড় চোপড় তৈরি রান্না বান্নাসহ সবার জন্য উপহার নিয়ে হাজির হতে হবে। এতে একটুও দেরি করা যাবে না। এসব উপহার দিতে সামান্য হেরফের হলে বা দেরি হলে কন্যার স্বাভাবিক স্বস্তি শান্তি ওরা কেড়ে নেবে।
ঈদুল ফিতর তো কোনোভাবে কাটিয়ে দেয়া হলো। এবার এলো ঈদুল আজহা। যদি হয় প্রথম কুরবানির বছর তাহলে কন্যার শ্বশুরালয়ে বড় ধরনের উপহার পাঠাতে হবে। অর্থাৎ গরু বা পশু। তাও আবার কম দামি হলে চলবে না। নাদুস নুদুস পশু না হলে চলবে না। এখন তো ৫০/৬০ হাজার টাকা দিয়েও পশু মেলে না। তাই লাখ টাকা দামের পশু উপহার দিয়ে কন্যার শ্বশুরালয়কে হাসি খুশিতে ভরে তুলতে হবে। অভাবের কারণে কেউ যদি ছাগল দেয় তাতে উনাদের গোস্বা দেখে কে! হাবভাব যেন এটা কী কোনো উপহার হলো? এত কম দামি ছাগল?
পাঠক এবার বলুন, আমাদের দেশে মুসলিম সমাজে রোজার ঈদ কুরবানির মৌসুমে চলমান এসব সামাজিক ঈদ উপহারের কোনো দ্বীনি ভিত্তি আছে কী? এটি কী কন্যাপক্ষের ওপর সরাসরি অত্যাচার ও জুলুম নয়? ইসলামের কোথায় আছে পাত্র পক্ষের পরিবারকে এতভাবে উপহারের ঢালি দিয়ে খুুশি করার! এতে কন্যাপক্ষের আর্থিক সামর্থ্য আছে কিনা তা কী ভেবে দেখা হচ্ছে? এই সভ্য জগতে নব্য আইয়ামে জাহেলিয়াত রুখবে কে? সাহস নিয়ে কিছু মানুষকে তো এসবের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। এসব অনাচার এখনই থামান। সমস্ত কুসংস্কার কুপ্রথার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন ও সচেতনতা গড়ে তুলুন। সেই জাহেলিয়া যুগের মতো এই সভ্য যুগেও কন্যা সন্তান জন্ম নেয়া তাহলে কী অপরাধ হয়ে গেল না?

লেখক : সাংবাদিক, ইসলামি চিন্তাবিদ।