বঙ্গবন্ধু কী করেছিলেন আমাদের জন্য

আগের সংবাদ

দেশে আরো দুইজন করোনা রোগী শনাক্ত

পরের সংবাদ

তোমার জন্মদিন আমাদের সূর্য

সেলিনা হোসেন

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ১৭, ২০২০ , ১২:২৮ অপরাহ্ণ

১৭ মার্চ বাঙালির মাথার উপরে নীলাকাশ। আদিগন্ত বিস্তৃত আকাশের দিকে তাকালে বাঙালি খুঁজে পায় তার জাতিসত্তার স্ফুরণ। ১৭ মার্চ এখন বাঙালির কাছে একটি তারিখ মাত্র নয়, ইতিহাসের সোনালি পাতার রক্তিম সূর্য। চেতনায় দিয়েছে আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষার জাতিসত্তার গৌরব।
জাতির বুকের ভেতরের প্রতিটি হৃৎপি- যে স্পন্দনে আন্দোলিত হয়, যে অযুত বছর অতিক্রম করে সময়ের পরিধি, তোমার ১০০ বছর তার বিবর্তন। যে বিবর্তন ছাড়া মানব সভ্যতার অগ্রগতি সাধিত হয় না। তুমি আমাদের সেই বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় অজস্র সময়ের আয়ু দিয়েছ। আমাদের আয়ু তোমার জন্মদিনকে বয়ে নিয়ে যাবে মহাকালের যাত্রায়।
তোমার জন্মদিন একটি দিনের ফুরিয়ে যাওয়ার নয়। প্রতিটি জন্মদিনে একটি করে নতুন সূর্য ওঠে। বিস্ময়কর আভায় রঞ্জিত করে প্রতিটি ধূলিকণা। প্রতিটি ঘাসের ডগা। প্রতিটি ঘরের চালের দর্পিত শিশির। প্রতিটি ধানের শীষ, নৌকার গলুই, শিশুর নিষ্পাপ শরীর, বয়সী নারীর প্রজ্ঞা, বয়সী পুরুষের অভিজ্ঞতা এবং যৌবনের শক্তির বরমাল্য। এভাবে তোমার জন্মদিন বছরের নবীন সূর্যের মহিমান্বিত আলোয় স্নাত হয়। আমরা তোমার জন্মদিনের ভেতর থেকে শক্তির ঝরনা টেনে বের করে বহমান নদী হই। মিলিত হই সাগর মোহনায় সাগর মেখলার চিত্রিত দিন আমাদের সঙ্গী হয়। আমরা বুঝি তোমার জন্মদিন প্রতিদিন, অনবরত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে আমাদের কাছে সত্য হয়ে থাকে।
আমাদের কাছে তোমার কোনো প্রত্যাশা ছিল না। তুমি তো দিতেই শিখেছিলে, ভালোবাসা ছাড়া আর কোনো কিছু নিতে চাওনি। তোমার বুক উজাড় করা ভালোবাসার মহাসমুদ্র আমাদের জীবনের চারপাশে কল্লোলিত হয়। আমরা বেঁচে থাকার অর্থ বুঝি। আমরা মানুষের মতো বাঁচার সাধনায় নিমজ্জিত হই। আমাদের ঘোর কাটে আমরা তোমার মতো সাহসী মানুষ হতে চাই। তাই এমন মানুষ খুঁজে ফিরি সর্বক্ষণ। দেখতে চাই সেসব মানুষের চেহারা। পেতে চাই তোমার উত্তরসূরি কাউকে। চোখ যায় দিগন্তে দৃষ্টি ফিরে আসে। চোখ যায় মহাকাশে দৃষ্টি টেনে নেয় কালো বিবরের অসীম গর্ত। চোখ যায় সাগরের কাছে দৃষ্টি ডুবে যায় অতলান্তের তলদেশে। চোখ যায় শস্য ক্ষেত্রের কাছে, দৃষ্টি বুজে যায় শস্যহীন জনপ্রান্তে। প্রবল অপেক্ষায় দেখি তোমার অবস্থানই আমাদের নিয়তি। তাই তোমার জন্মদিন আমাদের সাহসের পুঁজি। সাহস ছাড়া অর্থহীন জীবনের কাছে আমরা নতি স্বীকার করব না।
তুমি অনন্ত যৌবনের মানুষ। জয় করেছ জরাকে। পায়ে দলেছ অনৈতিকতাকে। তোমার অভিধানে বিশ্বঘাতকতা শব্দটি নেই। তোমার বার্ধক্যকে যৌবন শুষে নেয়, সেখানে জীর্ণতার প্রবেশ নেই। তুমি নতুন রূপে আসো আমাদের মাঝে। তোমার নতুন যৌবন আমাদের নতুন দীক্ষা। তোমার বয়সী যৌবন আমাদের প্রেরণা। আমরা ভুলে যাই না যে, নিয়ত তোমার উপস্থিতি আমাদের জাগরূক রাখে। তুমি একটি বিশাল তর্জনির অধীশ^র, যখন আকাশের দিকে উঁচিয়ে রাখো নত হয়ে আসে আকাশ। এমন এক অবিস্মরণীয় মানুষ ছিলে তুমি।
তুমিই সেই মানুষ যে একটি জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ করেছিলে। বেঁচে থাকার জন্য স্বাধীনতার বিকল্প কোনো শব্দ নেই। তুমি জানতে মানুষ দরিদ্র হতে পারে, কিন্তু তার আত্মমর্যাদাবোধ সবচেয়ে বড় সত্য। তুমি এ দেশের মানুষের নাড়ির স্পন্দন সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছ, তোমার অধিকার আদায়ের সংগ্রামী সময়জুড়ে। অসাধারণ তোমার প্রজ্ঞা দরিদ্র মানুষের জন্য ভালোবাসা এবং দেশের জন্য প্রেম। একক সত্তায় এতকিছু ধারণ করে তুমি আমাদের ইতিহাসের মানুষ, যার জ্ঞান ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে। যার জ্ঞান নতুন ইতিহাস রচনা করে এবং সবশেষে যিনি নিজেই ইতিহাসের সময়জুড়ে টিকে থাকেন। তুমি আমাদের গৌরবের অর্জন দিয়েছ। এই গৌরববোধ নিয়ে এখন আমাদের পথচলা।
তুমি টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে হেঁটে এসেছ ধুলোমাখা পায়ে টুঙ্গিপাড়ায় শুয়ে আছ গৌরবের অর্জন নিয়ে। তোমাকে ছাড়া তো এ দেশের ইতিহাস রচিত হবে না। তোমাকে আমরা শরতের কাশফুল দিয়ে বলতে পারি, বাংলাদেশের প্রকৃতি তোমার জন্মদিনে উপহার দিলাম। সব ঋতু তোমাকে দিলাম। সব নদী, সব পাখি, সব বৃক্ষ তোমার জন্মদিনের উপহার বঙ্গবন্ধু তারপরও বলা যাবে না তোমার জন্য সব আয়োজন করেছে এই জাতি। তোমাকে কিছু দেওয়ার সাধ্য এই জাতির নেই। বড় নির্মম সত্যের দিকে তাকিয়ে আমরা নিজেদের পাপক্ষয় করতে পারব কি?
বঙ্গবন্ধু তুমি ছিলে বলেই আমাদের স্বপ্নের জায়গা তৈরি হয়েছিল। আমরা নিজেদের শক্তির ব্যাপ্তি বুঝেছিলাম। বুঝেছিলাম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অর্জিত স্বাধীনতার মূল্য কী। আমরা পিছুটান বোধে আক্রান্ত হই না। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মানুষ হিসেবে আমরা নিজেদের অবস্থানের দিকে ঘুরে দাঁড়াতে পারছি। প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হয়েছে। আমাদের শহীদ দিবস ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশের গৌরবময় উপস্থিতি আছে।
নিজেদের অবস্থানকে বড় হতে দেখলে আমরা তোমার প্রতি শ্রদ্ধায় নত হই। বঙ্গবন্ধু তোমার জন্মদিন নিজেদের মূল্যায়নের কথা বলে। এগিয়ে যাওয়ার কথা বলে। একটি জাতির এরচেয়ে বেশি কী আর চাইবার আছে। তুমি আমাদের দুহাত ভরে দিয়েছ।
এ জাতির যা কিছু ব্যর্থতা তার জন্য দুঃখ পেয়ো না বঙ্গবন্ধু। সোনালি সময় আমরা ঠিকই অর্জন করব। সুদিনের জন্য জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতেই হবে। তোমাকে সঙ্গে নিয়ে সে অর্জন হবে। যদি এমনটি হয় তাহলে তোমার জন্মের উৎসবে ধন্য হবে আমাদের জীবন। আমরা তোমার জন্মের আলোয় স্নাত হতে চাই। তোমার জন্মদিনই হোক মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য আমাদের সমবেত প্রার্থনার দিন।
জয়তু ১৭ মার্চ। মহামানবের জন্মদিন।

এসএইচ