করোনাকালের কর্মী

আগের সংবাদ

জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ত্রাণ দুর্নীতির আভিযোগ মন্ত্রনালয়ে

পরের সংবাদ

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ

বিদায় অভিবাদন

ফরিদ আহমেদ দুলাল

প্রকাশিত হয়েছে: মে ১৫, ২০২০ , ১:০২ অপরাহ্ণ

‘বস্তুবাদী আবৃত্তি তত্ত্ব’ শিরোনামে আবৃত্তিবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ রচনা করেন তিনি, যার কিছু অংশ আমি পাণ্ডুলিপি অবস্থায় ছেপেছিও। তাঁর গ্রন্থটির সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েই আমি আজ একজন ‘শিল্পী সিসিফাস’-এর প্রতি বিদায়-শ্রদ্ধা নিবেদন করব শিল্পকলার সমস্ত নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর সাথে একাত্ম হয়ে।

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ (জন্ম : ১৪ অক্টোবর, ১৯৪১, টাঙ্গাইল \ মৃত্যু ১১ মে, ২০২০)
তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ বিস্ময়কর এক প্রতিভা নিয়ে জন্মেছিলেন। জীবনে কী হতে চেয়েছিলেন তিনি? পারিবারিক সূত্রে তারিক সালাহউদ্দিন ছিলেন বিনয়ী, ভদ্র-মিতভাষী-সজ্জন; ময়মনসিংহ শহরের স্বনামখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মৃত্যুঞ্জয় হাই স্কুল এবং আনন্দমোহন কলেজে অধ্যয়ন করেন তিনি, পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর হন। গৌরীপুর ডিগ্রি কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৭০-এ। ১৯৭৪-এ তিনি ময়মনসিংহে আলমগীর মনসুর মিন্টু মেমোরিয়াল কলেজে শিক্ষকতায় যুক্ত হন। ১৯৭৬-এর পর তিনি জটিল এক মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন এবং ১৯৮০ পর্যন্ত একই কলেজে কর্মরত থাকেন। ১৯৮৭-তে তিনি মুকুল নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োজিত হন এবং ২০০২ খ্রিস্টাব্দে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ব্যাধিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকেই মূলত তিনি সংকটকালের মুখোমুখি হন। দীর্ঘকাল মানসিক ব্যাধির পর তাঁর হার্টে ব্লক ধরা পড়ে, কিডনিতেও সমস্যা হয়। প্রায় এক দশককাল মধুমেহ রোগে ভোগেন। সম্প্রতি দ্বিতীয়বার স্ট্রোকের পর শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন, পিঠে ক্ষতের তৈরি হয় এবং তাতে পচন ধরতে শুরু করে। তেমন দুঃসহ অবস্থায় হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ১১ মে সন্ধ্যা ৭টায় নিজগৃহে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের একজন কিংবদন্তিতুল্য আবৃত্তিশিল্পীর জীবনাবসান হয়।
ষাটের দশকে তারিক সালাহউদ্দিন স্বল্প কিছু কবিতা লিখেছেন, যা দুই বাংলার বিভিন্ন কাগজে ছাপা হয়েছে; তবে তিনি আবৃত্তি করতেন নিয়মিত। তাঁর কণ্ঠস্বর মুগ্ধ করত সবাইকে। আকৈশোর তারেক ভাই আমাদের চোখে হিরো। একই স্কুলের ছাত্র হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম; আমি মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে ক্লাস টু-তে ভর্তি হওয়ার দুই বছরের মধ্যেই তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে স্কুলে প্রাক্তন হয়ে যান। যখন তিনি কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন তখনো প্রতি বছর স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আসতেন এবং কবিতা আবৃত্তি করতেন। সুতরাং আমার বালক বয়স থেকেই তিনি প্রিয়জন হয়ে উঠেছিলেন। শহরের টাউন হলে সেবার একটা চিত্রপ্রদর্শনী হয়েছিল, যেখানে আমাদের স্কুলের একজন প্রাক্তন ছাত্রের একক চিত্র প্রদর্শিত হয়, সেই শিল্পীর নাম ছিল রেজাউল করিম; সেই অনুষ্ঠানে তারিক ভাই কবি নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ এবং ‘দারিদ্র্য’ কবিতা দুটি আবৃত্তি করেছিলেন; সে কথাটি আমার আজো পরিস্কার মনে আছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী আশরাফুল আলম মাসিক আবৃত্তিলোক, নভেম্বর ২০০২ সংখ্যায় তাঁর সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে লেখেন, “তারিক নজরুলের ‘দারিদ্র্য’ কবিতাটি খুব পছন্দ করত। কবিতাটির এক জায়গায় আছে, ‘সর্বাঙ্গে দংশিল মোর নাগ নাগবালা’। ‘নাগ নাগবালা’ শব্দ দুটি উচ্চ স্বরগ্রামে নিয়ে তারিক এমনভাবে উচ্চারণ করত যা আজো আমার শ্রবণে লেগে আছে। তার কণ্ঠস্বরটি ছিল আভিজাত্যপূর্ণ, পরিশীলিত এবং দরাজ।” মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে তারিক ভাইয়ের সহপাঠী আশরাফুল আলম আমার পরিচিত হলেও স্কুল স্মৃতিতে অনুপস্থিত, কিন্তু তাঁর স্মৃতিচারণ করা আবৃত্তির সাথে আমার স্মৃতিও যুক্ত।
দুঃসহ করোনাকালে প্রয়াত হলেন তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ। বলা যায়, প্রায় নির্জনেই তিনি বিদায় নিলেন, আমি নিজেও উপস্থিত হতে পারিনি কবরস্থানে; মুষ্টিমেয় যে ক’জন তাঁর পাশে ছিলেন, তাঁদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। একজন বিপর্যস্ত ‘সিসিফাস’ সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়ে দয়া করে বিভ্রান্তি ছড়াবেন না। যারা ভুল তথ্য জানাচ্ছেন, আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, তাদের কেউ তারিক ভাইয়ের সুবর্ণ দিনের কবিতা আবৃত্তি শোনেননি। তাঁর কর্মজীবনের সত্যের পেছনেও আছে ভিন্ন এক বিষাদের গল্প, সে সব নিশ্চয়ই উন্মোচিত হতে পারে, কিন্তু তা আজকের অনুষঙ্গ নয়; আজ কেবল তাঁর প্রতি আমাদের সম্মিলিত বেদনা এবং শ্রদ্ধার্ঘ্য উচ্চারণ।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে তারিক ভাই মার্কস-লেনিন-মাও সেতুং-সিরাজ শিকদার চর্চায় মনোনিবেশ করেন, হয়ে ওঠেন মার্কসইজমের তাত্তি¡ক। তখনই তাঁর মনস্তাত্তি¡ক সংকট দেখা দেয়। ১৯৭৮-এ তারিক ভাইয়ের সাথে আমার নতুন করে পরিচয় হয়। তাঁর বাসায় তাঁর সাথে বেশ ক’দিন একান্ত বৈঠক হয়। তাঁর কাছেই শুনি অভিশপ্ত গ্রিকবীর ‘সিসিফাস’-এর পরিচয়। বেশ ক’দিনের দীর্ঘ বৈঠকের পর তাঁর মনোজাগতিক সংকট এবং একজন অভিশপ্ত সিসিফাসের প্রেক্ষাপট নিয়ে তখন আমি একটা নাটক লিখি। আসলে তিনি আমায় বিপ্লবে দীক্ষা দিতে চেয়েছিলেন, আমিও তাঁর প্রতি পূর্ণ মান্যতা নিবেদন করেছি। কিন্তু একটি ক্ষেত্রে তাঁর সাথে আমি ভিন্নমত পোষণ করে নিজেকে সযতে্ন আলাদা করে নিই; সেটি ছিল তত্ত¡জ্ঞান আর অনুশীলনের সমন্বয়হীনতা; কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্ব-প্রজ্ঞা আর সারল্য কোনোদিনই আমাকে তাঁর কাছ থেকে দূরে সরতে দেয়নি।
ষাটের দশকে তিনি নিয়মিত আবৃত্তি করতেন, তাঁর শিল্পনৈপুণ্য মুগ্ধ করেছে দেশের প্রাগ্রসর গুণীজনের মন। স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর আবৃত্তি শুনে চমকিত হয়েছিলেন জানা যায়; তাঁর চাল-চলন, স্মার্টনেস এবং আভিজাত্যপূর্ণ সৌন্দর্য সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী, ছাত্রছাত্রী আর শিক্ষকদের মুগ্ধ করেছিল। কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর স্মৃতিচরণমূলক গ্রন্থ ‘আমার কণ্ঠস্বর’-এ তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কিছু কথা বর্ণনা করেছেন, সে কথাগুলোও আজ এখানে সংক্ষিপ্ততার প্রশ্নে উল্লেখ করছি না, নিশ্চয়ই পরবর্তীতে যুক্ত করব। একাধিকবার তারিক ভাই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আবৃত্তিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে আমাদের গৌরবান্বিত করেছেন।
কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য সত্তরের দশকে প্রথমার্ধে তিনি মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে ক্রমান্বয়ে আবৃত্তি করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেন, তাঁর কণ্ঠস্বরেও সমস্যার সৃষ্টি হয়, বাধ্য হয়েই তিনি আবৃত্তির আনুষ্ঠানিকতা থেকে সরে আসেন এবং আবৃত্তিবিষয়ক গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। কবিতা আবৃত্তির সাথে তিনি বস্তুবাদী তত্তে¡র সমন্বয় করতে ব্রতী হন। উল্লেখ করা প্রয়োজন সত্তরের দশকের শেষার্ধ থেকে আশির দশক এ দেশে আবৃত্তিশিল্প স্বতন্ত্র একটি শিল্পমাধ্যম হিসেবে বিকশিত হতে শুরু করে। আবৃত্তি শিল্পের বিকাশের প্রয়োজনে বাচিকশিল্প কর্মীদের কিছু তাত্তি¡ক গুরুর প্রয়োজন পড়ে, নবীন আবৃত্তিকারদের জন্য ওয়াহিদুল হক, নরেন বিশ্বাস, গোলাম মোস্তফা, আশরাফুল আলম প্রমুখ তখন ‘আইকন’ হয়ে সামনে আসেন; ঢাকার বাইরে থেকেও তারিক সালাহউদ্দিন সে সময় তরুণ আবৃত্তিকারদের কাছে আবৃত্তি গুরু হয়ে ওঠেন। প্রকৃত প্রস্তাবে তারিক ভাই আবৃত্তিশিল্পের পরম্পরা তৈরির জন্য সে অর্থে তেমন কোনো শিষ্যের হাতেখড়ি দিয়ে যাননি। তারপরও তারিক ভাই হয়ে ওঠেন শিষ্যবিহীন আবৃত্তিগুরু।
‘বস্তুবাদী আবৃত্তি তত্ত¡’ শিরোনামে আবৃত্তিবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ রচনা করেন তিনি, যার কিছু অংশ আমি পাণ্ডুলিপি অবস্থায় ছেপেছিও। তাঁর গ্রন্থটির সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েই আমি আজ একজন ‘শিল্পী সিসিফাস’-এর প্রতি বিদায়-শ্রদ্ধা নিবেদন করব শিল্পকলার সমস্ত নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর সাথে একাত্ম হয়ে।
একসময়ের তুখোড় আবৃত্তিশিল্পী, পরবর্তী সময়ে অসুস্থতাজনিত কারণে নিজে আবৃত্তি করতে না পারলেও আবৃত্তি প্রশিক্ষণ এবং আবৃত্তিবিষয়ক গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন, সে কথা আগেই বলেছি। তাঁর দীর্ঘ গবেষণার ফসল হিসেবেই আমরা পেয়েছি আবৃত্তিবিষয়ক নতুন চিন্তার খোরাক ‘বস্তুবাদী আবৃত্তি তত্ত¡’ গ্রন্থটি। বাংলাদেশে যখন এককশিল্প হিসেবে আবৃত্তি মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইছে, তেমন এক গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটে তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ-এর গ্রন্থটি তাৎপর্যপূর্ণ ভ‚মিকা রাখবে বলে বিশ্বাস করি।

এসআর