সুবিধাবঞ্চিতদের পাশে সাকিব ফাউন্ডেশন

আগের সংবাদ

নিম্ন আয়ের মানুষের প্রতি বিশেষ নজর প্রয়োজন

পরের সংবাদ

ফোর্স নয়, সেবকও নয়, বন্ধু চাই

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ২৯, ২০২০ , ৬:১৮ অপরাহ্ণ

পুলিশ একটি বাহিনী, এর গঠনের সূত্রপাত ইংরেজ আমলে। লক্ষ্য ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজটা তখন খুবই জরুরি ছিল, ইংরেজদের খাজনা সংগ্রহ এবং ব্যবসায় উভয় তৎপরতার স্বার্থে। পুলিশের কাজ ছিল রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীনদের স্বার্থকে পাহারা দেয়া। এ কাজে পুলিশ ছিল একটি ফোর্স, যার পক্ষে জনবিরোধী না হয়ে কোনো উপায় ছিল না। পুলিশ বাহিনীকে পুলিশ সার্ভিস বলা হতো, শীর্ষ পদগুলোতে ইংরেজরাই থাকত, নিম্নবর্তী সব জায়গাতেই দেশি মানুষরা নিয়োগ পেতেন। পুলিশের লাল পাগড়ি কিংবা বড় অফিসারদের শোলার হ্যাট দেখলে মানুষ উৎফুল্ল নয়, আতঙ্কিত হতো। দারোগা সাহেবের সঙ্গে যাদের যোগ আছে তারা তো অবশ্যই, এমনকি তার নৌকার পাশে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়ার সুযোগ লাভ করেছে এমন লোকরাও নিজেদের সৌভাগ্যে বেশ স্ফীত হতো এবং আশপাশের মানুষরা তাদের সমীহ করে চলত। বাংলাদেশের অনেক এলাকায় দারোগা বাড়ি দেখা যায়, সেগুলো বেশ বিশিষ্ট বাসস্থান ছিল, আকার ও সৌন্দর্যের কারণে নয়, মালিকের পদবির দরুন।

তারপর সাতচল্লিশে দেশ স্বাধীন হলো, স্বভাবতই মানুষ আশা করল যে, পুলিশ বাহিনী এখন আর বল প্রয়োগে ব্যবহৃত হবে না, তাদের কাজ হবে মানুষের সেবা করা। ফোর্স রূপান্তরিত হয়ে যাবে সার্ভিসে। সেটা ঘটেনি। তার দায় অবশ্য পুলিশ বাহিনীর ওপর চাপানো যাবে না, দায়ী হচ্ছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হয়নি। দেশের মানুষ যে মুক্ত হয়েছে তাও নয়। আসলে সাতচল্লিশে যা ঘটেছে তাকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা বলা যাবে না, সেটা ছিল ক্ষমতার হস্তান্তর মাত্র। যারা ক্ষমতা পেলেন তার আগের শাসকদের মতোই জনগণকে অধীনস্থ এবং শাসনের অর্থাৎ শোষণের ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে থাকলেন। ব্যাপারটা বিশেষভাবে প্রকট ও দৃশ্যমান হয়ে উঠল পূর্ববঙ্গে। সাতচল্লিশের পরপরই পূর্ববঙ্গজুড়ে নিদারুণ অভাব দেখা দিয়েছিল। সব পেশার মানুষই অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েছিলেন। পুলিশ বাহিনীতে বিক্ষোভ দেখা দেয় এবং তারা বেতন ও পেশাগত সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবিতে ধর্মঘট পর্যন্ত করেন। সেই ধর্মঘট দমানোর জন্য যথার্থ যে ফোর্স, আর্মড ফোর্স অর্থাৎ সেনাবাহিনী- তাকে ব্যবহার করা হয়েছিল।

এর পরে আসে বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, তখন পুলিশকে ব্যবহার করা হয় সে আন্দোলনকে দমন করার জন্য। পুলিশ গুলি করতে বাধ্য হয়। স্বাধীন দেশে বাঙালি পুলিশের হাতে বাঙালি ছাত্ররা নিহত হবেন এটা কেবল অপ্রত্যাশিত ছিল না, ছিল অকল্পনীয়। অথচ সেটাই তো ঘটেছে। রাষ্ট্র পুলিশ বাহিনীকে ফোর্স হিসেবে ব্যবহার করেছে। আবার শেষ পর্যন্ত দেখা গেল হাতের ওই ফোর্স তাদের হুকুমবরদার হতে অসম্মত হবে এই বাস্তবসম্মত আশঙ্কাতে একাত্তরের পঁচিশে মার্চের রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাজারবাগ পুলিশকেন্দ্রে অবস্থানকারী পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। একাত্তরে ওই মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা অংশগ্রহণ করেছেন এবং যারা সেটা করতে পারেননি তারা নানাবিধ দৈহিক ও মানসিক নির্যাতনের ভেতর কালাতিপাত করেছেন। তখন জনতার সঙ্গে পুলিশের একটি অভূতপূর্ব মৈত্রীর বন্ধন স্থাপিত হয়েছিল।

কিন্তু সে বন্ধন টেকেনি, টেকবার কথাও নয়, কেননা পুলিশ সার্ভিসের সদস্যরা তো রাষ্ট্রের কর্মচারী। রাষ্ট্র হলো সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, বলা যায় দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, আর রাষ্ট্রের সে ক্ষমতা যাদের মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়, তাদের একটি শক্তিশালী ও কার্যকর অংশ হলো পুলিশ বাহিনী। সেনাবাহিনী থাকে, কিন্তু তাকে ছোটখাটো কাজে ব্যবহার করা যায় না। পুলিশ বাহিনীর পক্ষে জনগণের সঙ্গে মিশে থাকাটা একাত্তরে সম্ভব ছিল, কিন্তু পরে তা হওয়ার কথা নয়, হয়ও না। রাষ্ট্র জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে; খুব স্বাভাবিকভাবেই পুলিশের সঙ্গেও সমাজের বিচ্ছিন্নতা এসে গেছে।
মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত নতুন রাষ্ট্রে পুলিশ বাহিনীকে মানুষ কীভাবে দেখতে চেয়েছে? ফোর্স হিসেবে যে নয় সেটা তো বুঝতে অসুবিধা নেই। তাহলে কি সেবক হিসেবে? না, তাও নয়।

ফোর্স হিসেবে কেন দেখতে চাইবে না সেটা বোঝা গেল। ফোর্স একটা ক্ষমতা এবং ক্ষমতা মাত্রেই একটি সম্পর্ক, যেটি বিন্যাস ও প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে। পুলিশের ক্ষমতার উৎস জনগণ নয়, উৎস হলো রাষ্ট্র। এবং রাষ্ট্র যদি জনগণের কর্তৃত্বাধীন না থাকে অর্থাৎ গণতান্ত্রিক না হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যে কথিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ব্যবহৃত হবে এটা অনিবার্য। এবং ব্যাপারটা তখন বল প্রয়োগমূলক হতে বাধ্য। রাষ্ট্রীয় শক্তি ক্ষমতার অপব্যবহার করতে চাইলে পুলিশকে অবশ্যই তার অংশীদার হতে হবে।

ক্ষমতার নিজস্ব একটা চরিত্র আছে। যার হাতে সে থাকে, তাকে সে বল প্রয়োগে উত্তেজিত করতে চায়। ক্ষমতা যদি প্রদর্শিত না হলো তবে কতটাই বা তার মূল্য। আমাদের সমাজ ক্ষমতাবঞ্চিত। তাই প্রত্যেকেই ক্ষমতার জন্য ক্ষুধার্ত। সুযোগ পেলে তারা মনে হয় ঝাঁপিয়ে পড়ে বল প্রয়োগে। দেশের চরম সংকটকাল চলছে। করোনা সচেতনতায় অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে পুলিশ কাজ করছে। সচেতনতার পরিবর্তে লাঠিপেটা দেখছি আমরা। এমনকি বয়োবৃদ্ধ খেটে খাওয়া শ্রমিকরাও রেহাই পাচ্ছে না। আর এক সত্য হলো এই যে, সমাজ ক্ষমতা প্রয়োগকারীদের ভয় করে নিশ্চয়ই, কিন্তু সম্মান করে না, উল্টো বিরূপ দৃষ্টিতে দেখে। আমাদের পুলিশ বাহিনীকে আমরা ফোর্স হিসেবে দেখতে চাইব না, দেশের মানুষ যে মুক্তির জন্য সংগ্রাম করছে, যে সংগ্রামে পুলিশ বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল অংশগ্রহণ ছিল সেটির সঙ্গে বল প্রয়োগকারীর ভাবমূর্তি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাহলে কি আমরা চাইব পুলিশ সমাজের জন্য সেবকের ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হোক? না, তাও নয়। আমরা চাইব পুলিশ ফোর্স নয়, সেবকও নয়, হোক মানুষের বন্ধু।

ফোর্স কেন নয় সেটা তো বোঝা গেল, কিন্তু সেবক নয় কেন? সে ব্যাপারে আপত্তির হেতুটা কী? প্রধান হেতু এইটি যে, পুলিশ বাহিনীর কাজ সমাজসেবা নয়। সেবামূলক কাজ পুলিশ অবশ্যই করবে, দৃষ্টিহীন পথচারীকে রাস্তা পার হতে সাহায্য করা, বিপন্ন মানুষকে উদ্ধার করা, দুর্ঘটনা দেখলে এগিয়ে আসা, দুর্বৃত্তদের বিতাড়িত করা- এ ধরনের কাজ পুলিশের কাছ থেকে সর্বদাই প্রত্যাশিত; কিন্তু পুলিশের মূল কাজটা হচ্ছে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেনাবাহিনী যেমন রাষ্ট্রের সার্বোভৌমত্ব রক্ষা করবে, সীমান্তরক্ষীরা যেমন সীমান্তে পাহারায় থাকবে, পুলিশও তেমনি নাগরিকরা যাতে নিরাপদে থাকতে পারে তার ব্যবস্থা করবে। অপরাধীরা মানুষের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, মানুষকে তারা বিপন্ন করে, তারা বড়-ছোট নানা ধরনের অপরাধে লিপ্ত থাকে, পুলিশের কাজ এই অপরাধীদের দমন করা। কেবল দমন করা নয়, সেইসঙ্গে অপরাধ যাতে না ঘটে তার জন্য সামাজিক ক্ষেত্র তৈরিতে সহায়তা দেয়া, নিরীহ মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো। এগুলোর কোনোটাই সমাজসেবার পর্যায়ে পড়ে না। এগুলো হচ্ছে বন্ধুর মতো দায়িত্ব পালন।

বন্ধু হিসেবে পুলিশের উপস্থিতিটা হবে অনেকটা বিদ্যুতের মতো। বিদ্যুতের অপর নাম হচ্ছে শক্তি, ইংরেজিতে পাওয়ার। বিদ্যুৎ আছে বলেই আলো পাওয়া যাচ্ছে, কলকারখানা চলছে, কিন্তু তাকে দেখা যায় না, অদৃশ্য থেকে সে বন্ধুর মতো কাজ করে। তবে থেমে গেলেই বিপদ, সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু অচল হয়ে যায়। পুলিশও হবে সে রকমের। তারা আছে বলেই আমরা নিরাপদ থাকব। তবে অনাবশ্যকভাবে তাদের দৃশ্যমান না হলেও চলবে। কিন্তু বন্ধুত্ব তো একপক্ষের ব্যাপার নয়, সে তো সব সময়ই দ্বিপক্ষীয়। দেয়া এবং নেয়ার সম্পর্ক না হলে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে না, টিকে থাকা তো একেবারেই অসম্ভব। পুলিশ বাহিনী সমাজকে নিরাপত্তা দেবে, বিনিময়ে সমাজের তো কিছু দেয়ার থাকা চাই। সমাজ কী দিতে পারে? দিতে পারে সম্মান ও মর্যাদা। এই দুই বস্তু টাকা দিয়ে কেনা যায় না। টাকা থাকলেই ধরে রাখা সম্ভব হয় না। সমাজ আরো একটি কাজ করতে পারে এবং বন্ধুর জন্য কাজটা করা দরকারও, সেটা হলো সহযোগিতা দান।

এসবই আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বাস্তবতা কি এসবের সমর্থক? মোটেই না। পুলিশকে আমরা বন্ধু হিসেবে দেখতে চাইলে যে তা পাব এমন নিশ্চয়তা কে দেবে? দেয়ার কথা অন্য কারো নয়, স্বয়ং রাষ্ট্রের। ঘটনা নিচ থেকে ওপরে যাবে না, ওপর থেকে নিচে নামবে, নদী যেমন নামে। সেজন্য রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত জরুরি। যেমন ধরা যাক, প্রশিক্ষণের ব্যাপারটা। সেখানে শারীরিক অনুশীলন, অস্ত্র চালনায় দক্ষতা, আইনকানুন জানা, অপরাধী শনাক্তকরণের কৌশল- এসব বিষয় তো অন্তর্ভুক্ত থাকবেই। তেমনি থাকবে মানুষের নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির কথা এবং থাকবে সমাজে পুলিশের ভ‚মিকা কী হবে তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা এবং সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি করার দিকে মনোযোগ। অবশ্য আগে প্রয়োজন হবে রাষ্ট্রকে প্রকৃত গণতান্ত্রিক রূপদান অর্থাৎ ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, মানুষে মানুষে বৈষম্য কমিয়ে আনা, সর্বস্তরে জনপ্রতিনিধিদের শাসন নিশ্চিত করা।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এসআর