করোনায় বিপর্যস্ত বিশ্বের নেতৃত্ব এখন কার হাতে?

আগের সংবাদ

লকডাউনের দাবিতে অনড় সাদুল্যাপুরবাসী

পরের সংবাদ

ঢাকা ছাড়ছেন অনেকেই

করোনার প্রভাবে বেকার হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষ

দেব দুলাল মিত্র

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ২৪, ২০২০ , ১০:১৩ পূর্বাহ্ণ

‘রাস্তায় যাত্রী নাই। এক সপ্তাহ আগেও আধাবেলা রিকশা চালালে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা আয় হতো। এখন এর অর্ধেক আয় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। জমার টাকা দেয়ার পর নিজের খাবারের টাকাই থাকে না। ৫০ টাকার ভাড়া ২৫-৩০ টাকায় যেতে চাই। তারপরেও যাত্রী নাই। এভাবে চলতে থাকলে দু-এক দিনের মধ্যে বাড়ি যেতে হবে। এছাড়া উপায় দেখছি না।’

রংপুরের রিকশাচালক দিদার হোসেন আক্ষেপের সঙ্গে কথাগুলো বলেন। গত শনিবার রাতে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তার সঙ্গে সুর মেলান পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরো ৭ থেকে ৮ জন রিকশাচালক। তাদের অনেকে বললেন, গত এক সপ্তাহে গ্রামের বাড়িতে মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পাঠিয়েছেন। আয় না থাকায় এখন গ্রামের বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় গুনছেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসবই করোনা ভাইরাসের প্রভাব। করোনার প্রভাবে বিপাকে পড়েছেন রাজধানীর গণপরিবহন শ্রমিক, রিকশা ও অটোরিকশাচালক, গৃহকর্মী, হকারসহ নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ। রাজধানীর জনবহুল ও যানজটের সেই চিরচেনা রূপ এখন নেই।

রিকশা, অটোরিকশা ও গণপরিবহনগুলোকে যাত্রী পেতে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। অনেকেই বেকার হয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন। তাদের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। স্বল্প আয়ের এসব মানুষের ভিড় দেখা মিলছে বাসটার্মিনাল, বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনে। কম ভাড়ায় বাড়ি ফিরতে ট্রাকে ওঠার জন্য ভিড় করছেন। বাংলামোটর মোড়ে অপেক্ষমাণ সিএনজি অটোরিকশাচালক আমিনউদ্দিন বলেন, ‘দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩০০ টাকা আয় করেছি। এরপর ১ ঘণ্টার মধ্যে কোনো প্যাসেঞ্জার কাছে আসেনি। জমার টাকা ওঠানোর জন্যই বসে আছি।’

রাজধানীর ব্যস্ততম ফার্মগেট এলাকা এখন একেবারেই ফাঁকা। এখানেই সিএনজি চালক লোকমান হোসেন জানান, মতিঝিল থেকে ফার্মগেটে ৩০০ টাকায় আসতেন। আজ এসেছেন মাত্র ১০০ টাকায়। প্যাসেঞ্জার নাই। আর দুদিন দেখব, তারপর গ্রামে যাব। এভাবে ঢাকায় থাকা যাবে না।

বিকল্প পরিবহনের মিজানুর রহমানসহ একাধিক গণপরিবহন শ্রমিক জানান, করোনা আতঙ্কের কারণে কম সংখ্যক মানুষ বাইরে বের হচ্ছেন। স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। অনেক বেসরকারি অফিসও এখন বন্ধ। অনেকে ঢাকা ছেড়ে চলে গেছে এবং প্রতিদিন ঢাকা ছাড়ছে। প্রয়োজনে যারা রাস্তায় বের হচ্ছেন, তারা সংক্রমণের ভয়ে বাসে উঠছেন না। ফলে গণপরিবহনের যাত্রী কমেছে। বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যাত্রী স্বল্পতায় একটি বাস রাস্তায় বের করা হলেও যাত্রী না পাওয়ায় জমার টাকা উঠানো সম্ভব হচ্ছে না। জমার টাকা না পাওয়ায় অনেক পরিবহন মালিক বাস বের করতে দিচ্ছে না। ফলে রাস্তায় গণপরিবহনের সংখ্যা কমেছে এবং শত শত পরিবহন শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। যেসব শ্রমিক এখনো কাজ করছে তাদের প্রতিদিনের আয় অর্ধেকের নিচে নেমেছে। ঢাকায় টিকতে না পেরে অনেক শ্রমিক গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে অনেক বাসার গৃহপরিচারিকাদের কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। লালমাটিয়া, ধানমন্ডি, শংকর, মোহাম্মদপুর, পল্টন, মালিবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অনেক বাসায় এখন নিজেরা কাজ করছে। ফলে গৃহপরিচারিকারাও বেকার হয়ে পড়েন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গণমাধ্যম কর্মী জানান, পরিবারের নিরাপত্তা ও সাবধানতার কারণে তিনি তার বাসার গৃহপরিচারিকাকে এক মাসের জন্য ছুটি দিয়েছেন। কারণ গৃহপরিচারিকা বিভিন্ন বাসায় কাজ করে। কোথাও থেকে তিনি সংক্রমিত হলে পুরো পরিবারসহ বিপদে পড়তে হবে। তাই এই সতর্কতা। গৃহপরিচারিকা আকলিমা বলেন, তার পরিচিত অনেক গৃহকর্মী ইতোমধ্যেই বেকার হয়ে পড়েছেন। তাকেও দুটি বাসা থেকে কাজে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। যে কোনো সময় বেকার হতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

পান্থপথ বউ বাজারের সামনে কাঁচামালের দোকানদার রফিক জানান, গত ৪ থেকে ৫ দিন ধরে কোনো বেচাকেনা নেই। তরকারি কেনার মানুষ কমে গেছে। এ কারণে তার পরিচিত দোকানদাররা অনেকেই দোকান বন্ধ করে দিয়েছে। কেউ কেউ গ্রামে চলে গেছে। রফিক নিজেও পরিবারের সদস্যদের গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছেন। নিম্ন আয়ের মানুষের এখন গ্রামে ফেরার দৃশ্য দেখা যায় রাজধানীর বাস টার্মিনাল ও বাসস্ট্যান্ডগুলোতে। গতকাল রবিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে কাওরানবাজারের রাস্তায় কয়েকশ নারী-পুরুষকে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তারা সবাই দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষ। কথা বলে জানা যায়, করোনার কারণে তারা বেকার হয়ে পড়েছেন। তাই গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। উত্তরবঙ্গগামী ট্রাক আসার অপেক্ষা করছেন তারা। কম ভাড়ায় সেই ট্রাকে করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাবেন।

এ ধরনের দৃশ্য গাবতলী বাসটার্মিনালেও দেখা গেছে। কর্মহীন মানুষ গ্রামে ফিরে যেতে ট্রাকে উঠতে হুড়োহুড়ি করছেন। ভাড়ার টাকা কম থাকায় অনেকেই ট্রাকচালক ও হেলপারকে অনুরোধ করতেও দেখা যায়।

এমএইচ