আত্মবিশ্বাসের বলয়

আগের সংবাদ

বাঙালির গৌরবগাঁথার দিন আজ

পরের সংবাদ

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা ও অবাঞ্ছিত বিতর্ক

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ২৫, ২০২০ , ১০:৫৮ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার বিষয়টি নিয়ে নব্বইয়ের দশকে এসে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। তৎকালীন বিএনপির অন্তর্ভুক্ত স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তির তথাকথিত প্রেতাত্মাগোষ্ঠী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক অভিহিত করে বিতর্কের সূত্রপাত করে। এ বিতর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে বাহ্যত বড় করা হয়েছে বলে মনে করা হলেও প্রকৃতঅর্থে স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তির তথাকথিত প্রেতাত্মাগোষ্ঠী তাঁকে কোনো অর্থেই বড় করতে চায়নি।

মূলত এই বিতর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ২৩ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম, ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়, মার্চের আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার গৌরবকে বিতর্কিত করে তোলার কাজটি করেছে। যে বিতর্কের ঝড়ে তথাকথিত জিয়াভক্তকুল বিকৃত সুখলাভ করলেও স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তির তথাকথিত প্রেতাত্মাগোষ্ঠী প্রকৃতঅর্থে মুক্তিযুদ্ধের ১নং সেক্টর কমান্ডার ও জেড-ফোর্স প্রধান জিয়াউর রহমানের ১৯৭১ সালের গৌরবময় ভূমিকাকে বিতর্কিত ও ছোটো করে দিয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়কে বিতর্কিত করে তুলেছে।

উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তদানীন্তন উপপ্রধান থাকাকালীন অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’র ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ সংখ্যায় ‘একটি জাতির জন্ম’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেখানে তিনি বাঙালি জাতির মুক্তির প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান উদার চিত্তে স্বীকার করছেন। তিনি সে প্রবন্ধে বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভক্তি প্রকাশ করে লিখছেন :

একাডেমির ক্লাসগুলোতেও সবসময় বোঝানো হতো, আওয়ামী লীগ হচ্ছে ভারতের দালাল। পাকিস্তানের সংহতি বিনষ্ট করতেই আওয়ামী লীগ সচেষ্ট। এমনকি উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবেই ক্যাডেটদের শেখানো হতো, আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন ওদের রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু।

আবার জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ দেয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া ভাষণকে তাঁর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের গ্রিন সিগন্যাল বলেও স্বীকার করছেন। তিনি সে প্রবন্ধে লিখছেন :

৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে এক গ্রিন সিগন্যাল বলে মনে হলো। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চ‚ড়ান্তরূপ দিলাম। কিন্তু তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে তা জানালাম না। বাঙালি ও পাকিস্তানি সৈনিকদের মাঝেও উত্তেজনা ক্রমেই চরমে উঠছিল।

জিয়াউর রহমান ‘একটি জাতির জন্ম’ প্রবন্ধটিতে বাঙালি জাতীয়তবাদ সৃষ্টির সূচনা থেকে শুরু করে সে সময়ের ছোট-বড় অনেক ঘটনাসহ তাঁর বিদ্রোহ করার সামরিক পরিকল্পনার কথাও তুলে গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেছেন। তিনি সে প্রবন্ধে লিখছেন :

আমি সংক্ষেপে সব বললাম এবং তাদের নির্দেশ দিলাম সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে। তারা সর্বসম্মতিক্রমে হৃষ্টচিত্তে এ আদেশ মেনে নিলো। আমি তাদের একটা সামরিক পরিকল্পনা দিলাম। তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট। ২৬ মার্চ। ১৯৭১ সাল। রক্তাক্ষরে বাঙালির হৃদয়ে লেখা একটি দিন। বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন স্মরণ রাখবে এই দিনটিকে। স্মরণ রাখতে ভালোবাসবে। এই দিনটিকে তারা কোনোদিন ভুলবে না। কো-নো-দি-ন না।

জেনারেল জিয়াউর রহমান তাঁর ‘একটি জাতির জন্ম’ প্রবন্ধের শেষ পর্যায়ে তাঁর সামরিক পরিকল্পনা ও ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ, রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিটকে বাংলাদেশের জনগণের জন্য স্মরণীয় দিন বলে উল্লেখ করলেও কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্রে গিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার প্রসঙ্গটি সে প্রবন্ধে লিখেননি। বিষয়টি কেনো লিখেননি? বিএনপির বর্তমান সময়ের নেতাকর্মীদের সূত্রমতো স্বাধীনতা ঘোষণার এত বড় দাবিটির (যে দাবিটিকে তারা জেনারেল জিয়ার সেক্টর কমান্ড প্রধান ও জেড-ফোর্স প্রধানের চেয়েও বড় মনে করে) কথা উল্লেখ না করেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালীন উপপ্রধান জিয়া কেন প্রবন্ধটি শেষ করলেন?

আবার ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরপরই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালীন উপপ্রধান জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হলেন। পরবর্তীকালে তিনি কেবল নিজের জন্য অধ্যাদেশ ঘোষণা করে সেনাপতির পদে অধিষ্ঠিত থেকে নির্বাচনে প্রার্থী হলেন এবং নির্বাচনের পরে একই সঙ্গে তিনি সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি থাকলেন, কিন্তু কখনো তিনি নিজেকে স্বাধীনতা ঘোষক বলে দাবি করলেন না। আবার তিনি স্মরণীয় কাজ হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল-পত্র সংরক্ষণের জন্য ১৯৭৮ সালে গুরুত্বপূর্ণ একটি কমিটি করলেন, কিন্তু সে কমিটির নিকট স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে তাঁর নিজের নামটি লিপিবদ্ধ করার খায়েশও প্রকাশ করলেন না। কাউকে দিয়ে কমিটির নিকট সে বিষয়ে তাঁর সুপারিশ করার কথাও জানা যায় না। এর কারণ কী? তাহলে তিনি কি নিজেকে স্বাধীনতা ঘোষক বলে মনে করেননি? না-তিনি এ ঘটনাটিকে বড় করে দেখেননি?

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জানতেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেরিত স্বাধীনতার ঘোষণাটি কালুরঘাট বেতারে তাঁর পূর্বেই আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান ইংরেজিতে এবং আবুল কাসেম স›দ্বীপ সেটি বাংলায় অনুবাদ করে পাঠ করেছেন। তিনিও ছিলেন তাদের ধারাবাহিকতায় একজন পাঠকমাত্র। জেনারেল জিয়াউর রহমান আরো জানতেন যে, ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে সরকার গঠনের মতো নিরঙ্কুশ আসন লাভকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে পাকিস্তানের অবাঙালি শাসকেরা আইনগত ও নীতিগতভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা না দেয়ায় সৃষ্ট পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তিনি একজন বিদ্রোহী মেজর মাত্র। একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা প্রদানের মতো আইনগত, নীতিগত কিংবা রাজনীতিগত একবিন্দু অধিকারও তাঁর নেই। সে কারণে মাত্র ৩৫ বছর বয়সের টগবগে মেজর বিদ্রোহের আবেগতাড়িত উন্মাদনায় ২৭ মার্চ স্বনামে পঠিত ঘোষণাটি অবিলম্বে পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে পাঠ করেছেন। যে কারণে হয়তো তিনি ‘একটি জাতির জন্ম’ প্রবন্ধে বিষয়টি উত্থাপন করেননি। তাঁর আজকের তথাকথিত অনুসারীদের এই সততাটুকু না থাকলেও মনে করা যেতে পারে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেটি ছিল।

দুই.
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট বাস্তবায়নে ঢাকাসহ সারাদেশে গণহত্যা শুরু হয়। সেনাবাহিনী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার শুরু করে। সে অবস্থায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ গোপনে ৩১ মার্চ মেহেরপুর সীমান্ত দিয়ে কোলকাতা পৌঁছান। সেখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার প্রয়াস চালান। ২ এপ্রিল তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দিল্লিতে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন। তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশ সরকার গঠনে সহযোগিতা করার জন্য শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে অনুরোধ করেন। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী সে কথার উত্তর না দিয়ে প্রথমেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান ও ভ‚মিকার কথা জানতে চান। এ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বিশেষ সহকারী মঈদুল হাসান তাঁর ‘মূলধারা-৭১’ গ্রন্থে লিখেছেন :

একাত্তরের ৩ এপ্রিল রাতে তাজউদ্দীন আহমদকে ১ সফদর জং রোডের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। তাজউদ্দীনের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি যখন পেঁছান, মিসেস গান্ধী তখন দীর্ঘ বারান্দায় হাঁটছিলেন। তাঁকে দেখতে পাওয়ার সাথে সাথে ইন্দিরার প্রশ্ন ছিল, শেখ মুজিব কোথায়? উত্তরের অপেক্ষা না করে দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, তিনি গ্রেপ্তার হলেন কেন? তাজউদ্দীন তাঁকে বলেন, শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন, সরকার গঠন করেছেন, তারপর একটা বিভ্রাটে পড়ে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁর এই কথায় ইন্দিরা গান্ধীর সংশয় কাটেনি।

মঈদুল হাসানের জবানির দিকে নজর দিলে প্রশ্ন এসে যায় যে, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সাথে প্রথম সাক্ষাৎকালে তাজউদ্দীন আহমদকে ‘শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন, সরকার গঠন করেছেন’ কথাটি বলতে হয়েছিল কেন?

এসআর