মহিউদ্দীন-মিলন-স্মৃতির গেজেট প্রকাশ

আগের সংবাদ

করোনা নিয়ন্ত্রণে ২৯০ দলে কাজ করছে সেনাবাহিনী

পরের সংবাদ

বঙ্গবন্ধু নামকরণের নেপথ্য ইতিহাস

রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ২৬, ২০২০ , ৭:৫৫ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। মামলার প্রধান আসামি বিকাশমান বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিব। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে বিশেষ সামরিক আদালতে তখন মামলার ট্রায়াল চলছিল। আমি তখন ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। প্রচণ্ড ইচ্ছা হয়েছিল প্রিয় নেতাকে একবার দেখতে যাওয়ার। কিন্তু এতে ঝুঁকি যেমন আছে, তেমনি দেখতে যাওয়ার প্রক্রিয়াটাও ছিল বেশ জটিল। চিন্তা করতে থাকলাম কিছু একটা উপায় বের করতে, কয়েকদিনের মধ্যে একটি উপায়ও বের হয়ে গেল। আগরতলা মামলার অন্যতম কৌশলী এডভোকেট মশিউর রহমান (তিনি ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ন্যাশনাল এসেম্বলির এমএনএ নির্বাচিত হয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় মন্ত্রিসভার সদস্যও ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যশোরে তাঁকে আটক করে এবং অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে) হলেন ঢাকা কলেজের আমার সহপাঠী মাহমুদুর রহমানের বাবা। মশিউর চাচার কাছে শেখ মুজিবকে দেখতে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলাম, আমার কথা শুনে তিনি আর্শ্চয হলেন! আমাকে নানা প্রকার ভয়ভীতি ও শংকার কথা বলে নিভৃত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু আমি তো নাছোড়বান্দা, আমার প্রচণ্ড আগ্রহ ও আবদার মেনে নিয়ে অবশেষে তিনি রাজি হলেন। সামরিক আদালতে যাওয়ার জন্য তিনি আমাকে একটি পাস সংগ্রহ করে দিলেন। ঐতিহাসিক সেদিনটি ছিল ৮ আগস্ট ১৯৬৮।

আমার মাঝে সে কি উত্তেজনা, বাঙালির মুক্তিকামী জনতার প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে দেখতে যাওয়ার অধীর আগ্রহের অপেক্ষা যেন শেষ হতে চায় না! অনেকটা নির্ঘুম রাত কাটালাম, পরের দিন সকাল ৮টার মধ্যে আমাকে মশিউর চাচা তাঁর ধানমন্ডির বাসায় উপস্থিত থাকতে বললেন। যথারীতি পরের দিন সকালে আমি এডভোকেট মশিউর চাচার ধানমন্ডি বাসায় উপস্থিত হলাম। মশিউর চাচার ছেলে আমার বন্ধু মাহমুদুরসহ তাদের বাসায় সকালের নাস্তা করলাম। চাচা জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি ক্যান্টনমেন্টে যাবে কীভাবে?’ আমি বললাম, ‘রিকশা করে যাব’। তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘রিকশা করে তুমি বেশিদূর যেতে পারবে না’। শেষে তিনি বললেন, ‘চল আমার সাথে’। তিনি গাড়িতে করে আমাকে নিয়ে গেলেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে বিশেষ সামরিক আদালতে। শুনেছি বর্তমানে এটি একটি জাদুঘর। ট্রাইব্যুনাল কক্ষে আত্মীয়স্বজন ও দর্শকদের জন্য বসার ব্যবস্থা ছিল। সেখানে গিয়ে বসলাম, অপেক্ষা করছিলাম সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য।

অতঃপর তিনি আসলেন, কাছে থেকে দেখলাম ভবিষ্যৎ বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে। যাঁকে দেখার জন্য আমার এত ব্যাকুলতা, তিনিই মশিউর চাচার কাছে আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। মশিউর চাচা বললেন, রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, শেখ কামালের সহপাঠী। বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, ‘এত ঝুঁকির মধ্যে তোমার এখানে আসা ঠিক হয়নি’। বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েও ছেলের সহপাঠীর নিরাপত্তা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর উদ্বিগ্নতা দেখে আমি সেদিন বিস্মিত হয়েছিলাম। কেবল মাত্র একজন জাতির পিতা হলেই মানুষের এরকম একটি হৃদয় থাকতে পারে, তা আমি উপলব্ধি করলাম।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সে সামরিক আদালতে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখতে যাওয়াটা তখনকার সময়ের প্রেক্ষিতে কতবড় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ছিল, তা এখন ভাবতেই আমার গা শিউরে ওঠে। কারণ পাকিস্তানি শাসকদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করা তখন অনেক বাঙালির পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমি সৌভাগ্যবান এডভোকেট মশিউর চাচার বদান্যতায় একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। সামরিক আদালতের সেদিনের পাসটি আমার কাছে কালের সাক্ষী হিসেবে এখনো সংরক্ষিত আছে।

বঙ্গবন্ধুর নামকরণ :
বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের ইতিহাসে একাত্ম হয়ে আছেন। এরই ধারাবাহিকতায় শেখ মুজিব কীভাবে বঙ্গবন্ধু অভিধায় অভিষিক্ত হলেন সেটিও একটি ইতিহাস। বাংলায় বঙ্গবন্ধু নামটি তাৎপর্যবহ। বাংলা ভাষাগত জাতীয়তার মাধ্যমে যে একটি জাতি একত্রিত হচ্ছে তার একটি প্রমাণ এবং এর কেন্দ্রীয় চরিত্রকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বটে। ১৯৬৭ সালে চট্টগ্রাম মুসলিম হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করার পর আমি ঢাকা কলেজে ভর্তি হই। এখানে আমার সাথে পরিচয় হয় বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ সন্তান ছাত্রলীগ নেতা শেখ কামালের সাথে।

আমরা দুজন একই ক্লাসে পড়ি, সহপাঠী। কিন্তু সহপাঠীর পরিচয় ছাপিয়ে আমরা দুজনে পরিণত হই অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে। আমাদের বন্ধুত্বের এই সূত্রপাত ঘটিয়ে দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা জননেতা এম এ আজিজ। ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়ার কথা শুনে এম এ আজিজ আমাকে বললেন, ‘ঐখানে মুজিব ভাইয়ের ছেলে শেখ কামাল পড়ে, তোমাকে পেলে ও খুব খুশি হবে, তোমাকে ওর দরকার’। একথা বলে এম এ আজিজ একটি চিরকুট লিখে দিলেন শেখ কামালের কাছে। চিরকুটটি পেয়ে শেখ কামাল আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন যেন কতদিনের পুরনো বন্ধুকে তিনি খুঁজে পেলেন। আমাদের দুজনের মধ্যে তৎকালীন ছাত্র রাজনীতির নানা বিষয়ে কথা হতো বিশেষত ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগকে কীভাবে সংগঠিত করা যায়। এক পর্যায়ে আমাকে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকও করা হয়। ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচনকে সামনে রেখে তৎকালীন ছাত্র আন্দোলনের খবরাখবর প্রকাশ, বিকাশমান বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে আমি শেখ কামালকে একটি বুলেটিন প্রকাশ করার প্রস্তাব করি।

আমার প্রস্তাবমতে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ঢাকা কলেজ শাখার মুখপত্র হিসেবে ১৯৬৮ সালের নভেম্বর মাসে বুলেটিন ‘প্রতিধ্বনি’ প্রকাশিত হয়। তখনো শেখ মুজিবের নামের সাথে সুনির্দিষ্ট কোনো বিশেষণ যুক্ত হয়নি। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন নামকরণ হলেও কোনোটি তেমন স্বীকৃতি লাভ করেনি। শেখ মুজিবুর রহমান তখনো বঙ্গবন্ধু নামে পরিচিত হননি, দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তাঁকে মুজিব ভাই নামে সম্বোধন করতেন। ১৯৬৬ সাল থেকে তরুণ সমাজ তাঁর নামের আগে সিংহশার্দুল, বঙ্গশার্দুল ইত্যাদি খেতাব জুড়ে দিত। এই প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিবের নামের সাথে একটি যথাযথ বিশেষণ যুক্ত করার চিন্তা আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে দীর্ঘদিন ধরে। দ্বি-জাতিতত্তে¡র ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের অসারতা উল্লেখ করে ৩ নভেম্বর ১৯৬৮ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ঢাকা কলেজ শাখার প্যাডে সারথী ছদ্ম নামে ‘আজব দেশ’ শিরোনামে আমি একটি নিবন্ধ রচনা করি।

৬ দফার আলোকে লিখিত এই নিবন্ধে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অসারতার যুক্তি তুলে ধরার পাশাপাশি গণমানুষের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের নামের সাথে প্রচলিত বিভিন্ন বিশেষণের সাথে সর্বপ্রথম লিখিত আকারে ‘বঙ্গবন্ধু’ বিশেষণটি ব্যবহার করি। আমার ইচ্ছা ছিল এই নিবন্ধটি আমাদের বুলেটিন প্রতিধ্বনিতে প্রকাশ করতে। কিন্তু সিরাজুল আলম খানসহ ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতারা আমাকে ওই মুহূর্তে নিবন্ধটি না ছাপানোর পরামর্শ দেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, এই নিবন্ধ প্রকাশিত হলে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের ধারাবাহিক কার্যক্রম পুলিশি রোষানলে পড়বে একই সাথে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমার কার্যক্রম পরিচালনাও ব্যাহত হবে।

‘আজব দেশ’ নামে এই লেখায় ‘বঙ্গবন্ধু’ বিশেষণটি আমার কাছে খুব জুৎসই এবং যথার্থ মনে হওয়ায় ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি অন্য কোথাও ছাপার চিন্তা করলাম। ১৯৬৮ সালের নভেম্বরে প্রতিধ্বনি বুলেটিনে ঐতিহাসিক ৬ দফা পুনর্মুদ্রণের সময় সর্বপ্রথম ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে শেখ মুজিব বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতারূপে আত্মপ্রকাশ করেন। ’৬৯-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানের গণসংবর্ধনায় তোফায়েল আহমদ কর্তৃক বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভ‚ষিত হওয়ার পর থেকেই শেখ মুজিবের নামের সাথে এতদিনের প্রচলিত মুজিব ভাই, বঙ্গশার্দুল, সিংহশার্দুল ইত্যাদি বিশেষণকে রীতিমতো চিরবিদায় দিয়ে বঙ্গবন্ধু নামটিই সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু নামটি পরবর্তীকালে তাঁর নামের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে। এখন বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করলে আর শেখ মুজিব বলতে হয় না। একইভাবে শেখ মুজিব নাম উচ্চারিত হলেই বঙ্গবন্ধু উপাধিটিও চলে আসে অনিবার্যভাবে। তাই আজ বঙ্গবন্ধু মানে ‘শেখ মুজিবুর রহমান’, শেখ মুজিবুর রহমান মানেই ‘বঙ্গবন্ধু’।

এসআর