সেলফি যেন মরণনেশা

আগের সংবাদ

মুজিব শতবর্ষে ফেব্রুয়ারি

পরের সংবাদ

বিনিয়োগে ভাটা : কপালে চিন্তার রেখা

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২০ , ৮:২৯ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের অর্থনীতি ধেয়ে সামনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে প্রশান্তি লাভের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। মূলত আমাদের সামনে ভয়ের বড় ধরনের কোনো চ্যালেঞ্জ না থাকলেও অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে সতর্ক হওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর অধিকাংশ দেশই সাধারণভাবে অভ্যন্তরীণ কর উৎস এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

আর্থিক খাতে বাংলাদেশ অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। সমালোচনার তীর মেরেও তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু বাংলাদেশকে আরো এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। অর্থনৈতিক অগ্রগতি শুধু একা একা হাঁটে না, তার সঙ্গে আরো অনেক উপাদানও হাঁটে। কিন্তু বাংলাদেশে এর ব্যত্যয় ঘটেছে। এখানে শুধু উন্নয়ন ঘটেছে আর্থিক খাতে; কিন্তু অন্যান্য মানবিক অবকাঠামোতে দেখা গিয়েছে নেগেটিভ বার্তা। বাংলাদেশের সব আর্থিক ভালো খবরের পেছনে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তারা এদেশের বিত্তশালী সম্প্রদায় নয়; তারা এদেশের প্রান্তিক মানুষ। এশিয়া সভ্যতার শুরু থেকেই এ অঞ্চলে কৃষি সভ্যতা গড়ে উঠেছে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় মিলেনিয়ামের সময় থেকে দক্ষিণ ভারতের অঞ্চলে যে সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল, তার ভিত্তি ছিল পুরনো নবোপলীয় খামার ও গ্রাম্য সম্প্রদায়। কালক্রমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক এবং রাজনৈতিক মৈত্রীবন্ধনের মাধ্যমে খামার সম্প্রদায় আরো সমন্বিত হয়েছে। ইতিহাসের পথ ধরে যতই দিন অতিবাহিত হয়েছে- হিন্দু সাম্রাজ্য, মোগল সাম্রাজ্য, ইংরেজ শাসনামল এবং পাকিস্তান শাসনামলের হাত ধরে বাংলাদেশে এসেও এ অঞ্চলের মূল চালিকাশক্তির অন্যতম প্রধান উপাদান হয়ে ধরা দিয়েছে কৃষি উন্নয়ন। সেই কৃষি এবং কৃষক আজো আমাদের গর্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি।
পাকিস্তানের শাসনামলে এ অঞ্চলে পাট শিল্প ছিল উল্লেখ করার মতো কৃষি জাতীয় সম্পদ। সেই পাট শিল্পের বিশেষ করে আদমজী জুট মিলের শ্রমিকরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক এবং রাজনীতির এক বিশেষ নিয়ামক হিসেবে গণ্য হতো। পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে সেদিন ফুঁসে উঠেছিল এই হাজার হাজার শ্রমিক। সেই শ্রমিক আজো আমাদের অর্থনীতির চাকা ঘূর্ণায়মান রাখতে অন্যতম প্রধান চালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ আছে। উন্নয়নের হাত দিয়ে যে পোশাক শিল্পের বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশের ঘরে প্রবেশ করছে তার মূলে আছে এই দরিদ্র শ্রমিকের ঘাম। এক সময় চীন ছিল বিশ্ব দরবারের পোশাক শিল্পের জোগানদার। বাংলাদেশের শ্রমিকের স্বল্প বেতন সুবিধার হাত ধরে এখানকার পোশাক শিল্পের প্রতিষ্ঠানগুলো চীন থেকে কম মূল্যে পোশাক রপ্তানি করার সুযোগ পেলে পোশাক শিল্পের বিশ্ববাজার বাংলাদেশের প্রতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। চীনের অর্ডার কমতে থাকে আর বাংলাদেশের অর্ডার বাড়তে থাকে। শ্রমিকের বেতন কম থাকায় ভারত, নেপাল, ভিয়েতনামের সঙ্গেও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকল বাংলাদেশের পোশাক শিল্প। দরিদ্র শ্রমিক এখানেও অর্থনৈতিক চাকা ঘুরানোর মূল চালিকাশক্তি হয়েই থাকল।
অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নের তৃতীয় শক্তি আমাদের প্রবাসী আয়। বাংলাদেশের বৃহৎ এই সম্ভাবনার জায়গায়ও সেই দরিদ্র গ্রামীণ জীবনের মানুষগুলো। লক্ষাধিক প্রবাসী মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও অন্যান্য দেশে কর্মরত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণ করেছে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্ত একটি জায়গায় দাঁড় করাতে সাহায্য করেছে। আজো শ্রমের ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনের বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ।
প্রধান তিনটি খাতেই অবদান রেখে চলেছে বাংলাদেশের প্রান্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠী। তাদের শ্রমের ওপর আমাদের অর্থনীতি নির্ভরশীল হলেও এই দরিদ্র জনগোষ্ঠী দিন দিন সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়ে চলেছে। সরকারি রাজস্ব আদায় সন্তোষজনক পর্যায়ে উন্নীত হতে পারছে না। শেয়ারবাজারের শোচনীয় অবস্থা। আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের ওপরে। কিন্তু এর কোনো প্রভাবই নেই শেয়ার বাজারে। বেসরকারি বিনিয়োগে ভাটা পড়ে আছে দীর্ঘদিন ধরেই। সমস্যা দেখা দিয়েছে দীর্ঘমেয়াদি আমানত নিয়ে। মেয়াদকালীন সুদের হার কমানোর কোনো সুযোগ নেই। এই আমানতে অনেক ব্যাংকই সুদ দিচ্ছে ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে। আর এই কারণেই ব্যাংক সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের সুদের হার এক ডিজিটে আনতে সমর্থ হচ্ছে না। সমস্যা তাই অর্থ বাজারে।
একটি শক্ত অর্থনীতির ভিত হওয়া উচিত বিনিয়োগ। কিন্তু এই বিনিয়োগেই যত ভাটা বাংলাদেশে। অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ব্যবসায়ী ভালো ব্যবসা করছে, লাভও করছে, ব্যাংক থেকে ঋণও নিচ্ছে; কিন্তু নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত হচ্ছে না। এর কারণ তো নানাবিধ। অর্থনীতির সূচক বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক সূচক বৃদ্ধি না পেলে অর্থনীতির চাকা স্থায়ীভাবে অধিক শক্তি নিয়ে চলতে পারে না। বাংলাদেশের জিডিপি বাড়ছে, কিন্তু সেইসঙ্গে সামাজিক অবকাঠামোগত উন্নতি ত্বরান্বিত হচ্ছে না। কৃষক শ্রমিক আর প্রবাসীদের আয়ের ওপর নির্ভর করে যে জিডিপি সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তাকে টেকসই এবং স্থায়ীভাবে ধরে রাখার মতো অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে যদি ধনী শ্রেণি অর্থনীতির চাকাকে সচল করতে এগিয়ে আসে। কিন্তু বাংলাদেশে আশানুরূপভাবে তেমনটা ঘটছে না। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ধনী জনগোষ্ঠীর প্রচেষ্টা এক তারে বাঁশি বাজাচ্ছে না এখানে। সামাজিক, রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ধনী শ্রেণিকে অর্থনীতির সোপানে অবদান রাখার পক্ষে যথেষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগিয়ে আসতে পারছে না। ফলে দেশে বিনিয়োগ এবং নতুন শিল্প-কারখানার বৃদ্ধি আশানুরূপভাবে হচ্ছে না।
বিদেশি বিনিয়োগের দিকে তাকালে হতাশার পরিমাণ আরো একটু বেশি। এমনকি প্রবাসী বাংলাদেশিদের এবং দ্বৈত নাগরিকদের কাছ থেকেও আশানুরূপ বিনিয়োগ আসছে না বাংলাদেশে। বাংলাদেশে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে, চাল উৎপাদনসহ অন্যান্য কৃষিখাতে, টেক্সটাইল ও পোশাক প্রস্তুতকারী শিল্পে, ব্যাংকিং খাতে, সিফুড ও মাছ প্রক্রিয়াকরণে, চা প্রস্তুতকারী খাতে, পাওয়ার প্ল্যান্ট খাতে, টেলিফোন খাতে, আইসিটি খাতে, জাহাজ নির্মাণে, খনন কাজে, গ্যাস ফিল্ডে এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ আছে। আমরা দেখতে পাই- ২০১৮ সালে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীন (এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার) এবং যুক্তরাষ্ট্র (১৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) সবচেয়ে উপরে ছিল। এর পরের স্থানে আছে জাপান, ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর, হংকং, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মিসর, সৌদি আরব, ভারত এবং শ্রীলঙ্কা। কিন্তু সবার মিলিত অঙ্কের হিসাব মোটেই বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে না। চোখ ঘুরালেই আমরা বিপরীত চিত্র দেখি ভারতে। বিশাল অঙ্কের বিদেশি বিনিয়োগ হচ্ছে সেখানে। ভারতের কম বেতনে লেবারের সুযোগ নিতে সিঙ্গাপুর, মরিশাসসহ বেশ কিছু দেশের ব্যবসায়ীরা ভারতের প্রাইভেট সেক্টরে বিশাল অর্থের বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। ভারতের থেকেও কম মূল্যে বাংলাদেশের শ্রমিক কাজ করে বাংলাদেশে। কিন্তু তার পরও বিনিয়োগ বাংলাদেশে না এসে কেন ভারতে হচ্ছে তা বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি না হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ বিদ্যমান। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলার অভাব, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং সুশাসনের অভাব মূলত বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ করতে বাধা দিচ্ছে। এর ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিসহ বিদেশি বিনিয়োগকারী সবাই পিছিয়ে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় এই মার্কেট থেকে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ধেয়ে সামনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে প্রশান্তি লাভের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। মূলত আমাদের সামনে ভয়ের বড় ধরনের কোনো চ্যালেঞ্জ না থাকলেও অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে সতর্ক হওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর অধিকাংশ দেশই সাধারণভাবে অভ্যন্তরীণ কর উৎস এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কোনো দেশকে আবার শুধু তাদের অভ্যন্তরীণ করের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে হচ্ছে। কেননা তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের কোনো সুযোগ নেই। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে আছে কর উৎস এবং বিদেশি বিনিয়োগের ওপর। বাংলাদেশের ওপর অভ্যন্তরীণ কর আদায় সন্তোষজনক পর্যায়ে নেই; প্রাকৃতিক সম্পদের উৎসও এখানে বড় রকমের সান্ত্বনার পথ খুঁজে পায়নি কখনো। তাই বিদেশি বিনিয়োগের ওপর একটু বেশিই ভরসা ছিল। কিন্তু সেখানেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তাই ভয়ের সম্ভাবনা না থাকলেও চিন্তার এবং চ্যালেঞ্জের জায়গাটি আছে। টেকসই অর্থনীতির স্বার্থে আমাদের আরো কাজ করার আবশ্যকতা রয়েছে। প্রবাসী শ্রমিক, কৃষি ও কৃষক এবং পোশাক শিল্প এই তিনটি একত্রে কিংবা কোনো একটি টেকসই অর্থনীতির জন্য নিশ্চিত ভরসা হতে পারে না। বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির ভিন্ন পরিস্থিতি এবং নতুন যুগের অর্থনীতির গতিধারায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভবিষ্যতে আশঙ্কার সৃষ্টি হবে না এমনটা জোর দিয়ে বলার সুযোগ নেই। কেননা বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল কাণ্ডারি দরিদ্র কৃষক আর শ্রমিক। এই শ্রেণিতে পরিবর্তন এলেই তাদের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। আর তখন সস্তা শ্রমের নির্ভরযোগ্য জায়গা বাংলাদেশ বদলে যাবে। ফলে গরিবের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অর্থনীতির ভিত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এখানে বিত্তশালীদের অবদান বৃদ্ধি না পেলে, অভ্যন্তরীণ কর আদায়ের অঙ্ক বৃদ্ধি না পেলে, দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পেলে একদিন আজকের প্রশান্তির অর্থনৈতিক অবস্থা শঙ্কায় পড়তে পারেÑ এমন চিন্তা আমাদের মাথায় যত দ্রুত আসবে, ততই আমাদের ভবিষ্যৎ স্থায়ী টেকসই অর্থনীতির জন্য মঙ্গল।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক।

নকি