ক্ষুধার্ত সন্তানের মুখে খাবার দিতে চুল বিক্রি

আগের সংবাদ

মাজেদের স্ত্রীর হাহাকার, চাকরি চাইলেন মমতার কাছে

পরের সংবাদ

সঠিক তদারকির পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

প্রণোদনা বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিত: এপ্রিল ২২, ২০২০ , ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ২২, ২০২০ , ৯:৩৪ পূর্বাহ্ণ

করোনা মোকাবিলায় দিনমজুর থেকে শিল্পপতি সবার জীবন ও জীবিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজে। যা আমাদের জিডিপির ৩ শতাংশের বেশি। আপৎকালীন এ কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে খাদ্যসামগ্রী, ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি, লক্ষ্যভিত্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে নগদ অর্থ বিতরণ এবং বড়, মাঝারি, ক্ষুদ্র শিল্প ও সেবা খাতে সহজ শর্তে ঋণ দেবে সরকার।
জানা গেছে, করোনা ভাইরাসের কারণে দেশের অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটাতে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা (৯৯ হাজার ৪৮৯ কোটি) প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী ৩ বছরের অর্থনীতির বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে এ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় প্রণোদনা প্যাকেজ। প্রণোদনা প্যাকেজের পুরো অর্থ বাজেট থেকে দেয়া হচ্ছে না। এটি নতুনভাবে সরকারকে সংগ্রহ করতে হবে। যা এ প্যাকেজ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটা বড় চ্যালেঞ্জও বটে।
করোনা ভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত প্যাকেজ ঘোষণায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে দেশের অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার-সবাই বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্ত করোনা ভাইরাসে কাবু হওয়া অর্থনীতিতে প্রাণ ফেরাবে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত চার প্যাকেজের প্রণোদনায় রপ্তানি খাতের পাশাপাশি উৎপাদনমুখী ও সেবা খাতে ছোট-বড়-মাঝারি সব ধরনের শিল্পকারখানা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। করোনা ভাইরাস-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকাতে সহায়ক হবে এই প্রণোদনা।
প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে শিল্পঋণ খাতে ৩০ হাজার কোটি টাকা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা, কৃষি খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা, প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রেফারেন্স স্কিম নামে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ সুবিধা ও রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের বেতনভাতা পরিশোধে ৫ হাজার কোটি টাকা রয়েছে। এছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নগদ সহায়তা ৭৬১ কোটি টাকাসহ ২১ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা দেয়া হয়।
সরকারের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। জানতে চাইলে তিনি বলেন, আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের এসব তহবিল বাস্তবায়ন করবে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক। তারা যেন ছোট-বড় উদ্যোক্তার সমন্বয় করে সঠিক নিয়মে ঋণ সহায়তা দেয় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যেসব প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, তা বাস্তবসম্মত। এসব তহবিলের অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ হিসেবে বিতরণের জন্য দেবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। বলা হয়েছে, ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতেই ঋণ বিতরণ করবে ব্যাংকগুলো। এখন ব্যাংক কাদের ঋণ দেবে, এটা দেখার বিষয়। যাদের ঋণ দেবে তারা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কিনা? এই বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি, বলেন তিনি। মির্জা আজিজ বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে ব্যাংকের আমানত কমে যাবে। ফলে ঋণ দেয়ার সক্ষমতা কমবে। এ অবস্থায় ঋণ বিতরণ কীভাবে করবে? তহবিলের পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে কোনো ধরনের নিয়মনীতি কি করা হচ্ছে? সেটাই এখন দেখার বিষয়। এটি ভালোভাবে বাস্তবায়নের জন্য সঠিক নীতি ও তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পরামর্শ দিয়েছেন এ অর্থনীতিবিদ।
একই ধরনের পরামর্শ দিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদও। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই প্যাকেজে বড় শিল্পের জন্যই বেশি বরাদ্দ রয়েছে। তবে এসএমইর (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) জন্য যে ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল রয়েছে, এটা ভালো। কিন্তু এ তহবিলের ঋণ বাস্তবায়নের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংককে দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। এখন তারা কীভাবে তা পালন করবে, এটাই দেখার বিষয়। কারণ, বড় শিল্প সবসময় বড় অঙ্কের ঋণ নেয়। ব্যাংকগুলোও ওসব ঋণ দিতে বেশি আগ্রহ দেখায়। ফলে সবসময় ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো বঞ্চিত হয়। তাই ছোট উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা যেন ঋণ পান, এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে। পাশাপাশি যারা ক্ষতিগ্রস্ত তারা সঠিক পরিমাণে ঋণ পাচ্ছে কিনা, এটাও দেখভাল করতে হবে।
সালেহউদ্দিন আহমেদ আরো বলেন, এসএমই খাতে ব্যাংকগুলোকে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এ সুদহার আরো কম হলে বেশি ভালো। প্রধানমন্ত্রীর প্যাকেজ ঘোষণায় বড় শিল্পের প্রণোদনা থাকলেও কৃষি ও খাদ্য নিশ্চিতকরণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা প্রয়োজন ছিল। এ পরিস্থিতিতে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে বেশি জোর দিতে হবে। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এটি না পারলে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এ বিষয়টি স্পষ্ট করে সঠিক নির্দেশনা দেয়া জরুরি। এ সময় অপ্রাতিষ্ঠানিক লোকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার দাবি জানিয়ে সাবেক এই গভর্নর বলেন, যারা প্রাতিষ্ঠানিক তারা বেশকিছু সুবিধা পাবেন। তবে এখন সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় থাকা ছিন্নমূল অপ্রাতিষ্ঠানিক লোকদের বিষয়ে আর্থিক সহায়তা বাড়াতে হবে। এজন্য সরকারের উচিত সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর আওতা বাড়ানো। কারণ, এখন যে ১২ হাজার কোটি টাকার মতো বরাদ্দ আছে, তা খুবই সামান্য। এটি শিগগিরই বাড়ানো দরকার।
তবে প্রণোদনা প্যাকেজে খুশি ব্যবসায়ী মহল। জানতে চাইলে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্যাকেজকে স্বাগত জানাই। এ প্যাকেজ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কৃষি ও সেবাভিত্তিক খাতের উদ্যোক্তারা সঠিকভাবে ব্যবহার করবেন। আপাতত প্রধান লক্ষ্য হলো কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক করা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই প্যাকেজ সহযোগী ভ‚মিকা রাখবে। আমরা মনে করি, সরকার নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে। যেমন করোনা ভাইরাসের কারণে কোনো ব্যক্তি চাকরি হারালে তার ৬ মাসের জন্য বেতনভাতার ব্যয় নির্বাহ করবে সরকার। এর মানে হলো, একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যকেই ফোকাস করছে সরকার। যেখানে সবাইকে কভার করে। একই সঙ্গে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে যাতে কেউ চাকরি না হারায়। আমরা জানি এ বছরটা আমাদের একটু কঠিন যাবে। তবে আমাদের বিশ্বাস সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে যেসব উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, তা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুচারুরূপে বাস্তবায়ন করে এই কঠিন সময় উত্তরণে সক্ষম হব।
এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, এটা আমাদের কাছে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া। আমাদের জন্য এ দিনটি উৎসবের মতো। আমরা জানতাম সরকার প্রণোদনা দেবে, কিন্তু সঠিক সময়ে এত বেশি পরিমাণে দেবে, সেটা কেউ ভাবিনি। তিনি বলেন, এমন একটা তহবিল দরকার ছিল। এখানে আরেকটি বিষয়ে উল্লেখ করার মতো, সরকার যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিশেষ মূল্যায়ন করে ও যত্নশীল সেটা প্রমাণ হলো। কারণ সুদের ক্ষেত্রে বড় উদ্যোক্তারা এসএমই উদ্যোক্তাদের চেয়ে কম সুবিধা পাবেন। এর মানে সরকারের এসএমইর প্রতি বিশেষ নজর রয়েছে। এখন দেখতে হবে, এই টাকাটা যেন তারা ব্যবহার করতে পারেন। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নীতিমালা যেন সহজ করা হয়।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সফিকুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্যাকেজ প্রস্তাবে এমএসইর জন্য আলাদা তহবিল দিয়েছেন। এটা বিরাট ব্যাপার। কারণ দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করার ক্ষেত্রে এসএমই উদ্যোক্তারা মূল ভ‚মিকা পালন করে থাকেন। তিনি বলেন, আমরা প্রত্যাশা করব বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই উদ্যোক্তাদের উপযোগী করে একটি সহজ নীতিমালা দেবে, যেন তারা সহজেই নিজেদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারেন।
আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট এন্ড হাউজিং এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন (কাজল) বলেন, করোনা ভাইরাসে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। বৈশ্বিক এই সংকটে সারা বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় এই আর্থিক সহায়তার প্যাকেজ একটি সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে আবাসন খাতের জন্য বরাদ্দ রাখার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, আবাসন খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেক শিল্প খাত। এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল ৩৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান। এ খাতে দৈনিক মজুরিভিত্তিতে কয়েক লাখ শ্রমিক কাজ করেন। তাই আবাসনশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্যান্য খাতেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। এতে অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশ পোলট্রি কো-অর্ডিনেশন কমিটির (বিপিআইসিসি) সভাপতি মশিউর রহমান বলেন, পোল্ট্রি খাত ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। প্রধানমন্ত্রীর এই প্যাকেজে আমরা খুবই খুশি। আশা করি, এই কম সুদের ঋণ মূলধন পেয়ে গ্রামেগঞ্জে অনেকেই নতুন করে ব্যবসা শুরু করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে একটা বিষয় বলতেই হয়, ছোট উদ্যোক্তারা বাঁচলে আমরা বাঁচব। এজন্য আমার আহ্বান, সহজ শর্তে যেন এই ঋণ পেতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা। বাংলাদেশ বিসিক শিল্প মালিক সমিতির ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি হোসেন এ সিকদার বলেন, দেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত প্যাকেজে আমরা খুবই খুশি।
এদিকে কৃষকদের জন্য ৪ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা দেয়া হয়েছে। করোনায় অনেক কৃষকের ক্ষতি হয়েছে। মূলধনের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারবেন না অনেক কৃষক। তাদের জন্য এ প্যাকেজ সুবিধা দেয়া হয়। তবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা এ প্রণোদনা প্যাকেজকে সাধুবাদ জানালেও প্যাকেজের সুবিধা কোনো ধরনের মধ্যস্থতা ছাড়া সরাসরি তাদের হাতে পৌঁছবে কিনা এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকে।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়