ভুল প্রশ্নের দায় নেবে কে?

আগের সংবাদ

দিল্লির ভোটের বার্তা

পরের সংবাদ

বায়ান্নর পথ ধরে বাংলা ভাষা বিকশিত

ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ

কলাম লেখক ও গবেষক

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২০ , ৭:১১ অপরাহ্ণ

আজকের দিনে যে ইংরেজি ভাষা পৃথিবীর সব রাষ্ট্র ও জাতিতে স্থান করে নিয়েছে বা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে- সময়ের ব্যাপ্ত পরিসরে হয়তোবা আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলাও পৃথিবীর সব জাতি ও রাষ্ট্রের মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় ভাষা হিসেবে পৌঁছে যাবে এবং চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে। ক্রমে ক্রমে তা আন্তর্জাতিকতার মহিরুহে পরিণত হয়ে যথার্থ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হবে।

বাংলা বিশ্বের ২২ কোটি মানুষের মাতৃভাষা, বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা ও সরকারি ভাষা। এক কালের ‘ভাবের ভাষা’ একালের কাজের ভাষাও বটে। বাংলাদেশের সরকারি অফিস-আদালত, বেসরকারি অফিস, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রগুলো, সব পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় ও সমাজ জীবনের বিভিন্ন স্তরে বাংলা ভাষা বহুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, মননজীবী সবাই তাদের ধ্যান-ধারণায়, চিন্তা-চেতনায় ও কর্মজীবনে নানাভাবে বাংলা ভাষা ব্যবহার করছেন। এটা অত্যন্ত আনন্দ, সুখ ও গর্বের বিষয়। কেননা ভাষা স্থবির নয়, বরং জঙ্গম। তা প্রবহমান নদীর মতো দুক‚ল ছাপিয়ে চলে উদ্দাম গতিতে। পথে নানা স্থান থেকে সংগৃহীত হয় নানা উপকরণ, যা ভাষাকে সতত সমৃদ্ধ করে চলে। তাই ভাষার বহুমাত্রিক ও কলেবর ক্রমাগত বেড়েই চলে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, কালের পর কাল। যুগ যুগ ধরে ভাষা সমৃদ্ধশালী হয়। পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয় নতুন আঙ্গিক ও অবয়বে।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, রাষ্ট্রভাষা হলো মাতৃভাষারই বিকশিত রূপ। মাতৃভাষা মানুষ পারিবারিক ও সামাজিক গণ্ডির মধ্যে স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে অর্জন করে। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা সচেতন প্রয়াসে সৃষ্টি করতে হয় এবং তা শিক্ষা দ্বারা, সাধনা দ্বারা, পাণ্ডিত্যের দ্বারা, জ্ঞান-গরিমা নিয়ে অর্জন করতে হয়। রাষ্ট্র ব্যবস্থার অভ্যন্তরে রাষ্ট্রভাষাকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, সক্রিয় রাখতে হয় ও নিরন্তর সমৃদ্ধ করতে হয়। প্রশাসন ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা ও শিক্ষা ব্যবস্থার সম্ভবপর সব স্তরে রাষ্ট্রভাষাকে কার্যকর রাখতে হয়। চর্চার মাধ্যমে রাষ্ট্রভাষাকে ক্রমাগত বিকশিত করতে হয়। মনে রাখতে হবে যে, রাষ্ট্রের ভাষা আর দাপ্তরিক ভাষা এক নয়। মাতৃভাষার চর্চা বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের ক্ষুদ্র পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ থাকে। মাতৃভাষা দ্বারা জীবনকে বেশি উপভোগ করা যায়। আর মাতৃভাষাকে অবলম্বন করেই রাষ্ট্রভাষা গড়ে তোলা হয়। তবে মাতৃভাষার সঙ্গে রাষ্ট্রভাষার অনেক পার্থক্য ঘটে। আমাদের রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের স্পিরিট আর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের উদ্দেশ্য মোটেই এক নয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আয়োজনের মধ্যে আমরা যাতে আমাদের রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের স্পিরিটকে গুলিয়ে না ফেলি, সেজন্য আমাদের বিশেষ সতর্কতা দরকার। মাতৃভাষার ব্যবহার আজীবন আমরা আমাদের জীবনে চাই, সেই সঙ্গে চাই মাতৃভাষাকে ভিত্তি করে রাষ্ট্রভাষার প্রতিষ্ঠা ও প্রগতি। বাংলাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠিত রাখতে হবে এবং একে ক্রমাগত উন্নত করতে হবে।
বাংলা অনেক সমৃদ্ধ ভাষা। এর শব্দ ভাণ্ডার অফুরন্ত। রয়েছে নানা বৈচিত্র্য এবং মাধুর্য। শিক্ষিত সমাজ, শিক্ষকদের এবং গণমাধ্যমের জন্য একটি পরিমিত বাংলা ভাষা দরকার। শিক্ষকরা যদি নিজেই ভালো বাংলা না বলতে পারেন তাহলে শিক্ষার্থীদের শেখার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের গ্রামে এবং শহরে মাধ্যমিক এবং প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা পড়ানোর মতো ভালো কোনো শিক্ষক নেই। এটি একটি বড় সংকট। এক সময়ে স্কুলে পণ্ডিত মশাইরা ছিলেন যারা বাংলা পড়াতেন। শব্দের উৎপত্তি, বাংলা ব্যাকরণে তাদের ভালো দখল ছিল। রাজনৈতিক নানা কারণে সেই পণ্ডিত মশাইরা এখন দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। এসব শিক্ষক অত্যন্ত অধ্যবসায়ী ছিলেন। আমরা তথ্যপ্রযুক্তির ওপর জোর দিয়েছি তা ভালো কথা, তবে ভাষার দিকে কোনো খেয়াল নেই। এতে আমরা না পারছি ভালো বাংলা বা ইংরেজি শিখতে এবং বলতে। আমরা এখন দাবি করছি জাতিসংঘের ভাষা হবে বাংলা। সেজন্য যদি পরিভাষা তৈরি করতে না পারা যায়, তাহলে আমরা সমস্যায় পড়ব। এ জন্য আইন, বিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয়ের পরিভাষা তৈরি করতে হবে। কারণ জাতিসংঘ নানা আইন প্রণয়ন করে থাকে। বাংলাকে জাতিসংঘের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আগে আমাদের উচিত হবে বাংলাকে আরো সমৃদ্ধ করা। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার নিশ্চিত করার আগে জরুরি হলো আমরা শুদ্ধভাবে বাংলা বলতে এবং লিখতে পারি কিনা তা যাচাই করা। যারা বাংলায় লেখালেখি করেন তারা অবগত আছেন ব্যাকরণসম্মতভাবে বাংলা বাক্য তৈরি করা এবং শুদ্ধ বানানে বাংলা শব্দ লেখা কতটা কঠিন। প্রথমত, আমাদের কতকগুলো বিষয় আইনগত বাধ্যবাধকতার ভেতর নিয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের মনমানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির চরম আত্মোৎসর্গের চেতনা ধারণ করে বাংলাদেশের মানুষ অবিরাম সংগ্রাম করে চলেছে বাংলা ভাষাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার এক মহান ব্রতে। এই ভাষার দাবি কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল স্বাধিকারের আন্দোলন। এরই প্রেক্ষাপটে পরিচালিত হলো সশস্ত্র সংগ্রাম; অর্জিত হলো আমাদের মহান স্বাধীনতা। বাংলা ভাষাকে বিশ্বপরিমণ্ডলে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম কখনো থেমে ছিল না। অবশেষে ১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো কানাডা প্রবাসী বাঙালি তরুণদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এবং বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে একুশের চেতনা ধারণ করে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে স্বীকৃতি প্রদান করে। এরপর ২০০০ সালে ১৬ মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে মাতৃভাষাকে যথাযথ মর্যাদাসহকারে বিশ্বের প্রতিটি দেশ উদযাপন করবে। উল্লেখ করা হয় বিশ্বব্যাপী সব মানুষের ভাষার সুরক্ষা এবং উপস্থাপনার সুযোগ সৃষ্টি করাই হবে লক্ষ্য। এ হচ্ছে ভাষাপ্রেমিক বাঙালি জাতির বিশাল অর্জন। বহুমাত্রিক ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা ও সংস্কৃতির চর্চা এবং প্রশাসনিক পদ্ধতির প্রচলন করার এই আবেদন কতটা প্রয়োগ হবে এই নিয়ে সর্বত্র চলছে চিন্তাভাবনা। তবে বিলুপ্তির পথে অগ্রসর হওয়া ভাষাগুলোকে রক্ষা করতেই হবে। বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার ভাষা আছে। অনেক ভাষার কোনো লিপিমালা নেই। তারা হারিয়ে যাচ্ছে কালের গহ্বরে। কারণ তাদের বংশধররা বৃহৎ ভাষাভাষী এবং উন্নত লিপিমালায় সমৃদ্ধ ভাষাকে তাদের আপন করে নিয়েছে। হারিয়ে যাওয়ার পথে চলমান ভাষাকে রক্ষা করতে প্রত্যেক দেশ ও জাতির প্রতি আবেদন জানিয়েছে ইউনেস্কো। কিন্তু এ হচ্ছে এক গতিশীল ও প্রবাহমান ভাবধারা, যেখানে দেশ ও জাতি এবং সমাজ ও সমষ্টির প্রভাব বিশেষ ভ‚মিকা পালন করে। তাই দেখা যায় বাংলাদেশে প্রায় ৪৭টি ভাষা বিরাজমান থাকলেও কালের প্রভাবে আদিবাসীদের ভাষাকে বাংলা ভাষা প্রভাবিত করে চলেছে। আজকাল অনেকেই মনে করেন ইংরেজি জানা লোকরা হয়তোবা বাংলা ভাষার প্রতি তাদের অবজ্ঞা প্রদর্শন করেন। এটা কোনো প্রতিষ্ঠিত যুক্তি নির্ভর নয়। কেননা যারা নিজ মাতৃভাষা বা বাংলা ভাষায় সঠিক প্রয়োগ ও ব্যবহারে জানেন না তারা অন্য কোনো ভাষায় দক্ষতা বা পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন এ কথা বলা যাবে না। প্রথমেই মাতৃভাষার শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করে সে অন্য কোনো ভাষায় দক্ষ হতে পারেন। সুতরাং বাংলা ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণ, সঠিক ব্যবহার ও প্রয়োগ এবং সঠিক বানান রীতির ওপর বাঙালি হিসেবে সব বাঙালিকে অপরিহার্যভাবে যত্নবান হতে হবে। তাহলেই আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা একদিন আন্তর্জাতিক ভাষার মর্যাদা লাভ করতে সক্ষম হবে। আজকের দিনে যে ইংরেজি ভাষা পৃথিবীর সব রাষ্ট্র ও জাতিতে স্থান করে নিয়েছে বা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে- সময়ের ব্যাপ্ত পরিসরে হয়তোবা আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলাও পৃথিবীর সব জাতি ও রাষ্ট্রের মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় ভাষা হিসেবে পৌঁছে যাবে এবং চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে। ক্রমে ক্রমে তা আন্তর্জাতিকতার মহিরুহে পরিণত হয়ে যথার্থ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হবে।

এমএইচ