সংসদ ভবন চত্বরে গাছের চারা রোপণ করলেন স্পিকার

আগের সংবাদ

চিংড়ির রেনু আহরণে ধ্বংস হচ্ছে মাছের পোনা

পরের সংবাদ

সালাউদ্দিনের স্মৃতিচারণ

বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে বিশ্বকাপে খেলতো বাংলাদেশ

খেলা ডেস্ক

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ১৭, ২০২০ , ৬:০১ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের ফুটবলের নায়ক বলা হয় সালাউদ্দিনকে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন এবং সাফ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কাজী মো. সালাউদ্দিন স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে চাচা বলে ডাকতেন। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল ছিলেন সালাউদ্দিনের বাল্য বন্ধু। দুজন একই স্কুলে পড়াশুনা করেছেন। শেখ কামাল থাকতেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে আর সালাউদ্দিনরা থাকতেন ধানমন্ডি ১৮ নম্বরে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শেখ কামালকে কাছ থেকে দেখেছেন কিংবদন্তি এই ফুটবলার। তার জবানিতে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্মৃতিচারণ অনুলিখন করেছেন- শামসুজ্জামান শামস

২৫ মার্চ রাতে নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করতে অস্ত্র হাতে তুলে নেয় বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা। যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে ২৬ মার্চের পর ৩ বন্ধুকে নিয়ে আমি আগরতলায় রওনা দেই। সেখানে গিয়ে যুদ্ধের ট্রেনিংয়ের জন্য অপেক্ষা করছি এমন সময় কলকাতা থেকে এক ফটোসাংবাদিক এসে খুঁজে বের করে আমাকে। তার মুখে খবর পাই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠন করা হয়েছে। সেই সাংবাদিক আমাকে বললেন তোমার বন্ধুরা সব তোমার জন্য অপেক্ষা করছে কলকাতায়। তুমি সেখানে গিয়ে ফুটবল দলে যোগ দাও। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ভারতের বিভিন্ন এলাকায় মোট ১৬টি ম্যাচ খেলে স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার পাশাপাশি ফান্ড সংগ্রহ করে। ম্যাচগুলো থেকে আয় করা ৫ লাখ টাকা মুক্তিযুদ্ধের ফান্ডে জমা দেয়া হয়। ভারতের বিভিন্ন স্থানে ১২টি খেলায় আমরা জয়লাভ করি।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। সামনে সালাউদ্দিন। ছবি: ফাইল।

১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের দিনেও ফুটবল খেলে ক্যাম্পে ফিরে দেশ স্বাধীন হওয়ার সংবাদ পাই। পুরো কলকাতা শহরে তখন ব্যাপক হইচই। এত হই-হুল্লোড় দেখে বাংলাদেশ যে স্বাধীন হয়েছে এ কথা সত্য বলে বিশ্বাস করতে আমার ২ ঘণ্টা সময় লেগেছিল।

আমি আর শেখ কামাল বিএএফ শাহীন স্কুলে পড়াশোনা করেছি। আমার ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হয় ১৯৬৯ সালে ওয়ারি ক্লাবের হয়ে খেলার মধ্য দিয়ে। প্রথম বাংলাদেশি খেলোয়াড় হিসেবে হংকংয়ে প্রফেশনাল লিগে ক্যারোলিন হিল এফসিতে খেলেছি।

১৯৭২-১৯৮৪ সাল আবাহনী ক্রীড়া চক্রের খেলোয়াড় ছিলাম। ১৯৭১-১৯৮৩ পর্যন্ত জাতীয় দলের অন্যতম প্রধান সদস্য ছিলাম। ১৯৭৫ ও ১৯৭৯ সালে দুবার জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়কত্ব করেছি। ১৯৭৫ সালে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ মালয়েশিয়ার মারদেকা কাপে খেলি। ১৯৮৪ সালে ফুটবল খেলা ছেড়ে দেই। ১৯৮৫ সালে আবাহনীর কোচ হই এবং ওই বছর সব কয়টি টুর্নামেন্ট শিরোপা জেতে আকাশি-নীল জার্সিধারীরা।

১৯৮৫-১৯৮৮ জাতীয় দলের কোচ ছিলাম। ১৯৮৮ সালে কোচিং ছেড়ে দিলেও ১৯৯২ সালে আবার ফিরে আসি আবাহনীর কোচ হয়ে। আবাহনী ওই বছর লিগে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৯৪ সালে মুক্তিযোদ্ধা ফুটবল ক্লাবের কোচের দায়িত্ব গ্রহণ করি। মুক্তিযোদ্ধা ওই বছর ফেডারেশন কাপ জেতে। সে বছর পিতার মৃত্যুর পর কোচিং ছেড়ে দেই। ২০০৮, ২০১২ ও ২০১৬ সালে টানা তিনবার বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি নির্বাচিত হই। এবার চতুর্থবারের মতো বাফুফের সভাপতি পদে নির্বাচন করছি।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে ১৯৬৬ সালে। আমি তখন ক্লাস সেভেন কিংবা এইটে পড়ি। শেখ কামালের সঙ্গে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসায় গিয়েছিলাম। চাচাকে দেখে (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) সালাম দিলাম। আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে আদর করলেন। তারপর আমাদের নিয়ে খাবার টেবিলে বসলেন। আমার সৌভাগ্য যে আমি বঙ্গবন্ধুর মতো মহান নেতার সান্নিধ্য পেয়েছি।

স্বাধীনতার পর দেশের ক্রীড়া উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর আন্তরিকতার কমতি ছিল না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপ্রেরণা আর আন্তরিক সহযোগিতায় স্বাধীন বাংলাদেশে ফুটবল মাঠে গড়ায় মাত্র দুমাসের ব্যবধানে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তারকা ফুটবলারদের সমন্বয়ে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ একাদশ ও রাষ্ট্রপতি একাদশের মধ্যে এই ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৭২ সালের মে মাসে ঢাকায় খেলতে আসে ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা দল কলকাতা মোহনবাগান। প্রথম ম্যাচে কলকাতা মোহনবাগান ঢাকা মোহামেডানকে হারালেও পরের ম্যাচে হোঁচট খায় সফরকারীরা। দ্বিতীয় ম্যাচে মোহনবাগান ঢাকা একাদশের মোকাবিলা করে। খেলার আগে ঢাকা একাদশের খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ম্যাচের দিন প্রধান অতিথি হিসেবে মাঠে উপস্থিত থেকে খেলোয়াড়দের মনোবল চাঙ্গা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে সেদিন দুর্দান্ত এক জয় উপহার দিয়েছিলাম আমরা। ঢাকা একাদশ মোহনবাগানকে ১-০ গোলে হারিয়েছিল। ঢাকা একাদশের পক্ষে সেদিন জয়সূচক গোলটি করেছিলাম আমি।

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে খেলতে আসে রাশিয়ার মিন্সক ডায়নামো ক্লাব। ফুটবলপ্রেমী হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছোট ছেলে শেখ রাসেলকে নিয়ে ভিআইপি গ্যালারিতে বসে ঢাকা একাদশ এবং রাশিয়ার মিন্সক ডায়নামো ক্লাবের খেলা উপভোগ করেন। ১৯৭৫ সালে মালয়েশিয়ার মারদেকা ফুটবল টুর্নামেন্টে খেলতে যাই আমরা।

খেলোয়াড়দের উজ্জীবিত করতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় দলের বিদায়ক্ষণে গণভবনে ডেকেছিলেন আমাদের। খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা না থাকলে এমনটি সম্ভব নয়। দলের সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে ছবিও তুলেছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭৪ সালে আমরা ভারতের আইএফ শিল্ডে খেলতে যাওয়ার আগে চাচা (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) বলেছিলেন, চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে বিমান পাঠিয়ে দেব, আমি (বঙ্গবন্ধু) বিমানবন্দরে তোমাদের রিসিভ করবো। আমরা সেমিফাইনালে ইস্ট বেঙ্গলের বিপক্ষে হেরেছিলাম।

বঙ্গবন্ধু এবং শেখ কামাল বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের ফুটবলের মান বিশ্ব পর্যায়ে থাকতো। আমাদের ছেলেরা বিশ্বকাপে খেলতো।

জাতীয় স্টেডিয়ামে (তৎকালীন) বঙ্গবন্ধু। ছবি: ফাইল

পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ইংল্যান্ড এবং ভারত হয়ে ১০ জানুয়ারি ব্রিটিশ সরকারের বিশেষ একটি বিমান বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যখন ঢাকার বিমানবন্দরের মাটি স্পর্শ করে তখন সারা বাংলাদেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওই দিনের স্মৃতি এখনো আমাকে আলোড়িত করে। চাচাকে (শেখ মুজিব) অভ্যর্থনা জানাতে আমরা বিমানবন্দরে উপস্থিত হই। যেখানে বিমান ল্যান্ড করবে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বিমান থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আমাদের দেখে চাচা হাত উঁচু করেন। আমরা তখন আনন্দে আত্মহারা।

শেখ কামালের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয় ১৯৭৫ সালের ৮ আগস্ট, বিমানের মধ্যে। আমরা তখন মালয়েশিয়া যাচ্ছিলাম মারদেকা কাপ খেলতে। দলের ম্যানেজার হয়ে শেখ কামালেরও আমাদের সঙ্গে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একটা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের কারণে তার যাওয়া হয়নি। আমরা রওনা হওয়ার সময় শেখ কামাল আমাকে একটা কথাই বলেছিল, তুই এবার যা। ক্যাপ্টেইন হয়ে যাচ্ছিস, ভবিষ্যতে যতদিন খেলবি আমি ম্যানেজার থাকবো আর তুই ক্যাপ্টেনই থাকবি।

এনএম