বিপর্যয় থেকে মুক্তির দিকে চেয়ে আছে বিশ্ব

আগের সংবাদ

গত ৩ বছরে ঢাকার বায়ু বেশি খারাপ হয়েছে

পরের সংবাদ

আসছে ভয়াবহ ভাইরাস, আপনারা প্রস্তুত তো?

আহমেদ আমিনুল ইসলাম

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০ , ৮:৪৯ অপরাহ্ণ

নবনির্বাচিত মেয়রদের সামনে অতি দ্রুত যে দুটি চ্যালেঞ্জ এসে উপস্থিত হচ্ছে তা হলো ভয়াবহ ও ভয়ঙ্কর ভাইরাস থেকে নগরকে রক্ষা করা- নগরবাসীকে রক্ষা করা। ঢাকার উভয় মেয়রের কাছে আমরা প্রত্যাশা করব তারা যথাযথ সক্ষমতা প্রদর্শন করবেন। কেবল বক্তৃতা, বিবৃতি নয়- উপযুক্ত প্রযুক্তি, ফলপ্রসূ প্রতিষেধক, কর্মঠ ও দক্ষ কর্মীবাহিনী নিয়ে সংকট মোকাবিলার জন্য তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করবেন।

নবনির্বাচিত দুজন মেয়র ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব নিয়েছেন। তাদের দুজনের মধ্যে একজন নতুন হলেও অন্যজনের মেয়র হিসেবে কিছুদিনের অভিজ্ঞতা আছে। ঢাকা উত্তরের মেয়র হিসেবে আতিকুল ইসলাম এই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন আনিসুল হকের মৃত্যুজনিত শূন্যপদে নির্বাচনের মাধ্যমে। মেয়র হিসেবে তার দায়িত্ব নেয়ার কিছুদিন পরই ঢাকাজুড়ে শুরু হয়েছিল ডেঙ্গুর উপদ্রপ। একে তো আনিসুল হকের পর তার দায়িত্ব নেয়া এবং দায়িত্ব নেয়ার পরপরই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব। তাই মেয়র হিসেবে আতিকুলের অভিজ্ঞতা অনেকটাই তিক্ত বলতে হবে। ডেঙ্গুর উপদ্রব সেসময় অনেকটা যেন মহামারির রূপ নিয়েছিল। সারাদেশ ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছিল। বাংলাদেশের কোনো জেলা ডেঙ্গুর ছোবল থেকে মুক্ত ছিল না। বলার অপেক্ষা রাখে না, ঢাকা থেকেই সমগ্র দেশে তখন ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছিল। ডেঙ্গুর আক্রমণ থেকে ঢাকাবাসীকে রক্ষা করতে তৎকালীন দুই মেয়রের দৌড়ঝাঁপ আমরা গণমাধ্যমের কল্যাণে দেখেছি। কিন্তু কোনো মেয়রই কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ঢাকাবাসী নাগরিকদের আশ্বস্ত করতে পারেননি। শুধু আশ্বাসের পর আশ্বাস টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনামে পরিণত হয়েছিলেন তারা। ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে উন্নতমানের ওষুধসহ প্রতিষেধক হিসেবে নানা দ্রব্যাদি আসছে জাতীয় খবর আমরা ক্রমাগত কেবল শুনেছি- বাস্তবে তার কোনো পরিচয় পাইনি। আবার মেয়রদের কিছু ভবিষ্যদ্বাণীও শুনেছি বারংবার। তারা বলেছেন ‘অমুক’ মাসের ‘অমুক’ তারিখ থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে যাবে। দক্ষিণের মেয়র তো স্পষ্টই বলেছিলেন সেপ্টেম্বর মাস থেকে ডেঙ্গু কমে যাবে। অবশ্য আমরা নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তের খবর পেয়েছি। দাপটের সঙ্গেই ডেঙ্গু তার অস্তিত্ব জানান দিয়ে গেছে- আমাদের আতঙ্কিত করে গেছে। ‘নাগরিক ভাইরাস’ হলেও মেয়রদের সব ভবিষ্যদ্বাণী ব্যর্থ প্রমাণ করে ডেঙ্গু তার আক্রমণ বরং বিস্তৃত করেছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত। অবশেষে, শীতের কল্যাণে ডেঙ্গু নিরস্ত হলেও শীতের অবসানে পুনরায় তার কি মূর্তি দেখব সে ভয়ে সমগ্র নগরবাসী আবারো আতঙ্কিত- শঙ্কিত হয়ে উঠছেন। আবারো আক্রমণের জন্য ডেঙ্গু প্রস্তুতি নিচ্ছে, আমরা ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রস্তুত আছি তো?

সাম্প্রতিককালে ভয়াবহ রূপ নিয়ে নবতর আরেক ভাইরাস আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা আমরা চীনের উহানে দেখলাম। উহানের মতো ঢাকাও কি করোনা ভাইরাসের জন্য দরজা খুলে দেবে না কি যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে তার মোকাবিলা করবে? গত বছরের ডেঙ্গু আমাদের যেভাবে আতঙ্কিত করেছে এবারো যে তারচেয়ে কম আতঙ্কিত করবে তাও বলা যায় না- বিশ্বাসও করা যায় না। গত বছর আমরা কেবল টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে সংশ্লিষ্টদের সান্ত¡নার আশ্বাস বাণী শুনে শুনে যেমন ক্লান্ত হয়েছি তেমনি কর্তৃপক্ষের প্রতিকার-প্রতিরোধের দৈন্যদশা দেখে হতাশও হয়েছি অনেক। বিদেশি প্রতিষেধকের আশায় সিটি করপোরেশনকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দিনের পর দিন। আবার মশা নিধনের যন্ত্রপাতি ও ওষুধের গুণাগুণ নিয়েও জনমনে সন্দেহের উদ্রেক ঘটেছিল। কারণ সে সময় দেখা গিয়েছিল পর্যাপ্ত (!) ওষুধ প্রয়োগের পরও নগরের এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। মেয়রদের আমরা প্রায় অসহায় জীবন কাটাতে দেখেছি। ডেঙ্গুর সংক্রমণকালে গত বছর আমরা দেখেছি প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজারের অধিক মানুষ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাসেবা নিয়েছে। আর তখন প্রতিদিনই বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুর সংবাদও আমরা জেনেছি। আমরা দেখেছি ডেঙ্গু সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের জন্য সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিশেষ ‘সেল’ গঠন করেছিল। দেশব্যাপী হাসপাতালজুড়ে ডেঙ্গু আক্রান্তদের হাহাকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। সাধারণত শিশু ও নারীরা বেশি পরিমাণে ডেঙ্গুর সংক্রমণের শিকার হয়। গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্য থেকে মৃতের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আর বিভিন্ন বয়সী প্রায় লক্ষাধিক মানুষ সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়েছে।

এবার শীত শেষ হতে চলল। নাগরিকদের মনে ক্রমশ আতঙ্ক আর আশঙ্কাও ডানা মেলতে শুরু করেছে। ফেব্রুয়ারির শেষ ও মার্চের প্রথম থেকেই ঢাকা ও আশপাশে মশার উপদ্রব মাত্রাহীন বেড়ে যায়। আর বর্ষা শুরু হতেই লক্ষ করা যায় এডিস মশার তৎপরতা! আমরা এবারো গত বছরের মতো আতঙ্ক আর উদ্বিগ্নতার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করব নাকি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণের মাননীয় মেয়রদের পূর্বপ্রস্তুতির ফলস্বরূপ ডেঙ্গুমুক্ত স্বস্তির নিশ্বাসে ভরপুর নতুন ঢাকা দেখতে পাব? সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রাক্কালে উন্নত ঢাকা গড়ার প্রার্থীদের যেসব প্রতিশ্রুতি ছিল বিজয়ী হিসেবে বর্তমানের উত্তর ও দক্ষিণের মেয়ররাও অনুরূপ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সব দিক থেকে পরিচ্ছন্ন ও ডিজিটাল নগরী উপহারেরও প্রতিশ্রুতি ছিল বিজয়ীদের। এখনো পরিচ্ছন্নতার কোনো বিশেষ অভিযান শুরু হয়নি। এটি আগেভাগে শুরু হওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। এর মাধ্যমেই অনেক রোগ থেকে নিরাপদ থাকা সম্ভব। কিন্তু আমাদের একটি জাতীয় চারিত্র্যলক্ষণ এই যে, সমস্যা শুরু হলে এবং কখনো কখনো সংকট প্রকট আকার ধারণ করলে পরে তা নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দিই। ততদিনে ক্ষতি যা হওয়ার হয়েই যায়! নাগরিক স্বার্থে প্রায় প্রতি বছর সংক্রমিত হওয়া এই রোগ ও তার প্রতিকারের বিষয়ে পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সংস্থাসমূহকে সাধারণত আগ্রহী হতে দেখা যায় না। আমাদের দেশে কেবল ডেঙ্গুই নয়- যে কোনো সংকটের ক্ষেত্রে এই একই কথা প্রযোজ্য। শিক্ষিত ও সভ্য জাতি হিসেবে পরিচিত হতে হলে এরূপ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই।

নবনির্বাচিত মেয়রদের কাছে তাই আমাদের বিপন্ন নাগরিক প্রশ্নগুলো মনের সম্মুখেই কেবল ঘুরে ঘুরে ফেরে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমরা কি বিগত বছরের চেয়ে বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছি নাকি পূর্বের মতো জোড়াতালি দিয়ে চলতি বছরের আসন্ন বর্ষা মৌসুমের ভয়াবহ ও ভয়ঙ্কর উপদ্রব ডেঙ্গুর মোকাবিলা করব? সিটি করপোরেশন কি এবারো সংকট উপস্থিত হওয়ার পর দেশ-বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী আমদানির কথা ভাববে নাকি ইতোমধ্যে সেসব বিষয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে? আমরা তা জানি না। শুরু হয়ে থাকলে ভালো। সিটি করপোরেশনকে অভিনন্দন।

ঢাকার দুই নবনির্বাচিত মেয়রকে এবার দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। পরিচয় দিতে হবে চৌকস নেতৃত্বেরও। কারণ শুধু ডেঙ্গু নয় এবার নতুন করে শুরু হয়েছে ভাইরাসবাহিত ভয়ঙ্কর আরেক ঘাতক ব্যাধি করোনা। চীনের উহান প্রদেশে শুরু হলেও নানা মাধ্যমে বাহিত হয়ে এই ভাইরাস বাংলদেশেও মরণ ছোবল হানতে পারে। যদি একবার এই ভয়াবহ ভাইরাস ঢাকা আক্রমণ করে তবে ঢাকা দ্বিতীয় উহানে পরিণত হবে। বলা যায় উহানের চেয়ে ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনবে ঢাকায় তথা সমগ্র বাংলাদেশে। কারণ চীনের যে কোনো নগরীর চেয়ে ঢাকা বেশি স্পর্শকাতর। সমগ্র ঢাকায় ময়লা ও আবর্জনা ব্যবস্থপনা অত্যন্ত দুর্বল। ময়লা আবর্জনার স্তূপ, অপরিচ্ছন্ন এই নগরীর সাধারণ মানুষের চলাফেরাও বেশি মাত্রায় স্বাধীন এবং অসচেতন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই স্বাধীনতা একেবারেই স্বেচ্ছাচারের শামিল। নাগরিক হিসেবে আমাদের মতো বেসামাল পৃথিবীর কোনো নগরেই দেখা যাবে না। তাই ভাইরাসঘটিত যে কোনো রোগ দ্রুত ছড়াতে এ দেশে সময় লাগবে না। উহানের ভয়াবহ দুরবস্থার চিত্র আমরা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখে কেবল শঙ্কিতই বোধ করিনি, রীতিমতো বিপর্যস্ত হয়েছি। বিপর্যস্ত হয়েছি এই ভেবেও যে, যদি দুর্ঘটনাবশত করোনার সংক্রমণের কবলে আমরা পড়ে যাই তবে তা যে কত দ্রুত বিস্তার ঘটবে সেকথা কল্পনাও করা যায় না। তাই প্রতিষেধকের চেয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দিকে আমাদের সর্বাগ্রে দৃষ্টি দিতে হবে। চীনের ভয়াবহতা থেকে দেখে ও শুনে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য নগরবাসী কতটা প্রস্তুত আমরা তাও জানি না। নগরের পিতারাই বা কতটা প্রস্তুত তারও কোনো লক্ষণ এখন পর্যন্ত আমরা দেখিনি। কিন্তু বসে থাকলে এর খেসারত মহামারির বিনিময়েই দিতে হতে পারে।

নবনির্বাচিত মেয়রদের সামনে অতি দ্রুত যে দুটি চ্যালেঞ্জ এসে উপস্থিত হচ্ছে তা হলো ভয়াবহ ও ভয়ঙ্কর ভাইরাস থেকে নগরকে রক্ষা করা- নগরবাসীকে রক্ষা করা। ঢাকার উভয় মেয়রের কাছে আমরা প্রত্যাশা করব তারা যথাযথ সক্ষমতা প্রদর্শন করবেন। কেবল বক্তৃতা, বিবৃতি নয়- উপযুক্ত প্রযুক্তি, ফলপ্রসূ প্রতিষেধক, কর্মঠ ও দক্ষ কর্মীবাহিনী নিয়ে সংকট মোকাবিলার জন্য তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করবেন। ডেঙ্গু কিংবা ডেঙ্গুর মতো যে কোনো ভয়াবহ ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষায় তারা দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন। বিগত বছরের সব ব্যর্থতার অবসান আমরা নতুন মেয়রদের কর্মতৎপরতার মধ্যে খুঁজে পাব বলে আশা করি।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

এসআর