নোয়াখালীতে প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ করে দিয়েছেন ডাক্তাররা!

আগের সংবাদ

চিকিৎসা সেবা মিলছে না হাসপাতালে

পরের সংবাদ

বড় ঝুঁকিতে দক্ষিণ এশিয়া

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ২৩, ২০২০ , ৯:০৫ পূর্বাহ্ণ

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অধিকতর ঝুঁকিতে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়া। প্রায় তিন মাস আগে চীনসহ পূর্ব এশিয়ায় ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর ভাইরাসটি এ মুহূর্তে তার ভয়াল থাবা ছড়িয়েছে ইউরোপ-উত্তর আমেরিকা থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রতিটি মহাদেশের ১৮৮টির বেশি দেশে। ব্রিটেন, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোতে জনঘনত্ব কম, মানুষের শিক্ষা ও সচেতনতার হার বেশি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও তুলনামূলক উন্নত স্তরের, অথচ সেই তারাও রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে করোনা-বিপর্যয় সামাল দিতে গিয়ে। থমকে গেছে দৈনন্দিন জনজীবন। ভেঙে পড়ার মুখে চলে গেছে সেখানকার চিকিৎসা-কাঠামো। সেখানে এসব খাতে নিদারুণ পিছিয়ে থাকা দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর পরিস্থিতি করোনার আক্রমণে কোথায় গড়াবে, তা নিয়ে দারুণ শঙ্কিত সচেতন মহল।

অত্যন্ত ঘন জনবসতি, চরম দারিদ্র্য, বিজ্ঞানবিমুখতা এবং অশিক্ষা-কুশিক্ষায় আকীর্ণ গ্রামীণ সমাজ, দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, রোগ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা উপকরণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ঘাটতি- এখানকার নির্মম বাস্তবতা। এসব কারণে করোনা-কবলিত হলে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ২০০ কোটি মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বিশ্বের অন্য অঞ্চলের চেয়ে তুলনামূলক বেশি বলে বেশ আগে থেকেই বলে আসছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। প্রসঙ্গত, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সামর্থ্য বিচারে ভারতের অবস্থান ৫৭, ভুটানের ৮৫, পাকিস্তানের ১০৫, নেপালের ১১১, বাংলাদেশের ১১৩, শ্রীলঙ্কার ১২০, মালদ্বীপের ১২১ এবং আফগানিস্তানের অবস্থান ১৩০।

করোনা-প্রতিরোধ মানে মূলত এর সংক্রমণ প্রতিরোধ। সে জন্য প্রথম যা করণীয়, তা হচ্ছে- অবাধ মেলামেশা ও যোগাযোগ বন্ধ করতে হবে। সংক্রমণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানিয়ে দীর্ঘ ছয় বছর অচলাবস্থা কাটিয়ে ভিডিও সম্মেলন করেছেন সার্কভুক্ত আট দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা। জরুরি করোনা তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেখানে এক কোটি ডলার দিয়েছে ভারত। অন্যান্য দেশও চাঁদা দিচ্ছে তাদের সাধ্যমতো। বাংলাদেশ ১৫ লাখ ডলার দিয়েছে। অনুরূপ অর্থ দিয়েছে নেপাল ও ভুটান।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে করোনা সংক্রমণ শুরুর পরপরই সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। দেশের বাইরে থেকে পর্যটন, পরিবহন ও যোগাযোগ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ভ্রমণও। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, বিপুল জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এসব দেশে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে অবাধ যাতায়াত ঠেকানোর কার্যকর পথ অত্যন্ত সীমিত। সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর কিংবা বিমানবন্দরগুলোতেও নেই পর্যাপ্ত চেকিং কিংবা পরীক্ষণ উপকরণ। ভাইরাস আক্রান্ত কাউকে খুঁজে পাওয়া গেলেও তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখার মতো জায়গার প্রকট অভাব। ঘাটতি রয়েছে প্রয়োজনীয় লোকবল, স্বাস্থ্যকর্মী এবং চিকিৎসা ব্যবস্থারও।

করোনা-বিপর্যয় শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চীনের উহান থেকে নিজেদের নাগরিক ফিরিয়ে এনেছে ভারত ও বাংলাদেশ। তবে পাকিস্তান আনেনি। তারা জানায়, দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই তাদের শিক্ষার্থীদের চীন থেকে দেশে ফেরানো হচ্ছে না। ইরান থেকে চার হাজার ভারতীয়কে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। উহান থেকে ১৭৫ জন শিক্ষার্থীকে দেশে ফিরিয়েছে নেপাল। মালদ্বীপে পর্যটন নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে সে দেশের কর্তৃপক্ষ, যদিও দেশটির জিডিপির এক-চতুর্থাংশই আসে বিদেশি পর্যটকের আগমন থেকে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সম্ভাব্য ঝুঁকির অন্যতম কারণ এর জনমিতি। প্রযুক্তি আর বিজ্ঞানের সুফল, যেমন- মোবাইল ফোন, এসব দেশের প্রায় প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছালেও মানসিকভাবে গণমানুষের অধিকাংশই এখনো বিজ্ঞানবিমুখ। যে কোনো বিপর্যয়ে তারা বরং অনেক বেশি আস্থাশীল লোক, ধর্মীয় এবং টোটকা চিকিৎসার ওপর। ভারতের লোকসভায় নির্বাচিত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরাও করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক হিসেবে নির্বিচারে নেমে গেছেন অপ্রমাণিত এবং অপরীক্ষিত গোমূত্র ও গোবরের পক্ষে প্রচারণায়। এ কাজ করতে তাদের বুক কাঁপেনি এতটুকু। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে সরকারগুলো চেষ্টা করছে সংক্রমণ প্রতিরোধের। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমানে চলছে বিভিন্ন ধরনের কবিরাজি, আয়ুর্বেদিক আর ঘরোয়া ওষুধের প্রচারণা, যার কার্যকারিতার শক্তিশালী ভিত্তি মিলছে না কোথাও।

হাটেবাজারে দোকানপাট থেকে উধাও হয়েছে মাস্ক আর বিভিন্ন ধরনের স্যানিটাইজার। অসাধু ব্যবসায়ীরা ফাঁকতালে চেষ্টা করছেন বাড়তি মুনাফা লুটতে। সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকায় সাধারণ মানুষ রয়েছে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে। সরল বিশ্বাসে যেখানে যা দেখছে, যা শুনছে তার ওপরই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে সঠিক তথ্যবঞ্চিত অসহায় জনগোষ্ঠী।

জ্ঞাত তথ্যমতে, করোনার সর্বনাশা রূপ ইউরোপ-আমেরিকার মতো এখনো দেখা দেয়নি এসব দেশে। প্রাণঘাতী ভাইরাসের ছোবলে এখন পর্যন্ত ভারতে ৩৩২ আক্রান্তে ৬ জন মারা গেছে, বাংলাদেশে ২৭ আক্রান্তে মারা গেছে ৩ জন, পাকিস্তানে ৬৪৫ আক্রান্তে মারা গেছেন ৩ জন, শ্রীলঙ্কায় ৭৭ আক্রান্তে মৃত নেই, মালদ্বীপে ১৩ আক্রান্তে মৃত নেই, নেপালে ১ আক্রান্তে মৃত নেই, ভুটানে ২ আক্রান্তে মৃত নেই, আফগানিস্তানে ২৪ আক্রান্তে মৃত নেই। চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া এ ভাইরাসটি এখন বিশ্বের ১৮৮ দেশ ও অঞ্চলে পৌঁছে গিয়ে আক্রান্ত করেছে প্রায় ৩ লাখ ৭ হাজার ২৭৮ জনকে আর মারা গেছেন ১৩ হাজারের বেশি লোক।

মানুষের যে কোনো ধরনের জমায়েত করোনা ভাইরাস সংক্রমণের অন্যতম প্রধান কারণ। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ধর্মীয় কিংবা কোনো উৎসব উপলক্ষে বড় ধরনের জমায়েতের ঘটনা ঘটছে হরহামেশাই। দক্ষিণ কোরিয়ায় করোনা ভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ঘটে শিনশেওনজি নামে একটি গির্জার সমাবেশ থেকে। সেখানে আক্রান্ত এক মহিলার কাছ থেকে দাবানলের মতো সারাদেশে ছড়িয়ে যায় করোনা ভাইরাস। সিঙ্গাপুরেও সংক্রমণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি গির্জার নাম। ইরানেও সেখানকার ধর্মীয় তীর্থস্থান পবিত্র কওম শহর থেকেই মধ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ায় আগুনের মতো ছড়াতে শুরু করে ভাইরাস। মালয়েশিয়ায় করোনা-বিপর্যয় প্রকট রূপ ধারণের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে তাবলিগের বিশাল জমায়েত অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যোগ দেন বিশে^র ৩০টির বেশি দেশ থেকে আসা ২০ হাজারের বেশি মুসলিম। অনুষ্ঠানে আচারের অংশ হিসেবে তারা সেখানে একসঙ্গে প্রক্ষালন, একসঙ্গে পানাহার সারেন ও রাতে একসঙ্গে সারি বাঁধা বিছানায় ঘুমান। ওই সমাবেশ থেকে দেশে ফেরার পর এ অঞ্চলের প্রায় এক ডজনের বেশি দেশ থেকে করোনার সংক্রমণের খবর মেলে। ব্রুনেইয়ে ৭৩ জন ও থাইল্যান্ডে ১০ জন আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এরপরও টনক নড়েনি সমাবেশ আয়োজকদের।

চলতি সপ্তাহে ইন্দোনেশিয়ার সুলাবেশি দ্বীপে অনুরূপ আরেকটি আয়োজনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করে ফেলে তারা। যদিও সচেতন মহলের তীব্র প্রতিবাদের মুখে দেশটির প্রেসিডেন্ট শেষ মুহূর্তে ওই আয়োজন বাতিল ঘোষণা করেন, তবে ক্ষতি যা হওয়ার ঘটে যায় এরই মধ্যে। আয়োজকদের ডাকে সাড়া দিয়ে ইতোমধ্যেই সেখানে সমবেত হন ১০টির বেশি দেশের প্রায় ১০ হাজার লোক। সেখানকার একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিচালক রনি আরিফের কথায়, আমরা করোনা ভয় পাই না! গত ২ মার্চ দেশটিতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ২ জন। অথচ সর্বশেষ গত শুক্রবার পর্যন্ত হিসাবে, মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে সে দেশে আক্রান্ত হন ৩৩৯ জন, যার মধ্যে মারা গেছেন অন্তত ৩২ জন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও বিশেষজ্ঞরা যখন বলছেন, সংক্রমণ এড়াতে ব্যক্তিগত সুরক্ষা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে, তখন ভারতে চলেছে হোলি উৎসব। বাংলাদেশে মুজিব শতবর্ষ উদযাপনের উদ্বোধনী আয়োজনের রাশ শেষ মুহূর্তে গিয়ে টানা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে ছোট ছোট আয়োজনে লোকসমাগম হয়েছে প্রচুর। বাংলাদেশে প্রতিটি মসজিদে জুমা ও প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত জামাতে নামাজ পড়া অব্যাহত রয়েছে। তা ছাড়াও এসব দেশে প্রায় প্রতি সপ্তাহে ঘটছে কোনো না কোনো সামাজিক সমাবেশ কিংবা ধর্মীয় জমায়েত। ভারতের অন্যতম বৃহৎ শহর মুম্বাইয়ে করোনা ভাইরাসের কুশপুত্তলিকা বানিয়ে দাহ করেছে সেখানকার লোকজন।

অন্যদিকে করোনা ভাইরাসের আঘাতে ইতোমধ্যেই বেসামাল দক্ষিণ এশীয় অর্থনীতি। ভারতের ওষুধশিল্পের ৭০ ভাগ উপাদান এবং গাড়িশিল্পের ২৫ শতাংশ কাঁচামাল আসে চীন থেকে, করোনা-অবরোধের কারণে যা থমকে গেছে ইতোমধ্যেই। চীনা স্মার্টফোনের বৃহত্তম বাজার ভারত। সেখানকার দোকানগুলোতে ফোনসেট ফুরিয়ে গেছে, অথচ নতুন উৎপাদন হাতে আসেনি এখনো। ভারতে প্রবৃদ্ধির সাম্প্রতিক ইতিহাসে এত নাজুক পরিস্থিতি এর আগে তৈরি হয়নি কখনো। বিপর্যয়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে চীনা সরবরাহের ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল বাংলাদেশের বৃহত্তম খাত পোশাকশিল্প। তবে ভরসা একটাই, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি অনেকটাই জ্বালানি আমদানিনির্ভর। ফলে তেলের দাম নেমে যাওয়া হয়তো লাভজনক হিসেবে দেখা দিতেও পারে তাদের জন্য। উদাহরণ হিসেবে, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলার নেমে গেলেও এক বছরের আমদানির হিসাবে ভারতের সাশ্রয় ঘটবে দেশটির প্রবৃদ্ধির প্রায় ১ শতাংশ।

এমএইচ