দেশে আরো দুইজন করোনা রোগী শনাক্ত

আগের সংবাদ

পাকিস্তানিরা শাসনের নামে শোষণ করছে আমাদের

পরের সংবাদ

বঙ্গবন্ধু ও বাঙালির যৌথ চৈতন্য

দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ১৭, ২০২০ , ১২:৩৮ অপরাহ্ণ

বঙ্গবন্ধুর পুনর্জাগরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ বিশেষত তরুণ প্রজন্ম পল্লবিত হচ্ছে। আজ হোক, কাল হোক এবং যে রূপেই হোক বঙ্গবন্ধুর আলোয় এ দেশে সামাজিক রূপান্তর অবশ্যম্ভাবী। বঙ্গবন্ধু তাই কেবল বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসের মহানায়ক কিংবা বর্তমানের ভাবাদর্শিক আশ্রয়ই নন; তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও।

আজ ১৭ মার্চ। বাংলাদেশে স্বতন্ত্র সূর্যের দিন। শতবর্ষ আগে এই দিনে জন্মেছিলেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের ইতিহাস, বাঙালির জাতিসত্তা, রাষ্ট্র-স্বপ্ন আর বাঙালির ভবিষ্যৎ উদ্ভাসনের দিন এটি। এই দিনে দিগন্তের শিশির ভেঙে উঠে আসা সূর্যের কঁচিমুখে বিভাসিত বঙ্গবন্ধুর মুখ। সমুদ্র থেকে উড়ে আসা হাওয়ায় আজ যত গানের স্রোত তার নাম স্বাধীনতা। আজ এ দেশের আকাশে-আকাশে, নদী-প্রান্তরে, জনমনে আত্মপরিচয় আর সার্বভৌমত্বের যে সুখ তার নাম মুক্তি। এই দিনটিই জয় বাংলা; মহাকালের ধাবমান অক্ষের ওপর ঘোষণা করছে একটি অস্তিত্বের স্ফুটন রবীন্দ্রনাথের সেই মহামানবের আগমন।
এক. ভারতীয় উপমহাদেশের এই পূর্ব এলাকায় একটি জাতি রাষ্ট্রের নকশা জনমনে কি ইতিহাসের সকালবেলা থেকেই ছিল? এ প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। কিন্তু ভারত ভাগের এক দশক আগে যথা সময়ে প্রকৃত বাঙালি রাষ্ট্র এবং সমাজ জীবন যে পূর্ববঙ্গের উর্বর ভূমিতেই মূর্ত হয়ে উঠবে তা স্পষ্টই বুঝেছিলেন একজন দ্রষ্টা, এস. ওয়াজেদ আলী।
এই রাষ্ট্রগঠনের জন্য কালোপযোগী এক যুগমানবের আবির্ভাব তিনি দেখতে পেয়েছিলেন। কী হবে তার চরিত্র, তার ছবিও তিনি এঁকেছিলেন। সেই অনাগত মহামানব একান্তভাবে সত্যনিষ্ঠ, সত্যভাষী এবং সত্যদর্শী হবেন। মিথ্যা, প্রবঞ্চনা, ভ-ামি প্রভৃতি তিনি অন্তরের সঙ্গে ঘৃণা করবেন। দুঃখীর দুঃখে, শোকাতুরের শোকে, ব্যথিতের ক্রন্দনে অন্তর তাঁর বিগলিত হবে। ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অন্তরে তাঁর সর্বদাই তুমুল এক হিল্লোল চলবে। অন্যায় ও অত্যাচার তিনি মোটেই সহ্য করতে পারবেন না। জাতীয়তার তিনি মূর্ত প্রতীক হবেন, জাতীয়তার বাণী সর্বদাই তার মুখে শোনা যাবে। একান্তভাবে ন্যায়নিষ্ঠ এবং ধর্মপরায়ণ হলেও ধর্মশাস্ত্র নিয়ে তিনি বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করবেন না, কেননা তিনি হবেন বিশিষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ মহান এক আদর্শের মূর্ত প্রতীক। কে না বলবে এগুলো বঙ্গবন্ধুর চরিত্র লক্ষণ।
পৃথিবীর অনেক দেশই ইতিহাসের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশেরও তো একসময় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ঐতিহাসিকভাবেই এ ব্যাপারে মত-ভিন্নতা থাকতে পারে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে বিলুপ্তির প্রান্ত থেকে তুলে এনেছেন। বাঙালির জাতিসত্তাকে রক্ষা করেছেন। তাঁর নির্দেশে রক্তমূল্য দিয়ে এ দেশের মানুষ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। গত পঞ্চাশ বছরে স্বাধীনতার বহুপ্লাবি উর্বরতা অর্থনীতিসহ নানা দিগন্তে এ দেশবাসীকে প্রাণিত করেছে। এক ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র উপমা এই বাংলাদেশ তার জনকের নামে এখন মহাকাশে উপগ্রহ পাঠাচ্ছে।

দুই.
বাংলাদেশের জাতি রাষ্ট্র এ ভূখ-ের বাঙালি জনগোষ্ঠীর যৌথ চৈতন্য আর বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী চেতনার ফসল। বঙ্গবন্ধু এ দেশের সর্বস্তরের জনমনের এই চেতনা বুঝেছিলেন এবং নিজেকে এর প্রতিভূ করে তুলেছিলেন। রাজনীতি এবং ইতিহাসের প্রতিটি উন্মুক্ত সোপান কাজে লাগিয়ে তিনি এর বাস্তবায়ন ঘটিয়েছিলেন। পূর্ববর্তী এবং তার সমসাময়িক বাঙালি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের এইখানেই তাঁর প্রজ্ঞার পার্থক্য। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীনতা এবং মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক হয়ে ওঠার বাস্তব কারণও এগুলো। জনগণের আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক অবস্থা, এর ভেতরের দ্বন্দ্ব, সম্ভাবনা এবং এসবের পরিপ্রেক্ষিতে জনচৈতন্যের গতি ও দিক বুঝতে না পারলে এটি সম্ভব ছিল না। বঙ্গবন্ধু সত্যিকার অর্থেই ছিলেন জনমানুষের নেতা। অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম মনে করতেন, ‘জনতাই হচ্ছে শেখ মুজিব এবং শেখ মুজিবই হচ্ছে জনতা’। তৃণমূল মানুষের সংবেদন তার ভেতরে স্পন্দিত হতো।
যৌথ চৈতন্য একটি সামাজিক উৎপাদন; সামাজিক শক্তিসমূহের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া মিলে যৌথ চৈতন্য তৈরি হয়। যৌথ চৈতন্যের সহজ মানে হচ্ছে একগুচ্ছ বিশ্বাস, মূল্যবোধ, ধারণা, দৃষ্টিভঙ্গি আর জ্ঞান। একটি সামাজিক বর্গের কাছে এগুলো সাধারণ বলে প্রতীয়মান হয় এবং বর্গভুক্ত মানুষ তা সহভাগিতা করে। ইতিহাসে বাঙালির যৌথ চৈতন্যবিষয়ক কোনো আলোচনা নেই। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. নীহাররঞ্জন রায় তার বাঙালির ইতিহাস গ্রন্থে বাঙালি জীবনে তিন রকমের চেতনার কথা উল্লেখ করেছেন কৌম চেতনা, আঞ্চলিক চেতনা আর বর্ণ চেতনা। সাম্প্রদায়িক চেতনাও এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আলোচিত হতে পারে। বিচিত্র নরগোষ্ঠীর লোক নিয়ে বৃহত্তর বাঙালি জনের গঠন। সুদীর্ঘকাল যাবৎ এরা কৌমবদ্ধ জীবনেই অভ্যস্ত ছিল, ফলে কোমের মধ্যে বৃহত্তর জনচেতনা গড়ে ওঠেনি। প্রাচীন বাংলায় কোমগুলো ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে বাস করত। ফলে কৌম স্মৃতি আর কৌম চেতনার মতো আঞ্চলিক স্মৃতি এবং আঞ্চলিক চেতনাও গড়ে উঠেছিল। বাংলাদেশের সমাজে বর্ণ এবং সাম্প্রদায়িক চেতনার ইতিহাস অপেক্ষাকৃত পরবর্তী কালের ঘটনা। এই যে সব স্বাতন্ত্র্যবোধক এবং বিভাজক চেতনাবলয় তা ভেঙে কীভাবে যৌথ চৈতনার ছাঁচটি তৈরি হলো তা অনুসন্ধানের বিষয় বটে। একই বঙ্গবন্ধু কীভাবে এই যৌথ চৈতন্যকে স্পর্শ করলেন এবং তার আঁচে ও আলোয় একটি জাতিরাষ্ট্রর প্রতিষ্ঠা করলেন তাও বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
চেতনার ভূগোল ভাষাবাহিত। বাংলা ভাষার জন্ম এবং গোটা বাংলাদেশ একই ভাষা অঞ্চল হয়ে ওঠার কারণে একটি সমসত্ব চেতনা কাঠামো তৈরির মৌলিক শর্ত পূরণ হয়েছিল। সর্বপ্রাণবাদী বিশ্বাসের ছায়ায় কৌম জীবন আর কৃষির সংশ্লেষ নিয়ে বাঙালির যৌথ চৈতন্যের আদিম স্তরটি গড়ে উঠেছিল। শৈব, শাক্ত, জৈন, বৌদ্ধ আজীবিকী ইত্যাদি ধর্ম মতের প্রভাব আছে দ্বিতীয় স্তরে। বাঙালির যৌথ চৈতন্যের দৃশ্যমান স্তরে আছে হিন্দু, মুসলমানের যুগ্ম জীবন সাধনার সারাৎসার। বাঙালির সামাজিক জীবনের রীতিনীতি, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, সংস্কৃতির পুনরুৎপাদন, উৎসব-পার্বণ, অর্থনৈতিক জীবনের জ্ঞান অনুশীলন ও নৈতিকতা আর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আকাক্সক্ষার সাধারণ নিয়ামক এই যৌথ চেতনা সমষ্টি। এই যে সামাজিক প্রক্রিয়াগুলো যা জীবনকে ধারণ করে তা মিথজৈবিক। তার মানে এই যে, মনের ওপর এসবের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার যে ফলাফল নিংড়ে আসে তাতে কোনো দিকই বাদ পড়ে না। চৈতন্য তৈরি করে বাস্তবতা। চৈতন্য তাই বাস্তবতার প্রতিশ্রুতিও।
সুদীর্ঘ দুই হাজার বছরে বারবার আছড়ে পড়া ধর্ম আর উপনিবেশের অভিঘাতে এ দেশের মানুষ চৈতন্যের যে আকর কুড়িয়েছে তাতে রাষ্ট্র আকাক্সক্ষা ছিল না। কিন্তু একটি রাষ্ট্র পেলে তার সত্তার স্বরূপটি কেমন হবে তা বোঝার সংকেত ছিল। মগ্ন চৈতন্যে অথবা যৌথ চৈতন্যে বাঙালির আরাধ্য হচ্ছে মানুষ। ক্ষমতা নয়, রাষ্ট্র এ দেশে মানুষ কেন্দ্রিক হতে হবে। প্রেমই হচ্ছে মানব ধর্মের বড় কথা, শাস্ত্রের বাঁধা-ধরা নিয়ম-কুশলতা নয়। ধর্মাচরণে এটা যেমন স্বাধীনতার দ্যোতক তেমনি সামাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অপরায়নের বিরোধিতা। কৌম জীবন এবং কৃষি লগ্নতার কারণে বাঙালি স্বাধীনচেতা। মাতৃতান্ত্রিকতার আবেশের কারণে নারী-পুরুষে বৈষম্য সীমিত। বাঙালি নিয়তিবাদী, কিন্তু নিয়তির কাছে একেবারেই আত্মসমর্পণ করে বসে থাকে এমনো তো নয়। বাঙালির প্রয়োগবাদিতা ব্যক্তিগত স্বার্থ বৃত্তে। পরাগত ধর্ম আর উপনিবেশের অভিঘাতে তার দেবতা পরাধীন, ফলে সে ছন্নছাড়া। বাঙালির ঈশ্বর সংকট প্রবল অন্তরের দ্বৈধতার কারণেই। বাঙালির সাম্প্রদায়িকতা উপনিবেশের সম্প্রসারিত রূপ। দারিদ্র্য এক্ষেত্রে দুশ্চরিত্র অনুঘটক। এ দেশে উপনিবেশিকতা আর দারিদ্র্য বাঙালিকে দাস করতে পারেনি। জীবনের প্রতি, সচ্ছলতার প্রতি, ভালোবাসা তার প্রাণশক্তিকে পাহারা দিয়ে রাখে। সংবেদনশীল, সাহসী নেতৃত্ব পেলে বাঙালি খরবেগে জেগে উঠতে পারে। বঙ্গবন্ধু বাঙালি চৈতন্যের প্রধান প্রবণতাগুলো জানতেন, বুঝতেন তো বটেই।

তিন.
গ্রামীণ প্রতিবেশে বঙ্গবন্ধুর জন্ম ও তার চৈতন্যের উন্মেষ। সংবেদনশীল মন আর দেশপ্রেম তাঁর উদ্দীপিত বোধকে করেছিল গভীর ও ব্যাপ্ত। রাজনৈতিক জীবনের সূচনালগ্ন থেকে দেশ্যব্যাপী সাধারণ মানুষের সংযুক্তি ও সম্পৃক্তি বাঙালির যৌথ চৈতন্যের তাঁর পরিচয় নিবিড় করে তোলে। শোষণে, নিপীড়নে নিঃস্ব লোক বাঙালির এই চেতনা সমষ্টি। এর পশ্চাৎপটে কী, ভবিষ্যতেই বা কী? পেছনে বিছানো রূপকথার মতো এক দৃশ্যকল্প; ‘সোনার বাংলা’। সামনে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’। দূরত্ব অনেক। কিন্তু এ দুটি সত্তা ঘনবদ্ধ হয়ে তার সংগ্রামী চেতনার রূপ তৈরি করে দেয়। সোনার বাংলাকে তুলে এনে বসিয়ে দিতে হবে স্বাধীন বাংলার ওপর। এটা চূড়ান্ত অর্থে বি-উপনিবেশীকরণ। এর জন্য রাষ্ট্র আর জনগণের সম্পর্কের আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। সবটা মিলিয়ে এই তো বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন।
রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর আগমন যখন উপমহাদেশের রাজনীতিবিদগণ দুটো প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেনÑ অখ- বাংলা এবং পাকিস্তানের অংশ হিসেবে পূর্ববঙ্গ। তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে কাজ করেছিলেন। কিন্তু নানা সূত্রে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন তিনি তখনই দেখেছিলেন। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় চরিত্র হওয়ার পেছনে তার দাবিগুলো কী? মনীষী আব্দুর রাজ্জাক প্রশ্ন তুলেছেন। এ প্রশ্নটির উত্তরও তিনি দিয়েছেনÑ দেশপ্রেম। ‘দেশপ্রেমের সংজ্ঞাকে যত ব্যাপক করে তোলা যাক না কেন, বঙ্গবন্ধু ততখানিই তাঁর দেশকে ভালোবাসতেন।’ দেশকে তো তিনি ভালোবাসতেনই। তবে কেবল ভালোবাসা নয়, দেশের লোক-মানসের চৈতন্যকে তিনি নিজের ভেতরে ধারণ করেছিলেন। আর্তনাদ, ক্রন্দন, দাবি বা আহ্বান নয়, চৈতন্যের ভেতরে বাংলার চিরন্তন যে সত্য তা-ই তিনি দেখেছিলেন। দেশের এই সত্য দেখেছিলেন বলেই তার ভেতরে ঘৃণা আর দ্রোহের আগুন জন্মেছিল। ঘৃণা তাঁর উপনিবেশের বিরুদ্ধে, ধর্মান্ধতা আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। তার দ্রোহ দুঃখী, বঞ্চিত নিঃস্ব মানুষের ওপর শোষণ আর নির্যাতনের প্রতি। বাংলাদেশের সংবিধানে যে চারটি মূলনীতি তিনি বিন্যস্ত করেছিলেন। তা এ দেশের মানুষের আকাক্সক্ষা আর শ্রেয়বোধের প্রতিফলন। তিনি শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য দ্বিতীয় বিপ্লব শুরু করেছিলেন বাঙালির যৌথ চেতনার প্রতি তার অনমনীয় অঙ্গীকারের জন্যই।

চার.
এ কথা তো সত্যি, সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান যাঁরা তাঁদের নিয়ে মানুষের নানা ভাবনার প্রকাশ থাকবে। গিলগামেশ থেকে শুরু করে পৃথিবীর প্রাচীন সব মহাকাব্যে আমরা দেশপ্রেমিক বীর আর পরাক্রান্ত যুদ্ধ-নায়কদের অশুভ আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেখেছি। এদের অনেকেই নিয়তির কাছে হেরে গেছেন। কিন্তু তাদের আদর্শ, বীরত্ব, আত্মত্যাগ মানুষ বহু প্রজন্ম পরেও আবিষ্কার করেছে। সময়ের পায়ের চাপে মানবিকতা আর শুভবোধের ধ্রুবতা নষ্ট হয়ে যায় না। গত কয়েক দশকে এ দেশে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যা রচিত হচ্ছে এক অর্থে তা এক বিশাল মহাকাব্য।
বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু চর্চা রেনেসাঁস বা পুনর্জাগরণধর্মী। দীর্ঘ দুই দশক (১৯৭৫-১৯৯৫) এক মধ্যযুগ আমাদের টুঁটির ওপর চেপে বসেছিল। এই কালপর্বে এ দেশের মানুষ যেন বঙ্গবন্ধুকে ভুলে যায় এবং ভুল বোঝে তার জন্য একটি মনস্তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। পুস্তকে, প্রচারযন্ত্রে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ নিষিদ্ধ ছিল। মিথ্যাচার, ইতিহাস বিকৃতি, বঙ্গবন্ধুর ভাব-প্রতিমার ওপর কলঙ্কলেপন অন্ধকার অধ্যায়ে ষড়যন্ত্রের দ্বিতীয় অংশ। এসবের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমতলে ‘বঙ্গবন্ধু’ প্রতীকটির একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু নতুন এই সামরিক স্বত্বটি এতই খল এবং ক্ষুদ্র ছিল যে তাকে প্যালা দেয়ার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করতে দেখা যায়। নব্বইয়ের দশক থেকে মৃত্যুর খোঁয়াড় ভেঙে বঙ্গবন্ধুর ভাব-প্রতিমা, প্রতীক বেরিয়ে আসতে থাকে। অধ্যাপক সনৎ সাহার পর্যবেক্ষণ, ইতিহাসের বিকৃতি দিয়ে তাকে রোখা যায় না। কিংবদন্তি হয়ে সংক্রান্তি পুরুষের মহিমায় তিনি ফিরে দাঁড়ান। তাঁর পদধ্বনী শোনা যায়। ক্লিন্ন বিবর্ণ অভিশপ্ত জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে নিপীড়িত মানুষ তা কান পেতে শোনে। জনমনে তো বঙ্গবন্ধু ছিলেনই। তাই প্রত্যাবর্তন নয়, জনমনে বঙ্গবন্ধুর পুনর্জাগরণ ঘটছে। এ এক অনিঃশেষ এবং সম্ভবত পৌনঃপুনিক প্রক্রিয়া। আমাদের বর্ণমালা লাখ লাখ চোখ হয়ে বঙ্গবন্ধুকে খুঁজছে, তাঁর আকাশচুম্বী আর মৃত্যুঞ্জয়ী অবয়ব নির্মাণ করছে। বস্তুত বর্তমানে বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা বঙ্গবন্ধুর পুনর্জাগরণ পর্বে আছি।

পাঁচ.
পুনর্জাগরণের আলো আসে; আলোকায়নও তাই ঘটে যায়। মানুষের আত্মা যে আলোকের যাত্রী। এগারো শতকে ইতালিতে পুনর্জাগরণের ফলে আলোর টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। পাঁচশ বছরে মানবিকতার প্রতিজ্ঞায়, যুক্তির স্বাধীনতায় বিজ্ঞানের সত্যে আর শিল্পের নান্দনিকতায় গোটা ইউরোপে তা এক মুক্তিদায়ী রূপ নেয়। আঠারো শতকে ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে আধুনিকতার অভিমুখে পৃথিবীর যে নতুন যাত্রা শুরু হলো তা ওই আলোকায়নেরই ফল। উনিশ শতকে কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলার যে নবজাগরণ তার ভেতর থেকেও সমাজ পরিবর্তনের চিন্তারেখা বেরিয়ে এসেছিল। এই সূত্র ধরেই বাংলাদেশের সমাজ এবং রাষ্ট্রে বঙ্গবন্ধুর পুনর্জাগরণের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া পাঠ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর পুনর্জাগণের অর্থ বাঙালি যৌথ চৈতন্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর বাঙালির শ্রেয়বেধকে আশ্রয় করা। এসব প্রত্যয় অপরিবর্তনীয় ধ্রুবক নয় এবং সত্যিটা হচ্ছে এগুলোকে সমাজ বৈজ্ঞানিকভাবে সংজ্ঞায়িতও করা হয়নি। সাধারণ জ্ঞান দিয়ে লোকজন প্রত্যয়গুলোকে অনুধাবন করে এবং এক্ষেত্রে অর্থের তারতম্য খুব যে বেশি হয়, তা নয়। বঙ্গবন্ধুর পুনর্জাগরণের আরো একটি মানে শোষণ, বঞ্চনা, সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে দুর্নীতি এবং সকল প্রকার আমলাতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে অভিযান। বঙ্গবন্ধুর পুনর্জাগরণ মানে তো সোনার বাংলা বাস্তবায়নের উদ্যোগের পুনর্জাগরণ এবং এর অনিবার্র্যভাবেই চলে আসে বিকল্প গণতন্ত্র এবং বিকল্প সমাজের সাংগঠনিক কাঠামো অনুসন্ধান এবং জনগণের রাষ্ট্রের নতুন সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ প্রসঙ্গ। বঙ্গবন্ধুর পুনর্জাগরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ বিশেষত তরুণ প্রজন্ম পল্লবিত হচ্ছে। আজ হোক, কাল হোক এবং যে রূপেই হোক বঙ্গবন্ধুর আলোয় এ দেশে সামাজিক রূপান্তর অবশ্যম্ভাবী। বঙ্গবন্ধু তাই কেবল বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসের মহানায়ক কিংবা বর্তমানের ভাবাদর্শিক আশ্রয়ই নন; তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও।

এসএইচ