পিতার প্রতিকৃতির সামনে কন্যার সেলফি

আগের সংবাদ

জয়ে ফেরার মিশনে শুরুতেই উইকেট পেল টাইগাররা

পরের সংবাদ

বাতাসে ষড়যন্ত্রের গন্ধ!

সমরেশ বৈদ্য

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২০ , ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২০ , ১:০৪ অপরাহ্ণ

আসন্ন সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সব প্রভাবশালী নেতাই প্রকাশ্যে ‘ঐক্য’ ও দল মনোনীত প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীকে যে কোনো মূল্যে বিজয়ী করার কথা বলছেন। কিন্তু এসব নেতারাই কেউ কেউ আবার নিজের বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র’ দেখছেন। সভা-সমাবেশে প্রকাশ্যেই ‘আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড’, ‘অপরাজনীতির শিকার হয়েছি’- এ ধরনের মন্তব্য করছেন। পাশাপাশি এমনো বলেছেন, ‘কেউ যদি এসে আমাকে বলতেন, মেয়র পদ থেকে সরে যাও, আমি ছেড়ে দিতাম..’ প্রভৃতি। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নেতারা ওপরে ওপরে ঐক্যের কথা বললেও ভেতরে এখনো অনৈক্য কাজ করছে। নেতাদের এমন মন্তব্যে নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন লীগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নেতাকর্মীরা। সব বিভেদ ভুলে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার মনোনীত প্রার্থীকে জয়ী করার জন্য ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তারা। মুখে ‘ঐক্য’ আর ভেতরে ‘ষড়যন্ত্রের’ গন্ধ খোঁজা বিরোধী শিবিরকে শক্তিশালী করবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন অন্তত ২০ নেতা। এর মধ্যে বর্তমান মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন, সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান ও নগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালাম, সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির মতো শক্তিশালী নেতা ছিলেন মনোনয়ন দৌড়ে। ছিলেন ব্যবসায়ী নেতা চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলমও। মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রেজাউল করিম মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেও তেমন একটা আলোচনায় ছিলেন না তিনি।

কারণ রাজনৈতিক জীবনে অধিকাংশ সময় পাদপ্রদীপের আড়ালেই থেকেছেন রেজাউল। ফলে দলীয় সভানেত্রীর সভাপতিত্বে সেই মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে যখন প্রচারবিমুখ রেজাউল করিম চৌধুরীর নামটি ঘোষিত হলো, স্বাভাবিকভাবেই হেভিওয়েট প্রার্থীদের কেউ কেউ চরম হতাশ হন।

চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সাবেক তিনবারের মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর দীর্ঘদিনের অনুসারী হিসেবেই পরিচিত রেজাউল করিম চৌধুরী। তাকে তাই খুব একটা ভালোভাবে নিতে পারেননি মহিউদ্দিন চৌধুরী লবির বিরোধী পক্ষ। দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন গত ২০ ফেব্রুয়ারি থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আওয়ামী লীগের এক সমাবেশে বলেন, ‘আত্মঘাতী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত যারা আছেন, তাদের বলছি রাজনীতি বোঝার, শেখার চেষ্টা করুন। আজকের দিনটিই কিন্তু শেষ দিন নয়, আরো দিন আছে।’ তিনি দলের নীতি-আদর্শকে ধারণ করে সংগঠনের ভাবমূর্তি রক্ষা করে প্রধানমন্ত্রীর হাতকে শক্তিশালী করতে যার যার অবস্থান থেকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান ওই বৈঠকে।

এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময়কালে মেয়র পদে মনোনয়ন না পাওয়ায় কোনো হতাশা নেই দাবি করলেও বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ‘মিথ্যাচার-অপরাজনীতি-অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের শিকার’ হয়েছেন বলে মন্তব্য করেন। এমনকি তিনি কারো নাম উল্লেখ না করে বলেন- ‘কেউ যদি এসে আমাকে বলতেন, মেয়র পদ থেকে সরে যাও, আমি ছেড়ে দিতাম। গতবারও যে প্রধানমন্ত্রী মেয়র পদে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন, আমি কী চেয়েছি? আমি কী বলেছিলাম? আমি মেয়রের মনোনয়ন পেতে কোনো লবিং-তদবির করি নাই।’

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী-সমর্থকরা বলছেন, বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন যেসব মন্তব্য করেছেন তা কাকে বা কাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলছেন তা যারা বোঝার বুঝে গেছেন। প্রসঙ্গত গত ২০ ফেব্রুয়ারি মেয়র নাছির উদ্দীন আগামী নির্বাচনে দলীয় মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিমকে সঙ্গে নিয়ে কয়েকজন প্রয়াত শীর্ষস্থানীয় নেতার কবর জিয়ারতসহ সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাসায়ও যান। এমনকি গতকাল ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি বর্তমান ভ‚মিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পিতা ও আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য আখতারুজ্জামান চৌধুরীর বাড়ি আনোয়ারায় গিয়ে তার কবরও জিয়ারত করেছেন রেজাউল করিম চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে।

এদিকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ফিরে রেলওয়ে স্টেশনে দলীয় নেতাকর্মীদের সংবর্ধনার জবাবে বলেন, এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ১৭ বছর চট্টগ্রামবাসীর সেবা করেছেন এবং বাংলাদেশে একটা মডেল সিটি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তারপর ৫ বছর আমাদের হাতে ছিল না সিটি করপোরেশন। আবার ২০১৫ সালে এই করপোরেশন আমাদের হাতে এসেছে। বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির ও প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরী যে উন্নয়ন করেছেন আমিও ইনশাল্লাহ আপনাদের ভোটে মেয়র নির্বাচিত হতে পারলে সেই ধারা বহমান রাখব।’ তার বক্তব্যে প্রয়াত মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রতিই বেশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। মহিউদ্দিন চৌধুরী বিরোধী পক্ষ এটিকে ভালোভাবে নেয়নি।

অবশ্য গত ২০ ফেব্রুয়ারি টিআইসিতে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনসহ অন্য নেতাদের উপস্থিতিতেই রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন ‘আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্যরা যে কোনো সংকটময় মুহূর্তে ঐক্যবদ্ধ হয়ে, যে কোনো অপশক্তির মোকাবিলা অতীতেও করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। এই পরিবারের অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শত্রু কিন্তু ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে। শত্রুকে মোকাবিলার জন্য ঐক্যবদ্ধ ও প্রস্তুত থাকতে হবে। যতই কথা বলেন, আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় না থাকে কারোই অস্তিত্ব থাকবে না, কোনো নেতারও অস্তিত্ব থাকবে না। রেজাউল করিম চৌধুরী কিংবা আরো বড় নেতা- কারো অস্তিত্ব থাকবে না। জাতি ও রাষ্ট্রের অস্তিত্বের স্বার্থে যে কোনো কিছুর মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের বশ কয়েকজন ত্যাগী ও রাজপথে থাকা নেতাকর্মী বলেছেন, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হচ্ছে এবং সভানেত্রী নিজে নানা ধরনের যাচাই-বাছাই করে রেজাউল করিম চৌধুরীকে মেয়র পদে মনোনয়ন দিয়েছেন। তাই সেক্ষেত্রে সবাইকেই সংযত আচরণ করা প্রয়োজন। সেখানে ‘ষড়যন্ত্র’, ‘আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড’, ‘অপরাজনীতির শিকার হয়েছি’- এ ধরনের মন্তব্য থেকে বিরত থাকা আওয়ামী লীগের জন্য মঙ্গলজনক। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজনের মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, নির্বাচনে ভোটার ও আওয়ামী লীগ সমর্থকরা সব ধরনের মান-অভিমান ভুলে নৌকার পক্ষে এক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন এমন দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে আমার।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়