সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয়ে বিপর্যয়ের আশঙ্কা

আগের সংবাদ

সুস্থ রাজনীতি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার তাগিদ

পরের সংবাদ

আর্থিক খাতে স্বস্তি ফেরানো খুবই জরুরি

মরিয়ম সেঁজুতি

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২০ , ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ

আর্থিক খাতে শৃৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে মুজিববর্ষের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। গত একদশকে বাংলাদেশে আর্থিক খাতে সংঘটিত বিভিন্ন কেলেঙ্কারি, অনিয়ম, অর্থ লোপাটের চাঞ্চল্যকর ঘটনা সবাইকে হতবাক করেছে। এক ধরনের ভীতি সঞ্চার করেছে গোটা ব্যাংক খাত ঘিরে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বড় বড় ঋণগ্রহীতারা তা ফেরত দিতে চান না। ব্যাংক কর্মকর্তারা প্রায় ক্ষেত্রে বড় বড় ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে গিয়ে পদে পদে হোঁচট খান, বাধার সম্মুখীন হন। এসব কারণে এখন ব্যাংক খাতে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বিরাজ করছে স্থবিরতা, অনাগ্রহ। একই অবস্থা দেশের নন-ব্যাংকিং আর্থিক খাতে।

এমনকি পুঁজিবাজারেও। স্বস্তি নেই কোথাও। বাংলাদেশের সূচকগুলোর মধ্যে একমাত্র প্রবাসী আয় ভালো অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া আমদানিতে ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ, রপ্তানিতে ৫ দশমিক ২১ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। রাজস্ব আয়ে ঘাটতি ৩১ হাজার কোটি টাকা, সরকারের ঋণ ৪৯ হাজার কোটি, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ব্যাংকিং খাত ছাড়াও মুজিববর্ষে অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক কিছু চ্যালেঞ্জ থাকবে। সেগুলো হলো- টাকা পাচার রোধ, সরকারি ঋণ কমানো, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, বিদেশি ঋণের ঝুঁকি কমানো, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বাড়ানো, মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং বৈশি^ক অর্থনীতির নেতিবাচক অভিঘাত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের সব উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশের আর্থিক খাত। এখানে শৃঙ্খলা, সুশাসন এবং সর্বোপরি শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের আশা করা যায় না। আর্থিক খাতে শুদ্ধাচারের চর্চা না থাকলে বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম, দুর্নীতি বাসা বাধে। যা আমাদের অর্থনীতিতে চরমভাবে প্রতিয়মান। খেলাপি ঋণ, জাল-জালিয়াতি, আর অর্থপাচারসহ নানা কারণে দেশের আর্থিক খাত বিশৃঙ্খল। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত। সামগ্রিকভাবে যা এ খাতে সুশাসন ব্যাহত করছে। এ ছাড়া মুদ্রাবাজার, পুঁজিবাজার এবং বিমা খাতেও রয়েছে বিশৃঙ্খলা।

মুজিববর্ষে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সিনিয়র ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে আমরা যে যার মতো করে তার কাছে শ্রদ্ধা জানানোর উপকরণ নিয়ে যাচ্ছি। আমাদের ভাবতে হবে, আমরা জাতি হিসেবে কী নিয়ে যাব বঙ্গবন্ধুর কাছে। আমরা কি তাকে গিয়ে বলতে পারব, তুমি যে দেশ রেখে এসেছিলে তার চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধশালী করেছি? সমাজে সবার সমানভাবে সমৃদ্ধি এসেছে? তুমি যে সমাজ দিয়েছিলে তার চেয়ে আরো কল্যাণকর, মানবতার পক্ষে, অহিংসা, সম্প্রীতি- এমন একটা সমাজ আমরা তৈরি করে নিয়ে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে এ প্রশ্নগুলোই মনের মধ্যে ঘুরে-ফিরে আসে।

আামাদের অর্জন অনেক আছে। কিন্তু সেই অর্জনকে কিভাবে বঙ্গবন্ধুর কাছে নেব, কিভাবে সাজাবো- এটা ঠিক করে উঠতে পারিনি। এটাও সরকারের চ্যালেঞ্জ বলে মনে করি। সিপিডির সিনিয়র ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান পাঁচটি খাতে উদ্যোগ নেয়ার কথা বলেন। তার মতে, এসব খাতে উদ্যোগ নিলে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো হবে। এছাড়া বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন সেদিকে আমরা আরো দ্রুত গতিতে এগিয়ে যেতে পারব। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারকে অর্থনীতির অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। প্রথমত, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বা সুশাসন ফেরানো একটা অন্যতম চ্যালেঞ্জ। মুজিববর্ষে আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করব, সুশাসন শক্তিশালী করব, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াব- এরকম একটা চ্যালেঞ্জ নিতে পারি। তাহলেই বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে। কারণ তিনি একটা দুর্নীতিমুক্ত দেশ চেয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় বাড়াতে হবে।

আমাদের রাজস্ব আয় কম হওয়ার ফলে সরকারকে ব্যাংকিং খাত থেকে অনেক ঋণ নিতে হচ্ছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় বাড়ানো, নিয়মিত কর আদায় করা, ব্যাংক আইন বাস্তবায়ন করা- এ বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে হবে। তৃতীয়ত, আর্থিক খাতকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনকে শক্তিশালী করা দরকার। খেলাপি ঋণ যেন না বাড়ে- এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি থাকা দরকার। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে টাকা পাচার করছে। এসব বিষয়কে জিরো টলারেন্সের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। চতুর্থত, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি টেকসই করার জন্য এসডিজির আলোকে- শুধু প্রবৃদ্ধি নয়; এটা যেন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, পরিবেশ বান্ধব হয়, সেই অঙ্গীকার চাই। কারণ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে; কিন্তু অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বলতা দেখাচ্ছি। পঞ্চমত, অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন- এটা অবশ্য চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু তা আরো বেগবান করে আমাদের তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, তাদের জন্য বিভিন্ন উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া, ব্যবসায় পরিবেশ উন্নত করা দরকার। সুতরাং শোভন কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ এবং এর জন্য অর্থনীতির নতুন নতুন কর্মকাণ্ড বিশেষত যুব কর্মসংস্থানের জন্য অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হবে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, স্বনির্ভর, স্বয়ম্বর, সম্মানীয়- এ ধরনের একটি অর্থনীতির মুক্তির সংগ্রাম করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি তার ভাষণেও এ কথা বলেছেন। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ছিল তার দর্শন। বর্তমানে আস্থার সংকট একটি বড় সমস্যা। গ্রাহক ব্যাংকে টাকা রাখছে, প্রভাবশালীরা ব্যাংকের টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবাই যেন এ বিষয়ে নজর দেন। আবার সাধারণ মানুষ আয়কর দিচ্ছে অথচ তা কোথায় যাচ্ছে তা তারা জানে না। ফলে মানুষ এ বিষয়েও আস্থা হারাচ্ছে। তাই আয়করের বিষয়টি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। সর্বোপরি দেশের অর্থনীতিকে আস্থার পরিবেশে আনতে হবে। আস্থা এলেই সর্বত্র স্বয়ংক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অর্থনীতির সমস্যাগুলো চিহ্নিত। অর্থমন্ত্রী নিজেও বলেছেন। তিনি বলেন, আলাদা আলাদাভাবে খাতগুলোকে ঠিক করতে চাইলে হবে না। সার্বিক অর্থনীতিকেই ঠিক করতে হবে।

এসআর
বিষয়: