চীনের উহান থেকে দিল্লি এলেন ২৩ বাংলাদেশি

আগের সংবাদ

রিয়ালের বিভীষিকাময় আট মিনিট

পরের সংবাদ

ইস্কাটনে আগুনে শিশুসহ নিহত ৩

‘কোল থেকে পড়ে গেল বাঁচাতে পারলাম না’

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২০ , ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ

 আগুনের লেলিহান শিখা থেকে প্রাণ বাঁচাতে তৃতীয় তলার বাসিন্দা শহিদুল কিরমানি রনি পাঁচ বছর বয়সী একমাত্র ছেলে এ কে এম রুশদীকে কোলে নিয়ে নিচে নেমে আসছিলেন। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত। কিন্তু ফ্ল্যাট থেকে বের হতে গিয়েই কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হন তারা।

এতে রনির কোল থেকে পড়ে যায় রুশদী। তখন আর কোনো কিছু দেখতে পাননি রনি। গড়িয়ে গড়িয়ে ওই ভবনের কোনো একটি ফ্ল্যাটের বাথরুমে আশ্রয় নেন তিনি। স্ত্রী জান্নাত কোথায় গেছেন তাও তার অজানা। এরপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। মারাত্মক দগ্ধ অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। সকালের দিকে সেখানে জ্ঞান ফেরে তার। এর পরই ছেলে রুশদীর খোঁজ করতে থাকেন রনি।

আর্তনাদ করে বলতে থাকেন, ‘আমার কোল থেকে পড়ে গেল রুশদী, ওকে বাঁচাতে পারলাম না।’

গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে রাজধানীর ইস্কাটনের দিলু রোডের ৪৫/এ নম্বর বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডে রুশদীসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহত অন্য দুজন হলেন- আবদুল কাদের লিটন (৪০) ও আফরিন জান্নাত যুঁথি (১৭)। নিহত রুশদীর বাবা-মাও মারাত্মক দগ্ধ হয়েছেন। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এছাড়া ধোঁয়ায় অসুস্থ হওয়া চারজন এবং আতঙ্কে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে গিয়ে আহত একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা এরশাদ হোসাইন জানান, ভোর সাড়ে ৪টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের নয়টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আধ ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ৫টা ৬ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

পুরোপুরি নেভানোর পর উদ্ধারকর্মীরা ওই ভবন থেকে এক শিশুসহ তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার করেন। এদের মধ্যে আবদুল কাদের লিটনের (৪০) মৃতদেহ পাওয়া যায় গ্যারেজে। এছাড়া এক শিশুসহ দুজনের মৃতদেহ ছিল তিনতলার সিঁড়িতে। তিনি বলেন, আগুনে ওই বাড়ির গ্যারেজে থাকা পাঁচটি গাড়ি পুড়ে গেছে। তবে কীভাবে সেখানে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। এই প্রেক্ষাপটে অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধন।

ভবনের কেয়ারটেকার লুৎফর রহমান জানান, নিচতলায় গ্যারেজের সামনের দিকে বিদ্যুতের সুইচ বোর্ড বিস্ফোরিত হলে প্রথমে একটি গাড়িতে আগুন ধরে যায়। দ্রুত আরো চার-পাঁচটি গাড়ি ও মোটরসাইকেলে ছড়িয়ে পড়লে আগুনের তীব্রতা বেড়ে যায়। এরপরই উপরের তলায় ছড়িয়ে পড়ে আগুন।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনিস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, দগ্ধদের মধ্যে শহিদুল কিরমানি রনির শরীরের ৪৩ শতাংশ ও জান্নাতুলের শরীরের ৯৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাদের শ্বাসনালিও পুড়ে গেছে। দুজনের অবস্থাই গুরুতর। এই অবস্থা থেকে রিকোভারি করা সম্ভাবনা খুব কম থাকে। তবুও আমরা আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। এছাড়া আগুনের ধোঁয়ায় আহত কাঁচামাল ব্যবসায়ী মনির হোসেন (৪০), তার স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার (৩০), দুই ছেলে মাহমুদুল হাসান (৯) ও মাহাদি হাসান রিফাত (৯) প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।

নিহত লিটনের শ্যালক জহির আলম ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে সাংবাদিকদের বলেন, লিটনের বাড়ি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার পশ্চিম নন্দনপুর গ্রামে। দুই সন্তানের জনক তিনি। থাকতেন দিলু রোডের ওই বাসার নিচতলায় গ্যারেজের পাশের একটি রুমে। ওই ভবনের দ্বিতীয় তলার ‘ক্লাসিক ফ্যাশন ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি বায়িং হাউসের অফিস সহকারী হিসেবে ৮/১০ বছর ধরে চাকরি করতেন। আগুনের ধোঁয়ায় দম আটকে মৃত্যু হয়েছে তার। পরে ফায়ার সার্ভিস তার লাশ উদ্ধার করে।

নিহত শিশু এ বি এম রুশদীর মামা শাহাদাত হোসেন বিপ্লব কাঁদতে কাঁদতে বলেন, রুশদীদের গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর শিবপুরে। তার বাবা রনি পুলিশ প্লাজায় ভিআইভিপি এস্টেট ম্যানেজমেন্ট নামে একটি কোম্পানির ফাইন্যান্স ম্যানেজার। আর মা জান্নাত বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের অর্থ বিভাগে চাকরি করেন। সর্বনাশা আগুন ছোট্ট সুখী পরিবারটিকে তছনছ করে দিল।

নিহত অন্যজন আফরিন জান্নাত যুঁথি ভিকারুন নিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। তার বাবা জাহাঙ্গীর আলম পূর্ত ভবনের প্রশাসনিক সেকশনে চাকরি করেন। পরিবার নিয়ে ওই ভবনের ছাদের ফ্ল্যাটে বসবাস করেন।
চাচা মো. সুরুজ্জামান জানান, আগুন লেগেছে এই আতঙ্কে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল যুঁথি। এ সময় আগুনে পুড়ে মারা যায় সে। উপর থেকে বাইরে দিয়ে গ্রিল বেয়ে নামতে গিয়ে সামান্য আহত হন তার বাবা ও ভাই। একইভাবে নামার সময় পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন যুঁথির মা। পা ও কোমরের হাড় ভেঙে যাওয়ায় তাকে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

হাতিরঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) খন্দকার সেলিম শাহরিয়ার জীবন স্টালিন বলেন, নিহত তিনজনের মধ্যে শিশুসহ দুজনের শরীর এতটাই পুড়ে গেছে যে তাদের শনাক্ত করা কঠিন। তাই ফরেনসিক বিভাগকে ওই দুজনেরই ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের জন্য নমুনা সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। আবদুল কাদের লিটন নামের একজনের শরীর পোড়েনি। সম্ভবত ধোঁয়ায় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে তিনি মারা গেছেন।

এসআর
বিষয়: