বাঙালির বর্ণহীন বর্ষবরণ

আগের সংবাদ

দুধ-ডিম, সবজি নষ্ট করে দিচ্ছেন মার্কিন কৃষকরা

পরের সংবাদ

জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার শঙ্কা

অভ্যন্তরীণ-বৈশ্বিক চাহিদায় গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৪, ২০২০ , ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ১৪, ২০২০ , ২:০৪ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি হতাশাজনকভাবে কমে যাওয়ার বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেননি দেশের অর্থনীতিবিদরা। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে সতর্কতার সঙ্গে এগোনোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এক্ষেত্রে প্রথমেই মানুষের স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এরপর অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চাহিদার ভিত্তিতে কর্মপন্থা প্রণয়নের সুপারিশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। বর্তমানে ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজেরও সঠিক ব্যবহার করতে হবে।

গত রবিবার ওয়াশিংটন সদর দপ্তর থেকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলনের তথ্য প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। এতে বলা হয়েছে চলতি অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ২-৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে ২০২১-২২ অর্থবছরে অর্থনীতি একটু ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তখন ২ দশমিক ৮ থেকে ৩ দশমিক ৯ শতাংশের মধ্যেই থাকতে পারে প্রবৃদ্ধি। বাংলাদেশে এ চিত্র ছিল প্রায় ৩০ বছর আগে।

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ২৫ বছর পর্যন্ত বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৭৩-৭৪ থেকে ১৯৭৯-৮০ সময়ে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। পরের ১০ বছর জিডিপি বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ। আর গত ১০ বছরের বেশি সময় জিডিপি ছিল ৬ শতাংশের উপরে। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ জিডিপি হয়েছে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এটি দুই অঙ্কে নেয়ার টার্গেট ছিল সরকারের। কিন্তু সেলক্ষ্যের পথে বড় বাধা নিয়ে এসেছে করোনা ভাইরাস।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, করোনার প্রভাবে বাংলাদেশে চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ২-৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। কিন্তু এর আগে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলেছিল, চলতি অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ কমে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে।
অন্যদিকে করোনার প্রভাবে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ব অর্থনীতির চিত্রই পাল্টে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মহাপরিচালক রবার্তো অ্যাজেভেদো। তিনি বলেছেন, এই মহামারিতে চলমান অর্থনৈতিক অধোগতি ও মানুষের চাকরি হারানোর ফলে পরিস্থিতি একযুগ আগের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের চেয়ে ভয়াবহ হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী অর্থনৈতিক পরামর্শক সংস্থা ম্যাকেঞ্জি এন্ড কোম্পানি বলছে, করোনার ধাক্কায় পৃথিবীর চিত্রই বদলে যাচ্ছে। ফলে নতুন এক অর্থনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হবে পৃথিবী।
জিডিপি নিয়ে এডিবি এবং বিশ^ব্যাংকের অনুমান সম্পর্কে সিপিডির সম্মানিত ফেলো গোলাম মোয়াজ্জেম ভোরের কাগজকে বলেন, প্রাক্কলনগুলো কয়েকটি পর্যায়ে দেয়া হয়েছে। এডিবি মূলত করোনা প্রভাব বিবেচনার আগেই গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ধরে প্রাক্কলন করেছিল। আর এখন করোনার প্রভাবকে বিবেচনায় নিয়েই প্রাক্কলন করেছে বিশ^ব্যাংক। তবে করোনা পরিস্থিতি প্রতি নিয়ত পরিবর্তন হওয়ায় ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র আমরা এখনো উপলব্ধি করতে পারছি না। অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বিশ^ব্যাংক অনুমান করছে কোন দিকে যাচ্ছে প্রবৃদ্ধি। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলনগুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকার এখনই দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করে কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে পারে।
তিনি বলেন, করোনার প্রভাবের আগেই আমাদের অর্থনীতিতে একটা ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। এজন্য সরকারও জিডিপি কিছুটা কম ধরেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রবৃদ্ধি আরো কমবে। আর জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া মানে মানুষের মাথাপিছু আয় কমে যাওয়া, অভ্যন্তরীণ ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া। ফলে শিল্প খাতের বিক্রি কমে যাবে। সামগ্রিকভাবে এর প্রভাবে দারিদ্র্য বাড়বে।
এ পরিস্থিতিতে সরকারের করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, আগামী ২ মাস সরকারকে মানুষের স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তায় সমান গুরুত্ব দিয়ে এগুতে হবে। চলতি অর্থবছর এবং আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, সরকারের প্যাকেজগুলো এমনভাবে ঠিক করতে হবে যাতে আশঙ্কা সীমিত মাত্রায় রাখা যায় এবং দীর্ঘায়িত না হয়। সরকারের ঘোষিত প্যাকেজগুলো মোটামুটি টার্গেট হিসেবে ঠিক আছে। ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আসা শুরু করলে তখন হয়তো ঋণসহ অন্যান্য প্যাকেজগুলো প্রয়োজন পড়বে।
এ বিষয়ে বিশ^ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, অতীতে শুধু চাহিদা নয়, সরবরাহ দুর্বলতার কারণে বৈশি^ক মহামন্দাগুলো হয়েছে। কিন্তু নভেল করোনা ভাইরাসের কারণে চাহিদা ও সরবরাহ দুটোতে ব্যাঘাত ঘটেছে। বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থায় বৈশ্বিক জোগান বিশেষ করে আমদানি বিঘ্নিত হয়েছে। দেশীয় জোগানও ব্যাহত হচ্ছে। দেশের উৎপাদনশীল খাত অনেকটাই ম্রিয়মাণ। দেশে মোট ৬৯ শতাংশই ভোক্তা ব্যয়। এ ভোক্তা ব্যয়ের সিংহভাগই আসে দুটি উৎসবকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সেই দুটি উৎসব এখন বন্ধের পথে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ছাড়া বর্তমানে আর কোনো কেনাকাটা নেই।
চলতি সপ্তাহে বিশ্বব্যাংক যখন বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমার কথা বলছে তার ঠিক এক সপ্তাহ আগে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পূর্বাভাসে খুব বেশি নেতিবাচক চিত্র ফুটে উঠেনি। সেখানে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে। তবে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হবে বাংলাদেশের। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে পৃথিবীর অনেক দেশেরই জিডিপির ১০ শতাংশের বেশি ক্ষতি হবে। আমাদের কম হলেও অর্ধেক ক্ষতি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি ছুটিতে দেশের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতে হবে। ফলে এর ঋণাত্মক প্রভাবটা খুব বড় হবে। আর এটা এককভাবে উদ্যোক্তাদের পক্ষে সামাল দেয়া অসম্ভব। ফলে রাতারাতি তারা ঋণখেলাপি হয়ে পড়বে। কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, করোনার প্রভাবে কুটির শিল্পের লাখ লাখ লোক বেকার হয়ে যাবে। তাদের বিষয়ে করোনা পরবর্তী সময়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ যা করবে, আমাদেরও তাই করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী রপ্তানিমুখী খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। অন্যান্য খাতেও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পর্যটন শিল্প, হোটেল-রেস্টুরেন্ট সবই বন্ধ। এদের জন্যও সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। তার মতে, আমাদের ২টি জিনিস ঠিক রাখতে হবে- একটি অভ্যন্তরীণ চাহিদা, অন্যটি বৈদেশিক চাহিদা।
‘কঠিন’ এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের করণীয় তুলে ধরে সাবেক তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. মির্জ্জা আজিজ বলেন, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ^ব্যাংকসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা থেকে আমাদের মঞ্জুরি সহায়তা বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু এসব সংস্থাগুলো ঋণ দিতেই বেশি আগ্রহী থাকে। ফলে মঞ্জুরি সহায়তা খুব বেশি পাওয়া যাবে না। সেক্ষেত্রে সহজ ঋণের জন্য দর-কষাকষি করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকার দৃঢ় অবস্থান নিলে বাড়তি সুবিধা আদায় করা সহজ হবে।
করোনার প্রভাবে গত ২ মাস ধরেই শিল্প-বাণিজ্যের বিশ্বায়ন থমকে গেছে। করোনা-উত্তর পৃথিবীতে মানুষ কবে আবার ঘর থেকে বেরিয়ে কাজে ফিরবে, তারও উত্তর জানে না কেউ। তবে করোনা থেকে মুক্তির দিনক্ষণ অজানা থাকলেও বিশে^ স্থবির এই অর্থনীতির পরিবেশ আর আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না বলে পূর্বাভাস দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী অর্থনৈতিক পরামর্শক সংস্থা ম্যাকেঞ্জি এন্ড কোম্পানি। সংস্থাটি মনে করে, এই স্থবির অবস্থা থেকে বিশে^ নতুন এক অর্থনীতি জন্ম নিবে। যার সূচনা হতে পারে ২০২১ সালেই। এমনই এক নতুন অর্থনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্ববাসী।
এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ভোরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশের জিডিপি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ এখনই এটা বলার সময় আসেনি। বিশেষ করে অঙ্ক ধরে বলার উপযুক্ত সময় এটা নয়। আমাদের সামনে ৮ মাসের তথ্য রয়েছে। সেগুলো যাচাই করে কিছুদিন আগে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলেছে, এবার আমাদের প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। ফলে বিশ্বব্যাংকের এই পূর্বাভাসকে আমি সময়োপযোগী মনে করি না।
তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সারাবিশ্বের মতো আমাদের জিডিপিও কমবে। তবে আমাদের এতটা কমবে না। এ বছরও আমরা কমপক্ষে ৬ শতাংশের উপরে জিডিপি অর্জন করতে সক্ষম হব। কেননা, বাংলাদেশে করোনার প্রভাব পড়ার আগেই চলতি অর্থবছরের ৮ মাস অতিবাহিত হয়েছে। বাকি আছে মার্চ-জুন ৪ মাস। এ সময়ে যদি আমাদের শূন্য কিংবা নেগেটিভ গ্রোথও হয় তারপরও আগের ৮ মাসে আমরা যা অর্জন করেছি সেটা ৬ শতাংশের বেশিই হবে।
তিনি আরো বলেন, অর্থনীতির চেয়ে আমাদের এখন বড় অগ্রাধিকার হচ্ছে দেশের মানুষের জীবন রক্ষা করা। তাদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা, খাবারের জোগান দেয়াসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাই এখন আমাদের মৌলিক কাজ। আমাদের প্রবৃদ্ধির প্রধান ৩টি খাত হলো- কৃষি, শিল্প ও সেবা। আমাদের কৃষি খাতে করোনা ভাইরাসের তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। এটা যদি দীর্ঘায়িত না হয় তাহলে কৃষি খাতে আমরা সম্পূর্ণ প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হব। আর শিল্প খাতে কিছুটা প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এটা কাটানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগও নিয়েছি। একইভাবে সেবা খাতেও কিছুটা প্রভাব পড়ছে। আমরা স্বীকার করছি প্রবৃদ্ধি কমবে, কিন্তু এতটা কমবে না।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়