গণহত্যা দিবস

আগের সংবাদ

করোনায় ঝুঁকি এড়াতে টেলি স্বাস্থ্যসেবা বাড়ছে

পরের সংবাদ

সেই কালরাত

সভ্যতাকে স্তম্ভিত করে দেয়া গণহত্যা

শরীফা বুলবুল

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ২৫, ২০২০ , ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

বিশ্ব ইতিহাসে গণহত্যার যেসব ঘটনা মানবজাতিকে স্তম্ভিত করে দেয় তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মধ্যরাতের গণহত্যা। এতো অল্প সময়ে এতো বেশি সংখ্যক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ইতিহাসে বিরল। ২৫ মার্চের রাতে ঢাকায় নিরস্ত্র নিরীহ ঘুমন্ত বাঙালির ওপর অতর্কিত ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকায় তিরিশ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় ঢাকানগরী।

অপারেশন সার্চলাইট

প্রতিবছর ২৫ মার্চ এলেই সেই কালরাতের কথা স্মরণ করে শিউরে উঠতে হয়। একটা দগদগে স্মৃতি তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। যার সঙ্গে কোনো ভয়াবহতারই তুলনা চলে না। পাকিস্তানি শাসকরা সেই গণহত্যাকেই নাম দিয়েছিল অপারেশন সার্চলাইট। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানায় ইপিআর সদস্য বাঙালি জওয়ানেরা।

এ অপারেশনের অন্য উদ্দেশ্য ছিল টেলিফোন, টেলিভিশন, রেডিও, টেলিগ্রাফসহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ধ্বংস করে দেয়া। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও এর ছাত্রসংগঠনসহ সর্বোচ্চ সংখ্যায় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতাকর্মীদের হত্যা করা, ঢাকাকে শতভাগ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসা। আর এসব উদ্দেশ্য সফল করার জন্য পাকিস্তানিরা সে রাতে মেশিনগানকেই প্রধান অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিল।

২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী একযোগে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় ঢাকার তখনকার পুলিশ (ইপিআর) সদর দপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবাসে। তারা গোলা নিক্ষেপ করে মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসে, হামলা চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বস্তি এলাকায়। ঘুমন্ত মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সেনাবাহিনী। ইতিহাসের এই নির্মম নিধনযজ্ঞ রাতেই ছড়িয়ে পরে পুরো শহরে। তবে সেই রাতেই রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে প্রতিরোধ শুরু হয়। ইপিআর সদস্যরাও প্রতিরোধের চেষ্টা করে জীবন দেন।

অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম পর্যায় শুধু ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একই সঙ্গে আক্রমণ চালানো হয়েছিল চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, খুলনা, যশোর, রংপুর, সৈয়দপুর ও সিলেটে। পাকিস্তানের সামরিক এ অভিযান চলছিল একাত্তরের মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত। এরপর ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দেশে। দেশের এমন কোনো স্থান ছিল না, যেখানে পাকিস্তানি সেনারা বাঙালিদের নিধন করে লাশ নদীতে ভাসায়নি বা গণকবর দেয়নি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনাট ঘটে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে। একাত্তরের ২০ মে একদিনেই চুকনগরে পাকসেনারা হত্যা করে সাত থেকে ১০ হাজার মানুষকে।

একইভাবে রংপুরের ঝাড়ুয়ার বিল, পাবনার ঈশ্বরদী, খুলনার প্লাটিনাম জুটমিল, গাইবান্ধার বোনারপাড়া, ঢাকার রায়েরবাজার ও মিরপুর, চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকসেনারা। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের কয়েকদিন আগে ঢাকার মোহাম্মদপুরের শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্র পরিণত করা হয়েছিল বুদ্ধিজীবী নির্যাতন কেন্দ্রে। শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে এসে এখানে নির্মম নির্যাতন চালাতো পাকসেনা ও তাদের সহযোগী আলবদররা। পরে রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমিতে নিয়ে তাদের হত্যা করা হতো।

একাত্তরের পর পরই বাংলাদেশে এসে নানা স্তরের মানুষের সঙ্গে কথা বলে গণহত্যার তরতাজা সংবাদ সংগ্রহ করেছিলেন মার্কিন সাংবাদিক ও লেখক রবার্ট পেইন। সেসব তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৭২ সালে প্রকাশিত পেইনের ‘ম্যাসাকার’ বইটিতে গণহত্যার চিত্র ফুটে উঠেছে। ২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দিতে গিয়ে রবার্ট লিখেছেন, মাত্র ১৫ মিনিটে হত্যা করা হলো প্রাণোচ্ছল ১০৯ জন ছাত্রকে। ইকবাল হলের ছাদে মরদেহগুলো যেন শকুনের অপেক্ষায় ফেলে রাখা হলো। হিন্দু ছাত্রদের দেহগুলো রাখা হয়েছিল জ্বালানি কাঠের মতো স্তূপ করে। রাতে মরদেহগুলো কবর দেয়ার জন্য কয়েকজন ছাত্রকে দিয়ে গর্ত খোঁড়ানো হলো। গর্ত খোঁড়া শেষ হলে তাদের গুলি করে সেই গর্তে ফেলে দিল পাকিস্তানি সৈন্যরা। পেইনের মতে, অভিযানের প্রথম রাতে শুধু ঢাকা শহরেই ৩০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। এরপর গণহত্যা চলতে থাকে শহর পেরিয়ে গ্রামে।

অনেক আগেই অপারেশন সার্চলাইটের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পাকিস্তানি শাসকরা। ‘ম্যাসাকার’ বইটিতে এ বিষয়ে রবার্ট পেইন লিখেছেন, ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত এক সামরিক বৈঠকে বাঙালিদের খতম করার সিদ্ধান্ত নেন ইয়াহিয়া খান। সেনাবাহিনীর ওই বৈঠকে ইয়াহিয়া খান নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘ওদের ৩০ লাখ মেরে ফেলো। বাদবাকিরা আমাদের হাত থেকেই খেয়ে বেঁচে থাকবে (কিল থ্রি মিলিয়ন অব দেম, অ্যান্ড দ্য রেস্ট উইল ইট আউট অব আওয়ার হ্যান্ডস)।

ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানও বলেন, বাঙালির ওপর অপারেশন সার্চলাইট নামের নিধনযজ্ঞের পরিকল্পনা করা হয়েছিল একাত্তরের মার্চের শুরুতে জুলফিকার আলী ভুট্টোর বাড়ি পাকিস্তানের লারকানায়। গণহত্যার ষড়যন্ত্রে যারা অংশ নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো, জেনারেল ইয়াহিয়া ও জেনারেল হামিদ। তাদের ধারণা ছিল, হাজার বিশেক মানুষ হত্যা করলেই ভয় পেয়ে যাবে বাঙালিরা। তারা ভয়ে স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের কথা মুখে আনবে না।

পকিস্তানের তিন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব, ইয়াহিয়া আর ভুট্টোর এইড ডি ক্যাম্প (এডিসি) বা বিশ্বস্ত সহকারী ছিলেন সেনা কর্মকর্তা আরশাদ সামি খান। তার লেখা, ‘থ্রি প্রেসিডেন্টস অ্যান্ড অ্যান এইড: লাইফ, পাওয়ার অ্যান্ড পলিটিকস’ বইয়ে পাকিস্তানের ক্ষমতার অন্দরমহলের অনেক কথাই পাওয়া যায়। অনেক কিছুই কাছ থেকে দেখেছেন লেখক। অপারেশন সার্চলাইট সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যায় তার বইতে। তিনি লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় উপস্থিত সামরিক হাইকমান্ড নিয়ে বৈঠক করে সবুজ সংকেত দিলেন।

কালরাতের হত্যাযজ্ঞ

অপারেশনের জন্য দিন নির্ধারণ করা হলো ২৫ মার্চ। সিদ্ধান্ত হলো, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে শেখ মুজিবুর রহমানসহ বিদ্রোহী আওয়ামী লীগের অন্য সিনিয়র নেতাদের অক্ষত অবস্থায় জীবিত ধরতে হবে। ইয়াহিয়া জোরের সঙ্গে কথাটা কয়েকবার বললেন, তাঁদের অক্ষত ও জীবিত ধরতে হবে এবং শক্তি যত কম ব্যবহার করে। আরশাদ সামি তার বইয়ে আরো লেখেন, ২৫ মার্চ ঢাকায় অপারেশন সার্চলাইট শুরু করার আদেশ দিয়ে নিশ্চিন্ত মনেই ইসলামাবাদ ফিরে গিয়েছিলেন ইয়াহিয়া। ভুট্টো তার পদক্ষেপকে সমর্থন দেয়ায় তার কাঁধ থেকে যেন একটা বোঝা নেমে গেল।

তিনি ভাবলেন: ‘পূর্ব পাকিস্তান’ ছিল একটা কঠিন সমস্যা এবং শিগগিরই সবকিছুর সমাধান হয়ে যাবে। তিনি ভুট্টোর কাছ থেকে একটু দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করলেন। আরশাদ সামি সে সময়ের একটা ঘটনার উল্লেখ করে লেখেন,

এক সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ভবনে একটা জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ইয়াহিয়া বেশ খোশমেজাজে ছিলেন। তিনি দুটো বড় বেলুন হাতে নিলেন। তারপর একটা করে বেলুনে লাথি মারলেন আর বললেন, ‘হিয়ার গোওজ মুজিব অ্যান্ড হিয়ার গোওজ ভুট্টো’। তিনি ভাবতেও পারেননি মুজিবের কারণে পূর্ব পাকিস্তানে কী ভয়াবহ আগুন জ্বলবে এবং ভুট্টো তলে তলে কী কারসাজি করবে।

শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ মার্চ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কিছু এলাকায় জনতার ওপর সেনাবাহিনীর হামলার প্রতিবাদে দুদিন পর ২৭ মার্চ হরতালের ডাক দিয়েছিলেন। সেটাই ছিল ২৫ মার্চ কালরাতের আগে শেখ মুজিবুর বা আওয়ামী লীগের শেষ কর্মসূচি। তবে সেই কর্মসূচি পালনের আগে ওই রাতেই শুরু হয় অপারেশন সার্চলাইট। মধ্যরাতে বন্দী করা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে।

এখানে উল্লেখ করা যায় যে, ২৫ মার্চ রাতে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া, না দেয়া নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ জলঘোলা করার চেষ্টা করে আসছে। যদিও স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সালের ৭ এপ্রিল ঢাকায় অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভায় বক্তব্য দেয়ার এক পর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমান স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, ২৫ মার্চ রাতে তিনি চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন।

তবে রাজনীতিক ছাড়াও অনেকেই মনে করেন, স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকলে মুক্তিযুদ্ধের বুঝি বৈধতা দেয়া যায় না। আর সেই ঘোষণা শেখ মুজিবুর রহমান নিজ কণ্ঠে না দিয়ে থাকলে তিনি যে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক, সেটাও প্রমাণ করা যায় না। এরকম নেতিবাচক ধারণা থেকেই পরবর্তী সময়ে নানা বিতর্কের জন্ম দেয়া হয়। যদিও ৭ মার্চের ভাষণেই শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, যার যা আছে তা নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে।

একাত্তরে বাঙালি নিধনযজ্ঞে সামনের সারিতে থাকা পাকিস্তানি জেনারেল টিক্কা খানের সহযোগী ছিল তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ও শান্তি কমিটি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল খাদিম রাজা, গুল হাসান খান তাদের আত্মজীবনীমূলক বইয়ে অপারেশন সার্চলাইট এর কথা বলেছেন। কারা কারা বাংলাদেশে গণহত্যার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের নামও তারা লিখেছেন। বিশেষত খাদিম রাজার লেখা ‘স্ট্রেঞ্জার ইন ওন কান্ট্রি’ বইটি এক্ষেত্রে খুবই তথ্যবহুল।

তাছাড়া পাকিস্তান সরকার নিজেই মুক্তিযুদ্ধকালীন একাত্তরের ৫ আগস্ট ‘ক্রাইসিস ইন পাকিস্তান’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তাতে একপেশে তথ্য পরিবেশন করা হলেও গণহত্যার ভয়াবহতার বিষয়টি বোঝা যায়।

তাছাড়া স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের পর ১৯৭২ সালে পাকিস্তান সরকার একটি কমিশনও গঠন করেছিল। হামুদুর রহমান কমিশনের সেই প্রতিবেদন কখনও আলোর মুখ দেখেনি। তবে প্রতিবেদনের অনেক তথ্যই এখন জানা যায়। সেখানেও অপারেশন সার্চলাইট নামে গণহত্যার ষড়যন্ত্রের জন্য প্রধানত জুলফিকার আলী ভুট্টো, জেনারেল ইয়াহিয়া, জেনারেল হামিদ ও টিক্কা খানকে দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিবেদনে নয় মাসের গণহত্যার কথা উল্লেখ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধ্যে যারা যুদ্ধাপরাধে জড়িত, তাদের বিচারের আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছিল।

এনএম