বঙ্গবন্ধু ও বাঙালির যৌথ চৈতন্য

আগের সংবাদ

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

পরের সংবাদ

১৯৬৬ সালে বেগমগঞ্জে শেখ মুজিব

পাকিস্তানিরা শাসনের নামে শোষণ করছে আমাদের

মোহাম্মদ সোহেল, নোয়াখালী থেকে

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ১৭, ২০২০ , ১২:৫০ অপরাহ্ণ

১৯৬৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে উত্তাল জনসমুদ্রে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, আমরা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে পাকিস্তান করেছি। কিন্তু পাকিস্তানিরা আমাদের প্রতি ন্যায়বিচার না করে আমাদের শাসনের নামে শোষণ করছে। পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়দে আজম জিন্নাহর নেতৃত্বে আমাদের মায়ের ভাষা বাংলাকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল, যার কারণে আমাদের ভাষার জন্য আন্দোলন করতে হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, বাঙালিদের কঙ্কালসার দেহের ওপর পাকিস্তানি পাঞ্জাবিদের লাল টয়োটা গাড়ি চলবে, এটা পৃথিবীর সবাই মেনে নিলেও আমি মুজিবুর রহমান কখনোই মেনে নিব না।
স্মৃতিচারণ করে শেখ মুজিবুর রহমানের এ বক্তব্য তুলে ধরেন সে দিনের প্রত্যক্ষদর্শী ৬ দফার মোহাম্মদ উল্লাহ ও বঙ্গবন্ধুর কালো মানিক হিসেবে খ্যাত তৎকালীন নোয়াখালীর চৌমুহনী শহর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, বর্তমানে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও বেগমগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ভিপি মোহাম্মদ উল্লাহ।
২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬, বিকাল ৩টায় নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ দীঘির পাড়ে ৬ দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশব্যাপী গণসংযোগের অংশ হিসেবে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য দেন শেখ মুজিবুর রহমান।
ভিপি মোহাম্মদ উল্লাহর ভাষ্যমতে, শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্যের মধ্যে তিনিসহ তখনকার ছাত্রনেতা মমিন উল্লা, লোকমান গাজী ও জয়নাল আবেদীনের স্লোগানে ৬ দফার পক্ষে উত্তাল হয়ে ওঠেন সেই জনসভায় উপস্থিত দেড় লক্ষাধিক মানুষ। শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফার পক্ষে জনমত চাইতেই উত্তাল জনসমুদ্র থেকে আওয়াজ আসতে থাকে ‘৬ দফা মানতে হবে, না হলে বাংলা স্বাধীন হবে’, মুজিব তোমার ভয় নাই, সারা বাংলা তোমার সাথে, বাঙালিরা তোমার সাথে’।
বেগমগঞ্জ দীঘির পাড়ের মাঠের দক্ষিণ পাশে উত্তরমুখী বাঁশ-কাঠ আর কাপড় মোড়ানো মঞ্চে বিকাল ৩টার ওই জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান বক্তব্য শুরু করেন বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে। এর আগে তৎকালীন নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল মালেক উকিলের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল হকের পরিচালনায় জনসভায় বক্তব্য রাখেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক ও চট্টগ্রামের জহুর আহম্মদ চৌধুরী। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন নোয়াখালীর আবদুর রশিদ, আবু নাছের চৌধুরী, সহিদ উদ্দিন ইস্কান্দার কচি, ফেনীর খাজা আহম্মেদ, লক্ষ্মীপুরের নাছির আহম্মদ ভূঁইয়াসহ নোয়াখালী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতারা। মঞ্চের নিচে সামনের সারিতে ছিলেন আ স ম আবদুর রব, মোহম্মদ হানিফ, মাহমুদুর রহমান বেলায়েত, মোহাম্মদ উল্লাহ, মমিন উল্লা, লোকমান গাজী, জয়নাল আবেদীন, শাহজাহান কামাল, আলা উদ্দিন, মোস্তাফিজুর রহমান, গোলাম ছারওয়ার, মোস্তাফিজুর রহমান লুতু, মো. শাহজাহান, মমিনুল হক বাকেরসহ বিপুলসংখ্যক ছাত্রনেতা। ভিপি মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে সর্বদলীয় বিরোধী দলের সভায় বাঙালির মুক্তি সনদ ৬ দফা পেশ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। ওই সভায় তৎকালীন পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খানসহ পশ্চিম পাকিস্তানের অধিকাংশ নেতা ৬ দফা নিয়ে আলোচনা করতে রাজি না হওয়ায় শেখ মুজিব সভা বয়কট করে তার সঙ্গীদের নিয়ে বেরিয়ে আসেন। এরপর শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এসে সংবাদ সম্মেলন করে পাকিস্তানে পেশকৃত ৬ দফার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন এবং সারা পূর্ব পাকিস্তানে ৬ দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশব্যাপী গণসংযোগের ঘোষণা দেন।
ভিপি মোহাম্মদ উল্লাহ আরো বলেন, বেগমগঞ্জ দীঘিরপাড়ের ওই সভা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারকে অবিলম্বে আওয়ামী লীগের ৬ দফা মেনে নিয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যেকার বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান।
বঙ্গবন্ধু যখন বেগমগঞ্জ দীঘির পাড়ে জনসভা করেন, তখন ওই দীঘির পাড়জুড়ে ছিল শুধু খালি মাঠ আর পাকিস্তান সরকার নির্মিত একটি হেলিপোর্ট।
বর্তমানে হেলিপোর্টটি থাকলেও ওই দীঘির পাড়জুড়ে নাই বিশাল মাঠ। দীঘির পাড়ে নির্মিত হয়েছে নোয়াখালী পাবলিক স্কুল, বেগমগঞ্জ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের কার্যালয়, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র, আনসার ভিডিপি অফিস, সরকারি কোয়ার্টার। রয়েছে হরেক রকমের গাছ-গাছড়া।
বঙ্গবন্ধুর জনসভার ওই স্থান বেগমগঞ্জ দীঘিরপাড়কে স্মরণীয় করে রাখতে সেখানে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিফলক নির্মাণের দাবি উঠেছে স্থানীয়ভাবে।
বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব আলম জানান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওই সভাস্থলে এখনো কোনো স্মৃতিফলক নির্মিত হয়নি। তবে ওই স্মৃতি ধরে রাখতে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে বেগমগঞ্জ চৌরাস্তায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এসএইচ