এমপিওভুক্তিকরণ কার্যক্রমে নজরদারি করবে দুদক

আগের সংবাদ

এফবিসিসিআইর প্রস্তাবে বিশেষ উদ্যোগ

পরের সংবাদ

গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলায় নিষেধাজ্ঞা

সঙ্কুচিত হচ্ছে তথ্যপ্রবাহ

প্রকাশিত: মে ৫, ২০২০ , ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ৫, ২০২০ , ১:৩৮ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলায় শুরু থেকেই ‘গুজব’ প্রসঙ্গে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে আসছে সরকার। অন্যদিকে এ বিষয়ে তথ্যের প্রবাহকে প্রতিনিয়তই সঙ্কুচিত করছে। ফলে কোভিড-১৯ আক্রান্ত, মৃত্যু এবং এর বিস্তার নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে অবিশ্বাস।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সরকারি চিকিৎসকরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা আজকালের মধ্যে জারি করবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এর আগে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কর্মকর্তাদের বিবৃতি দিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিষেধ করার পর কোভিড-১৯: অপপ্রচার ঠেকাতে ২৩ এপ্রিল ‘মিডিয়া সেল’ গঠন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এর আগে বিশেষজ্ঞদের ওপর সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকার মৌখিক নির্দেশনা জারি হয়। শুধু তাই নয়, করোনার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদেরও গণমাধ্যমে কথা না বলার নির্দেশ দেয়া হয়। কোভিড-১৯ নিয়ে গুজব ঠেকাতে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়।

গত ২ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল হান্নান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এখন থেকে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না। কথা বলতে হলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথম থেকেই গণমাধ্যমের সঙ্গে তথ্য নিয়ে লুকোচুরি করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। যারাই সত্য তথ্য প্রকাশ করেছে তাদের বিরুদ্ধে নেয়া হয়েছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের সুরক্ষা দিতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। পাশাপাশি সব ধরনের তথ্য দাবি করা, তথ্য পাওয়া এবং যে কোনো বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য লাভের অধিকারও নাগরিকদের রয়েছে। জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তথ্যের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। এদিকে করোনা মোকাবিলায় এতদিন কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করলেও এখন থেকে গবেষণা কাজেই সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা

ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) কাজ। তাই করোনা সন্দেহ ব্যক্তির কাছ থেকে এই প্রতিষ্ঠান আর কোনো নমুনা নেবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয়ের কাজটি করবে। প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোস্তাক হোসেন জানান, কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার জন্য যে নমুনা সংগ্রহ করা প্রয়োজন আইইডিসিআর এখন থেকে শুধু ওই কাজটুকুই করবে। নমুনা পরীক্ষার চাপে আইইডিসিআর তাদের মূল গবেষণা ঠিকমতো করতে পারছিল না।

এখন প্রশ্ন উঠছে গবেষণাই যদি মূল কাজ হয় তবে এতদিন কেন এই প্রতিষ্ঠানকে নমুনা পরীক্ষার কাজে ব্যস্ত রাখা হলো? এই সিদ্ধান্ত আগে থেকে কেন নেয়া হলো না? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসএমএমইউর কয়েকজন চিকিৎসক জানান, কৌশলগত কারণে ‘কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে কথা বলতে হবে’ এই অংশটুকু সংযুক্ত করা হয়েছে। মূলকথা হলো- কর্তৃপক্ষ চিকিৎসকদের তথ্য প্রকাশের অনুমতি দেবে না। তবে মুখ চেনা কয়েকজনের ক্ষেত্রে হয়তো এর ব্যতিক্রম হতে পারে। সরকারের হ্যাঁ’তে হ্যাঁ আর না’তে না বলা লোকদের হয়তো অসুবিধা হবে না। এটি মূলত ভিন্ন মতাদর্শের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, করোনা প্রতিরোধে প্রস্তুতির জন্য আমরা অনেকটা সময় পেয়েছিলাম। কিন্তু তাতে যে আমরা ব্যর্থ হয়েছি তা পদে পদে প্রমাণ মিলছে। প্রথম থেকেই স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে। পিপিই, মাস্কসহ সব ধরনের ব্যবস্থাই পর্যাপ্ত আছে বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু পরে আমরা কী দেখলাম? এখনই বা কী দেখছি?

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন চিকিৎসক জানান, গণমাধ্যমে বক্তব্য না দেয়ার জন্য তাদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, এই হাসপাতালে করোনা ইউনিট করা হয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক করোনা রোগী ভর্তি হয়েছে। কিন্তু যারা করোনা আক্রান্তদের সেবা দেবে এখনো তাদের নিরাপত্তার যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। ওই ইউনিটের চিকিৎসক এবং নার্সদের এন-৯৫ বা তার সমমানের মাস্ক পর্যন্ত দেয়া সম্ভব হয়নি। আর পিপিইর অবস্থা আরো করুণ। এ অবস্থায় চিকিৎসক নার্সরা কাজে অনীহা প্রকাশ করেছেন। চিকিৎসক-নার্সদেরই যখন এই অবস্থা তখন অন্যান্য স্বাস্থ্য সেবাদানকারীদের অবস্থা কেমন হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

এ প্রসঙ্গে পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, গুজব ক্ষতিকর এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু পর্যাপ্ত তথ্যপ্রবাহ না থাকলে গুজব ডালাপালা মেলে। সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকে। সরকার নির্দেশিত তথ্যটুকুই তারা সরবরাহ করবে। তবে যারা সরকারি চাকরি করেন না তাদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা সঠিক কাজ নয়। দক্ষিণ কোরিয়া আজ করোনা মোকাবিলায় সফল। কারণ তারা শুরু থেকেই স্বচ্ছতা এবং পর্যাপ্ত তথ্য সরবরাহ করেছে। আর উল্টো দিকে যদি ইতালির উদাহরণ দেখি। তথ্য লুকানোর কারণে দেশটিতে করোনার ব্যাপকতা ছিল ভয়াবহ। তাই সঠিক ও পর্যাপ্ত তথ্যের প্রবাহ কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ডা. শামীম রিজওয়ান মনে করেন, ইতিবাচক প্রচারণা কম থাকায় করোনা আতঙ্ক বাড়ছে।

 

নকি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়