অগ্নিঝুঁকি থেকে মানুষকে বাঁচাতে হবে

আগের সংবাদ

আসছে ভয়াবহ ভাইরাস, আপনারা প্রস্তুত তো?

পরের সংবাদ

বিপর্যয় থেকে মুক্তির দিকে চেয়ে আছে বিশ্ব

ফারুক যোশী

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০ , ৮:৩২ অপরাহ্ণ

আতঙ্ক ছড়ানো করোনা ভাইরাস সারা পৃথিবীতে এখন যেন এক বিপর্যয় হয়েই সংক্রমিত হচ্ছে পৃথিবীর দেশে দেশে। এই বিপর্যয়ে যেমন উঠে আসছে গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রভাবের কথা, পাশাপাশি উচ্চারিত হচ্ছে এমনকি ছোঁয়াচে রোগ নিয়ে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তৈরির এক বর্ণবাদী দেয়ালের কথা। এই বিপর্যয় থেকে মুক্তির শেষ দেখার দিকে চেয়ে আছে সারা বিশ্ব।

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্রিটেনের ২ হাজার ৫২১ জনকে পরীক্ষার পর এ পর্যন্ত ৯ জনকে পজিটিভ অর্থাৎ এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী হিসেবে ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ব্রিটেনের স্বাস্থ্য বিভাগ উদ্বেগ প্রকাশ করছে, যদি এই রোগীদের জনমানবহীন কিংবা বিচ্ছিন্ন না রাখা যায় তাহলে ব্রিটেনেও এ বিপর্যয় ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে। শুধু তাই নয়, সন্দেহজনক যে কাউকেই এভাবে আইসলেইটেড না রাখতে পারলে ব্রিটেনের ৪০ মিলিয়ন মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাবে না। ব্রিটেনের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একজন নেইল ফারগিসন বলেছেন, এই মহামারিটি এখন বিশ্বব্যাপী প্রাথমিক পর্যায়ে আছে।

ব্রিটেনে যারা হংকং, তাইওয়ান, জাপান, মালয়েশিয়া, সাউথ কোরিয়া এবং চীন থেকে আসছেন, তাদের বলা হচ্ছে তারা যেন মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকেন, যদি তারা কেউ কাশি, জ্বর কিংবা শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখেন নিজেদের মাঝে। করোনা ভাইরাস আতঙ্ক এমনকি ইংল্যান্ডে বর্ণবাদ উসকিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। ভিন্ন চেহারার অর্থাৎ চীনের মানুষ হিসেবে কাউকে দেখলে অন্য বর্ণের মানুষ দূরে সরে যাচ্ছে কোথাও কোথাও।

ম্যানচেস্টার চায়নিজ সেন্টারের পরিচালক জেনি ওঙ্গ অভিযোগ করেছেন, তিনি ইতোমধ্যে অনেক বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ পেয়েছেন তার সেন্টারে। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকরা এসব অভিযোগ করছেন। অভিযোগগুলোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ম্যানচেস্টারের একটা স্কুলের চায়নিজ বংশোদ্ভূত এক ছাত্রী তার মায়ের কাছে এসে অভিযোগ করেছে, মেয়েটার সবচেয়ে ভালো বন্ধুটি তাকে বলেছে, সে কোনো চায়নিজ ছাত্রছাত্রীর পাশে যাবে না। কারণ ওই মেয়েটার মা তাকে চায়নিজদের কাছে ঘেঁষতে নিষেধ করেছেন। ওল্ডহ্যামের একটা স্কুলে এক বন্ধু তার আরেক বন্ধুকে বলছে, চায়নিজদের কাছ থেকে দূরে সরে থাকতে হবে, কারণ তারা সবাই ভাইরাসের বিষে (পয়জনড) আক্রান্ত। জেনি ওঙ্গ এ রকম আরো অভিযোগের কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদন করেছে ম্যানচেস্টার ইভিনিং নিউজ।

ব্রিটেনে চায়নিজ রেস্টুরেন্ট কিংবা টেকওয়ের খাদ্য ব্রিটিশ জনসাধারণের একটা অন্যতম প্রিয় খাবার। সারা ব্রিটেনেই রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ও কিছুটা ধস নেমেছে। শুধু তাই নয়, তারা নিজেদের মাঝেও সন্দেহ নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। তারা মনে করছে, তাদের নিজেদের মাঝেই কারো না কারো এ ভাইরাস থাকতেই পারে। সন্দেহ হলেই তারা একে অপরকে এড়িয়ে চলছে, এমনকি বন্ধু কিংবা স্বজনদের বাসায় যাওয়া কমিয়ে দিয়েছে তারা। ম্যানচেস্টার চায়নিজ সেন্টার একটা ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুল চালায়, যেখানে মূলত চীনের ম্যান্ডারিন এবং অন্যান্য চায়নিজ আঞ্চলিক ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়, আমাদের বাংলা শেখানোর মতো। ৪৫০ জন ছাত্রছাত্রী এই স্কুলে নিয়মিত শিক্ষা গ্রহণ করে। করোনা ভাইরাস আতঙ্কের কারণে অভিভাবকদের চাপে এই স্কুলটি দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। প্রথম করোনা ভাইরাসে এক রোগী শনাক্ত হওয়ার পর যুক্তরাজ্যের লন্ডনের ব্যস্ততম শহর চায়না টাউন বলতে গেলে শূন্য হয়ে গেছে। পর্যটকদের কোলাহলে লন্ডনের একটা অন্যতম ব্যস্ততম এই টাউন এখন পথচারীশূন্য। চীন থেকে লন্ডনে ফেরা এক নারী করোনায় আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পথে বের হওয়া থেকে বিরত রয়েছেন পর্যটক ও বাসিন্দারা।এর প্রভাব পড়েছে সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে। সারা পৃথিবীর বাজারে চীনের সামগ্রী প্রভাব বিস্তার করে আছে। ব্রিটেনের বাজারও চীনের সামগ্রীতে সয়লাব। কিন্তু বন্ধ হয়ে গেছে এই বাজারের ব্যাপক কেনাবেচা। ইতোমধ্যে চীনের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের এমনকি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে।

চীন নিয়ে ব্রিটেন তথা বিশ্বের এ রকম পরিস্থিতির মাঝেই বাতিল করা হয়েছে এবারের মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস (গডঈ)। আগামী ২৪ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি স্পেনের বার্সেলোনা শহরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল বিশ্বের বৃহত্তম এ মোবাইল ফোন প্রদর্শনী। কারণ বিটি, এলজি, নোকিয়া, সনি, ভোডাফোনের মতো বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ভাইরাস সংকটের মধ্যে প্রদর্শনীতে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দেয়ায় শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করতে বাধ্য হয় আয়োজক (এঝগ) এসোসিয়েশন (এঝগঅ)।

পৃথিবীর দ্বিতীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে পরিচিত চীন হঠাৎ করেই হোঁচট খেয়েছে। জিডিপির সূচকে আমেরিকার পরই চীনের অবস্থান। সে হিসেবে সারা দুনিয়ার সঙ্গেই আছে চীনের ‘সাপলাই চেইন’। সেই চেইনেও এসেছে প্রতিবন্ধকতা। করোনা ভাইরাসে দেশটির উহান শহর আক্রান্ত হওয়ার পর মৃত মানুষের মিছিল বাড়তে থাকলে রেড অ্যালার্ট যেমন জারি হয় এই শহরে, ঠিক তেমনি এই শহরটির সঙ্গে দেশটার অন্যান্য শহরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। চীনের বেশিরভাগ শিল্প-কারখানা ‘চন্দ্র নববর্ষ’কে ঘিরে দুই সপ্তাহের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। গত সপ্তাহে চীনের অধিকাংশ শিল্প-কারখানা বন্ধ থাকে।

বেশিরভাগ কারখানা গত উইকএন্ড অবধি পুনরায় চালু হওয়ার প্রত্যাশাই করতে পারেনি চীন। সাবধানতা অবলম্বন করে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছিল কয়েকটা কোম্পানি। ১২টিরও বেশি বিভিন্ন শহরের প্রায় ১০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষকে ঘরে বসে থাকতে হয় এই সময়ে। এ সময়ে গচ্চা যায় বিলিয়ন পাউন্ড। ১১ মিলিয়ন চায়নিজদের আবাস উহান শহর। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের একটা বড় জায়গা এটা। অন্তত ১০টা বিশ্ববিদ্যালয় আছে এই শহরে, যার মাঝে দুটি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের শীর্ষ পর্যায়ের। বিদেশি বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই শহর। এ রকম একটা জীবন্ত নগরী হঠাৎ করে হয়ে যায় মৃতপ্রায়, নীরবতার দীর্ঘশ্বাস এই শহরে। এই নগরীকে কেন্দ্র করে সারা চীনের উৎপাদন থমকে গেছে। কারণ স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে চীনের সঙ্গে সারা পৃথিবীর বাণিজ্য এখন প্রায় হ্রাস পেয়েছে। আর সে কারণে এ রকম ভাবাটাই স্বাভাবিক যে, গত কয়েক সপ্তাহের বাণিজ্যিক স্থবিরতা তাদের দেশের পাশাপাশি সারা পৃথিবীর অর্থনীতিতে একটা ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং গত সপ্তাহে তা স্বীকারও করেছেন। এবং সেজন্যই আমেরিকার দ্রব্য আমদানিতে এমনকি শুল্ক কমিয়ে দেয়ার বিষয়টা পর্যন্ত বিবেচনায় নিয়েছেন। ভাইরাস সংকট অব্যাহত থাকলে, বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব আরো সুদূরপ্রসারী হবে। একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ পর্যন্ত ১২ মাসের মধ্যে চীনা নাগরিকরা ১৭৩ মিলিয়ন ভ্রমণ করেছে। এই ভ্রমণগুলোতে তারা এক ট্রিলিয়ন ডলারের চতুর্থাংশের বেশি ব্যয় করেছে, যা পৃথিবীর অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে বেশি ভ্রমণ পৃথিবীব্যাপী। এ তো হলো শুধু চীনাদের নিয়ে পৃথিবীর ভ্রমণ বাণিজ্যের চিত্র।

এ ছাড়া আছে তাদের অটোমোবাইল শিল্প, বৈদ্যুতিক পণ্যের একটা বিশাল বাজার। ইতোমধ্যে তাদের এ বাণিজ্যও হ্রাস পেয়েছে সারা পৃথিবীতেই। চীনের রপ্তানি কিংবা তাদের জনগণের ভ্রমণ প্রতিবন্ধকতায় যেমন সরাসরি আঘাত এসেছে বিদেশি অর্থনীতিতে, ঠিক তেমনি অন্যান্য দেশে সাধারণ মানুষরাও এর শিকার হচ্ছে। কারণ ‘মেইড ইন চীন’ সামগ্রীর বিপরীতে অধিক দাম দিয়ে অনেক পণ্যই এখন কিনতে হচ্ছে তাদের।

সহজ কথায়, আতঙ্ক ছড়ানো করোনা ভাইরাস সারা পৃথিবীতে এখন যেন এক বিপর্যয় হয়েই সংক্রমিত হচ্ছে পৃথিবীর দেশে দেশে। এই বিপর্যয়ে যেমন উঠে আসছে গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রভাবের কথা, পাশাপাশি উচ্চারিত হচ্ছে এমনকি ছোঁয়াচে রোগ নিয়ে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তৈরির এক বর্ণবাদী দেয়ালের কথা। এই বিপর্যয় থেকে মুক্তির শেষ দেখার দিকে চেয়ে আছে সারা বিশ্ব। বিশ্বের স্বাস্থ্য নিয়ে যারা কাজ করছে, তাদের দিকেই এখন এ বিশ্বের অগণিত মানুষের তাকিয়ে থাকা।

ফারুক যোশী : কলাম লেখক।
[email protected]

এসআর