প্রত্যাশা রেনেসাঁর, নবজাগৃতির

আগের সংবাদ

বঙ্গবন্ধুর ছেলেবেলা

পরের সংবাদ

অভাজনের বঙ্গবন্ধু

আতিউর রহমান

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ১৭, ২০২০ , ১২:০৮ অপরাহ্ণ

খোকার স্কুল ছুটির সময় হলে বাড়ির আঙিনায় আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতেন মা সায়রা খাতুন। খোকা আসবে দূর থেকে রাস্তার উপর নজর রাখতেন। একদিন দেখেন তার খোকা গায়ের চাদর জড়িয়ে হেঁটে আসছে, পরনের পায়জামা-পাঞ্জাবি নেই। কি ব্যাপার? এক গরিব ছেলেকে তার শত ছিন্ন কাপড়ে দেখে সব দিয়ে এসেছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তাঁর ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইয়ে জানিয়েছেন, ‘দাদির কাছে শুনেছি আব্বার জন্য মাসে কয়েকটা ছাতা কিনতে হতো কারণ আর কিছুই নয়। কোনো ছেলে গরিব, ছাতা কিনতে পারে না, দূরের পথ রোদ-বৃষ্টিতে কষ্ট হবে দেখে, তাদের ছাতা দিয়ে দিতেন। এমনকি পড়ার বইও মাঝে মাঝে দিয়ে আসতেন’। গরিব-দুঃখী, প্রান্তজন, অভাজনের জন্য বঙ্গবন্ধুর মায়া-মমতা-ভালোবাসা ছিল সেই ছোটবেলা থেকেই। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে আমরা জানি, স্কুলে পড়ার সময় তিনি কাজী আবদুল হামিদ এমএসসি মাস্টারের সঙ্গে ‘মুসলিম সেবা সমিতি’ গঠনে যুক্ত হয়েছিলেন। প্রত্যেক রবিবার থলি হাতে বাড়ি বাড়ি থেকে চাল উঠাতেন। সেই চাল বিক্রি করে গরিব ছাত্রদের বইখাতা কেনা, লেখাপড়ার খরচ চলত। হঠাৎ যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে হামিদ মাস্টার মারা গেলে এই সেবা সমিতির ভার তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেন। ছোটবেলায় তাঁর গভীর মানবিক হৃদয়ের আরেকটি ঘটনা আমাদের অবাক করে। একবার তাঁর গ্রামের চাষিদের ফসল নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কৃষকদের জীবনে নেমে আসে অভাব-অনটন। অনেক বাড়িতেই দুবেলা ভাত রান্না বন্ধ হয়ে যায়। চাষিদের চোখে-মুখে দুশ্চিন্তা। তাদের সন্তানেরা অভুক্ত। সারা গ্রামেই প্রায়-দুর্ভিক্ষাবস্থা নিয়ে চাপা গুঞ্জন। কিশোর মুজিব এরকম পরিস্থিতিতে দুঃখ-ভারাক্রান্ত। কিন্তু কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। একটা কিছু করার জন্য তিনি ছটফট করছিলেন। সেসময় যে পথটি তাঁর সামনে খোলা ছিল, তিনি তাই করলেন। নিজের পিতাকে তিনি তাঁদের গোলা থেকে বিপন্ন কৃষকদের মধ্যে ধান বিতরণের জন্য অনুরোধ জানালেন। তাঁদের নিজেদের ধানের মজুত কেমন, এই অনুরোধ তাঁর বাবা রাখতে পারবেন কিনা, সেসব তিনি ভাবেননি। কৃষকদের বাঁচিয়ে রাখার চিন্তাটিই ছিল তখন তাঁর কাছে মুখ্য। সারাজীবন ধরেই তিনি এই প্রান্তজনের সপক্ষে লড়েছেন। অভাজনেরাই ছিল তার চিরকালের সুখ-দুঃখের সাথি। প্রাণের তাগিদেই তিনি তাদের সাথে মিশতেন। শেখ মুজিবুর রহমান রচিত তিনটি গ্রন্থ এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে। অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা এবং আমার দেখা নয়া চীন। অন্য কারো বক্তব্য বা লেখা থেকে সাহায্য নেয়ার দরকার নেই, শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের লেখা থেকেই জানা যায় সমাজের অসহায়-বঞ্চিত-লাঞ্ছিত মানুষদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা কতো গভীর ছিল। আর জানা যায় সম্প্রতি তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো থেকে। তাঁর মানবিক হৃদয়ের অপূর্ব দৃষ্টান্ত গোয়েন্দারাও এড়িয়ে যেতে পারেনি। শত্রুপক্ষও যখন কোনো মানুষের ভালো গুণগুলো সামনে আনেন তখন আমাদের সেই মানুষটির প্রতি স্বাভাবিকভাবেই আরো গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জাগ্রত হয়।
‘দাওয়াল’- আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বদানের কথা আমরা বিস্তৃত আকারে প্রথম জানতে পারি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকেই। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তার স্বাক্ষ্য বহন করে, “about 350 reapers for Faridpur, Dacca and Commilla. He (Sheikh Mujibur Rahman) asked them to follow him to D.M’S Bungalow in order to demand from the Dist-Magistrate permit for going home with paddy they had obtained as their wages for reaping. […] The Dist. Magistrate told the Dewalias and Sk. Mujibar Rahman that he had no power to allow them to take paddy from this district and that the Govt. order must be obeyed.” SECRET DOCUPMENTS OF INTELLINGENCE BRANCE ON FATHER OF THE NATION BANGABANDHU SHEIKH MUJIBUR RAHMAN Edited by Sheikh Hasina, Hakkani Publishers, Dhaka, 2018, VOl-1, page-89) বাংলার গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষ বঙ্গবন্ধুকে কতখানি ভালোবাসতেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় এই গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোতে অন্তর্ভুক্ত কিছু চিঠি থেকে। ১৯৫০ সালে শেখ মুজিব যখন জেলে বন্দি তখন সেপ্টেম্বর মাসে গিমাডাঙ্গা হাইস্কুল থেকে একটি চিঠি আসে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। কোমলমতি ছাত্ররা লিখেছে, “জোনাব নেতা সাহেব পর সমাচার প্রায় ৮/৯ মাস গত হয় আপনি জেলে গিয়াছেন তাহাতে আমরাও আপনার সুসংবাদআদি না পাইয়া যার পর নাইয়া চিন্তাযুক্ত আছি। আশা করি আপনী আপনার কার্য্যরে জন্য বেতীব্যস্ত আছেন যা হোক সে কার্য্য একদিন না একদিন জয়ই হইবেই, তাহার জন্য চিন্তা করিবেন না বা দৈর্য্য হারাইবেন না আমরা ছাত্রবৃন্ধ আপনার সব কাজ প্রায় সমধনা করিয়া আনিয়া আনিয়াছি, তাহার জন্য আপনী চিন্তা করিবেনা আপনী এবৎসর গোপালগঞ্জে মোহকমার একজন এম এল সাহেব হইবেন, এই আসাতে আমরা ছাত্রবৃন্দ এক সভা করিয়া সেই সভায় হিন্দু মুসলমান সবাই এক বাক্যে সিকার করেছেন যে মুসলিম নেতা মুজিবর রহমানের জন্য আমারা প্রাণপণে প্রার্থনা করি যাহাতে দেশের ও দুঃখ দীনের অভাব অভিযোগ না থাকে তাহার জন্য প্রাণ দিতে আমরা রাজী, চাই গরিবের দুঃখ মছোন করিতে আমারা চাই জাতী ও দেশকে বাচাইতে আমরা চাই জগতের সম্মুখে জাতীয় গৌরব রক্ষা করিতে তাহাতে আমরা জীবন দান করিব তাহার জন্য আপনি কোনই চিন্তাযুক্ত হইবেন না আল্লা আমাদের সহায় আছে ভয় কি আছে। হবে হবে জয় জয় থাকবে গাথা হৃদয় মাজে তোমার প্রেমের ভালবাসা পাকিস্তান মুক্তির মাস জিন্দাবাদ, মুসলিম নেতা জিন্দাবাদ আওমই মুসলিম লীগ কি জয়ো জয়ো জয়ো জয়ো…”(পৃষ্ঠা-৫০০-৫০১, ভলিউম-১)
একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে চিঠিটিতে ছেলেমানুষি আবেগে ভরপুর, অনেক বানান ভুল। ভালোবাসার যে আবেগ সেটা মিথ্যা নয়। গিমাডাঙ্গা হাই স্কুলের ছাত্রবৃন্দের পক্ষে চিঠির প্রেরকের নাম ছিল ‘ছরওয়ার’ । আরেকটি চিঠি গোপালগঞ্জ থেকে লিখেছেন অজ্ঞাতনামা একজন। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে সম্বোধন করছেন ‘খোকা’ বলে। মুজিব যেন দ্রুত ছাড়া পান সেই প্রার্থনা জানিয়ে বলেছেন, “We are in quite darkness about your present modes of living. If money can add you any comfort in your present life, please do not forget to write poor man. For god’s sake you must inform me.” (page- 511, volume-1)
এটুকু পড়েই বোঝা যায় সাধারণ মানুষ তখন কতোখানি উদ্বিগ্ন শেখ মুজিবুর রহমানের বিষয়ে। কতোখানি ভালোবাসা থাকলে জেলখানায় তাঁকে টাকা পাঠাতে চান। উল্লেখ্য যে, শেখ মুজিবুর রহমান তখন দুটো ছোট ছোট সন্তানের পিতা। এ কথাও নিশ্চয়ই চিঠির প্রেরক জানতেন। চিঠি পড়ে মনে হয় তিনি মুরব্বিশ্রেণির কেউ এবং শেখ মুজিবকে কাছ থেকে চিনতেন। দুঃখের ব্যাপার তাঁর নাম-পরিচয় জানা যায়নি। গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোর মাধ্যমে তাঁর এই ভালোবাসা অমর হয়ে রইল।
সাধারণ মানুষকে বঙ্গবন্ধু যেমন ভালোবেসেছিলেন বঙ্গবন্ধুকেও তারা সেরকম ভালোবেসেছিলেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে জানিয়েছেন এক অসহায় মাঝির কথা। ১৯৪৮ সালের দিকে সরকার ‘জিন্নাহ ফান্ড’ গঠন করে। সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার শুরু হয় মহামারীর মতো। সবার কাছ থেকে জোর করে টাকা উঠিয়ে নিয়ে যেত। এই সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান একবার গোপালগঞ্জ যান। হরিদাসপুর থেকে নৌকায় গোপালগঞ্জ যেতে হয়। নৌকা ছেড়ে দিয়ে মাঝি বললেন, “ভাইজান, আপনি এখন এসেছেন, আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে। পাঁচজন লোক আমরা, হুকুম এসেছে পাঁচ টাকা দিতে হবে। দিনভর কোনোদিন দুই টাকা, কোনোদিন আরও কম উপার্জন করি, বলেন তো পাঁচ টাকা কোথায় পাই? গতকাল আমার বাবার আমলের একটা পিতলা বদনা ছিল, তা চৌকিদার টাকার দায়ে কেড়ে নিয়ে গেছে।” এই কথা বলে কেঁদে ফেলল। সমস্ত ঘটনা আমাকে আস্তে আস্তে বলল। মাঝির বাড়ি টাউনের কাছেই। সে চালাক চতুরও আছে। শেষে বলে, “পাকিস্তানের কথা তো আপনার কাছ থেকেই শুনেছিলাম, এই পাকিস্তান আনলেন!” আমি শুধু বললাম, “এটা পাকিস্তানের দোষ না।” (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-১০৬)
এই যে বঙ্গবন্ধুর ওপর সাধারণ মানুষের নির্ভরতা এটা এক অনন্য নজির। সব শ্রেণিপেশার মানুষের কাছেই তিনি পরম আস্থাভাজন ছিলেন। জেলখানায় থাকার সময় জেলের বাবুর্চি তাঁকে যে সেবাযতœ করে খাওয়াত তা পরিবারের কোনো প্রিয় মানুষই করে। অসুস্থ থাকলে, খাওয়ায় রুচি না থাকলে সে জোর করে খাওয়াত। বলত, ‘এতবড় শরীর আধা পোয়া চালের ভাত খাবেন না, তাহলে বাঁচবেন কেমন করে’? আর বঙ্গন্ধু শুধু ভাবতেন, এদের এই ভালোবাসার প্রতিদান তিনি কী করে দিবেন? কারাগারের রোজনামচায় লিখেছেন, “আমার বাবুর্চি একটু চালাক চতুর ছেলে, কেরামত নাম। বলে, স্যার আপনি তো জানেন না যেখানে দুইশত-তিনশত কয়েদি থাকে তারা নামাজ পড়ে আপনাকে দোয়া করে। তারা বলে, আপনি ক্ষমতায় থাকলে তাদের আর চিন্তা থাকতো না।” (পৃষ্ঠা-৬০)
এরই মধ্যে ঝাড়–দার এক কয়েদি নাছোড় বান্দা। ‘আমাকে আপনি ছেড়ে দিন, আপনি বললেই জেল থেকে বের করে দিবে।’ তার এ কথার উত্তরে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমি তো তোমার মতো একজন কয়েদি, আমার ক্ষমতা থাকলেই আমিওবা জেলে আসব কেন?’ সে বলে, ‘আপনি কলম মাইরা দিলেই কাজ হয়ে যায়।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘কলম আছে, কিন্তু মাইরা দিবার ক্ষমতা নাই।’ তাদের সকলের বিশ্বাস তিনি বললেই হবে। এই যে মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং তাঁর প্রতি মানুষের বিশ্বাস তা তো একদিনে হয়নি। আজীবন তিনি যে তাদের পাশেই ছিলেন। সকল অর্থেই যে তিনি হতে পেরেছিলেন ‘তাদের লোক’। এই কারাগারেই তাঁর পরিচয় হয় লুদুর সঙ্গে। ১৯৫০ সালে যখন জেলে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু, তখন পরিচয় হয় লুদু ওরফে লুৎফর রহমানের সঙ্গে। ১৯৫৪ ও ১৯৫৮ সালেও তাকে তিনি দেখেছেন জেলে। ১৯৬৬-তেও এসে পান তাকে। তার গল্প তিনি লিখেছেন অসীম মমতায়। চুরি ও পকেটমারাকে কেন পেশা হিসেবে নিয়েছিল লুদু? তার বাবার সাত বিয়ে ও নানা বদভ্যাসের ফসল লুদু। নানা বাড়ির পাশের বাড়ির গোপাল নামের এক যুবকের কাছে তার চুরি বিদ্যায় হাতে খড়ি। এরপর একা চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়লো লুদু। থানার পুলিশ ও দারোগার সাথে ‘দেখা সাক্ষাৎ করে’ কী করে আরও বড় পকেটমার হয়ে উঠলো সে কাহিনী বঙ্গবন্ধুর বইতে ফুটে উঠেছে। এরপর জিআরপি, সিআইডিসহ পুলিশের নানা পর্যায়ে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ‘বন্দোবস্ত’ করতে পারেনি এমন পুলিশের হাতে ধরা পড়ে ফের লুদু জেলে। জেলের ভেতরেও রয়েছে অপরাধ জগত। সেই জগতেরও পাকা সদস্য লুদু। গলায় ‘খোকড়’ কেটে জেলখানা থেকে বের হয়ে নানা জায়গায় পকেটমারি করে। ফের ধরা পড়ে। মাঝখানে বের হয়ে বিয়েও করেছে লুদু। তার স্ত্রীর জন্যে খুব মায়া অনুভব করে লুদু। একটা ছেলে ছিল। সেও মারা গেছে। লুদুর চিন্তা কী করে বাঁচবে তার স্ত্রী। ‘জীবনের উপর একটা ধিক্কার এসেছে’ লুদুর। এইভাবে একেবারে সাধারণ এক অপরাধীর কষ্টের কথা সযত্নে তুলে এনেছেন বঙ্গবন্ধু তাঁর লেখায়।
বঙ্গবন্ধুর দেখার চোখটা যে ভিন্নরকম ছিল সেটা বোঝা যায় চারদিকে তাঁর সজাগ দৃষ্টি ছিল সব সময়। ১৯৫২ সালে চীনে ভ্রমণ করতে গিয়েও তিনি বারবার খোঁজ নিয়েছেন নয়াচীনের শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষরা কীরকম আছে। রাস্তার রিকশাওয়ালাদের সাথে কথা বলেছেন পরম বন্ধুর মতো। এমনকি সে দেশের পতিতাবৃত্তি কী করে বন্ধ হলো তারও খোঁজ নিয়েছেন বিস্তৃতভাবে। তাঁকে যারা স্বচক্ষে দেখেছেন তাদের ভাষ্য থেকে জানা যায় অসংখ্য মানুষের নাম-পরিচয় বঙ্গবন্ধুর মনে থাকত। বহু বছর দেখা হলে তিনি ঠিক ঠিক চিনে ফেলে বলতেন, ‘তোর বাবার শরীরটা কেমন আছে? হাঁপানিটা ভালো হয়েছে তো!’ প্রশ্ন উঠতে পারে এই অভাজনদের জন্য নীতিনির্ধারক হিসেবে তিনি কী কী করেছেন? যখনই ক্ষমতায় ছিলেন তখনই তাদের ভাগ্যের উন্নয়নের জন্য তিনি উপযুক্ত নীতি ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। পাকিস্তান আমলে দুদুবার প্রাদেশিক মন্ত্রী থাকার সময় পূর্ব-পাকিস্তানের বঞ্চিত মানুষের জন্য তিনি সমবায় অধিদপ্তরকে অর্থ বরাদ্দ করেছেন, উপেক্ষিত উদ্যোক্তাদের সুযোগ সৃষ্টির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে লড়েছেন, গণপরিষদের সদস্য হিসেবে গরিব-দুঃখী মানুষের পক্ষে সোচ্চার হয়েছেন, স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কৃষকদের সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করেছেন, ভূমিহীন কৃষকদের মাঝে খাস জমি বিতরণ করেছেন, কৃষির আধুনিকায়নের জন্য নয়া নয়া উদ্যোগ নিয়েছেন, সংবিধানে সাম্যের কথা বলেছেন, প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বঞ্চিতজনদের উন্নয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়েছেন, গ্রামে-গঞ্জে বিদুৎ পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন, প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করার জন্য সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নিয়েছেন, এবং নির্যাতিত নারীর পুনবার্সনে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এরকম অসংখ্য উদাহরণ দিয়ে বলা যায় সুযোগ পেলেই তিনি অভাজনের ভাগ্যোন্নয়নে তাঁর সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছেন। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ তিনি যে দ্বিতীয় বিপ্লবের ঘোষণা দিলেন তা এই অভাজন মানুষের কথা ভেবেই। তিনি বারবার বলতেন, ‘আমি যদি বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে না পারি, আমি যদি দেখি বাংলার মানুষ দুঃখী, আর যদি দেখি বাংলার মানুষ পেট ভরে খায় নাই, তা হলে আমি শান্তিতে মরতে পারবো না পারবো না পারবো না।’ বাংলার মানুষও তাই তাঁকে চিরদিনের জন্য তাদের অন্তরে গেঁথে রেখেছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বুকে ধারণ করেই আজ বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে উন্নয়নের মহাসড়কে। সুখের কথা বাংলাদেশের সকল মানুষ এখন দুবেলা পেট ভরে খেতে পারছেন। মুজিববর্ষে আমাদের প্রত্যাশা তারা আগামী দিনে আরও পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবার পাবেন। তাদের সন্তানদের কাক্সিক্ষত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসনের সুযোগ করে দিতে পারবেন। কাউকে পেছনে না ফেলে সবাই মিলে সুন্দর ও সমৃদ্ধ জীবন চলার পথ নিশ্চিত করার সুযোগ পাবেন।

এসএইচ