আরো সতর্ক থাকি কিছুদিন

আগের সংবাদ

পোশাক শ্রমিকদের বেতন-বোনাস

পরের সংবাদ

আসুন, বিভাজনের দেয়াল ভেঙে ফেলি

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২০, ২০২০ , ১১:৩৯ অপরাহ্ণ

আমার জীবনের বহুকাল পার হয়ে এখন করোনায় এসে থেমেছে। এই সুদীর্ঘ সময়ে আমি বহু কিছু দেখলাম। দেশ ও সমাজ বিভক্তি দেখলাম, রক্তের হোলি খেলা দেখলাম, তথাকথিত খাঁটি মুসলমানের সঙ্গে শঙ্কর মুসলমানদের বসবাস দেখলাম, ভাষাভিত্তিক বিভক্তি দেখলাম, দ্বিজাতিতত্তে¡র প্রবক্তাদের কারণে দুই অর্থনীতির শাসনের নামে শোষণ দেখলাম, নির্যাতন দেখলাম, গণহত্যা দেখলাম। উপায়ন্তর না দেখে রক্তস্নানে আপন গৃহে প্রত্যাবর্তন করলাম।
শত্রুর জাল ছিঁড়ে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরলেন, বাঙালিত্ব প্রতিষ্ঠায় নামলেন অর্থাৎ সুশাসন চিরায়ত করার পদক্ষেপসহ অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পা ফেললেন। রোগের প্রকৃত চিকিৎসা শুরুর অপচিকিৎসার অজুহাতে তাকে সপরিবারে হত্যা করেছে। তার প্রবর্তিত বাকশাল শেকড় গাড়তে পারলে দেশটা বহু আগেই ২০১৯ সালের অবস্থানে এসে পৌঁছাত। দেশের সব মানুষ হতো দেশটির মালিক। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন ক্ষমতাহীনদের ক্ষমতায়ন, আমলাদের পাশে জনপ্রতিনিধিদের সম্মানজনক অবস্থান, জোতদারের পাশে ভ‚মিহীন ও নিরন্নদের খাদ্যের নিশ্চয়তা, পুঁজিপতি ও মুৎসুদ্দিদের পাশে খেটেখাওয়া মানুষের সহাবস্থান। তাকে হত্যা করে মানুষে মানুষে ফারাক বিস্তৃত করা হলো, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশটাকে বাংলাদেশি ও বাঙালিতে বিভাজন করা হলো। তারা জিন্দাবাদের ভঙ্গুর প্রাচীর টেনে জয় বাংলাকে আড়াল করতে চেয়েছিল, দৃশ্যপটে সেই সাবেকী মুখাবয়ব নিয়ে আবিভর্‚ত হতে লাগল জোতদার, পুঁজিপতি, মুৎসুদ্দি, আমলাসহ আরো অনেকে। যাদের জনগণের সেবক হওয়ার কথা ছিল তারা শাসক, শোষক ও দণ্ডমুণ্ডের স্বঘোষিত নিয়ামক হলেন। এরপর অনেক জল গড়িয়ে গেল পদ্মা, মেঘনা, বুড়িগঙ্গায়। বহু তেল খড় পুড়িয়ে, বহু সংগ্রাম, ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে জনগণের ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলেন। তার পিতৃপ্রদত্ত ওয়াদামাফিক তিনি জনগণের ভাত, কাপড়, বাসস্থানের সংস্থান এবং শিক্ষা ও চিকিৎসার উন্নয়নে ব্রতী হলেন। পূর্বে সৃষ্ট বিভাজন ক্রমশ স্বল্প পরিসরে স্থিতি পেল। করোনা ভাইরাসের তাণ্ডব শুরুর আগে উন্নয়নের বহু সূচক বিশ্লেষণে দেখেছি মানুষের মাথাপিছু আয় ও গড় আয়ু বেড়েছে, প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, দারিদ্র্য কমেছে, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু কমেছে, ভিক্ষুক কমেছে, অভাবের তাড়নাজাত চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি কমেছে। দেশ ও বিশ্বকে বিস্মিত করা আরো বহু কিছু ঘটেছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে। পাঁচ কোটি মানুষ নিঃস্ব ও নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তের বলয়ে প্রবেশ করেছে, মঙ্গা ইতিহাসে আশ্রয় নিয়েছে। আরো উদাহরণ দেয়া যায়, তবে উপসংহার একটাই আমরা ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছি। অবশ্য কিছু মানুষ মানুষ হওয়ার সুযোগ পেয়েও হয়েছে শোষক, অত্যাচারী, অধার্মিক ও দাম্ভিক। দুর্বৃত্তপনা বেড়েছে অনেক। কিছু চক্র তৈরি হয়েছে। তারপরও দুর্বৃত্তায়নের অর্থনীতিটি বলতে গেলে চোখে পড়েনি কেননা মানুষের কাজ ছিল, পেটে ভাত ছিল, কাপড় ছিল, এমনকি কাজ না থাকলেও ভাতের কমবেশি নিশ্চয়তা ছিল। একটা ছন্দময় জীবন ছিল। দুঃখ-বঞ্চনার বোধটা তীব্র ছিল না। তাই দৌরাত্ম্য, অর্থ পাচার, বেগম পাড়ার কৃত্তিমান স্বামীদের কর্ম ও কথা তেমন চোখে পড়েনি বা মনে ধরেনি। দিনরাত কর্ম নিমগ্নতার কারণে বহু মানুষ এক বা অভিন্ন স্রোতে মিলেছিল তাই তারা অনেক কিছু দেখেও দেখেনি, কানে শুনলেও মনে ধরেনি। ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডা এড়িয়ে গেছে, হরতালে যোগ দেয়নি। কিন্তু করোনা এসে পুরো দৃশ্যপট বদলে দিচ্ছে; আরো দেবে। এখন বহু মানুষ এক ছাদের নিচে কিংবা ক্ষুদ্র বস্তিতে কারারুদ্ধ। হাতে অখণ্ড অবসর, গণমাধ্যমের বদৌলতে পরস্পরের মিথস্ক্রিয়া সম্প্রসারিত ও নিজের সঙ্গে অপরকে মেলানোর সুযোগ অবধারিত। তারা দেখছে মধ্যবিত্তরা কি দ্রুতগতিতে নিম্নবিত্ত হয়ে যাচ্ছে; নিম্নমধ্যবিত্তরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে, আর চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীরা সর্বহারায় পরিণত হয়ে যাচ্ছে। ক্ষুধার তাড়না তেমন বোধ না হলেও দেশ ও বিদেশের পরিস্থিতি তাদের ভাবিত করছে, তাড়িত করছে, আতঙ্কিত করছে। অতীতে এড়িয়ে যাওয়া অনেক কিছুতেই তারা এমন চোখ মেলছে বা ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য করছে, কান খাড়া করছে, পক্ষ ছেড়ে ক্রমশ নিরপেক্ষ অবস্থানে এসে গেছে প্রায়। বিরূপ প্রচারণায় এবং কখনো কখনো প্রাপ্ত বাস্তবতায় তারা বিগড়ে যাচ্ছে, বিরুদ্ধবাদীদের কথায় সায় দিচ্ছে। শিগগিরই তারা শুধু ভাবতে নয়, বলতে শুরু করবে যে তাদের বদৌলতে মাটির হাঁড়ি সোনার হাঁড়িতে রূপ নিয়েছে; তাদের শ্রমে আর ঘামে কারা কীভাবে গায়ে গতরে বাড়ছে তাদের চিনতে শুরু করছে এবং ক্রমশ বিভক্ত সামাজিক দ্বীপ সদৃশ বিচ্ছিন্ন বলয় তৈরি করছে। সামাজিক মিডিয়া কিংবা গণমিডিয়ার কারণে তাদের কিছু পূর্ব-ধারণা বা অনুমিতি চাঙ্গা হচ্ছে বা সত্যি বলে প্রমাণিত হচ্ছে। হয়তো অপরাজনীতির কারণে বঞ্চনার কল্পিত বোধটি আড়মোড় ভাঙছে। করোনার তাণ্ডবে খাদ্যের ঘাটতির সম্ভাবনা দেখছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্ব যাত্রা দেখছে, গরিবের হক ও সামনে বাড়ার ইতিবাচক আবহ বিনিষ্ট হচ্ছে। পরিণামে বিভাজন বাড়বে, ঐ যে অতি প্রাচীন ও অতি কদর্য হ্যাভ আর হ্যাভনট অর্থাৎ বিত্তবান-ক্ষমতাবান এবং বিত্তহীন-ক্ষমতাহীনদের সংঘাত বাড়বে। তাকে উপজীব্য করে বিভক্তি ও বিভাজন সৃষ্টির খলনায়করা তৎপর হচ্ছে। সমান্তরালে বাড়বে বিভেদ, বৈষম্য, শোষণ, নির্যাতন দুর্বৃত্তায়ন, মাদকের অনুপ্রবেশ, জঙ্গির উত্থান। ক্ষোভ বিক্ষোভে রূপ নেবে, বিক্ষোভ আন্দোলনে বা অন্য কোনো রূপে নেবে। তাই শিখাটা দাবানলে রূপ নেয়ার আগেই ব্যবস্থা চাই। লকডাউন শিথিল হচ্ছে, আরো পরিকল্পিত শিথিলতা কাম্য। বেকারত্ব ঠেকাতে বা বিদেশি বাজার ধরে রাখতে কিংবা বিদেশ প্রত্যাবর্তনের পুনর্বাসনে এই শিথিলতা আরো প্রয়োজন হয়ে দেখা দিয়েছে। করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে, তাই অভাবী মানুষের কাছে খাদ্যসামগ্রীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ অব্যাহত রাখতে হবে আরো বহুদিন। গৃহে আবদ্ধ কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অনলাইন শিক্ষামুখী করতে হবে। অব্যবহৃত ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুলভে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে। কৃষকের পণ্যের কাক্সিক্ষত মূল্য দিতে হবে, বাজারে চাহিদা ও সরবরাহে সামঞ্জস্যতা আনা প্রয়োজন। আম ও লিচুগুলোর পচনের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। এসবেও খাদ্যে রাসায়নিক ব্যবহার কঠোরভাবে দমন করতে হবে। জিডিপিতে ও কর্মসংস্থানে ব্যাপক অবদানকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পুঁজিবাজারটা সচল করে তাকে নিষ্কলুষ ও গতিশীল করতে হবে। অপকর্মের অপসায়ন একান্তই কাক্সিক্ষত। মুৎসুদ্দিদের আপাতত কাজে লাগাতে হবে। অতি প্রশ্রয়ে মাথায় তুললে রাজনীতিতে অস্থিরতার জন্ম হতে পারে। নব্য ধনিকদের সম্পদ প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে তা না হলে বঞ্চিতদের দহন জ্বালা আরো বাড়বে। দাম্ভিকতা বা অবহেলার কারণে প্রতিহিংসার মাত্রা বাড়বে। তিলকে তাল করে দেখানোর প্রবণতা বাড়ছে। পঞ্চম কলামিস্টের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে।
আবারো বলছি, বহু মানুষ একদিনে দরিদ্র হয়ে গেছে। চিকিৎসার দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট হচ্ছে। অভিযোগ আসছে মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে, চিকিৎসা ও খাবার নিতে গিয়ে অশোভন আচরণের শিকার হচ্ছে। এসব কিছুকে মিথ্যা, কল্পিত বা ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। সরকারের কথিত সিদ্ধান্তহীনতা, দৌদুল্যমানতা ও নিষ্ক্রিয়তার আমলাতোষণকে তথ্য, যুক্তি ও কাজ দিয়ে মিথ্যা প্রমাণ করতে হবে। কাজ করেও মজুরি পাচ্ছে না, কাজের যথোপযুক্ত মজুরি, চাকরির নিশ্চয়তা, ভাড়া বাড়ি থেকে উচ্ছেদ প্রতিহত করতে হবে। তবে বিপরীতে অবস্থানকারীদের সত্যি ও যৌক্তিক অভাবগুলোতে দৃষ্টিদান আবশ্যক হবে। এসব যে শুধু সরকার করবে, তা কেন হবে, সরকারের ফ্রন্ট লাইন সুবিধাভোগীরা কেন আরো সজাগ আরো যত্নবান বা ক্রিয়াশীল হচ্ছে না? বিত্তবানদের এমনভাবে এগিয়ে আসতে হবে যেন তাদের শোষক, লুটেরা চেহারাটা দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার স্বরূপ ও মাত্রা বাড়াতে হবে। ইচ্ছে করলে তারা কিন্তু লোকচক্ষুর বা চক্ষুলজ্জায় আক্রান্তদের জন্য সহায়তার হাত বাড়াতে পারেন। একজন সামান্য রিকশাচালক বা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা যদি তার সামগ্রিক সামর্থ্য জনকল্যাণে তুলে দিতে পারেন, তখন বিত্তশালীরা চিরাচারিত কারুনের অবস্থান ছেড়ে হারুনের অবস্থানে চলে আসতে পারেন।
এই সংকট সহসা যাবে না, প্রবৃদ্ধির চালক যে নিম্নগামী হবেই। চাকরি-বাকরিতে ভাটার মাত্রা আরো বাড়বে, সঙ্গে সামাজিক অস্থিরতা ও কম্পন বাড়বে। আমরা তো হিমবাহের শীর্ষ ভাগ দেখছি মাত্র। তার আকার আকৃতি আরো বাড়তে পারে। সারা বিশ্বের ক্ষতি কেউ বলছেন তিন হাজার কোটি ডলার আর কেউ বলছেন নয় হাজার কোটি ডলারের উপরে। অনুমান যাই হোক না কেন, আমাদের সর্বোচ্চ ক্ষতি মোকাবিলার সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। ক্ষোভ-বিক্ষোভ ক্রোধ বা বিদ্রোহকে প্রশমিত করার উপায় হচ্ছে কর্ম সংরক্ষণ, কর্মসস্থান সম্প্রসারণ। ভিত্তিহীন প্রচার প্রপাগান্ডার লাগাম ধরে রাখতে হবে।
এখন রাজনীতিবিদদের নির্বাচনী এলাকা পূর্ণকর্ষণের অপূর্ব সুযোগ। দুর্দিনে পাশে থাকার কথা দুর্গত ও দুস্থরা বেশি মনে রাখেন। নিজেরাই অভাবীদের হাতে শ’টাকা তুলে দিয়ে সহস্র টাকার কৃতজ্ঞতা ভরা চাহনী দেখছি। অতীতে বড় অংক তুলে দিয়েও এমন অভিব্যক্তি দেখিনি। রাজনীতিবিদদের বলি, করোনা আপনাদের মানুষের কাছে যাওয়ার, থাকার ও সেবার অপূর্ব সুযোগ করে দিয়েছে। সজাগ হতে, বিবেচক হতে, সবশেষে সবাইকে মানবিক হতে বলছি। এটা হবে বাঙালিত্ব ধরে রাখার ও এগিয়ে দেয়ার মোক্ষম বিনিয়োগ।

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী : শিক্ষাবিদ ও মুক্তিযোদ্ধা; উপাচার্য, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ