শেখ মুজিবের জন্মভূমি এবং জন্মশতবর্ষের অঙ্গীকার

আগের সংবাদ

শিল্পখাতকে আরো শক্তিশালী করার আহ্বান

পরের সংবাদ

বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শন ও জাতীয় পুনর্গঠন

এ কে এম এ হামিদ

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ১৭, ২০২০ , ২:৩৪ অপরাহ্ণ

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধায়নে প্রণীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫নং অনুচ্ছেদে মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে ‘সবার জন্য গৃহ’ প্রদানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। অথচ গণমানুষের এই সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার পূরণে বিগত সরকারসমূহের আমলে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। যার পরিপ্রেক্ষিতে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী মুজিববর্ষ উদযাপন শুরুর প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিক বক্তব্যে দেশের সব গৃহহীন মানুষকে মুজিববর্ষেই বাসস্থান প্রদানের নির্দেশনা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর আজন্ম লালিত স্বপ্ন বাংলার দুঃখী মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্যতম ‘সবার জন্য গৃহ’ প্রদানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী ১৯৯৬ সাল থেকে সচেষ্ট রয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহকে বঙ্গবন্ধুর দর্শন অনুযায়ী মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার পূরণে যথাযথ উদ্যোগ ও পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শও প্রদান করেছিলেন।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের কতিপয় ব্যক্তির সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা ব্যতীত জনগণের সাংবিধানিক অধিকার ‘সবার জন্য গৃহ নীতি’ বাস্তবায়নে ও প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা পূরণে আর কোনো অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা যায়নি। এমনি পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই মুজিববর্ষ উপলক্ষে আবার জনগণের মৌলিক অধিকার পূরণে নির্দেশনা প্রদান করতে হয়েছে।
যে মানুষটির জন্ম না হলে বাংলাদেশ সৃষ্টি হতো না এবং বিশ্বে বাংলা ও বাঙালির অস্তিত্ব বিপন্ন হত, সেই মহান জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে দেশের সব গৃহহীন মানুষকে বাসস্থান তথা গৃহ প্রদান করতেই হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই অঙ্গীকার পূরণে আমাদের ব্যর্থতা জাতির পিতাকে অশ্রদ্ধা করারই নামান্তর। তাই এই দায়বদ্ধতা ও অঙ্গীকার হেতু জননেত্রী শেখ হাসিনার ওই জনগুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা বাস্তবায়নে সরকারকে সুপরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যেতে হবে।
জননেত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম টার্মে (১৯৯৬-২০০১) ‘জাতীয় গৃহায়ন নীতিমালা’ প্রণয়নপূর্বক জনগণের বাসস্থান সমস্যা সমাধানে হাউসিং এন্ড সেটেলমেন্টকে ‘জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে পুনর্গঠন করা হলেও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিনেও গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের গৃহায়ন বা বাসস্থানের বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা বা উদ্যোগ নেয়নি। বরং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্তাব্যক্তিরা শহর ভিত্তিক অফিস/দপ্তরে অনড়ভাবে বসে আছেন। যা অব্যাহতভাবে চলতে দেয়া যায় না। দেশের সব মানুষের বাসস্থানের এই মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার পূরণ বা প্রতিষ্ঠায় সরকারি কোষাগারের অর্থে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটিকে অবশ্যই সঠিক ও যথার্থভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। দেশের সীমিত ভূমি ও সম্পদের মধ্যেই সব মানুষের গৃহ বা বাসস্থান সমস্যার সমাধান করতে হবে। কেননা, গৃহ বা বাসস্থানকে শুধু আবাসস্থল হিসেবে দেখলেই হবে না বরং গৃহকে আয় বৃদ্ধির উদ্দীপনার সৃষ্টিসহ ছোট ছোট কটেজ ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আদি যুগ থেকে মানুষ বাসস্থান পেলে সংসার এবং সংসারের প্রয়োজনে আয় বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হয়। চীনসহ উন্নত অনেক দেশই আজ বাসস্থানে ছোট ছোট কটেজ ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলে পরিবার ও রাষ্ট্রের উৎপাদন বৃদ্ধির কার্যক্রম শুরু করেছে।
বর্তমান সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ‘আমার গ্রাম-আমার শহর’ স্লোগানের মূল দর্শনকে নীতি হিসেবে গ্রহণপূর্বক জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার এই বিশাল গুরুদায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে (১) জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম মূলত দু’ভাগে যথা (ক) গ্রামীণ গৃহায়ন ও (খ) শহর গৃহায়ন কার্যক্রম হিসেবে পরিচালিত হওয়া উচিত। তবে গৃহায়ন খাতের মোট কাজের ৭০/৮০ ভাগ কাজই হবে গ্রামীণ হাউসিং সংশ্লিষ্ট। আর শহর গৃহায়নের কাজ হবে ২০/২৫ ভাগ। (২) হাউসিং কর্তৃপক্ষের শহর গৃহায়ন অংশকে দেশের সব শহরে গৃহায়ন বা আবাসন নির্মাণের নীতিমালার ভিত্তিতে রেগুলেটরি বডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। দেশের সব পৌর কর্তৃপক্ষ স্টেক হোল্ডার হিসেবে আইনের মাধ্যমে হাউসিং অথরিটির রেগুলেটরি বডির সদস্য হবেন। যার ফলে দেশের সব শহরে একই নিয়মনীতিতে বাড়ি নির্মিত হবে এবং শহরসমূহ পরিকল্পিত পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে উঠবে।

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকে প্রাথমিকভাবে দেশব্যাপী পরিকল্পিত গ্রামীণ জনপদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ‘কৃষি জমি রক্ষা কর-পরিকল্পিত গ্রাম গড়’ এই রাষ্ট্রীয় নীতির ভিত্তিতে জনমত গঠনে উদ্যোগী ভূমিকা পালনসহ গৃহনির্মাণে সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ আধুনিক নাগরিক সুবিধা সংবলিত (যেমন বিদ্যুৎ, পানি, গ্রামীণ রাস্তা, পয়ঃব্যবস্থাপনা ইত্যাদি) গ্রামীণ জনপদ গড়ে তুলতে জনগণকে প্রকৌশল সহায়তা প্রদান এবং অর্থায়নে যাথযথ দায়িত্ব পালন করবে। এক্ষেত্রে বিক্ষিপ্তভাবে নির্মিত বাড়িঘর একটি নির্দিষ্ট এলাকায় একীভূত করে আমার গ্রাম আমার শহর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
যত্রতত্র বাড়ি ঘর নির্মাণ ও আবাদি জমি নষ্ট করে নতুন বাড়ি নির্মাণে নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে নতুন বাড়ি নির্মাণে বা পুরাতন বাড়িঘর সম্প্রসারণে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সুপারিশক্রমে উপজেলা হাউসিং কর্তৃপক্ষের অনুমতি গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করা যেতে পারে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিনামূল্যে সরবরাহকৃত গ্রামীণ যৌথ মালিকানাধীন ক্লাস্টার ভিলেজের নকশা প্রণয়ন ও নকশায় বাড়ির আঙ্গিনায় বা গ্রামের কোনো স্থানে কি ধরনের ফলদ, বনজ গাছপালা রোপণ করা যায় সে নির্দেশনাসহ গাছপালা পরিচর্যার পরামর্শ /নির্দেশনা প্রদান করবে। দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে ঘর বাড়ি নির্মাণে আবাদি জমির ব্যবহার হ্রাসকল্পে গ্রামীণ জনপদে জাতির পিতার উন্নয়ন দর্শনের অন্যতম সমবায় ভিত্তিতে অথবা পারিবারিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে বহুতল ভবন নির্মাণে আগ্রহীদের সরকারিভাবে ঋণ সহায়তা দিয়ে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
আমার গ্রাম-আমার শহর প্রকল্পের আওতায় ক্লাস্টার ভিলেজ নির্মাণে উদ্যোগী হলে প্রতিটি গ্রামে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করে বহু পরিবারের আবাসন সংকুলান করা সম্ভব হবে। এর ফলে (২.১) বিশাল পরিমাণে কৃষি জমি রক্ষা পাবে; (২.২) কৃষকের গরু ছাগল সহ অন্যান্য পোষ্য প্রাণী আধুনিক ব্যবস্থায় লালন পালনের সুযোগ সৃষ্টি হবে; (২.৩) একত্রে বসবাসকারী মানুষের পরিত্যক্ত বর্জ্য ব্যবহার করে বায়োগ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে সব পরিবারের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হবে; (২.৪) আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্গানিক সার উৎপাদন করে জমির উর্বরতায় ব্যবহার করা যাবে; (২.৫) বাচ্চাদের জন্য স্কুল কলেজ, খেলার মাঠ, বাজার ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের মাধ্যমে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করে পরিবেশ সংরক্ষণ সহজতর হবে।
দেশব্যাপী জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম গ্রাম পর্যায়ে বিস্তৃতকরণ ও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পর্যালোচনান্তে স্ব স্ব এলাকাস্থ শিক্ষক, প্রকৌশলী, স্থপতি, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি (সরকারি/বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে) নিয়ে প্রথমে উপজেলা পর্যায়ে একটি করে এবং পরবর্তীতে প্রয়োজনে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে ‘পরিকল্পিত গ্রামীণ জনপদ উন্নয়ন কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে।
(৩) দেশের ইউনিয়ন পর্যায়ে হাউসিং কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম বিস্তৃত করা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ইউনিয়ন পর্যায়ের দপ্তরে একজন জুনিয়র আর্কিটেক্ট নিয়োগ দেয়া। এই দপ্তর জনগণকে কৃষি জমির অপব্যবহার বন্ধ করে পরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণে নকশা প্রদানসহ জনগণকে সঠিক পরামর্শ প্রদান করবে। (৪) হাউসিং কর্তৃপক্ষ গ্রাম পর্যায়ে ১৫/২০ তলা বিশিষ্ট বিল্ডিং তৈরি করে প্রতিটি গ্রামকে একই বিল্ডিংয়ে নিয়ে আসা এবং কমিউনিটি বসবাসে উদ্ধুদ্ধ করা। গ্রাম বা শহরে ব্যক্তিগত তথা পারিবারিক বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রেও ১০/১৫ তলার নকশা প্রদান এবং কৃষি জমির অকৃষি কাজে ব্যবহার রোধকল্পে উদ্বুদ্ধ করা। (৫) কোনো ব্যক্তি বা পরিবার প্রাথমিকভাবে ২/৩ তলা বিশিষ্ট বিল্ডিং নির্মাণ করলেও পরবর্তীতে পরিবারের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিল্ডিং উপরের দিকে সম্প্রসারণ করবে। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত কৃষি জমি ব্যবহার কমে আসবে। একইভাবেই প্রতিটি ইউনিয়ন/উপজেলার জন্য পরিকল্পিত নগরায়নে বা গ্রামীণ জনপদের প্ল্যান বা নকশা সরবরাহপূর্বক তা বাস্তবায়নে কঠোর তদারকির দায়িত্ব পালন করবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে জরুরিভাবে ‘গৃহায়ন মন্ত্রণালয়’ বা ‘গ্রাম উন্নয়ন মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। যদি এই মুহূর্তে তা সম্ভব না হয়, তবে পূর্ত মন্ত্রণালয়ে ‘গৃহায়ন বিভাগ’ বা ‘গ্রাম উন্নয়ন বিভাগ’ গঠন করা যেতে পারে। যা পরবর্তীতে ‘গ্রাম উন্নয়ন মন্ত্রণালয়’ বা ‘গৃহায়ন মন্ত্রণালয়’ এ রূপান্তরিত হবে। সরকার প্রস্তাবটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিলে খাদ্য নিরাপত্তাসহ নগর ও গ্রামে পরিকল্পিত আবাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় পরিকল্পিত গ্রাম ও নগরায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা যদি মূল্যবান কৃষি জমি রক্ষা করতে পারি, এরই সঙ্গে বাসস্থানের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তাহলে সেটিই হবে আগামী প্রজন্মের নিকট এ প্রজন্মের সার্থক ও সুচিন্তিত দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত। বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের স্বার্থে দেশপ্রেমমূলক চেতনা সংবলিত তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতির পিতার চির কাক্সিক্ষত সোনার বাংলা ও জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যাশিত উন্নত সমৃদ্ধ আমাদের অহংকারের বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

এসএইচ