রোজা-ঈদে সামাজিক অনাচার থামাতে হবে

আগের সংবাদ

আসুন, বিভাজনের দেয়াল ভেঙে ফেলি

পরের সংবাদ

আরো সতর্ক থাকি কিছুদিন

আহমেদ আমিনুল ইসলাম

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২০, ২০২০ , ১১:৩৫ অপরাহ্ণ

সাম্প্রতিক সময়ে করোনা বাদ দিয়ে যেন কোনো চিন্তা-ভাবনাই হতে পারে না। হতে পারে না সাধারণ থেকে উচ্চাঙ্গেও কোনো আলোচনা। আমাদের সব চিন্তা ও আলোচনাকে দাপটের সঙ্গে করোনা আক্রমণ করে ফেলে! মহামারি-রূপ এই ভাইরাসটি আমাদের জীবনযাপনের যাবতীয় প্রণালিকে আকণ্ঠ গ্রাস করে নিয়েছে। আমাদের বেঁচে থাকাকে চারপাশ থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে করেছে অত্যন্ত সঙ্কুচিত। শুধু সঙ্কুচিতই নয়, করোনা ভাইরাস আমাদের সামগ্রিক জীবনযাপনকে একেবারেই তুচ্ছ করে দিয়েছে। মৃত্যুকেও সে মুহুর্মুহু অমর্যাদা করে ছাড়ছে! কেবল কোনো সাধারণ মৃত্যু নয় অনেক মহীয়ান মৃত্যুকেও সে ঠেলে দিয়েছে বিশেষ বিধিবিধানের এক সীমার আবেষ্টনীর মধ্যে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কারণে রাষ্ট্রের অসাধারণ মানুষের চিরবিদায়ের আনুষ্ঠানিকতাগুলোকেও করোনা-ভয় সঙ্কুচিত করে দিয়েছে। আমাদের আনন্দিত মুহূর্তগুলোর উদযাপনকে যেমন নিঃসঙ্গের বেদনায় নিমজ্জিত করেছে তেমনি জর্জরিত শোক-সন্তাপ প্রকাশের সমবেত কণ্ঠকেও টুঁটি চেপে ধরেছে কোভিড-১৯! করোনা-তাণ্ডবের কারণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষের বৈচিত্র্যময় আনুষ্ঠানিকতার সব উদযাপন থেকে আমরা নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছি। সদ্যপ্রয়াত জাতির অভিভাবক ড. আনিসুজ্জামানের জন্য সমবেত শোক উদযাপন থেকেও আমাদের বিরত থাকতে বাধ্যই হতে হয়েছে। বিগত ১৪ মে বিকেলে আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন বাঙালি জাতির নির্ভীক বাতিঘর, জ্ঞানতাপস, অভিভাবক, জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। করোনার প্রাদুর্ভাব না থাকলে ড. আনিসুজ্জামানের মতো জাতীয় এই বীরের মৃত্যু-পরবর্তী যে কৃত্যাদি ও আচার অনুষ্ঠানের আয়োজন আমরা করতাম এখন আর তা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। সম্ভব হচ্ছে না। এই মহামানবের শেষ বিদায়ের লগ্নটিতে আমরা সবাই কাঁধে কাঁধ রেখে সমবেত শোকও প্রকাশ করতে পারলাম না! করোনা-তাণ্ডব আমাদের কী ভয়ঙ্করভাবে গৃহবন্দি করে রেখেছে বিগত প্রায় তিন মাস ধরে আমরা তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করে যাচ্ছি। আর কতদিন এই গৃহবন্দি জীবন ও নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যবিধির সঙ্গে আমাদের তাল মিলিয়ে চলতে হবে তা কেউ বলতে পারে না।
নানা রকমের খবর, আলোচনা, বিশ্লেষণ, ভয় ও আতঙ্কে শুরুর দিকে একদা মনে হয়েছিল করোনা ভাইরাস ‘হঠাৎ কালবৈশাখীর’ ঝড়ের মতো আমাদের জীবনে আসবে। কোথাও কোথাও প্রাণ-প্রকৃতি ও মানুষকে মুহূর্তে তছনছ ও লণ্ডভণ্ড করে মুহূর্তেই ফিরে যাবে আবার এলেও আসতে পারে বহুদিন পর। এভাবেই হয়তো এই ভয়ঙ্কর ভাইরাসের সঙ্গে মানুষের জীবন জুঝবে। মনে হয়েছিল আমরা এই ভাইরাসটির হঠাৎ হঠাৎ আক্রমণ ও ধ্বংসলীলায় আহত হবো, হত হবো। এভাবেই আমাদের নৈমিত্তিক জীবন সংগ্রামের অঙ্গরূপে গ্রহণ করব মানিয়ে নেবো নিজেদের। যেমনটি আমরা নিপা, ডেঙ্গু বা অন্যান্য ভয়াবহ সংক্রামক ভাইরাসগুলোর সঙ্গে ইতোপূর্বে মানিয়ে নিয়েছি। কাজেই করোনা-ঝড়ের হঠাৎ ঝাপ্টা থেমে গেলে আমরা আমাদের স্বাভাবিক জীবনে আগের মতো আবারো অভ্যস্ত হয়ে পড়ব রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার, কল-কারখানা, অফিস-আদালতে আবারো মেতে উঠব সতত উল্লাস আর ঘনিষ্ঠ আড্ডায়। কিন্তু করোনা যদি ‘হঠাৎ কালবৈশাখী’ না হয়ে শান্ত ও ধীর লয়ের ‘মৃদুমন্দ বায়ু’ হয় আর অনিকেত-অনির্দিষ্ট দিবস ও রজনীর প্রতিটি সময় প্রতিনিয়ত শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গী হয় তবে আমাদের আগামী দিনের জীবনযাপন পদ্ধতির পরিবর্তন ও পরিশুদ্ধি আবশ্যক হয়ে উঠবে জীবনযাপনে পরিবর্তন আনতেই হবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে হাজারো মানুষের প্রাণ কাড়ার পরও করোনা ভাইরাসটি ‘কালবৈশাখীর ঝড়ের’ মতো সহসাই আমাদের ছেড়ে বিদায় নেবে না। বরং ভাইরাসটি দীর্ঘমেয়াদে সভ্যতার প্রতিদ্ব›দ্বী হয়ে আমাদের সঙ্গেই আষ্টেপৃষ্ঠে অবস্থান করবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় আমাদেরই ঠিক করে নিতে হবে। কিন্তু কী আমাদের করণীয়? কী উপায়ে আমরা করোনার বিপরীতে ঠিক করব আমাদের অবস্থান? এর উপায়টিও অনিকেত-অনির্দিষ্ট। কেউ সুনির্দিষ্টভাবে কোনো উপদেশ-বটিকা দিয়ে আমাদের নিশ্চিন্ত করতে পারছেন না। সহসা পারবেন সেরূপ কোনো ইঙ্গিতও আপাতত দেখা যাচ্ছে না। অনেকটাই যেন নিয়তি-নির্ভর বেঁচে থাকা আমাদের, সমগ্র মানব সভ্যতার। তবে সংক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার আপাতত যে মহৌষধটি আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে সেটি হলো ‘সামাজিক দূরত্ব’ রক্ষা করে চলা।
বিগত সপ্তাহের করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখতে পাই প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১৫ থেকে ২০। যা পূর্ববর্তী সপ্তাহের চেয়ে বেশি। আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায় আগামীতে মৃত্যু হার কমপক্ষে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে। কারণ গত সপ্তাহের মৃত্যু হারটি দেখতে হবে তার পূর্ববর্তী সপ্তাহের আক্রান্তের নিরিখে। সে সময় দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা ৫ থেকে ৬০০-এর মধ্যে ছিল। সুতরাং বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, আগামী সপ্তাহ বা তার পরের সপ্তাহ থেকে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা আমাদের ঊর্ধ্বমুখী হিসাবেই গণনা করতে হবে। বিষয়টি যে মোটেই সুখকর হবে না তা আর বলার প্রয়োজন পড়ে না। আবার এই আশঙ্কাকেও অতিক্রম করে যেতে পারে গার্মেন্টস শিল্প-কারখানা খুলে দেয়া এবং লকডাউনের শৈথিল্য। সীমিত আকারে শপিংমল ও মার্কেট চালুর ‘সাইড-এফেক্ট’ও এর সঙ্গে যুক্ত হবে। এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আসছে দিনগুলোতে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা স্বীকার করেছেন, লকডাউনের শৈথিল্যের কারণে করোনা সংক্রমণের হার বাড়লেও তা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তবে সব কিছুই জনগণের সচেতনতার ওপর নির্ভরশীল। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চললে অবশ্যই করোনার ভয়াবহ সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকা সহজ হবে। এদিকে ৩০ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি বাড়ানো হয়েছে। করোনা বিপর্যয়কে সামনে রেখে জনস্বার্থে এ ছুটিতে সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী বিধিবদ্ধ করা হয়েছে ১৫টি বিধান। এই বিধানগুলো মূলত স্বাস্থ্যবিধি ও স্বাস্থ্যঝুঁকির আলোকে প্রণীত। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি মোতাবেক দীর্ঘমেয়াদে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায়সহ অন্যান্য বিধিবিধান মেনে চলা আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও স্বল্প-আয়ের দেশে কত যে কঠিন তা অনুমান করাও কষ্টকর নয়। ঈদকে সামনে রেখে ‘সীমিত আকারে’ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয়েছে। খুলে দেয়া হয়েছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সুপার মার্কেট ও শপিংমল। এসব ব্যবসায়িক প্রাঙ্গণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা থাকলেও সংবাদ মাধ্যমে সেসবের সীমাহীন ব্যত্যয়ও লক্ষ করা যায়। মনে রাখতে হবে স্ব-স্ব সচেতনতার বিকল্প কিছু নেই। প্রতিদিন করোনা সংক্রান্ত যেসব তথ্য আমরা আইইডিসিআর থেকে পাচ্ছি তাতে মনে হচ্ছে আমাদের দেশের কোভিড-১৯ সংক্রমণের ক্রমোত্তরণ এ মাসের শেষ বা আগামী মাসের মাঝামাঝি পর্যায়ে তা চ‚ড়ান্তরূপে আত্মপ্রকাশ করবে। সুতরাং আগামী একটি মাসের মধ্যে আমরা ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছি বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমাদের অন্তত আরো একটি মাস তাই সতর্ক অবস্থায় থাকাটাই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু নানা বিবেচনায় লকডাউনের মধ্যেই ‘সীমিত আকারে’ নানা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার প্রবণতায় একটু লাগাম বোধ করি টেনে ধরাই জাতির জন্য মঙ্গলকর ছিল। অবশ্য একথা বলারও সময় হয়তো শেষ হয়ে গেছেÑ সেক্ষেত্রে এখন একমাত্র বচন স্বসচেতনতার মাধ্যমেই ‘সতর্ক’ থাকতে হবে সবাইকে।
এদিকে দেশের অর্থনীতি ও সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ নিয়ে এডিবি, বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব খাদ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান আগাম যে পূর্বাভাস দিয়ে যাচ্ছে তাও আশঙ্কার উদ্রেক ঘটায়। করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনৈতিক বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এর মধ্যে সুখের কথা আপাত এইটি যে, আমাদের বোরো আবাদের বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় এড়িয়ে এই বাম্পার ফলনের বেশির ভাগই আবার কৃষকের পক্ষে ঘরে তোলাও সম্ভব হয়েছে। সুতরাং আগামী তিন থেকে চার মাস অন্তত খাদ্য সঙ্কটে আমাদের পড়তে হবে না। কিন্তু বিশ্ববাজার থেকে আসা রেমিটেন্স কমে যাচ্ছে দ্রুত হারে। আগামীতে আরো কমবে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে সঙ্কুচিত হয়ে গেছে আমাদের শ্রমবাজারও। অদূর ভবিষ্যতে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরবেন হাজার হাজার প্রবাসী। সুতরাং করোনা-উত্তর সামগ্রিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় করোনাকালেই বিভিন্ন মেয়াদের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার যুৎসই বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগী হতে হবে। করোনা আমাদের বিপর্যস্ত করতে চাইলেও পরিকল্পিত কর্মসূচির বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামী দিনগুলোতে আমরা যেন আমাদের সামাজিক সুরক্ষা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সামর্থ্য দেখাতে পারি।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ডিসি