বায়ান্নর পথ ধরে বাংলা ভাষা বিকশিত

আগের সংবাদ

টিসিবির পেঁয়াজ কালোবাজারি, আটক ২

পরের সংবাদ

দিল্লির ভোটের বার্তা

বিভুরঞ্জন সরকার

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২০ , ৭:১৫ অপরাহ্ণ

মোদি-অমিত শাহরা দিল্লি দখলের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। অমিত শাহ নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন নির্বাচনী প্রচারের দায়িত্ব। মেরুকরণ ও বিভাজনের বিদ্বেষী প্রচারণা চালিয়েও শেষ পর্যন্ত দিল্লি বিজেপির অধরাই থেকে গেল। দিল্লির গরিষ্ঠ সংখ্যক ভোটার নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহের ধর্মকে ‘না’ বলে আঁকড়ে ধরেছে কেজরিওয়ালের কর্মকে। বিজেপির শাসন যে ভারতের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আলগা করে দিচ্ছে, এটা মানুষ টের পেতে শুরু করেছে।

ভারতের রাজধানী দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করেছে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দল আম আদমি পার্টি, এএপি বা আপ। টানা তৃতীয়বারের মতো দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে চলেছেন কেজরিওয়াল। এবার দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনকে মর্যাদার লড়াই হিসেবে নিয়েছিল ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপি। কেন্দ্রে ক্ষমতায় এই দল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার প্রধান মন্ত্রণাদাতা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের জন্য নানা কারণে দিল্লির নির্বাচন ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে ভারতের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী এই জুটির শোচনীয় হার হয়েছে দিল্লিতে।
দিল্লিতে আবার কেজরিওয়ালই ক্ষমতায় ফিরছেন- এটা বোঝা গিয়েছিল নির্বাচনী প্রচারণার গোড়া থেকেই। মানুষ কেজরিওয়ালের শাসনকালে উপকার পেয়েছে। কেজরিওয়াল কেবল প্রতিশ্রুতির রাজনীতি করেননি, বাস্তবায়নের রাজনীতি করেছেন। নাগরিক পরিষেবার দৃশ্যমান উন্নতি তিনি করেছেন। নিখরচায় দরিদ্র মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছেন। ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ বিল মওকুফ করেছেন। গরিব মানুষ ৭০০ লিটার পানি পেয়েছে বিনা পয়সায়। নারীদের জন্য বিনা ভাড়ায় গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু, চিকিৎসাসেবার উন্নতি, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মান উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ে যারা সরাসরি উপকারভোগী তারা কেজরিওয়াল ছাড়া আর কারো হাতে দিল্লি শাসনের ভার যাক তা চায়নি। সাধারণ মানুষের কাছে আস্থা অর্জন করা যে ভোটের রাজনীতিতে একটি বড় উপাদান, সেটা দিল্লির নির্বাচন স্পষ্ট করেছে।
মোদি-অমিত শাহরা দিল্লি দখলের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। অমিত শাহ নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন নির্বাচনী প্রচারের দায়িত্ব। মেরুকরণ ও বিভাজনের বিদ্বেষী প্রচারণা চালিয়েও শেষ পর্যন্ত দিল্লি বিজেপির অধরাই থেকে গেল। নির্বাচনী যুদ্ধে জেতার জন্য বিজেপি প্রধান হাতিয়ার বেছে নিয়েছিল ধর্মকে। হিন্দুদের জন্য হিন্দুস্তান, এটাই তারা সামনে এনেছিল। কিন্তু দিল্লির গরিষ্ঠ সংখ্যক ভোটার নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহের ধর্মকে ‘না’ বলে আঁকড়ে ধরেছে কেজরিওয়ালের কর্মকে। বিজেপির শাসন যে ভারতের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আলগা করে দিচ্ছে, এটা মানুষ টের পেতে শুরু করেছে।
দিল্লিকে বলা হয় ‘মিনি ভারত’। কারণ দিল্লিতে ভারতের সব রাজ্যের, সব ধর্মের, সব ভাষার মানুষের বাস। দিল্লিতে মাত্র ৭টি সংসদীয় আসন হলেও এখানকার ভোটের ফলাফলকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়- সারা ভারতের জনমতের প্রতিফলন দিল্লিতে পাওয়া যায় বলেই। মাত্র ৮ মাস আগে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে দিল্লির ৭টি সংসদীয় আসনই বিজেপির দখলে গিয়েছিল। ভোটের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে ছিল কংগ্রেস। আম আদমি পার্টি ছিল তৃতীয় স্থানে। জাতীয় নির্বাচনের ওই ফলাফলের ওপর অঙ্ক কষেই মোদি-শাহ দিল্লি জয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাদের অঙ্কে ভুল ছিল। বিধানসভা নির্বাচনের ফল হয়েছে সংসদ নির্বাচনের উল্টো। বিধানসভায় আম আদমি প্রথম, বিজেপি দ্বিতীয় এবং কংগ্রেস প্রায় বিলীন হয়েছে। বিজেপি হয়তো ভেবেছিল, হিন্দু ভোট যেহেতু বেশি, সেহেতু হিন্দুত্ববাদের স্লোগান তুললেই তারা অনায়াসে ভোটের বৈতরণী পার হয়ে যাবে।
বিজেপির মুসলিম বিদ্বেষী আগ্রাসী প্রচারণা মুসলিম ভোটারদের ঐক্যবদ্ধ করেছে। কেজরিওয়ালের বিজয়ের উজ্জ্বল সম্ভাবনা লক্ষ করে মুসলিম ভোটাররা তাদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে এনেছে কেজরিওয়ালের নাম। কংগ্রেস কিংবা বামপন্থিদের দিয়ে বিজেপিকে রোখা যাবে না, বুঝতে পেরে মুসলিম ভোটাররা একদিকে ঝুঁকে পড়েছে। কেজরিওয়াল যে মুসলিম ভোট একচেটিয়া পেয়েছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মুসলিম ভোট একদিকে জমাট হলেও হিন্দু ভোট কিন্তু সেটা হয়নি। ভারতকে যারা ধর্ম রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চান না, যারা মনে করেন ধর্মীয় বিভাজনের কারণে ভারত রাষ্ট্রের সংহতি ও স্থিতি ঝুঁকির মুখে পড়বে তারা বিজেপিকে ভোট দেয়া বিপজ্জনক মনে করেছে। ফলে হিন্দু ভোট সব বিজেপির পক্ষে যায়নি। এমনকি যে ভোটার মোদি নীতিতে আস্থাবান, তিনিও দিল্লিতে কেজরিওয়ালকেই ভোট দেয়া যুক্তিসঙ্গত মনে করেছেন। কেজরিওয়াল মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন তার কাজের মাধ্যমে। একদিকে তিনি উন্নয়ন করেছেন, অন্যদিকে কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে পেরেছেন। দুর্নীতির অপবাদ তার গায়ে লাগেনি। বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে এটা একটি বিরল ঘটনা। আজকাল রাজনীতিবিদরা যে আস্ফালনের রাজনীতি করেন, সেক্ষেত্রেও কেজরিওয়াল ব্যতিক্রম। তিনি রাজনীতিতে এসেছেন একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে। তিনি আগাগোড়া রাজনীতির মানুষ ছিলেন না। রাজনীতিক হওয়ার স্বপ্নও ছিল না। ভালো এবং নিরাপদ সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি রাজনীতির অনিশ্চিত পথে পা রেখেছেন মানুষের জন্য ভালো কিছু করার লক্ষ্য নিয়ে। প্রথম দিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি প্রচার আন্দোলন শুরু করেছিলেন গান্ধীবাদী নেতা আন্না হাজারের সহযোগী হিসেবে। কথায় ও কাজে তার মধ্য ভিন্নতা না দেখেই মানুষ তার সমর্থক হয়েছে। নির্বাচনে হ্যাটট্রিক জয়ের পেছনে এর বাইরে কোনো গোপন রহস্য নেই। ৮ ফেব্রুয়ারি বুথফেরত জরিপের ফলই বলে দিয়েছিল যে ১১ ফেব্রুয়ারি গণনায় কী হবে। কিন্তু আম আদমি পার্টি বা কেজরিওয়ালের ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিল বিজেপি। সব জনমত জরিপের ফল যখন আম আদমি পার্টির পক্ষে, তখনো বিজেপির দায়িত্বশীল নেতারা দাবি করেছেন যে ৪৮ আসনে জিতে সরকার গঠন করবেন তারাই। জনমত জরিপ নাকি ঠিকঠাক মতো হয়নি বা তাতে প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন ঘটেনি। কিন্তু ভোট গণনা শুরু হওয়ার প্রথম মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে বিজেপির দিল্লি শাসনের সাধ পূরণ হচ্ছে না। ৭০ আসনের বিধানসভায় বিজেপি পেয়েছে মাত্র ৮টি আসন। আম আদমি পার্টির সংগ্রহ ৬২ আসন। গতবারের তুলনায় আম আদমি পার্টির আসন সামান্য কমেছে, বিজেপির আসন বেড়েছে। বিজেপির ভোটের হারও বেড়েছে ৬ শতাংশের মতো। ভোট ও আসন কিছু বাড়া ছাড়া এই নির্বাচনে বিজেপির বড় কোনো অর্জন নেই। তাদের যে বিভাজনের রাজনীতি তার প্রতি সমর্থন জানায়নি দিল্লিবাসী। বিজেপির নির্বাচনী প্রচার ছিল হিন্দুস্তান-পাকিস্তান, হিন্দু-মুসলমান তথা উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী ধারায়। ধর্মের কার্ড ব্যবহার করে বিজেপির উত্থান হলেও এই কার্ড ব্যবহার করে তারা আর কতদূর যেতে পারবে, সে প্রশ্ন এখন অনেকের মধ্যেই দেখা দিয়েছে। গত নির্বাচনে ব্যাপক জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছেন নরেন্দ্র মোদি। সরকার গঠনের পর একের পর এক এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে যা ভারতের ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িক বা ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মিরে এক বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। সেখানে উন্নয়ন ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে যেসব কথা বলা হয়েছিল তার কিছুই এখনো বাস্তবের মুখ দেখেনি। বরং কাশ্মিরে জনজীবন অচল হয়ে পড়েছে। কাশ্মিরি নেতাদের গ্রেপ্তার করে রাখা হয়েছে। কাশ্মিরের পর আদালতের মাধ্যমে অযোধ্যায় রামমন্দির সমস্যার যে সমাধান করা হয়েছে তা যেমন মুসলমানদের খুশি করেনি, তেমনি যুক্তিবাদী প্রগতিবাদী উদারমনা হিন্দুদেরও অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছে। জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি এবং সংশোধিত নাগরিক আইন বা সিএএ নিয়ে ভারতজুড়ে চলছে ব্যাপক আন্দোলন। বিজেপি সরকারের এসব কর্মকাণ্ড যতটা না জনসমর্থন পেয়েছে, তার চেয়ে বেশি পড়েছে বিরোধিতার মুখে। সংশোধিত নাগরিক আইন এবং এনআরসি বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। যেসব রাজ্যে অকংগ্রেসী সরকার আছে সেসব রাজ্য বিধানসভায় সিএএবিরোধী প্রস্তাব পাস হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, কেরালাসহ কয়েকটি রাজ্য এই বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজপথে নেমে উথাল-পাতাল অবস্থা তৈরি করেছিলেন। বিজেপির মিত্রদের মধ্যেও সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন নিয়ে মতৈক্যের অভাব দেখা গেছে। এই আইন পাসের পর যে কয়টি রাজ্যে ভোট হয়েছে সেগুলোতে বিজেপি হেরেছে।
দিল্লির নির্বাচনী প্রচারে বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল কেজরিওয়ালকে ভোট দিলে ভারত নাকি পাকিস্তান হয়ে যাবে। কেজরিওয়ালকে ‘সন্ত্রাসী’ বলেও আখ্যায়িত করা হয়েছিল। দিল্লির শাহিনবাগে মুসলিম নারীদের টানা অবস্থান নিয়েও অনেক বিষোদগার করেছিল বিজেপি। কিন্তু এসব ভিত্তিহীন প্রচার-অপপ্রচার ভোটারদের যে তেমন প্রভাবিত করেনি, সেটা ফলাফল থেকেই বোঝা যায়। বিজেপির উসকানিমূলক প্রচারণার কোনো জবাব দিতে যাননি কেজরিওয়াল। তাকে ফাঁদে পা দিতে প্ররোচিত করা হলেও তিনি ছিলেন শান্ত। অন্যের সমালোচনা বা নিন্দা-মন্দ না করে তিনি ভোটারদের কাছে পাঁচ বছরে কী করেছেন, সে সবই তুলে ধরেছেন। মানুষ দেখেছে তিনি ফাঁকা বুলি কপচান না। একজন আপাদমস্তক নিরহংকার ঘরের মানুষের মতো আচরণে অভ্যস্ত কেজরিওয়ালকে দিল্লির মানুষ বুকে টেনে নিয়েছেন, পিঠ দেখাননি। রাজনীতির বিদ্বেষী আবহাওয়ায় এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম কেজরিওয়াল। আর তার পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন প্রশান্ত কিশোর (পি কে) নামের একজন ভোট-কুশলী বা ইলেকশন স্ট্র্যাটেজিস্ট। পি কের পরামর্শ কেজরিওয়ালের বিজয়ের পথ সুগম করেছে বলে ভারতের গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর কেজরিওয়াল বলেছেন, ‘দিল্লির মানুষ এক নতুন রাজনীতির জন্ম দিল। সেটা উন্নয়নের রাজনীতি, কাজের রাজনীতি।’ দিল্লির পরাজয় বিজেপির জন্য বড় শিক্ষা হয়ে উঠবে বলে মনে হচ্ছে। মোদি এবং অমিতের যাত্রাপথ অপ্রতিরোধ্য এবং অমিত শাহ হলেন চানক্য বুদ্ধির অধিকারী বলে যে ড্রাম পেটানো হচ্ছিল, দিল্লি তা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ধর্মের রাজনীতি, নাকি কর্মের রাজনীতি- এ জিজ্ঞাসার উত্তর না খুঁজে বিজেপি সামনে এগোতে পারবে বলে মনে হয় না।

এমএইচ