সবার নজর উচ্চ আদালতের দিকে

আগের সংবাদ

অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে গোয়েন্দারা

পরের সংবাদ

ওয়েস্টিনে এসব কি!

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২০ , ১০:০১ পূর্বাহ্ণ

নানাবিধ বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম পাঁচ তারকা হোটেল ওয়েস্টিন। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই সেখানে অবাধে চলছে অপকর্ম। বিতর্কিত ব্যক্তি ও অপরাধীদের আনাগোনা থাকলেও নেই কোনো বিধিনিষেধ। দেশি-বিদেশিদের অবাধ আসা-যাওয়ার মধ্যে ‘অপকর্মের ডিল’ হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রয়েছে নীরব। এমনকি বিদেশি তরুণীদের এনে রুম ও স্যুট ভাড়া করে রেখে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের জমজমাট বাণিজ্যতেও বাধা নেই। নিয়ম না মেনে রুম ভাড়া দেয়ায় অসামাজিক কর্মকাণ্ড ওপেন সিক্রেট হলেও নেই কোনো তদারকি। সর্বশেষ নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ বিমানবন্দরে র‌্যাবের হাতে আটকের পর র‌্যাব-পুলিশের তদন্তে ওয়েস্টিন হোটেল অপকর্মের ঠিকানা হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সুইমিংপুলে ডুলুডুলু চোখে ৬ নারীর জলকেলির ভাইরাল হওয়া ভিডিওর পর প্রশ্ন উঠেছে ওয়েস্টিনে এসব কি হয়? তবে এসব নিয়ে ওয়েস্টিনের কোনো পর্যায়ের কর্মকর্তা এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হোটেলটির দিনের চিত্র এক রকম। সন্ধ্যা হতেই বদলে যায় এর ভেতরকার দৃশ্যপট। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই ঢাকার অভিজাত এলাকা খ্যাত, গুলশান, বনানী, বারিধারার ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানদের ঠিকানা হয়ে উঠে ওয়েস্টিন। পাঁচ তলায় সুইমিং পুল ও বারের পাশে অনুমোদনহীন সিসা বারে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে আড্ডা। সরকারের অনেক মন্ত্রী, সাংসদ, শীর্ষ ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক নেতারা অন্যের নামে মাসের পর মাস সেখানে রুম ও স্যুট ভাড়া নিয়ে অপকর্ম করে এলেও বাদ সাধছে না কেউ। অথচ তারকা এই হোটেলে বর্ডারদের প্রতিদিনকার তালিকা সংশ্লিষ্ট থানায় অবগত করার নিয়ম রয়েছে। আবার গোয়েন্দারা সার্বক্ষণিক সেখানে নজরদারি করলেও অপকর্মের ব্যাপারে নেই কোনো বিধিনিষেধ।
জনশ্রুতি রয়েছে, ওয়েস্টিনে টাকা হলে সেখানে সব মিলে। মদ-নারী সম্মিলনে অভিজাত এই হোটেলে আলো-আঁধারির খেলায় ধনাঢ্যদের অবাধ আনাগোনা ও যাতায়াত থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেদিকে গা করে না। রাত যত গভীর হয়, জমে উঠে উন্মাদনার আসর। সুইমিং পুলে গানের তালে তালে চলে জলকেলি। রয়েছে মনোরঞ্জনের সব ধরনের আয়োজন। সেখানে লোকজনকে নিমন্ত্রণ করে ডেকে নিয়ে কৌশলে ফাঁদ পেতে অসামাজিক কার্যকালাপে জড়িয়ে গোপনে ধারণ করা হয় এর ভিডিও। পরে প্রতারণার মাধ্যমে তার কাছ থেকে আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা। এমন অভিযোগও ভূরি ভূরি।
এদিকে পাপিয়া দম্পতি আটকের পর তাদের অপকর্মের হেডকোয়ার্টার হিসেবে আলোচনায় এসেছে ওয়েস্টিন হোটেলের বিলাসবহুল স্যুট। পাপিয়া ও তার স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে র‌্যাব সেখানে অভিযান চালালেও অবৈধ অস্ত্র, জালটাকা, জাল বৈদেশিক মুদ্রা উদ্ধারের ঘটনায় রাজধানীর বিমানবন্দর ও শেরেবাংলা নগর থানায় তিনটি পৃথক মামলা রুজু হলেও কোথাও নেই ওয়েস্টিনের নাম। অথচ পাপিয়াকাণ্ডে অভিযানের অংশ হিসেবে র‌্যাব ওয়েস্টিনের স্যুটেও তল্লাশি চালায় এবং তদন্ত কাজে স্যুটটি কয়েক ঘণ্টা ছিল র‌্যাবের কব্জায়।
গতকাল বুধবার বিকেলে সরেজমিন গুলশান-২ নম্বরের ৪৫ নম্বর সড়কে ১ নম্বর প্লটে অবস্থিত তারকা হোটেল ওয়েস্টিনের একাধিক ফ্লোর ঘুরে দেখা গেছে অনেকটা নীরবতা। সুইমিং পুল, বার ছিল অনেকটা ফাঁকা। হোটেলের পূর্ব পাশে পথচারী চলাচলের ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে হোটেলে গাড়িযোগে প্রবেশ পথ। ভবনটি ২৩ তলা বলা হলেও মূলত তা ২৭ তলা। ভবন নির্দেশিকা মতে, টপফ্লোরে রেস্টুরেন্ট, বার ও বেলকুনিতে কফি শপ। নিচতলায় স্ন্যাকস বার-মদের বার। দোতলায় একই ব্যবস্থা। পাঁচতলায় স্পা, মেসেজ পার্লার ও সুইমিং পুল। ২১ ও ২২ তলায় প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট। লেভেল-২২ এ ১ হাজার ৪১১ বর্গফুট জায়গাজুড়ে বিলাসবহুল প্রেসিডেনসিয়াল স্যুট। হোটেল স্টাফরা জানিয়েছেন, সেখানে গত বছরের ১২ অক্টোবর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ২০ দিন ছিলেন। এ ছাড়া গত ৫ জানুয়ারি থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ওই হোটেলে অবস্থান করছিলেন তিনি। ২২ ফেব্রুয়ারি বিমানবন্দরে আটকের সময়ও তার নামে স্যুট বুকিং ছিল।
পরিচয় গোপন করে আলাপকালে হোটেলের একাধিক স্টাফ জানান, তারা পাপিয়াকে ভালো করেন চেনেন। দিন-রাত তার কাছে অনেক লোক আসত। যার অধিকাংশ পুরুষ এবং দেশের চেনা মুখ। অনেকে ব্যবসায়ী, অনেকে রাজনৈতিক নেতা। সুইমিং পুল, স্পা ও মেসেজ পার্লারে তার অবাধ যাতায়াত ছিল। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হোটেলের ফ্লোরগুলো জমজমাট থাকে দাবি করে পাঁচতলার একজন নিরাপত্তাকর্মী জানান, লোকজন ইচ্ছামতো তাদের আড্ডা সাজিয়ে নেয়। নাচ-গানে ভরপুর থাকে আয়োজন। বিদেশি তরুণীরা জমায় আসর। তবে পাপিয়াকাণ্ডের পর সেখানে চলছে রাখঢাক। সিসা বার বন্ধ রয়েছে। নিয়মিত আসতেন ধনাঢ্য পরিবারের এমন সন্তানদের আনাগোনা কমে গেছে বলে জানা গেছে।
অপর একটি সূত্রের দাবি, বিভিন্ন সময়ে ওই হোটেলে একাধিক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। শীর্ষ দুজন শিল্পপতির সন্তানদের মধ্যে সেখানে মারামারির ঘটনাও এক সময় আলোচিত ছিল।
অন্যদিকে পাপিয়াকে আটকের পর র‌্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পাপিয়া ওরফে পিউ ও তার স্বামী সুমন চৌধুরীর দেওয়া তথ্য মতে, ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকাল আনুমানিক ৪টার সময় হোটেল ওয়েস্টিনে তাদের নামে বুকিংকৃত বিলাসবহুল প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট রুম থেকে এবং ফার্মগেট এলাকার ২৮নং ইন্দিরা রোডস্থ ‘রওশন’স ডমিনো রিলিভো’ নামের বিলাসবহুল ভবনে তাদের দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, ৫ বোতল বিদেশি মদ ও নগদ ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, ৫টি পাসপোর্ট, ব্যাংকের ৩টি চেক, কিছু বিদেশি মুদ্রা, বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি ভিসা/এটিএম কার্ড উদ্ধার করা হয়। সর্বশেষ গত বছরের ১২ অক্টোবর থেকে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাপিয়া দম্পতি বিভিন্ন মেয়াদে মোট ৫৯ দিন হোটেল ওয়েস্টিনের কয়েকটি বিলাসবহুল রুমে অবস্থান করে এবং আনুষঙ্গিক খরচসহ সর্বমোট ৮১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ টাকা ৩১ পয়সা নগদ প্রদান করেছে বলে র‌্যাব নিশ্চিত করেছে।
অবশ্য র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল শাফী উল্লাহ বুলবুল গতকাল বলেছেন, হোটেল স্যুটে অভিযানে কিছু পাওয়া যায়নি। সব কিছু নিয়ে পাপিয়া ও তার স্বামী আগেই বের হয়ে গিয়েছিল।
জাল মুদ্রাসংক্রান্ত মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) কায়কোবাদ কাজী নিশ্চিত করে বলেছেন, এজাহারে কোথাও ওয়েস্টিন হোটেলের কথা উল্লেখ নেই। সেখান থেকে কিছু পাওয়া গেছে এমন কিছুই নেই এজাহারে। ১৫ দিনের রিমান্ডে পাপিয়া দম্পতিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে কথা বলতে দি ওয়েস্টিন ঢাকার বিক্রয় বিশেষজ্ঞ মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে গতকাল রাতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। মার্কেটিং কমিউনিকেশন বিভাগের সহকারী পরিচালক সাদমান সালাউদ্দিনের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

ডিসি