চিকিৎসা সেবা মিলছে না হাসপাতালে

আগের সংবাদ

দোলাচলে স্পিনার আবদুর রাজ্জাক

পরের সংবাদ

ঝুঁকিতে কারাবন্দিরা

কামরুজ্জামান খান

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ২৩, ২০২০ , ৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ

দেশের ৬৮টি কারাগারের প্রায় ৯০ হাজার বন্দিকে করোনা সচেতনতায় বিভিন্ন বার্তা দেয়া হলেও আতঙ্ক কাটেনি। স্থান সংকুলানের অভাবে গাদাগাদি অবস্থায় থাকা বন্দিরা রয়েছেন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। এ অবস্থায় করোনা ভাইরাস তাদের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বন্দিদের মধ্যে বিদেশি থাকায় উৎকণ্ঠা একটু বেশি। যদিও এরই মধ্যে কারা কর্তৃপক্ষ নানাবিধ পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন করে কেউ কারাগারে গেলে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে রাখার পর তাকে অন্য বন্দিদের সঙ্গে দেয়া হচ্ছে। আইসোলেশন প্রস্তুত করা হয়েছে। বিতরণ করা হয়েছে ফেস মাস্ক। হাতের পাশাপাশি পা ধোয়া নিশ্চিত করা হয়েছে। বন্দিদের স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়েছে। মাদারীপুর জেলা কারাগারে সাক্ষাৎ বন্ধ করা হয়েছে। প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপের জন্য রাখা হয়েছে থার্মাল স্ক্যানার। তবুও কাটছে না শঙ্কা।

এ প্রসঙ্গে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মোস্তফা কামাল পাশা গতকাল রবিবার ভোরের কাগজকে জানান, বন্দিদের আদালতে হাজিরা স্থগিত করা হয়েছে। কারা অধিদপ্তরের সব বিভাগে পৃথক ‘আইসোলেশন’ চালু করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে কারা অধিদপ্তরের গার্মেন্টেসে তৈরি ফেস মাস্ক কারারক্ষীদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। বন্দিদের মধ্যে যাদের সর্দি-কাশি রয়েছে তাদেরও এই মাস্ক দেয়া হয়েছে। বন্দিদের সচেতনতা বাড়াতে পদক্ষেপসহ কারাগারে যারা প্রবেশ করে, তাদের হাতের পাশাপাশি পা ধোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব কারাগারে থার্মাল স্ক্যানার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কয়েকটি কারাগারে স্প্রে করা হয়েছে। বিদেশি বন্দিদের পৃথক

রাখাসহ আইসোলেটেড ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাদারীপুর কারাগারে বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ বন্ধ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সব কারাগারে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বন্দিদের সঙ্গে স্বজনদের দেখা করায় আপাতত কড়াকড়ি করা হয়েছে। আইজি প্রিজন্স এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি কারাগার পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানা গেছে। এর মধ্যে কোনো ধরনের গুজব ছড়িয়ে যাতে আতঙ্ক সৃষ্টি করা না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাহাবুবুর রহমান জানান, বন্দিদের সচেতন করা হচ্ছে। কেউ যাতে কারো সংস্পর্শে না যায় এবং বারবার হাত ধুতে বলা হয়েছে। কারো জ্বর বা ঠাণ্ডা লাগলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে কারা হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। নতুন কোনো আসামি কারাগারে এলে তাকে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে রাখার পর সেল বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে একজনকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হলে তার লক্ষণ দেখে সন্দেহ হয়। পরে তাকে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হলেও কেউ চিকিৎসা করেননি। পরে তাকে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়।

জানা গেছে, দেশের কারাগারগুলোয় চীনা, ভারতীয়সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অপরাধীরা বন্দি হিসেবে রয়েছেন। প্রতিটি কারাগারেই বন্দিদের সুরক্ষায় নিয়োজিত রয়েছেন কারারক্ষীরা। দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে কারা অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন তারা। এখন পর্যন্ত শুধু স্যানিটাইজার ও সাবান দিয়েই সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে হচ্ছে তাদের।

কারাবিধি মতে, বন্দিদের অনেক সময় একত্রে হতে হয়। স্থান সংকুলানের অভাবে হয় গাদাগাদি। বিশেষ করে কারাগারের ওয়ার্ডগুলো ও আমদানিতে বন্দিরা গাদাগাদি অবস্থায় থাকে। সাক্ষাৎ কক্ষেও একই দশা হয়। খাবার দেয়ার সময়ও ভিড় হয়। এ অবস্থায় হাজার হাজার বন্দি সুরক্ষা কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জেল কোড অনুযায়ী, কারাবন্দিরা প্রতিবার তাদের দুজন করে স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ কক্ষে গিয়ে আধা ঘণ্টা কথা বলতে পারেন। একেক শিফটে সাক্ষাৎ কক্ষে কারাগারভেদে হাজির হন ৫০ থেকে ১৫০ বন্দি। প্রতি বন্দির জন্য দুজন করে স্বজন সাক্ষাৎ কক্ষে যেতে পারেন। সব মিলিয়ে একেক শিফটে কারা সাক্ষাৎ কক্ষে হাজির হন কয়েকশ বন্দি ও তাদের স্বজনরা। তবে অবস্থা বিচেনায় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সব ধরনের সাক্ষাৎ আপাতত বন্ধ করা হয়েছে।

অপরদিকে দেশের কারা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকসহ জনবল সংকটের অভিযোগ পুরনো। মাত্র দুজন চিকিৎসক, একজন নার্স ও একজন ফার্মাসিস্ট দিয়ে দেশের সব কারাগারের বন্দিদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়। অথচ এখনো তাদের ব্যক্তিগত সুরক্ষায় কোনো উপকরণ সরবরাহ করা হয়নি। এ অবস্থায় দেশের কারাগারগুলোতে ১১৭টি শূন্য পদে অবিলম্বে^ চিকিৎসক নিয়োগের জন্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এই আদেশ পাওয়ার এক মাসের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেয়ার জন্যও বলা হয়েছে। দেশের কারাগারগুলোতে শূন্য পদে চিকিৎসক নিয়োগের প্রয়োজনীয় আদেশ চেয়ে গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. জে আর খান রবিন একটি রিট আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ জানুয়ারি হাইকোর্টে শুনানি শেষে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই আদেশ দেন।

কারা হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মাহমুদুল হাসান গতকাল সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদককে বলেন, করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ চেয়ে আবেদন করা হলেও এখনো তা পাইনি। শুধু মাস্ক আর স্যানিটাইজার দিয়ে চিকিৎসক, নার্স ও কারারক্ষীদের সংক্রমণ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, কারাগারগুলোতে দেশি বন্দির পাশাপাশি বিদেশি বন্দিও রয়েছে। কেউ অসুস্থ হলে ঝুঁকি নিয়ে তাদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হচ্ছে।

এমএইচ