নিম্নমানের মাস্ক নিয়ে অভিযোগ করায় ওএসডি-বদলি

আগের সংবাদ

নারায়ণগঞ্জে র‌্যাবের ৩৯ কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্ত

পরের সংবাদ

করোনার ছোবলে জীবন থমকে গেছে

প্রকাশিত: এপ্রিল ৩০, ২০২০ , ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ৩০, ২০২০ , ১:২৭ পূর্বাহ্ণ

বিশেষ সাক্ষাৎকার
নাসির আহমেদ
কবি

নাসির আহমেদ। বিশিষ্ট কবি। দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি একাধারে নাট্যকার, গীতিকারও। এই কবি স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে দীর্ঘ চার দশকের নিরন্তর সাধনায় নিবিষ্ট রয়েছেন নিজস্ব এক কবিতা-ভুবনে। জনজীবনচেতনা, প্রকৃতিমুগ্ধতা, প্রবল জীবনাবেগ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং নিরাশ্রয়ী পৃথিবীতে বাসজনিত একাকিত্ববোধ- এসবই তার কবিতার শিল্পিত প্রবণতা।

নাসির আহমেদের কবিতার চারধারে প্রতিনিয়ত গড়ে ওঠে এক আত্মতার দেয়াল। এই অবয়বেই তাঁর কবিতায় পরিলক্ষিত হয় সমকালীন বাংলাদেশের নানা আলোড়ন-বিলোড়ন, মূল্যবোধহীনতা, রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচার, সংগ্রামশীল মানুষের দুর্মর জীবনযন্ত্রণা, স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি এবং যুদ্ধোত্তর বিপন্নতার চিত্র। তবে, এই কবির স্বাতন্ত্র্য এখানে যে, নিখিল নিরাশার প্রান্তরে বাস করেও তিনি মানুষকে শোনান আশার গান। তাঁর সৃষ্টিসম্ভার হয়ে ওঠে অনিঃশেষ স্বপ্নের অপরূপ উৎস। এমন জীবন-অন্বেষায় ইতিবাচকতাই কবি নাসির আহমেদকে বাংলাদেশের কাব্যসাহিত্যে অবিসংবাদিতভাবে এনে দিয়েছে একজন মুখ্য কবির মর্যাদা।

এই জনসচেতন ও দেশপ্রেমিক কবির করোনাকাল কেমন কাটছে? ভোরের কাগজের এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, অনিচ্ছুক ঘরবন্দী একটা গুমোট সময় পার করছি। টিভির সামনে বসলেই নিরন্তর দুঃসংবাদ মনটা বিষণ্ণ করে তোলে। প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল বড় হচ্ছে। কি চেনাজানা, কি অচেনা যেকোনো মানুষের মৃত্যুই মনকে ভারাতুর করে তোলে। এই তো গত মঙ্গলবার করোনা কেড়ে নিলো দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ স্বজন অনুজপ্রতিম সাংবাদিক হুমায়ুন কবির খোকনকে। ওর জন্য মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যেও কারো কারো করোনার দুঃসংবাদ পাচ্ছি। সন্তানদের জন্যেও উৎকণ্ঠা। আর বয়স্করা তো আছেনই। দুনিয়াজুড়ে এই বিপর্যয় কবে বন্ধ হবে সেই প্রতীক্ষায় আছি।

এই সময়টায় কী লিখছেন? তা কি করোনা কেন্দ্রিক? কবি নাসির আহমেদ বলেন, এই সময়ে পরিকল্পনা করে কোনো কাজ করার মতো মনোসংযোগ করতে পারছি না। তারপরও যা-ই লিখি তাতে এই দুঃসময়ের চিত্র চলে আসে। বেশ কয়েকটি কবিতা লিখেছি, এর মধ্যে একটি কবিতা ‘যদি ক্ষমা করো’ সঙ্গীত পরিচালক শাহীন সরদারের সুরে বুবলির কণ্ঠে গান হয়ে ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।

পড়াশোনা? পরিকল্পনা করে কোনো বই পড়া হচ্ছে না। যখন হাতের কাছে যা পাচ্ছি তা-ই পড়ছি। এই তো মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাকের ‘১৯৭১: বিদেশি গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ ’ বইটি ফাঁকে ফাঁকে পড়ছি। এ ছাড়া অনেক অল্প পরিচিত/অপরিচিত লেখকের বই যা আগে পড়া হয়নি, এই দীর্ঘ অবসরে সেগুলো উল্টেপাল্টে দেখার সুযোগ হয়েছে। আসলে সময় কাটতে চায় না। স্বজন পরিজনদের সঙ্গে ফোনে কথা বলছি। বন্ধুরাও অনেকে খোঁজখবর নিচ্ছেন। এক তরুণ লেখক ফোন করে জানালেন, স্ত্রী সন্তান নিয়ে চরম কষ্টে আছেন সহায়তা করার চেষ্টা করলাম। আমার একাধিক বন্ধু হাত বাড়িয়ে দিলেন। স্বস্তি পেলাম।

জীবনে এমন দুঃসময়ের মুখোমুখি কখনও হয়েছেন কি? তিনি বলেন, এ জীবনে এমন আরেকটি দুঃসময়ের মুখোমুখি হয়েছিলাম ১৯৭১ সালে। তখনও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে পদে পদে মৃত্যুর আশঙ্কা ছিলো। ত্রিশ লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়ার সেই দুঃসময়কে আমি আর কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করতে পারি না।

করোনার অভিঘাতে আপনার চেনা পৃথিবীর কতোটা বদল ঘটেছে? সংবেদনশীল এই কবি বলেন, অবশ্যই। করোনার ছোবলে আমাদের জীবন থমকে গেছে। এর অভিঘাত আমাদের চেনা পরিবেশকে পাল্টে দিয়েছে। মানুষ মানুষের জন্য এই মানবিক মূল্যবোধ অনেকের মধ্যেই জাগ্রত হয়েছে। আবার দুস্থ মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে খাওয়ার মতো পশুদেরও দেখলাম নতুন করে।

আপনার কি মনে হয় প্রকৃতির ওপর মানুষের যথেচ্ছাচারের কারণে প্রকৃতি এমন মানববিধ্বংসী আচরণ করছে? হ্যাঁ,

প্রকৃতির ওপর মানুষ তো যথেষ্ট নিষ্ঠুর আচরণ করেছেই, তার প্রতিশোধ যদি প্রকৃতি নেয় তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। আমরা পরিবেশের ওপর কতোটা জুলুম করেছিলাম তার প্রমাণ তো আজকের ঢাকা শহর। এখন রাস্তাঘাটে অলিগলিতে নানারকম পাখি দেখা যায়, দুমাস আগের কালচে আকাশটাও এখন কী নীল! ধুলোয় ধূসর গাছের পাতারা এখন স্বচ্ছ- সবুজ। নগরীতে এখন শব্দদুষণ নেই। পুরো পরিবেশটাই যেন পাল্টে গেছে। এর থেকেও আমাদের শিক্ষণীয় আছে।

কবি নাসির আহমেদ

করোনাকে অনেকে ভয় পাচ্ছে না- এ ব্যাপারে কোনো পরামর্শ আছে কি না জানতে চাইলে বিশিষ্ট এই কবি বলেন, সকলেই জানি, কিন্তু মানি না। মানলে আমরা দেশকে ভালো রাখার জন্য, মানুষকে ভালো রাখার জন্য আরও কিছুদিন ধৈর্য ধরে ঘরে থাকতাম, অকারণে বের হতাম না। খুব দুঃখ হয় যখন দেখি সরকার ও গণমাধ্যম নানাভাবে প্রতিমুহূর্তে এত সচেতন করার পরেও বিভিন্ন স্থানে বহু মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ কারণে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

আর একটি কথা বলতেই হচ্ছে- যখন দিনদিন করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে তখনই পোশাক কারখানাগুলো খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত কতটা সমিচীন আর এর পরিণাম কী হবে তা ভেবে দেখার এখনো সময় আছে। দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্য সাহায্যে সরকারি অনুদানের পাশাপাশি প্রতিটি স্বচ্ছল মানুষের সাহায্যের হাত আরো প্রসারিত হবে- এটুকুই প্রত্যাশা। সবাই ঘরে থাকি। সুস্থ থাকি। নিরাপদ রাখি দেশকে।

এসবি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়