শিল্পখাতকে আরো শক্তিশালী করার আহ্বান

আগের সংবাদ

স্মৃতির পাতায় বঙ্গবন্ধু ও আজকের বরিশাল

পরের সংবাদ

ক্যান্টনমেন্ট দখল হলো না কেন?

জাফর ওয়াজেদ

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ১৭, ২০২০ , ৩:০০ অপরাহ্ণ

একাত্তরের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় লাঠিসোঁটা নিয়ে এসেছিলেন যারা স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে বেঁধে, মহানায়কের ঘোষণা শোনার জন্য, তারা জানতেন, কঠিন লড়াই ছাড়া স্বাধীনতা আসবে না। ঘুণাক্ষরে বিষয়টি কারো মাথায় আসেনি, জনসভা শেষে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি সেনাদের ওপর সমাগত জনগণকে নিয়ে হামলা করলেই দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই কথাটা ক্ষীণ হলেও কিছু কিছুু ভিন্নমতের মানুষেরা প্রশ্ন তুলতেন, তাদের লেখাতেও। যে, কেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় উপস্থিত ১৪/১৫ লাখ জনতাকে নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করে পাকিস্তানি সেনাদের পর্যুদস্ত করলেন না। তাহলে ক্ষয়ক্ষতিসহ প্রাণহানি কম হতো। দেশও স্বাধীন হতো। এই ভাবনাটা ক্রমান্বয়ে মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের অনেকের মধ্যে সংক্রমিত হতে দেখা যায় তাদের গ্রন্থে। তাদের ভাবনাটা সেই সময়ের জনসভায় আসা জনের কাছে সরলীকরণই মনে হওয়া স্বাভাবিক। ভূ-বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি শুধু নয়, এতদঞ্চলের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে স্বাধীনতার অনেক পরেও এমন প্রচারণাটা ব্যাপকতা পায়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর একজন বিদেশি সাংবাদিক কল্পনার মিশেল দেয়া বাংলাদেশ বিষয়ক গ্রন্থে এই তত্ত্বটি প্রচার করেন যে, সেদিন জনসভার লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা করলেই পাকিস্তানি সেনারা পরাজিত হতো আর দেশ স্বাধীন হতো। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া সেক্টর কমান্ডার থেকে কমান্ডারসহ বাঙালি সামরিক কর্তারাও এই তত্ত্বে আক্রান্ত হয়েছেন। বিষয়টিকে তারা তাদের গ্রন্থে বেশ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদেরও আশা ছিল, যারা নিজেরাই তখন পাকিস্তানি বিভিন্ন সেনাছাউনিতে কর্মরত, নিজেরা বিদ্রোহ করে বেরিয়ে আসার মতো সাহস ছিল না, ৭ মার্চ সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করা হবে রেসকোর্স ময়দান থেকে। আশা করেছিলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’ বলবেন বঙ্গবন্ধু। তারপর জনতা লাঠিসোঁটা নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করবে। আর তাতেই দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। এই ভাবনা যাদের, তারা যে সার্বিক বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছিলেন, তা স্পষ্ট। এদের ধারণায় তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার ঘটনা আসে না।
একটি দেশের বিজয়ী নেতা, যাকে দেশের মানুষ অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে; যিনি দেশ পরিচালনা করবেন, তিনি সময় বাস্তবতায় সিদ্ধান্ত নেবেন হঠকারিতার, এমন ভাবনা বাস্তবতাবিবর্জিত। ৭ মার্চ স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামের ঘোষণা দিয়ে তিনি দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন বাঙালির পথরেখা কোন দিকে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে মানুষ বুঝে নিয়েছিল ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ার সময় এখন। ৭ মার্চ নয়, ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।’ আর এই স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে তৈরি হতে জনগণকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ৭ মার্চ। বঙ্গবন্ধু কোন পরিপ্রেক্ষিতে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, জনগণ তার কাছ থেকে সেদিন কী চেয়েছিলেন, তিনি কী দিয়েছিলেন, কেন তিনি স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি; দিলে কী হতো পারত ইত্যাদি প্রশ্নের যথাযথ উত্তর জানা থাকার পরও অযথাই বিভ্রান্তির সম্ভাবনা বাড়ে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, চীনাপন্থিরাও তাদের লেখায় এসব প্রসঙ্গ টেনে আনেন, এটা বুঝাতে যে, শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি। কূপম-ূকতা তাদের স্বাভাবিক চিন্তার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে পদে পদে। তারা কিছুতেই বুঝতে চায় না যে, প্রতিটি পদক্ষেপই যে শেখ মুজিব সতর্কভাবে ফেলেছেন, তা ইতিহাসের দিকে সুনজরে, নির্মোহ দৃষ্টিতে তাকালেই স্পষ্ট হয়। শেখ মুজিব নাশকতাকারী, বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা ছিলেন না। তার জীবন সংগ্রামই জানান দেয়, কখন কোন পদক্ষেপ নিতে হবে, তার সমীকরণ জানা ছিল। তাই পলাতক কাপুরুষের মতো আচরণ কখনো গ্রাস করেনি। সাহসের দৃঢ়তায় তিনি পাকিস্তানের ২৪টি বছর ধাপে ধাপে এগিয়ে অনেক জনপ্রিয় নেতাকে ডিঙ্গিয়ে জনগণের একমাত্র নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ থেকে তার অসাধারণে উত্তরণ মেনে নিতে না পারারা নানাভাবে বিরোধিতা করে আসছেন বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশা হতেই।
ইতিহাসের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়, একাত্তরের ৬ মার্চ ইয়াহিয়ার স্থগিত জাতীয় পরিষদ অধিবেশন ২৫ মার্চ হবে বলে ঘোষণার পর সার্বিক পরিস্থিতির একটুও বদলায়নি। বরং জনগণ আরো ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। বিদ্রোহ তখন চারদিকে। ‘৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারেন’Ñ এমন কথা নানাভাবে উচ্চারিত হতে থাকে দেশজুড়ে। দেশের জনগণও স্বাধীনতার পথে, একদফার পথে বঙ্গবন্ধুকে অগ্রসর হওয়ার জন্য সর্বাত্মক সহায়তা দিতে থাকে। পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ বিচ্ছিন্নতার পথে, স্বাধীনতার পথে অগ্রসর না হওয়ার জন্য শেখ মুজিবকে চাপ দিতে থাকে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ৭ মার্চ সকালে দেখা করে এ ব্যাপারে তাদের মনোভাব বঙ্গবন্ধুকে জানিয়ে দেন। রাষ্ট্রদূত জানান যে, পাকিস্তান থেকে পূর্ববঙ্গ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি মার্কিন সরকার ভালোভাবে নেবে না এবং সমর্থনও করবে না। সেই পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ কী হতে পারে, তা নিয়ে দলের নেতারা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তের ভার এককভাবে শেখ মুজিবকেই দেন।
রেসকোর্সে সমাবেশ চলাকালে আকাশে উড়ছিল পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার মেশিনগান নিয়ে। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ছিল সেনারা সতর্ক। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কোনো ব্যাটালিয়ন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ছিল না তখন। বঙ্গবন্ধু যদি স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন, তবে সর্বাত্মক আক্রমণের যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। বঙ্গবন্ধুসহ নেতা-জনতার ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটত। পাকিস্তান তখন বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে চিহ্নিত করে হত্যা করতে পারত এবং তাতে বৈধতা পেত। দেশজুড়ে চলত ভয়াবহ দমননীতি। প্রতিরোধ করার জন্য সংগঠিত হওয়ার সুযোগ মিলত না। যে গণহত্যা তারা একাত্তরের চালিয়েছে, তার বেশি হত্যা করত।
স্বাধীনতা আর বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে যে তফাৎ রয়েছে, সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকলে ভ্রান্তি আসে না। যদিও জনগণের কাছে স্বাধীনতা তখন একমাত্র চাওয়া। কিন্তু শেখ মুজিব তো বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা নন। নিয়মতান্ত্রিক ধারায় ধাপে ধাপে এগিয়েছেন। তাই তিনি জনসভার ১৫ লাখ লোকের সমর্থনে স্বাধীনতা ঘোষণা এবং ক্যান্টনমেন্ট তাদের নিয়ে আক্রমণের ফলাফল কী তা শেখ মুজিবের জানা ছিল। ছিলেন তিনি দূরদর্শী তাই পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নিয়েছেন এবং তা সফল হয়েছে। সেদিন দেশের অন্যান্য স্থানের ক্যান্টমেন্টগুলোর পাকিস্তানি নেতারা নিশ্চয়ই হাত গুঁটিয়ে বসে থাকত না। বাঙালি সেনারাও তাদের সমর্থন করত। কারণ ২৫ মার্চের পর যুদ্ধ চলাকালে অনেক বাঙালি সেনা কর্মকর্তা পাকিস্তানিদের পক্ষাবলম্বন শুধু নয়, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছে। বাঙালি সেনারা তখনো মোটিভেটিভ হননি। তাই তারা ৭ মার্চ বিদ্রোহ করে জনসভায়ও আসেননি।

তৎকালীন সময়ের বাস্তবতায় শেখ মুজিব পুরো পাকিস্তানের নেতা, যার হওয়ার কথা তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। ইয়াহিয়া খান একাত্তরের গোড়ায় শেখ মুজিবকে ‘মি: প্রাইম মিনিস্টার’ সম্বোধনও করেছিলেন। ৬ দফা তথা পূর্ববঙ্গের স্বাধিকার দাবি থেকে একটু সরে এলেই তিনি তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারতেন। কিন্তু স্বপ্ন তো তার বাংলার স্বাধীনতা। দাবি হতে এক ইঞ্চিও সরে আসেননি। বিশ্ব ও স্বদেশ রাজনীতির বাস্তবতার আলোকে জনগণকে ধাপে ধাপে তৈরি করেছেন স্বাধীনতার দিকে। হিসাব না কষে, ভাবাবেগতাড়িত হয়ে ‘খেয়ালখুশি’র কাজ তিনি করেননি। তাছাড়া কোনো হঠকারিতায় কখনো আস্থা ছিল না বঙ্গবন্ধুর। তিনি চেয়েছিলেন পাকিস্তানিরা সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি করুক, যেখানে তারা বাঙালির হাতে ক্ষমতা না দিতে বদ্ধপরিকর। বরং পাকিস্তানিরা নিজেরাই বাংলা ছেড়ে দেবে। যা ভুট্টো চেয়েছিলেন বলে পরবর্তীকালে প্রকাশিত হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু পরিস্থিতি সেদিকেই নিয়ে গিয়েছিলেন যেখানে স্বাধীনতার কোনো বিকল্প নেই। দেখা যায় যে, বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ যে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন, সে ডাকে সাড়ে সাত কোটি মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ১ কোটি মানুষ শরণার্থী হয়েছিল। কিন্তু তারপরও ভারত ও ভুটান ছাড়া বিশ্বের আর কোনো দেশ নয় মাসে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। কমনওয়েলথ দেশগুলোও নয়। এমনকি সমাজতন্ত্রীরাও নয়। সুতরাং ৭ মার্চ সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলে প্রতিবেশী ভারত তো নয়ই, বিশ্বের কোনো দেশই সমর্থন করত না। আর সেনাছাউনিতে হামলার জন্য নাশকতাকারী হিসেবে চিহ্নিত হতেন। এতে স্বাধীনতার সব আয়োজনই বিনষ্ট হতো। ক্যান্টনমেন্টের বাঙালি সেনারাও সমর্থনে এগিয়ে আসতেন না। যদি তাই হতো, তবে তারা ২৫ মার্চের আগেই বিদ্রোহ করতেন। যখন সারাদেশ শেখ মুজিবের অঙ্গুলিহেলনে পরিচালিত হচ্ছিল।
মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এমন সেনা কর্মকর্তাদের কেউ কেউ সময়ের বাস্তবতার ধারে কাছেও যাননি। দেশের পরিস্থিতি টের পাননি কী অবস্থায়। ৮ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু উসমান চৌধুরী। একাত্তরে ছিলেন তিনি চুয়াডাঙ্গায়। যিনি ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর আম্রকাননে মুজিবনগর সরকার তথা বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের শপথ পাঠ অনুষ্ঠানের আয়োজক। তার গ্রন্থ ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ লিখেছেন তিনি ‘ওইদিন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন, এমন আশা অনেকেই করেছিলেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু উপস্থিত রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্রকে সঙ্গে নিয়ে অগ্রসর হলে কয়েকশ বা কয়েক হাজার প্রাণের বিনিময়ে হলেও ঢাকা সেনানিবাস দখল করা অসম্ভব ছিল না। কিন্তু সেদিন নেতা আমাদের, তথা সব বাঙালিকে হতাশ করেছেন।’ এমন ভাষ্য অতি সরলীকরণ। একজন সেক্টর কমান্ডারের এমন মূল্যায়ন যথাযথ না হওয়ার কারণ ঢাকা থেকে বহু দূরে চুয়াডাঙ্গায় অবস্থানের জন্যও হতে পারে, তথ্য ঘাটতিও। তবে গ্রন্থটি তিনি ১৯৯১ সালের পরে লিখেছেন। এত পরে এসেও এমন সাধারণ বিশ্লেষণ ভাবায় বৈকি। বঙ্গবন্ধু প্রথমেই আক্রমণকারী হয়ে মানুষ হত্যার দায়িত্ব শুধু নয়, একটি দেশের নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা সশস্ত্র ব্যক্তিদের হামলা করবেন নিরস্ত্র জনতাকে নিয়ে যেন লাঠিয়াল বাহিনীর চরদখল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বন্দুকের নলের মুখে এমন ধারণা থেকেই এই বিশ্লেষণ।
কেমন ছিল একাত্তরের ৭ মার্চ সকালে ও বিকালে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের পরিস্থিতি? সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী ছিল সকাল ও বিকালের অবস্থা। ‘সকাল ছিল নিস্তব্ধ পরিবেশ। অবাঙালি সামরিক অসামরিক অধিবাসীরা ছিলেন ভীত, সন্ত্রস্ত ও শঙ্কিত। সব বাড়িই ছিল রুদ্ধদ্বার।’ এমন বর্ণনা দিয়েছেন একাত্তরে নৌ কমান্ডোর উপ-অধিনায়ক একদা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আহমদ রেজা তার ‘একাত্তরের স্মৃতিচারণ’ গ্রন্থে। একই বর্ণনা দিয়েছেন পাকিস্তান বাহিনীতে একদা রেজার সিনিয়র বৈমানিক একে খন্দকার তার বিতর্কিত গ্রন্থে। তারা উভয়েই ক্যান্টনমেন্টেই থাকতেন। ৭ মার্চ হামলা হলে তারাও মারা পড়তেন। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান বিমানবাহিনী থেকে পদত্যাগকারী আহমদ রেজা লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর পরই ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের পরিস্থিতি বদলে যায়।’ এই বদলে যাওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন অনেকটা হতাশার ভঙ্গিতে। ‘সব বাড়ির দরজা-জানালা খোলা হলো। ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে এসে খেলাধুলা শুরু করল। ভীতসন্ত্রস্ত এক পরিবেশ যেন জাদুবলে হাসি-খুশিতে ভরে উঠল। পরে প্রতিবেশী এক পাঞ্জাবি কর্নেল সাহেব কথায় কথায় বলেছিলেন যে, সেদিন যদি স্বাধীনতা ঘোষণা করা হতো, আর লাখ লাখ বাঙালি শুধু বাঁশের লাঠি হাতে ঢুকে পড়ত ক্যান্টনমেন্টে, তাহলে তারা ক্যান্টমেন্ট দখল করে নিতে পারত। কারণ তখন সামরিক বাহিনীও সমন্বিত ও সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে উঠতে পারেনি। উপরন্তু পুলিশ, ইপিআর ও সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যরাও বাঙালিদের সঙ্গেই যোগ দিত তখন। এ রকম পরিস্থিতিতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আত্মসমর্পণ ছাড়া কোনো পথ খোলা ছিল না। পাকিস্তানি বাহিনীর আর কোনো পথ থাকত কিনা জানি না।’ কত সহজভাবে বলে ফেলা যায়। পুলিশ ও ইপিআর যোগ দিত হয়তো। কিন্তু সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা তাদের চাকরির শৃঙ্খলা ও মায়া ছেড়ে আসতেন- এমনটা অকল্পনীয় ও অসম্ভব ছিল। যদি হতো, তবে ২৫ মার্চের পরও বাঙালি সেনাদের অনেকে পাকিস্তানিদের পক্ষে আনুগত্য প্রকাশ করেছেন, অনেকে বাধ্য হয়ে মুক্তিযুদ্ধে নেমেছেন। তারা যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি আগ্রহী হতেন, তবে ৭ মার্চ বিদ্রোহ করতেন, কিংবা ২৫ মার্চ রাতেই প্রতিরোধ গড়তেন। ৭ মার্চ আক্রমণ করার মতো পরিস্থিতি তখনো তৈরি হয়নি। জনগণও সংগঠিত হয়ে ওঠেনি। জনগণের নির্ধারিত একচ্ছত্র নেতা এভাবে হামলা করতে যাবেন একটি প্রশিক্ষিত সশস্ত্র বাহিনীকে এমন ভাবনা বাহিনীর লোকদেরই একান্ত মস্তিষ্কজাত। আহমদ রেজা সার্বিক পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট এখানে বিবেচনা করেননি। তার গ্রন্থ থেকে নেয়া তথ্য একে খন্দকারও ব্যবহার করে বাস্তবতাবর্জিত বিশ্লেষণই করেছেন। আহমদ রেজা তদুপরি লিখেছেন, ‘৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার কর্মসূচি ঘোষণা করলেন, কিন্তু স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন না। আর পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে গতানুগতিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মসূচি দিলেন মাত্র। বাঙালিরা উন্মুখ ছিল যে, স্বাধীনতার ঘোষণা শুনবে আর অবাঙালিরা একই কারণে শঙ্কিত এবং তারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল এমন কিছুই ঘটল না ভেবে।’ এটাও তার সামরিক চেতনাজাত স্থানীয় ভাবনা। যেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট দখল করা মানেই দেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়া। দেশ জাতি, বিশ্বপরিস্থিতি, ভূরাজনীতি এবং পাকিস্তানিদের মনোভাব কোনো কিছুকেই সামনে রেখে মূল্যায়ন করা হয়নি আহমদ রেজার গ্রন্থে। সেটা ভাবনার প্রতিফলন মনে হতে পারে। আবু উসমান চৌধুরী ও আহমদ রেজার সীমাবদ্ধ ভাবনায় তাই দেখা যায়, গ্রেফ ক্যান্টনমেন্ট দখল করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। দেশ স্বাধীন হয়ে যেত। কিন্তু আসলে কি তাই। বাস্তব অবস্থা এর ধারে কাছেও ছিল না। বাঙালি সেনারা বিদ্রোহে যোগ দিত। এমন নিশ্চয়তা ছিল না। থাকলে ৭ মার্চের ভাষণের পর তারা ক্যান্টনমেন্টে বিদ্রোহ করত। পাকিস্তানি সেনাদের নিরস্ত্র করে জনগণকে আহ্বান জানাত। একে খন্দকার তো টেরই পাননি ক্যান্টনমেন্টের বাইরে কী চলছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত সব বাঙালি সেনা না হোক অর্ধেকও তখন পরিস্থিতি টের পাননি। যদি পেতেন তবে ১ম ও ২য় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের দুই বাঙালি অধিনায়ক ২৫ মার্চ আত্মসমর্পণ করতেন না। সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করতে যেতেন না। এমনকি যশোর ক্যান্টনমেন্টে বাঙালি সেনারা অস্ত্রশস্ত্র জমা দিয়ে নিজেদের ঘাতকের হাতে তুলে দিতেন না।
৭ মার্চ ভাষণের একদিন আগের পরিস্থিতি কী ছিল দেশের, সে অবস্থাটা পর্যবেক্ষণের পর স্পষ্ট করে বলা সঙ্গত কি যে, ক্যান্টনমেন্টে আক্রমণ করা যুক্তিযুক্ত বা গ্রহণযোগ্য হতো? ১৯৭১ এর ৫ মার্চ পরিস্থিতি সম্পর্কে আহমদ রেজাই লিখেছেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক আইন প্রশাসক সামরিক বাহিনীকে বেসামরিক এলাকা থেকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দিলেন ৫ মার্চ। কিন্তু সেইদিনই টঙ্গীতে সকালবেলা নিরস্ত্র জনতার এক বিক্ষোভ সমাবেশের ওপর গুলি চালাল সামরিক বাহিনী। রাজশাহীতে গুলি চালাল মিছিলের ওপর। গুলি চালাল রংপুরে। ঢাকা শহরেও বিভিন্ন এলাকায় নির্বিচারে গুলি চালাল পাকিস্তানি বাহিনী। হতাহতের সংখ্যা নিরূপণ করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু সংখ্যা যে খুব কম নয়। এমন অনুমান করা কী কঠিন? সমবেত জনতার ওপর সামরিক বাহিনী গুলি চালালে, সে গুলি তো লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার কথা নয়।
৪ মার্চ থেকে দেশজুড়ে বঙ্গবন্ধুর ডাকে হরতাল চলছিল। ৬ মার্চ ছিল হরতালের শেষ দিন। হরতালের কারণে ক্যাটনমেন্ট এলাকার কচুক্ষেতে কাঁচাবাজার না বসায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন একে খন্দকার তার গ্রন্থে। তিনি হরতাল প্রসঙ্গ টানেননি, জানা না থাকায়। হরতালের কারণে পণ্য সরবরাহ ছিল বন্ধ। ৬ মার্চ ঢাকা শহরজুড়ে শুধু মিছিল আর মিছিল। মোড়ে মোড়ে পথসভা। আহমদ রেজা লিখেছেন, ‘ক্যান্টনমেন্টের আবহাওয়া ছিল থমথমে। বহু অসামরিক অবাঙালি এসে আশ্রয় নিয়েছে ক্যান্টনমেন্টে নিজেদের শহরের বাসস্থান ছেড়ে। তারা যেন আতঙ্কিত। সশস্ত্রভাবে ঘোরাফেরা করছে তারা।’ ৭ মার্চ যদি হামলা করা হতো, তবে এই অসামরিকরাও মারা যেত। কিন্তু অস্ত্র থাকায় ঠিকই তারা প্রতিরোধও গড়ত। বিনা যুদ্ধে মারা যেত, তা নয়।
স্মরণ করা যায়, ৬ মার্চ টিক্কাখান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর। আঞ্চলিক প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পূর্বাঞ্চলীয় বাহিনীর কমান্ডার নিয়োগ করা হয়। ভাইস এডমিরাল আহসানকে গভর্নর পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হলো। ‘বেলুচ কসাই’ খ্যাত টিক্কাকে পূর্ববঙ্গের সর্বোচ্চ সরকারি পদে নিয়োগ স্বভাবতই দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায় বাঙালিদের জন্য। বিস্ময়কর যে, শেখ মুজিব পাকিস্তানি উপনিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই করেই নিজের রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। ’৬৬ সালে ৬ দফা দিয়ে জাতিকে টানা পাঁচ বছর ধরে ক্রমশ তৈরি করেছেন একাত্তরের ৭ মার্চের জন্য। যেখানে প্রতিরোধ গ্রহণের ডাক রয়েছে। স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামের কথা রয়েছে। ৭ মার্চ ক্যান্টনমেন্টে কেন লাখ লাখ মানুষ হামলা চালায়নি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে-এর জবাব তো রয়েছেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল না কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। ভাষণে প্রাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা পাকিস্তান ভাঙার কোনো দায় নেননি। বরং বাংলাদেশকে স্বাধীন করার এক পথ তৈরি করেন। বঙ্গবন্ধু আক্রমণকারী হলে স্বাধীনতার প্রশ্নে মানুষ দ্বিধাভিভক্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিত। তাতে স্বাধীনতা লাভ নাও হতে পারত। ড. কামাল হোসেন তো বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা দিলে সেখানে জালিয়ানওয়ালাবাগের মতো কা- হতো।
৭ মার্চ সম্পর্কে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নিজেই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসমাবেশে বলেছেন, ‘বাংলার মানুষকে আমি ডাক দিয়েছিলাম। ৭ মার্চ আমি তাদের প্রস্তুত করে দিয়েছিলাম। যখন দেখলাম আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে সেই মুহূর্তে আবার আমি ডাক দিয়েছিলাম আর নয় মোকাবিলা কর। বাংলার মাটি থেকে মানুষকে উৎখাত করতে হবে। বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারবা না।’ গ্রন্থকাররা রচনাকালে যদি বঙ্গবন্ধুর ব্যাখ্যার প্রতি শ্রদ্ধা রাখতেন, তবে এভাবে ভাবাবেগতাড়িত বাস্তবতা বিবর্জিত বক্তব্য প্রকাশে আগ্রহী হতেন, তা নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতাও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির অপপ্রচারের শিকার হয়ে এসব অবান্তর বিষয় সামনে আনা হয়েছে পঁচাত্তরপরবর্তী সময় থেকেই।

এসএইচ