স্বাস্থ্যকর্মী-রোগী ছাড়া মাস্ক পরার দরকার নেই

আগের সংবাদ

দিল্লির মসজিদে জমায়েত, কোয়ারেন্টিনে ২০০০

পরের সংবাদ

করোনা সাংবাদিকতা!

পেটের ক্ষুধা কি আর করোনা মানে?

নিয়ন মতিয়ুল

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ৩১, ২০২০ , ১:১৩ পূর্বাহ্ণ

রাত তখন সোয়া নয়টা। বাটা সিগন্যাল মোড়। অফিসের গাড়ি থেকে নেমে বাসায় ফিরছি। হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ালেন বয়স্ক এক রিকশাচালক। আমি মাথা নেড়ে ইশারায় জানালাম ‘যাবো না’। কিন্তু না, বিষয়টা যাওয়া-নাযাওয়া নিয়ে নয়। বয়স্ক ব্যক্তিটি অসহায়ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বিকেলে বের হইছি, কোনো ভাড়া পাইনি। আমার ভাত খাওয়ারও টাকা নাই। এ পর্যন্ত বলে থেমে গেলেন। এরপর মনে হয় ‘কিছু টাকা দিবেন’ বাক্যটি বলার মতো সাহস পেলেন না।

থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আবছা আলোয় তার চোখ-মুখের দিকে তাকালাম। মুখে মাস্ক। চোখ দুটো ছলছল। অসহায় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে। মাথার ভেতর পেশার ভাবনা তখন গিজগিজ করছিল। হঠাৎ কৌতুহল মাথা চাড়া দিল। ‘কোথায় বাড়ি? কখন বেরিয়েছে? কত টাকা কামায় হয়েছে? সংসারে সদস্য কত? এই টাকায় কীভাবে চলছে?

হর হর করে এসব প্রশ্ন মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে লাগলো। সেই সঙ্গে মোবাইলের ক্যামেরাটা তার অসহায় মুখের দিকে তাক করলাম। আমার এ পেশাদারিত্ব দেখে আশপাশে আরো বেশ কিছু রিকশার জটলা লেগে গেল। আমিও সুযোগ পেয়ে গেলাম। একের পর এক উত্তেজনার বসে কথা বলে যাচ্ছি।

কুড়িগ্রাম থেকে আসা জালাউদ্দিন প্রশ্ন করতেই বলতে শুরু করলেন, ঘরে আর কয়দিন বসে থাকি। পকেটে টাকা নাই। ঘরে চালডাল নেই। পেটের ক্ষুধা কি আর করোনা মানে? তাই বের হয়েছি। কিন্তু সারাদিনে ঘুরেও ভাড়া পাইনি। একই সুরে বললেন পঞ্চগড়ের তছলিম উদ্দিন। জান বাঁচানোর জন্যই তো ঘরে ঘরে থাকতে বলেছে সরকার। এখন তো সেই জানই বাঁচতেছে না। টাকা নাই, পয়সা নাই। শহরের রাস্তায় কোনো জনমানুষ নাই। কেমন করে বাঁচবো?

এবার সামনে এগিয়ে এসে কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে পাবনার রিকশাচালক খয়বর বললেন, শুনিচ্চি সরকার গরীবদের সাহায্য করিচ্ছে, ত্রাণ দিচ্চে। তো হামড়া সেগলে কুনটি পামু? কেউ কিছু কচ্চেও না। তার কথার সঙ্গে সুর মেলালেন বগুড়ার সোনাতলার রিকশাচালক কাউছার। বললেন, করোনা থেকে হামাগেরে ভয় নাই। ভয় হামাগেরে পেট। পেট চিল্লালে হামরা কুন্টি যামু কন? যিটি টাকা পামু সিটিই তো যামু।

এবার জটলার মধ্য থেকে লম্বা সাদা শুভ্র চুলের এক বয়স্ক রিকশাচালক গলা চড়িয়ে বললেন, ত্রাণের কথা বলছেন। যারা আসল রিকশাওয়ালা তারা তো ত্রাণ পাচ্ছে না। পাচ্ছে ওই হিরোইন সেবীরা। সরকারি লোকজন এসে তাদের হাতে ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। আমরা যারা আসল তারা বাদ পড়ে যাচ্ছি।

এর মধ্যে অটোরিকশা নিয়ে এক প্রতিবন্ধী যুবক খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা শুনছিলেন। এগিয়ে গিয়ে বললাম, ভাড়া পাচ্ছেন? কত টাকা হলো? প্রশ্ন শুনে বিষণ্ণ মুখে বললো, না স্যার। ভাড়া তো আগের মতো পাচ্ছি না। যা পাচ্ছি কোনো মতে পেট চালাচ্ছি। মাস শেষে বাসা ভাড়া কেমনে দিব তা নিয়ে চিন্তায় আছি।

এ সময় একজন এগিয়ে এলেন। নাম নেছার। বাড়ি নরসিংদী। বললেন, স্যার, কয়েকদিন তো ঘরেই ছিলাম। বাড়ি থেকে কিছু টাকা পয়সা এনেছিলাম। কিন্তু এখন তো সব শেষ। ঘরে বসে থাকলে তো এমনিতেই না খেয়ে মরতে হবে। তাই ঘর থেকে বের হইছি। এর মধ্যেই সরকারি দলের স্থানীয় এক পরিচিত নেতা এগিয়ে এলেন। তাকে গিয়ে ধরলাম, দলীয়ভাবে কোনো ত্রাণ দিচ্ছেন আপনারা? তিনি বললেন, হ্যাঁ ত্রাণের লিস্ট করা হয়েছে। তবে এখনও দেয়া শুরু হয়নি।

এসময় ক্লান্ত বয়স্ক এক ব্যক্তি রিকশা নিয়ে পা বাড়ালেন। হাল ছেড়ে দেয়া সুরে বললেন, আজকের দুনিয়ায় মানুষ কি আর মানুষ আছে। সবাই বিপথে গেছে। সেজন্যই আল্লাহর গজব নেমে এসেছে। সরকারকে দোষ দিয়ে আর কী হবে। যা কপালে আছে তাই হবে।

চারদিকের এই জটলার মধ্যে আমার পেশাদারিত্ব বেশ জমে উঠেছিল। খেয়াল করা হয়নি সেই অসহায় মুখের বয়স্ক রিকশাচালকটির কথা। এর মধ্যেই লোকটি চলে গেছে। ভাবছিলাম, ভাত খাওয়ার মতো কিছু টাকা তার হাতে যদি ধরিয়ে দিব। কিন্তু আমার পেশার তোড়জোরের কারণেই তাকে চলে যেতে হয়েছে। তাহলে কি উনি বুঝে গেছেন, আমরা শুধু লিখতেই পারি- কোনো ক্ষমতা আমাদের নেই! তারাই যে আমাদের সংবাদপণ্য- সেটা কি বুঝে ফেলেছেন?

এনএম