এবারের ভ্যালেন্টাইনে ‘ভিলেন’ করোনা

আগের সংবাদ

উৎসবে-উন্নয়নে মুজিববর্ষ

পরের সংবাদ

বদলে যাবে গণমাধ্যম?

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২০ , ৯:৫৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৩, ২০২০ , ৩:২৩ অপরাহ্ণ

বিশ্বজুড়ে যখন কর্তৃত্ববাদের জয়জয়কার, তখন মুক্ত গণমাধ্যম বা স্বাধীন সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ কী- তা সহজেই অনুমেয়। এই মুহূর্তে সম্ভবত সাংবাদিকতাই একমাত্র পেশা, যা একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে কঠিন বর্তমানকে মোকাবিলা করছে। আপনি জানেন না- কত দিন আপনি টিকতে পারবেন। নিউ মিডিয়ার আগ্রাসী বাস্তবতায় নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার কৌশল কী হবে- তার কোনো ধারণা নেই, অথচ আপনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে- এক অসম প্রতিযোগিতার বাজারকে। এ যেন ভবিষ্যৎ কঠিন জেনেও আপনি পা বাড়াচ্ছেন তার দিকে। জেনে, শুনে, বুঝে সাংবাদিকতা পেশাটি যখন একটি এমন ধরনের ঝুঁকির মুখে- তখন ভালো সাংবাদিকতা কিংবা খারাপ সাংবাদিকতার চেয়ে আলোচনায় বেশি মুখ্য হয়ে ওঠে টিকে থাকার প্রশ্নটি।

গণমাধ্যমের এ রকম একটি টালমাটাল সময়ে দেশের অন্যতম একটি দৈনিক ভোরের কাগজ পা রাখছে ২৯ বছরে। ২৯ বছর মানে পোক্ত তারুণ্য। মেধা, মননে ও শক্তির আবরণে। কিন্তু সময় কী তা বলে? পুরো জগৎটি যখন অনিশ্চয়তায়- তখন তার কী অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়। ২৯ বছর আগে যখন ভোরের কাগজের যাত্রা শুরু হয়েছিল-

তখন ছিল গণমাধ্যমের রমরমা অবস্থা। গণতন্ত্রের সংগ্রামে তখন সহযাত্রী শক্তিশালী গণমাধ্যম। মাত্র তিন দশকের ব্যবধানে গণমাধ্যম দেখেছে আদর্শের পতন। সমাজতন্ত্রের বিলুপ্তের মধ্য দিয়ে নতুন পুঁজিবাদের বিকাশ। বিশ্বায়নের নামে নতুন ঔপনিবেশিকতার বিস্তার, মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে বড় বড় হাঙ্গরগুলো খেয়ে নিচ্ছে ছোট ছোট মাছগুলোকে। অথচ সমাজে তো বেঁচে থাকার কথা সবারই। ছোট-বড় সবারই তো অধিকার সমান। সবাই মিলেই তো সমাজ, রাষ্ট্র। কিন্তু আমরা এর নাম দিয়েছি প্রতিযোগিতার বাজার। যে টিকে থাকতে পারবে সেই-ই জয়ী। এই অবস্থায় কত মানুষ, কত পেশা যে টিকে থাকার সংগ্রাম করছে- আমরাই বা তার ব্যতিক্রম কী?

২৯ বছরে পা রেখে ভোরের কাগজকে আজ এই আলোচনাটি করতে হচ্ছে- বর্তমানের এই বাস্তবতার কারণে। আলোচনা করার কথা পোক্ত তারুণ্য নিয়ে। অথচ আলোচনায় বেশি জরুরি হয়ে উঠছে টিকে থাকার সংগ্রামের বিষয়টি। দীপ্ত একঝাঁক তরুণের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল ভোরের কাগজের। ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ সালের কাগজটি হাতে নিয়ে সবার মন্তব্য ছিল তারুণ্যের স্ফুলিঙ্গ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিটি বর্ণমালায়। ফেব্রুয়ারি মানেই ভাষার সংগ্রাম, নিজস্ব আত্মপরিচয় নিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়ার এক অধ্যায়। সেই মাসে টগবগে তরুণদের এই প্রকাশকে দেখে অনেকে বলেছিল এরা ভেঙে দেবে অনেক প্রথার দেয়ালকে। হয়েছেও তাই।

সাংবাদিকতার পুরনো ধ্যান-ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে একদল টগবগে তরুণের স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে উঠল ভোরের কাগজ। দীর্ঘ তিন দশক সেই তারুণ্যেই দাবিয়ে বেড়াল বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম জগৎ। কিন্তু আজ পুরো গণমাধ্যম জগৎটিই যখন ভঙ্গুর- তখন তাদের সামনে হাজির হয়েছে নতুন এক বাস্তবতা- নতুন সংগ্রাম। করপোরেট পুঁজির দাপটে হারিয়ে গেল ছোট ছোট স্বপ্নগুলো, যা একটি সুন্দর বাগান গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে জন্ম হয়েছিল। এখন বাগানে অনেক ফুল, সৌন্দর্যের জন্য নয়। অত্যন্ত রঙিন, কিন্তু ঘ্রাণ নেই। বাজারে বিক্রি হয় ভালো, বাজারে বিক্রি হওয়াটাই যেন মুখ্য।

বাজার যখন মুখ্য হয়, সৃষ্টিশীলতা তখন গৌণ। গণমাধ্যমও পড়েছে এই ফাঁদে। বাজার যা খেতে চায়, আমরা তাই লিখি। বাজারে খাওয়া জিনিস না লিখলে বিক্রি হয় না। বিক্রি না হলে বিজ্ঞাপন পাওয়া যায় না। বিজ্ঞাপন না পেলে অর্থের জোগান হয় না। অর্থের জোগান না হলে সংসার তো চলে না। তাই গণমাধ্যম অফিসগুলোতে প্রধান আলোচনা, খরচ কমানোর জন্য কারা কত জন ছাঁটাই করছে- কোন অফিসে কত তারিখে বেতন হচ্ছে- অথবা আরো রূঢ় হলে- কোন অফিসে কত মাস বেতন বন্ধ। ২৯-এ পা রাখার একটি দৈনিকের জন্মদিনে এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হচ্ছে, যা কাম্য ছিল না। কিন্তু বাস্তবতাটা এমন এই অন্ধকারের মধ্যে যেন আলোর পথ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা। আলোটা কোথায়? তার জন্য এক নতুন সংগ্রামের চেষ্টা।

বিশ্বজুড়ে বেশ কিছু প্রথিতযশা মুদ্রণ গণমাধ্যম বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ কেউ নতুন টেকনোলজিকে সঙ্গে নিয়ে টিকে থাকার কৌশল তৈরি করছে। কয়েক বছর আগে বিশ্বখ্যাত দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক সিনিয়র সাংবাদিকের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলাম আমরা বাংলাদেশের কয়েকজন সাংবাদিক। জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের সার্কুলেশনের অবস্থা কী? তিনি বললেন, মুদ্রণ সার্কুলেশন কমছে। ডিজিটাল সার্কুলেশন বাড়ছে। বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত সম্পাদক সম্প্রতি লিখেছেন পত্রিকাকে বাঁচাতে হলে ডিজিটাল সার্কুলেশনের দিকে জোর দিতে হবে। ডিজিটাল ভার্সন থেকে আয় বাড়াতে হবে। মানুষের হেভিট পরিবর্তন হয়ে গেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম- যাদের ঢাউস একটি পত্রিকা পড়ার জন্য সময় নেই। হাতে মোবাইল আছে, সেখানে ইন্টারনেট থাকলে সোশ্যাল মিডিয়া আছে। তাতে তথ্য পাওয়া যায় সর্বত্র সবখানে। পত্রিকা পড়াটা শুধু এখন অভ্যাসের বিষয়। ১৪ কোটি মোবাইলের বাংলাদেশে ৮ কোটি ইন্টারনেটের গ্রাহক- তার সামনে গুগল-ইউটিউব-নেটফ্লিক্স-এর অবারিত জগৎ। পত্রিকার পৃষ্ঠা উল্টে খবরের স্বাদ নেয়ার সময় কোথায়?

তাই এক নতুন বাস্তবতাকে নিয়ে ভোরের কাগজকে পা রাখতে যাচ্ছে ২৯ বছরে। ডিজিটাল জেনারেশনের যুগে আমাদেরও বদলে যেতে হচ্ছে নতুন বাস্তবতায়। মানুষ এখন তথ্য চায়, তথ্যের গভীরে যাওয়ার সময় নেই। তথ্যের এখন এত সূত্র, কোনটি নির্ভরযোগ্য, কোনটি নির্ভরযোগ্য নয়- তাতে পাঠকের কিছু যায়-আসে না। কিন্তু সংকটটা প্রাতিষ্ঠানিক গণমাধ্যমের। তাদেরকে তো পেশাদারিত্বের সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন করতে হয়, যাচাই-বাছাই করে। সেটিই হয়ে উঠেছে বড় সংকটের বিষয়।

সত্য-মিথ্যার এই দ্বন্দ্বের মধ্যে নিজেকেই বেছে নিতে হবে সে কৌশল। গণমাধ্যম বোদ্ধারা বলেন, কৌশলে যারা জয়ী হবেন, তারাই টিকে থাকবেন প্রতিযোগিতায়, সেটাই নিয়ম। তাই বাস্তবতাকে সামনে রেখে গণমাধ্যমকে সাজাতে হচ্ছে কৌশল। তারুণ্যের অগ্রযাত্রায় যে ভোরের কাগজের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই তারুণ্যকে মাথায় রেখে ঢেলে সাজানো হচ্ছে ভোরের কাগজকে। ২০১৭ সালে ২৫ বছর পূর্তিতে আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম ডিজিটাল ভোরের কাগজের। ২০২০ সালে এক ধাপ এগিয়ে আমরা চূড়ান্ত করেছি একটি লাইভ পত্রিকার- যার নাম ‘ভোরের কাগজ লাইভ’। পত্রিকাটিকে স্ট্যাটিক চরিত্র থেকে জীবন্ত করা। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যাত্রা শুরু হবে তার। মুজিববর্ষে ভোরের কাগজের পাঠককে সেটাই আমাদের উপহার। পাঠক, সাংবাদিক, শুভানুধ্যায়ী- সবাইকে নিয়েই একটি নিউজ প্ল্যাটফর্ম। যেখানে সবাই সংযুক্ত- এই সংযুক্ততাই হবে ভোরের কাগজ লাইভ-এর শক্তি। ভোরের কাগজ থাকবে- তার সঙ্গে যুক্ত হবে নতুন একটি প্রেরণা, যার নাম হবে ভোরের কাগজ লাইভ- আপনার সঙ্গে, আপনাকে সঙ্গে নিয়ে।

নতুন বছরের পদার্পণে ভোরের কাগজ পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা, তৃণমূলে ছড়িয়ে থাকা প্রতিনিধি, সবাইকে জানাই শুভেচ্ছা। আপনাদের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করতে চাই নতুন এই উদ্যোগ-যাত্রা। শুভ কামনা সবার জন্য।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়