বিকালে ডিএসসিসির দায়িত্ব নিচ্ছেন তাপস

আগের সংবাদ

করোনার শতভাগ কার্যকর অ্যান্টিবডি আবিষ্কার!

পরের সংবাদ

শ্রমবাজার টালমাটাল

কামরুজ্জামান খান:

প্রকাশিত হয়েছে: মে ১৬, ২০২০ , ৯:৫১ পূর্বাহ্ণ

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার

রেমিট্যান্সে অশনি সংকেত
সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ইতালি, কুয়েত
মালদ্বীপ থেকে কর্মী ফিরছে

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের থাবায় মধ্যপাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকাসহ পৃথিবীর কোথাও বাংলাদেশিরা কার্যত ভালো নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক বাংলাদেশি কর্মীকে বিভিন্নভাবে সাহায্য নিয়ে চলতে হচ্ছে। অনেকে দেশে ফিরেছেন, আরো অনেকে ফেরার সুযোগ খুঁজছেন। বিশ্বের ১৬৮টি দেশে বাংলাদেশি কর্মী থাকলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে কোথাও সুখবর মিলছে না। পৃথিবীর প্রায় সব দেশ ধীরে ধীরে লকডাউন তুলে নিলেও কোথাও কর্মচাঞ্চল্য ফেরেনি। সর্বত্র এখনো ধাওয়া করছে করোনা, থামেনি মৃত্যুর মিছিল। এ অবস্থায় গত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বিদেশ থেকে ফিরেছেন প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশি। এর মধ্যে শুধু মার্চ মাসে দেশে ফেরা দুই লাখ শ্রমিকের মধ্যে লক্ষাধিকই চাকরিচ্যুত। করোনা বিধ্বস্ত বিশ্বে নিজ দেশের মানুষই যেখানে ঠিকমতো কাজে ফিরতে পারছে না সেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকরা যে ধরনের কাজ করেন তাতে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। এদিকে বৈধ অভিবাসীরাই যেখানে কষ্টে আছেন; সেখানে অবৈধ বাংলাদেশিরা রীতিমতো মানবেতর সময় পার করছেন। তাদের দেশে ফেরাতে নেই কার্যকর কোনো উদ্যোগ। এ অবস্থায় বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে এখন টালমাটাল অবস্থা বিরাজ করছে। রেমিট্যান্সের ভবিষ্যৎ নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়।

এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে প্রবাসী বেকারদের জন্য আড়াই হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের কথা জানিয়ে বলেছেন, তারা কিন্তু রেমিট্যান্স পাঠায়। বিদেশে অনেক বাংলাদেশি বেকার হয়েছেন। দেশে ফিরে তাদের যাতে কষ্ট না হয় সে জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন এ প্রসঙ্গে জানান, সৌদি আরবসহ তেলনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোতে কর্মসংস্থান পরিস্থিতি আগের মতো ভবিষ্যতে আর নাও থাকতে পারে। তাই শ্রমিকদের বিকল্প শ্রমবাজারে পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছেন তারা। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে তেলের দাম পড়ে গেছে। এতে অনেক দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে যাবে। তখন যাতে শ্রমিকরা অন্য দেশে যেতে পারেন সে জন্য অন্যান্য দেশে এভিনিউ খুঁজছি- তাদের কোথায় পাঠানো যেতে পারে, সে চেষ্টা চলছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, যারা ইতোমধ্যেই এসেছেন ও সামনে আসবেন তাদের জন্যও সরকারের দিক থেকে নেয়া হয়েছে বিশেষ পরিকল্পনা। যাতে তারা কর্মক্ষম থাকতে পারেন সে জন্য ঋণ দেয়া হবে। স্কিল ট্রেনিং দেব, যাতে নিজেরা কাজ পান বা উদ্যোক্তা হতে পারেন।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটিএ) মহাপরিচালক মো. শামছুল আলম বলেছেন, এমনিতেই প্রতিদিন বাংলাদেশ থেকে কর্মী বিদেশে যাওয়া-আসা করে থাকে। কর্মী হিসেবে গেলেও আসার সময় কারা আসছে তা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। এ অবস্থায় বৈশ্বিক দুর্যোগ কবে শেষ হবে তা বলা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশি কর্মীরা বেশিরভাগই বিদেশে নিম্নমানের কাজ করেন। যার প্রয়োজন সবসময়ই থাকবে। এরপরও যারা ফিরতে বাধ্য হবেন, তারা যাতে দেশে কাজ করে চলতে পারনে সরকার তাদের আর্থিক সহায়তা দেবে। এনিয়ে কাজ চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, লোক যেমন ফিরবে তেমনিভাবে নতুন কর্মীও যাবে। করোনা পরিস্থিতিতে তেলের দাম কমাসহ বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে রেমিট্যান্সও কমে আসবে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, রেমিট্যান্স কমবেশি আসা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এখন সারাবিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দাভাব চলছে। শ্রমিকরা ফিরে আসছেন। রেমিট্যান্সের ওপর এর প্রভাব পড়বে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি অনেক বেড়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

জানা গেছে, প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা সবমিলিয়ে প্রায় এক কোটি ২৮ লাখ। করোনার ধাক্কায় মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, লেবানন, ইরাক, জর্ডান, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, আশিয়ানভুক্ত দেশ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কম্বোডিয়া ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপের ইতালি, স্পেন, জার্মানি, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ব্রুনাই, সুইডেন, লিবিয়ার শ্রমবাজারে অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে। সৌদি আবর থেকে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক ফেরত পাঠানোর খবর ডালপালা ছড়িয়েছে। মধ্যপাচ্য দেড় লাখ বাংলাদেশি কর্মীর ভিসা বাতিল করছে বলে চাউর হয়েছে। কুয়েতে অবৈধভাবে থাকা প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি আত্মসমর্পণ করে দেশে ফেরার প্রহর গুনছেন। এর মধ্যে অনাহারে সেখানে দুইজনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। কুয়েত থেকে মঙ্গলবার দেশে ফিরেছেন ৩০০ বাংলাদেশি। মালদ্বীপ থেকে ১৬ মে দেশে ফিরছে ৪০০ বাংলাদেশি।

মালয়েশিয়ায় দুই বছরের জন্য যাওয়া কর্মীদের দেশে ফেরার সময় হয়েছে। এছাড়া সেখানকার অবৈধ প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশি কিভাবে দেশে ফিরবেন তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই কারো কাছে। তারা যেমন দেশে কোনো টাকা পাঠাচ্ছেন না; তেমনিভাবে বিমানের টিকেট কেটে দেশে ফেরাার মতো অবস্থায়ও নেই তারা। এর মধ্যে মালয়েশিয়ায় বন্ধ শ্রমবাজার খোলার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তা ঝুলে গেছে। থমছে গেছে দুই লাখ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ। আবার মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে অনলাইনে প্রায় এক লাখ ভিসা প্রক্রিয়াধীন ছিল। করোনার কারণে গোটা বিশ্ব লকডাউনে পড়ায় ৯০ দিন মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় সেসব ভিসা এখন বাতিল হওয়ার উপক্রম। এরমধ্যে বিদেশে কর্মী পাঠাতে যদি সিন্ডিকেট ফের জেঁকে বসে তবে বিদেশে শ্রমবাজার যে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে তাতে সংকট আরো ঘণীভূত হবে। করোনার কারণে রেস্টুরেন্ট, সুপারশপ, চেইনশপ, পণ্যের দোকান, বার, নাইট ক্লাব সবকিছু বন্ধ থাকার পর এখনো সেসব স্থানে প্রাণ ফেরেনি। ওইসব প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশিদের বড় অংশ কাজ করেন। এছাড়া হকার বিচরণও নিষিদ্ধ রয়েছে। গৃহকর্মীদের অনেকেই বেকার হয়েছেন। অজানা আতঙ্কে চাহিদা নেই কর্মীর।

এদিকে ইতালিতে ২ লাখ ৬০ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন। এর মধ্যে ৭৫ হাজার অবৈধ। অবৈধভাবে যারা আছেন তারা প্রায় প্রত্যেকেই পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসার (ভ্রাম্যমাণ) সঙ্গে জড়িত। অল্প পুঁজিতে লাভ বেশি হওয়ায় বৈধভাবে থাকা অনেক বাংলাদেশিও সেখানকার পর্যটক অঞ্চলগুলোয় হকারি করেন। সব মিলিয়ে কমপক্ষে দেড় লাখ বাংলাদেশি ইতালিতে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা করেন। কিন্তু করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর পর্যটকরা আসা বন্ধ, ইতালিয়ানরাও প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে তেমন বের হন না। ফলে হঠাৎ করেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন ভ্রাম্যমান ব্যবসা করা অন্তত এক লাখ বাংলাদেশি। সৌদি আরবে রয়েছে ২২ লাখ বাংলাদেশি। যারা বিভিন্ন দোকান, রেস্তোরা ও সবজি ক্ষেতে কাজ করেন। তারা এখন বেকার। এদের একটি বড় অংশ দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন ১০ লক্ষাধিক বাংলাদেশি। কাতারে রয়েছে ৪ লাখ এবং কুয়েতে সাড়ে ৩ লাখ বাংলাদেশি। ব্রুনাইয়ে ৫০ হাজার, সিঙ্গাপুরে প্রায় ৩ লাখ, পুর্তগালে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশীর প্রায় সবাই বেকার। তাদের ভবিষ্যত আশা নিরাশার দোলাচলে। এদের অনেকে এখন নানাভাবে সাহায্য নিয়ে চলছেন। এছাড়া বাংলাদেশ সরকার দূতাবাসের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাহায্য করছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

এমআই