বিশ্বরাজনীতির ধ্রুবতারা বঙ্গবন্ধু

আগের সংবাদ

শেখ মুজিবের জন্মভূমি এবং জন্মশতবর্ষের অঙ্গীকার

পরের সংবাদ

বঙ্গবন্ধু চিঠিটা একটু পড়ে দেখো

রণেশ মৈত্র

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ১৭, ২০২০ , ২:১৬ অপরাহ্ণ

প্রিয় মুুজিব ভাই, ১৯৫৩ সালে পাবনাতে তোমার সাথে প্রথম পরিচয়। সেই যে তোমাকে চিনলাম আর তোমাকে ভুলতে পারলাম না। আর জানো, প্রতিদিনই তোমাকে চিনছি। চেনার শেষ নেই যেন। আজও মনে হয়, তোমাকে চিনবার আরও কতই না বাকি। তোমার ঠিকানা জানা নাই তবুও এই প্রথম চিঠিখানা লিখছি।
আগেই একটি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই মুজিব ভাই। নেহায়েতই ব্যক্তিগত। অজ্ঞতার স্বীকারোক্তি দিয়েই শুরু করি। জনতাম না তুমি ডায়েরি লিখো বা লিখতে। কিন্তু অবাক বিস্ময়ে তা প্রথম জানলাম যখন ‘কারাগারের রোজনামচা’ শীর্ষক মহামূল্যবান বইটি বাংলা একাডেমি প্রকাশ করলো। তাতে দেখি বইটির ৮৫,৯০,১১৮,১৩৮,১৫৭ ও ১৬১নং পৃষ্ঠায় আমার নামটি উল্লেখ করেছ। একই সময়ে নিকটতম দুটি ওয়ার্ডে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ষাটের দশকে যখন তুমি ও আমি আটক ছিলাম তখন গোপনে উভয়ের যে সাক্ষাৎ হতো উল্লেখ করেছ সেই কথা।
কিন্তু আমি অবার হলাম কেন? ব্যক্তিগতভাবে আমি তো তখন, বা আজো তোমার দল করি না। করেছি আওয়ামী লীগ তবে তা ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৭ সাল অবধি। তারপর থেকে ন্যাপ করি। তা তোমারও জানা। ভিন্ন দলের একজন কর্মী হওয়া সত্ত্বেও এবং আদৌ কন কেউকেটা না হওয়া সত্ত্বেও নামটা অতবার উল্লেখ করায় বিস্মিত হবোই বা না কেন? এই উদারতা নামক গুণটি গণতন্ত্রেরই প্রাথমিক শর্ত এবং তুমি তা দিব্যি বুঝেছিলে। তুমিও হারিয়ে গেলে উদারতাও হারিয়ে গেল বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে। আজো তা ফিরে পাইনি।
আচ্ছা মুজিব ভাই, তুমি তো মহান মুক্তিযুদ্ধের তর্কাতীত মহানায়ক। মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে তোমাকে তো পাকিস্তানি শাসকেরা উপস্থিত থাকতে দিতে সাহস করলো না। তবুও মুক্তিযুদ্ধে তোমার নামেই তো আমরা (গোটা বাঙালি জাতি) ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম দেশ স্বাধীন করে তবেই না সবাই আমরা ঘরে ফিরেছি। তোমাকেও সসম্মানে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি ১০ জানুয়ারি ১৯৭২-এর যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত এই দেশটিতে।
ফিরে আসার পর, আরো অনেক কাজের মধ্যে, তুমি হাতে নিলে দেশের জন্য একটি সংবিধান রচনার দ্রুততম সময়ে তা রচিত সংসদে গৃহীত হলো। ঐ সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মৌলিনীতি নির্ধারিত করলে ‘গণতন্ত্র’ ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র এই চারটি। এগুলো আমাদের সংবিধানের মূল স্তম্ভ।
কিন্তু শত্রুরা তো তোমাকে বেশিদিন বাঁচতে দিল না। তোমাকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যার পরেই দিব্যি খুনিরা হত্যা করলো সংবিধানের ওই চার মৌলনীতিকে। সংবিধানের শুরুত্বে জুড়ে দিল ‘বিসমিল্লাহির রাহমানুর রহিম’ যা বাহাত্তরের সংবিধানে তুমি লেখনি। ওরা ধর্মশ্রয়ী দলগুলোকে বৈধতা দিল জামায়াতে ইসলামীসহ সকল ইসলামপন্থি দলকে যদিও এরা সবাই ছিল মুক্তিযুদ্ধেয় সক্রিয় বিরোধিতাকারী।
ওরা সংবিধানে বসালো ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’। এটাও তো তুমি বসাওনি। আরো বিস্ময়ের ব্যাপার আছে এই যে সংবিধানের মৌলনীতি পরিবর্তিত হলো ১৯৭৫-এরপর আজো কিন্তু তারা আর পরিবর্তন হয়নি। যদিও তোমার দল দীর্ঘকাল ক্ষমতাসীন রয়েছে দুই-তৃতীয়াংশের অধিক সংসদ সদস্য নিয়ে।
তাই না শুধু।
পাঠ্যপুস্তুকের কী মারাত্মক পরিবর্তনই না করা হলো তো কি তুমি জানো? অসাম্প্রদায়িক খ্যাতনাম লেখক লেখিকাদের লেখা উধাও করে দিয়ে তিন চার বছর যাবৎ সাম্প্রদায়িক লেখকদের লেখা উধাও করে দিয়ে তিন চার বছর যাবৎ সাম্প্রদায়িক লেখকদের লেখাকে শিশু-কিশোরদের পাঠ্যপুস্তুকে স্থান করে দেয়া হলো। কিন্তু তুমিতো এমটি করোনি।
সর্বশেষ, কওমি মাদ্রাসার সর্বশেষ ডিগ্রিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ডিগ্রির সমতুল্য বলে গণ্য করার আইনও পাস করা হচ্ছে।
সর্বশেষ এই দুটি শিক্ষাসংক্রান্ত দাবি একমাত্র হেফাজতে ইসলামীর অন্য কারো না। সবাই এতে ক্ষুব্ধ তবুও এগুলো হলো।
আচ্ছা মুজিব ভাই, এখন যে বলা হয় বাংলাদেশ মুসলমানের দেশ, তাই ওগুলো করা হলো। তবে কি ১৯৭২-এ বাংলাদেশে কি মুসলমানের দেশ ছিল না?
সংবিধানে বিসমিল্লাহ, ‘রাষ্ট্রধর্ম’ প্রভৃতি তুমি লেখ নি কেন? জানতাম, তুমি বলতে ওগুলো ধোঁকাবাজি ওসব পাকিস্তান করতে পারে কিন্তু তুমি মানুষকে ধোঁকা দিতে রাজি না থাকায় ওগুলোকে সংবিধানে স্থান দাওনি।
তবে কি মুজিব ভাই, তুমি কি কিছু কম মুসলমান ছিলে? তখনকার সংসদই কি কম ছিল মুসলান হিসেবে?
তেমনই আজকের সংসদ কি প্রকৃত মুসলমানদের নিয়ে গঠিত?
জবাব দিও মুজিব ভাই, অপেক্ষায় থাকব না। আজকের আওয়ামী লীগ শুধুই খারাপ কাজ করছে তা কিন্তু ঠিক না। তেমনটি ভেবে নিও না আমার এই চিঠি থেকে। বাংলাদেশের তোমার দলের সরকার কিন্তু বেশ কয়েকটি দুঃসাহসী কাজও করেছে।
এক. বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার করে আটক অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রদত্ত সাজা বাস্তবায়ন করেছে এবং বিদেশে পালিয়ে থাকা দ-প্রাপ্ত অপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে তা কার্যকর করার প্রচেষ্টও চলছে,
দুই, চার জাতীয় নেতা হত্যার ও বিচার হয়েছে এবং অপরাধীদের শাস্তি কার্যকর করা হয়েছে।
তিন. বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে,
চার. বিশ্বব্যাংক তার সাহায্য/ঋণের প্রতিশ্রুতি না রাখলেও নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ করা হচ্ছে এবং নির্মাণ কাজ দ্রুত এগুচ্ছে।
পাঁচ. অব কাঠামোগত উন্নয়ন বিস্তর ঘটানো হয়েছে যেমন বেশ কয়েকটি সেতু, রাস্তা, রেলপথ প্রভৃতি নির্মাণ করা হয়েছে,
ছয়. পাবনার রূপপুরে দেশের পপথম পারমাণবিক প্রকল্প রাশিয়ার সহায়তায় নির্মাণ শুরু হয়েছে;
সাত. জাতীয় প্রবৃদ্ধি ক্রমশ বাড়ছে;
আট. মানুষের মাথাপিছু আয়ও বিপুলভাবে বেড়েছে।
তার পরেও কথা আছে।
মাথা পিছু আয় বাড়লেও তা কিন্তু শতকরা ৯০ ভাগ মানুষের ঘরে না পৌঁছে ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে অন্যরা তার ছোঁয়া পাচ্ছেন না।
দেশে দুর্নীতির ব্যাপক প্রসার ঘটেছে এবং দুর্নীতিবাজদের রাঘব বোয়ালরা দিব্যি ধরা-ছোঁয়ার বাইরে অবস্থান করছে। জানা যায় তা সরকারি চাঁইদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সম্পদের সুষম বণ্টন হচ্ছে না সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য বজায় না থাকায় পুঁজিবাদের অবাধ বিকাশ এবং শোষণের মাত্র দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা বহুলাংশে বিপর্যস্ত। কেন বুক পোস্টগুলোর যাচাই-বাছাই না করেই অহর্নিশি মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। ব্লগারদের স্বাধীন মত প্রকাশ করলে ‘নাস্তিক’ আখ্যায়িত করে গ্রেপ্তার করে খুশি করা হচ্ছে হেফাজতি দেশদ্রোহীদেরকে।
নারী নির্যাতন বেড়েছে ভয়াবহভাবে।
বঙ্গবন্ধু, চিঠিখানি লিখতে বসে দেশের অবস্থার সঠিক প্রকাশ করতে গিয়ে সম্ভবত আবেগ প্রবণ হয়ে পড়েছি কারণ তোমার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগুচ্ছে না দেশটা।

এসএইচ