বিক্রিতে সেরা ‘আমার দেখা নয়াচীন’

আগের সংবাদ

বিদেশ থেকে ফিরছে শ্রমিক

পরের সংবাদ

চসিক নির্বাচন

১১ কারণে বাদ নাছির

প্রীতম দাশ

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২০ , ৯:৪৯ পূর্বাহ্ণ

বাদ পড়লেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলেন না তিনি। নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার স্বপ্নও পূরণ হলো না তার। নাছিরকে টপকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলেন নগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম চৌধুরী। আর দলীয় মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই চট্টগ্রাম নগরসহ দেশজুড়ে এ নিয়ে চলছে নানামুখী আলোচনা। কেন বাদ পড়লেন নাছির? মেয়র হিসেবে তার ব্যর্থতা-নাকি দলীয় সাংগঠনিক কাজে ব্যর্থতা? এসব প্রশ্নের জবাব নিয়েও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। আর এসব বিশ্লেষণে অন্তত ১১টি কারণ বেরিয়ে এসেছে। সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে দলীয় শৃঙ্খলার বিষয়টি। এসেছে নাছিরের নিজস্ব বলয়ের সমালোচনাও। অন্যদিকে দলীয় আনুগত্য এবং দলের প্রতি নিবেদিত থাকার পুরস্কার পেয়েছেন রেজাউল করিম।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েকটি উদ্যোগের জন্য মেয়র নাছির প্রশংসিত হলেও স্থানীয় রাজনীতিতে বিরোধ ও জলাবদ্ধতা দূরসহ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচিত হন নাছির। এছাড়া প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা, নেতাকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব, বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে জটিলতা, গৃহকর বাড়ানোর চেষ্টা, সৌন্দর্যবর্ধনের নামে বাণিজ্য, সড়কের দুরবস্থা, নিজের অনুসারী কাউন্সিলরদের অপকর্মসহ নানা কারণে সমালোচিত হন তিনি। এছাড়া ওয়াইফাই জোন নির্মাণ, কর্ণফুলী রক্ষা, তথ্য প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা, শিক্ষার্থীদের বাস ভাড়ায় ভর্তুকি, নারীদের জন্য আলাদা বাস চালু ও আবাসন সংকট নিরসনসহ নানা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি। অন্যদিকে কর্ণফুলীর তীরে মৎস্য অবতরণকেন্দ্র ও আউটার স্টেডিয়ামের মাঠে সুইমিং পুল নির্মাণ নিয়েও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ান তিনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে তিনি কার্যকর উদ্যোগ নেননি। এর ফলে জলাবদ্ধতা নিরসনে চসিককে বাদ দিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (সিডিএ) ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয় সরকার। এতে সিডিএর তৎকালীন চেয়ারম্যান ও নগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালামের সঙ্গে তার দূরত্ব সৃষ্টি হয়।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব এবং সিনিয়র নেতাদের মূল্যায়ন না করার অভিযোগও রয়েছে নাছিরের বিরুদ্ধে। এছাড়া দীর্ঘদিন নগর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেয়া এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে আ জ ম নাছিরের বিরোধের কারণেও তিনি মনোনয়ন বঞ্চিত হতে পারেন। মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর নাছিরের কারণে তার অনুসারীরা কোণঠাঁসা হয়ে পড়েন। সর্বশেষ একটি অনুষ্ঠানে মহিউদ্দিনপত্নী হাসিনা মহিউদ্দিনকে মঞ্চ থেকে অশোভনভাবে নামিয়ে দেয়ার বিতর্ক সেই দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্য রূপ দেয়। চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় দুই সাংসদ শামসুল হক ও এম এ লতিফের সঙ্গে বিরোধে জড়ান নাছির।

‘সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের’ নামে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ফুটপাত দখল করে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে আ জ ম নাছিরের বিরুদ্ধে। নাছিরপন্থি কাউন্সিলরদের নানা অপকর্মও তাকে সমালোচিত করে। গৃহকর বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেও মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরোধিতা এবং নাগরিক আন্দোলনের চাপে সরে আসতে বাধ্য হন নাছির।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মেয়র ও দলের শীর্ষ পদে থেকেও অন্তত অর্ধশতাধিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে সিটি করপোরেশনের কাজে স্থবিরতা আসে। তিনি চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির সভাপতি, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সহসভাপতিসহ অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের দায়িত্বেও ছিলেন। এক সঙ্গে এত বেশি কমিটির দায়িত্বে থাকার কারণে মেয়র হিসেবে তিনি কাক্সিক্ষত সফলতা দেখাতে পারেননি।

দায়িত্ব পালনকালে চট্টগ্রাম নগরীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নির্মাণকাজে দীর্ঘসূত্রতা ও এসব কাজ শেষ করতে না পারার ব্যর্থতাও মেয়র নাছিরের বাদ পড়ার একটি কারণ। চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান দুটি সড়ক পোর্ট কানেকটিং রোড ও আগ্রাবাদ এক্সেস রোড ২০১৭ সালের শেষের দিকে সম্প্রসারণ ও সংস্কার কাজ শুরু করে চসিক। ২০১৯ সালের মে মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত এই দুই সড়কের বেশিরভাগ কাজই বাকি। একই দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে আরাকান সড়কের বহদ্দারহাট থেকে মোহরা অংশেও। প্রায় সাড়ে তিন বছর টানা ভোগান্তির পর গত বছরের জুলাই থেকে এই সড়কের সংস্কার কাজ শুরু করে চসিক।

মেয়র ঘনিষ্ঠ কাউন্সিলরদের মধ্যে কয়েকজন সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজি, ফুটপাত দখল এবং স্থানীয় রাজনীতির বিরোধ নিয়ে নিয়মিত বিরোধী পক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। গত চার বছরে যুবলীগ-ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ দ্ব›দ্ব ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দশটিরও বেশি খুনের ঘটনা ঘটে। এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে নাছির ছিলেন নীরব। অধিকাংশ বিরোধের ঘটনা তার অনুসারীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফল। এসব ঘটনায় নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিবেশকেও বারবার অস্থিতিশীল করে তোলে।

নগর আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলী ও সম্পাদকমণ্ডলীর একাধিক সদস্য ভোরের কাগজকে বলেন, সিটি করপোরেশনের দৈনন্দিন কাজ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সমাধানে যে ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে আগানো উচিত ছিল তা তিনি করতে পারেননি। এ কাজে দলীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করলে মেয়র হিসেবে তিনি অনেক বেশি সফল হতেন।

এসব বিষয় বিবেচনার পাশাপাশি দলের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কর্মী এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে রেজাউল করিম চৌধুরীকে বেছে নেন দলীয় সভানেত্রী। ছাত্রলীগ-যুবলীগ, নাগরিক সংগঠন এবং মহানগর আওয়ামী লীগের গত প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে পদ ব্যবহার করে সুবিধা আদায় বা দলে গ্রুপিংকে মদদ দেয়ার কোনো অভিযোগ নেই। এই মুক্তিযোদ্ধা নীরবে দলের জন্য কাজ করেছেন। নাছিরের নেতিবাচক ভাবমূর্তির বিপরীতে তৃণমূলের এই নেতা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি সিটি নির্বাচনে দলীয় নেতাকর্মী ও ভোটারদের কেন্দ্রমুখী করতে ভূমিকা রাখবে- এমন বিবেচনাও ছিল দলীয় হাইকমান্ডের।

ইতোমধ্যে পদে থাকা মেয়র নাছির উদ্দিন, সাবেক সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম ও সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজনসহ মনোননয়ন দৌড়ে থাকা শীর্ষ নেতারা রেজাউল করিম চৌধুরীর সমর্থন জানিয়ে তাকে বিজয়ী করতে মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। আর মনোনয়ন পেয়ে রেজাউল করিমের দলীয় সভানেত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকা এবং মহিউদ্দিন চৌধুরীর পথ অনুসরণের ঘোষণা মহানগর আওয়ামী লীগের সব পক্ষকে নির্বাচনমুখী করেছে।

চসিক নির্বাচনে মেয়র পদে রেজাউল করিম চৌধুরীকে দলীয় মনোনয়ন দেয়ার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, নেত্রীর সিদ্ধান্ত শিরোধার্য। আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী একজন যোগ্য প্রার্থী। তার জয় সুনিশ্চিত করতে মহানগর আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে। প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই এ কারণে যে, মেয়র নির্বাচনের জন্য তিনি রাজনীতির একজন তৃণমূল কর্মীকেই বেছে নিয়েছেন। তিনি বলেন, ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে ভোটের মাঠে কাজ করতে হবে। আমাদের কাজ হচ্ছে, নেত্রীর মনোনীত নৌকার প্রার্থীকে ভোটে জিতিয়ে আনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চট্টগ্রামের মেয়র পদটি উপহার দেয়াই হবে প্রধান লক্ষ্য।

এমএইচ