সোয়ারিঘাটে বিপুল পরিমাণ জাটকা উদ্ধার

আগের সংবাদ

সংসদের বিশেষ অধিবেশনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত বুধবার

পরের সংবাদ

৩০ লাখ টাকার লোভে সন্তানকে খুন করায় বাবা-মা

প্রকাশিত: মার্চ ৯, ২০২০ , ৭:২১ অপরাহ্ণ আপডেট: মার্চ ৯, ২০২০ , ৯:৪০ অপরাহ্ণ

“আগে টাকা দাও পরে কাম সারো” নিজের ১১ বছর বয়সী মেয়েকে হত্যার আগে এভাবেই টাকা দাবী করেছিল শিশুটির বাবা। বিষয়টি জানতো শিশুটির মা নিজেও। পরে বাবার সামনেই ভগ্নিপতি ও ফুপাতো ভাই হকিস্টিক দিয়ে শিশুটিকে প্রথমে আঘাত করে। এরপর ইট দিয়ে মাথা থেতলে ও গলা কেটে নৃশংসভাবে তাকে হত্যা করে। আর লোমহর্ষক এ ঘটনাটি ঘটে দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের জের ধরে, প্রতিপক্ষকে হত্যার মামলায় ফাঁসিয়ে প্রতিশোধ নিতে। যদিও ৩০ লাখ টাকা চুক্তি হলেও এক টাকাও পায়নি ওই পাষণ্ড বাবা ও মা।

হত্যাকাণ্ডের ৫ বছর পর নরসিংদীর চাঞ্চল্যকর শিশু ইলমা বেগম (১১) হত্যার রহস্য উদঘাটনের বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লোমহর্ষক এসব তথ্য জানান পুলিশের অপরাধ তদন্ত শাখার (সিআইডি) অর্গনাইজড ক্রাইমের ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ। গতকাল সোমবার দুপুরে সিআইডি প্রধান কর্যালয়ের কনফরেন্স কক্ষে সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। ডিআইজি বলেন, বাবা আবদুল মোতালেব, মা মঙ্গলী বেগম, বোন জামাই বাবুল ও ফুফাত ভাই মাসুম মিয়াসহ আরো কয়েকজন শিশুটিকে নৃশংসভাবে হত্যা করার পর ধানক্ষেতে ফেলে দেয়। মুলত শাহজাহান নামে একটি গ্রুপ আধিপত্য বিস্তার ও প্রতিপক্ষ বাচ্চু গ্রুপকে ফাঁসাতেই ৩০ লাখ টাকায় ইলমাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় বাবা।

গত ২০১৫ সালের ২৮ মার্চ শিশু ইলমার মৃতদেহ নরসিংদী থানাধীন বাহেরচর গ্রামের একটি ধানক্ষেতে পাওয়া যায়। শিশুটি বাহেরচর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২য় শ্রেণীর ছাত্রী ছিল। ছয় ভাইবোনের মধ্যে ইলমা ছিল সবার ছোট । পরে ৩১ মার্চ ইলমার বাবা মোতালেব বাদী হয়ে প্রতিপক্ষ বাচ্চু গ্রুপের বিলকিস বেগম, খোরশেদ ও নাসুসহ অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামী করে একটি হত্যা মামলা করেন। নরসিংদী সদর থানা পুলিশ আসামী ধরতে ব্যর্থ হলে মামলাটি সিআইডির কাছে আসে। পরে তদন্ত শুরু হলে, তিন আসামীর দুজনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়া হলেও হত্যার কোনো ক্লু খুঁজে না পাওয়ায় তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এখন তারা জামিনে আছেন। তবে এর পরেও হত্যার রহস্য উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রাখে সিআইডির কর্মকর্তারা।

তিনি আরো বলেন, এরমধ্যে ইলমার বাবা মোতালেব সিআইডির কাছে কয়েক দফা এসে আসামীদের নাম পরিবর্তন করতে বলেন। কখনো বলেন, এরা খুন করেননি। আবার কখনো কয়েকজনের নাম দিয়ে বলেন, এরা খুন করেছে আমার মেয়েকে। মামলায় তাদের নাম তালিকাভুক্ত করেন। তখন বাবাকে সন্দেহ হওয়ায় সিআইডি এক পর্যায়ে তার পরিবারের ওপর নজরদারি শুরু করে। তখন জানা যায়, এর আগে ২০১৩ সালে একবার মোতালেব নিজের ঘর পুড়িয়ে অন্যকে ফাঁসাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তদন্তে প্রমাণিত হয়, নিজের ঘরে নিজেই আগুন দিয়েছিলেন ওই ব্যক্তি। এছাড়াও মোতালেবের ভাগিনা মাসুম এক মামলার আসামী। ভাগ্নের খোঁজ করতে গিয়ে বের হয়ে আসে, গত ৫ বছর ধরে মাসুম এলাকায় থাকেন না। কোথায় থাকেন কেউ বলতে পারেন না। আর ইলমা হত্যার পর থেকেই লাপাত্তা রয়েছেন মাসুম। ইলমার ভগ্নিপতিও ঘটনার পর বিদেশে চলে গেলেও আর ফিরেন নি। শেষ পর্যন্ত সিআইডি দেশের বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালিয়ে সম্প্রতি মাসুমকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলে ইলমা হত্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য সিআইডিকে দেন তিনি।

১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবাবনন্দি দেন মাসুম। মাসুমকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে সিআইডির এ ডিআইজি বলেন, নরসিংদীর বাহের চর এলাকাটি একেবারেই দূর্গম এলাকা। মো. শাহজাহান ভূঁইয়া ও সাবেক মেম্বার বাচ্চুর নেতৃত্বে দুটি দলের মধ্যে এলাকায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছিল। শাহজাহান গ্রুপের সদস্য ইলমার ফুফাত ভাই মাসুমের সঙ্গে বাচ্চু গ্রুপের সদস্য তোফাজ্জলের মেয়ে তানিয়ার প্রেম ছিল। বিয়ে করার জন্য মাসুম ভাইয়ের শ্বশুরবাড়িতে তানিয়াকে নিয়ে আসে। টের পেয়ে তানিয়ার বাবা দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্রসহ দলবল নিয়ে হামলা করে মেয়েকে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় তানিয়ার বাবা বাদী হয়ে মাসুমসহ তার ভাই খসরু ও ভাইয়ের শুশ্বর বাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে নরসিংদী সদর থানায় অপহরণ মামলা করেন। বাচ্চু গ্রুপের সদস্যদের ক্ষতি করার জন্য আরেক গ্রুপের দলনেতা শাহজাহানের বাড়িতে ১ মার্চ রাতে মাসুমসহ ১৩ জন বৈঠক করে। প্রতিশোধ নিতে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে বাচ্চু গ্রুপের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার বিষয়ে বৈঠকে সিন্ধান্ত হয়। সিন্ধান্ত অনুযায়ী শাহজাহান ভুইয়া মোতালেবকে তার মেয়ে ইলমাকে টাকার বিনিময়ে হত্যা করার প্রস্তাব করে। মাত্র ত্রিশ লাখ টাকার বিনিময়ে মেয়েকে হত্যা করতে রাজি হন তিনি।

টাকার চুক্তি অনুযায়ী ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় ইলমাকে টাকা দিয়ে দোকান থেকে কিছু কিনে আনতে বলা হয়। বাড়ির পাশে নুরার দোকান থেকে জিনিসপত্র কিনে বাড়ি ফেরার পথে ইলমার দুলাভাই বাবুল ও ফুফাত ভাই মাসুম পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী পাশের একটি ধানক্ষেতের পাশে প্রথমে হকিস্টিক দিয়ে আঘাত করে। এরপর ইট দিয়ে মাথা থেতলে ইলমাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তারপর মাসুম নিজেই গলা কেটে হত্যা নিশ্চিত করে। এ সময় ইলমার বাবাসহ প্রতিবেশি বাতেন ও শাহজাহান গ্রুপের প্রধান শাহজাহান ভূইয়া উপস্থিত ছিলেন। মৃতদেহ ধানক্ষেতে ফেলে দেয়ার সময় শাহজাহানের কাছে ইলমার বাবা “আগে টাকা দাও পরে কাম সারো” বলে টাকা দাবি করেছিল। তবে চুক্তির ৩০ লাখ টাকা হাতে ইলমার বাবা পায়নি বলে তদন্তে বেরিয়ে আসে। সিআইডি কর্মকর্তা ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, মাসুমের স্বীকারোক্তি মোতাবেক বাবা-মা ছাড়াও প্রতিবেশি বাতেন ও শাহজাহান গ্রুপের প্রধান শাহজাহান ভূইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা সবাই ইলমাকে টাকার বিনিময়ে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। আর বোন জামাই বাবুল বিদেশে থাকায় গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। এর পেছনে আর কারা জড়িত তা জানতে রিমান্ডে এনে আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এছাড়া বাকী আসামীদের ধরতে সিআইডির অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়