না ফেরার দেশে অভিনেতা তাপস পাল

আগের সংবাদ

রিয়াদে প্রকাশ্যেই ধূমপান করছেন সৌদি নারীরা

পরের সংবাদ

বাস্তবে নয়, কাগজে কমেছে খেলাপি ঋণ

মরিয়ম সেঁজুতি

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২০ , ১০:১৫ পূর্বাহ্ণ

বিশ্ব ব্যাংকের হিসাবে ঋণ খেলাপিতে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে বাংলাদেশ। পুনঃতফসিলে তিন মাসে কমেছে ২২ হাজার কোটি টাকা। এক বছরে খেলাপি বেড়েছে ৪২০ কোটি টাকা।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি, ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছে ভুটান ও আফগানিস্তান, যাদের খেলাপি ঋণের হার যথাক্রমে ১০ দশমিক ৯ ও ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। নানা সুবিধা দিয়েও দেশের ব্যাংকগুলো ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে কোনোভাবেই পাওনা টাকা আদায় করতে পারছে না। অবশেষে গত বছরের সেপ্টেম্বরে খেলাপি আইন শিথিল, অবলোপন নীতিমালায় ছাড়, গণছাড়ের আওতায় পুনঃতফসিল, স্বল্প সুদের ঋণের ব্যবস্থাসহ বিশেষ সুবিধা দেয়া হয় ঋণখেলাপিদের। এসব ছাড় নিয়ে অর্ধ লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এতে করে বছর শেষে অর্থমন্ত্রীর কথার কিছুটা রক্ষা হয়েছে। তবে তা কাগজে-কলমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, তিন মাসের ব্যবধানে ২২ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমিয়ে ফেলেছে ব্যাংকগুলো।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃত খেলাপি ঋণ এর চেয়ে অন্তত কয়েক গুণ বেশি। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ ১১ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকাই খেলাপি হয়ে গেছে। মূলত গত বছরের ব্যাপক হারে পুনঃতফসিল সুবিধা দেয়ায় প্রথমবারের মতো বেসরকারি ব্যাংকগুলোর তুলনায় এবার সরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমেছে।

দীর্ঘদিন ধরেই দেশের ব্যাংকিং খাতে নানা সমস্যা বিরাজ করছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো উচ্চ খেলাপি ঋণ। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকিং খাতে নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেই ঝুঁকিপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করছে। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপির প্রভাব পড়ছে ঋণ ব্যবস্থাপনায়। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, ছাড় দিয়ে পুনঃতফসিল ও অবলোপনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানো হয়েছে। এটা মোটেই স্বাভাবিক পর্যায়ে আসেনি। ২২ হাজার কোটি টাকা খেলাপি কম হয়েছে। কিন্তু পুনঃতফসিল হয়েছে পায় অর্ধ কোটি টাকার বেশি। এগুলো এক ধরনের হোয়াইট ওয়াশ করা হয়েছে। পুনঃতফসিল করে খেলাপি ঋণের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হলো। কিন্তু আদতে খেলাপি ঋণ আদায় হচ্ছে না।

অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, পুনঃতফসিলের পরও এ খেলাপি ঋণ আদায় হয়নি। বরং আবার খেলাপি হয়েছে। এটা পরিতোষের কোনো বিষয় নয়। এতে ব্যাংকের সাময়িক লাভ হলেও কাঠামোগত দুর্বলতা থেকেই যাচ্ছে। খাতা-কলমে খেলাপি ঋণ কম দেখানো যাচ্ছে কিন্তু অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলো আরো প্রবল হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রকৃত অর্থে খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য অনাদায়ী ঋণের আদায় বাড়াতে হবে। আর যারা ঋণের টাকা আত্মসাৎ করেছেন তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে হবে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই বলে আসছেন, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ আর বাড়বে না। কয়েকবারই এ কথা বলেছেন তিনি। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে উল্টোটা। যেমন ২০১৮ সাল শেষে যেখানে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। ২০১৯ সাল শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১ বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪২০ কোটি টাকা। এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো অনেক বেশি।

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০১৯ সালের প্রাক্কলিত হিসাব অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশেই খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছে ভুটান ও আফগানিস্তান, যাদের খেলাপি ঋণের হার যথাক্রমে ১০ দশমিক ৯ ও ১০ দশমিক ৮ শতাংশ।

প্রতিবেদনে অবশ্য বলা হয়েছে, শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থাই খারাপ। গত ছয় মাসে অবস্থা খারাপ হয়েছে। দেশগুলোর আর্থিক খাত এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। যে কারণে বিনিয়োগকারী ও ভোক্তাদের আস্থা কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যক্তিপর্যায়ের ভোগ ও বিনিয়োগ কমছে। বিশ^ব্যাংকের ধারণা, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে ঝুঁকি আরো বাড়বে। ঝুঁকির মূল কারণগুলো হচ্ছে- আর্থিক খাতের দুরবস্থা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংস্কারের ধীরগতি। ভারত ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক উত্তেজনা কমে এলেও তা যদি আবারো বাড়ে, তাহলে এই অঞ্চলের বিনিয়োগ ব্যাহত হবে।

ব্যাংকিং খাত নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা ঝুঁকিসহন ক্ষমতা যাচাই (স্ট্রেস টেস্ট) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মুহূর্তে অভিঘাত সামলানোর মতো অবস্থায় নেই ব্যাংক খাত। বড় ধরনের ধাক্কা এলে ব্যাংক খাতের মূলধন সংরক্ষণের হার ঋণাত্মক ৭ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে যাবে। এ ধাক্কা মাঝারি মানের হলে মূলধন সংরক্ষণের হার এক শতাংশের নিচে অর্থাৎ শূন্য দশমিক ৭ শতাংশে নেমে যাবে। আর এ ধাক্কা ন্যূনতম হলেও মূলধন সংরক্ষণের হার সোয়া ৮ শতাংশে নেমে যাবে।

এতে আরো বলা হয়, দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, বড় অভিঘাত এলে অর্থাৎ খেলাপি ঋণ ১৫ শতাংশ বাড়লে ন্যূনতম মূলধন তথা ১১ দশমিক ৬৫ শতাংশ হারে মূলধন সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হবে দেশের ৩৪টি সরকারি ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। মাঝারি অভিঘাত অর্থাৎ খেলাপি ঋণ ৯ শতাংশ বাড়লেও ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হবে ৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক।

সোমবার প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ ১১ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকাই খেলাপি হয়ে গেছে। মোট ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। তবে গত সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ১৬ হাজর ২৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ২২ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমিয়ে ফেলেছে ব্যাংকগুলো। তবে আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে ৪২০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, সরকার দীর্ঘদিন থেকে একক অংকে খেলাপি ঋণ আনতে চেষ্টা করেছেন। এবার সফল হয়েছেন। সরকার শুধু খেলাপিদের বিশেষ সুবিধাই দেয়নি, তারা খেলাপি ঋণ আদায়ে ক্যাশ রিকভারিও করেছে। তিনি বলেন, সরকারের নানা উদ্যোগ ও ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার করায় খেলাপি ঋণ কমে এসেছে। ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ, আগের প্রান্তিকে, যা ছিল ১১ দশমিক ৯৯। এ খেলাপি ঋণ কমাতে বিশেষ ছাড়ে পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট সুবিধা কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

সূত্র জানায়, গত বছরের শুরুতে নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে খেলাপি ঋণ এক টাকাও বাড়বে না বলে ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ জন্য প্রথমে আন্তর্জাতিক মানের খেলাপি নীতিমালায় শিথিলতা আনা হয়। আগে ৩ মাস অনাদায়ী থাকলেই তা খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করতে হতো। এটি সংশোধন করে ৬ মাস এবং সর্বোচ্চ ১২ মাস করা হয়। অন্যদিকে খেলাপিদের গণছাড় দিতে বিশেষ পুনঃতফসিল নীতিমালা জারি করা হয়।

গত বছরের মে মাসে জারি করা এক সার্কুলারে বলা হয়, ঋণখেলাপিরা মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের মেয়াদে মাত্র ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। আবার নতুন করে যারা ঋণ নেবেন তাদের জন্য নয়-ছয় জোর করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ইতোমধ্যে আমানতকারীদের সুদহার ৬ এবং ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমের সুদহার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। গণছাড়ের আওতায় ১৫ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ নবায়ন করেছে ব্যাংকগুলো। যার অর্ধেকই করেছে সরকারি ব্যাংকগুলো। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিয়েও গত বছর বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৫২ থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর বাইরে বিপুল পরিমাণ ঋণ অবলোপন করেছে ব্যাংকগুলো। তবে পুনঃতফসিল ও অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ এখনো জানা যায়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি ৬ বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিতরণ করা ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ২৪ শতাংশ বা ৪৩ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। আগের বছর ১ লাখ ৬২ হাজার ৫২০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণ ছিল ৪৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। গত বছর শেষে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ৪৪ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা, যা তাদের বিতরণকৃত ৭ লাখ ৬৩ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা ঋণের ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। আগের বছর খেলাপি ঋণ ছিল ৩৮ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। অনেক বছর ধরেই খাতওয়ারী হিসেবে সরকারি ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণ বেশি ছিল। কিন্তু গত বছর বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি হয়েছে।

বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ২ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। সরকারি মালিকানাধীন বিশেষায়িত তিন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ হাজার ৫৯ কোটি টাকা; আগের বছর যা ছিল ৪ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা।

এমএইচ