তিনি আমাদেরই লোক

আগের সংবাদ

বাঙালির প্রতিবাদের প্রতীক বইমেলা

পরের সংবাদ

শ্রদ্ধাভাজন আপনজন

সুব্রত বড়ুয়া

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০ , ৭:৫৭ অপরাহ্ণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা সম্পর্কে যারা জানেন তাদের কাছে এটি অজানা নয় যে কার্জন হল থেকে কলাভবনের দূরত্ব খুব বেশি নয়, তবু এ দুটি জায়গা দুই ভুবন তো বটেই, অন্তত অধীতব্য বিষয়গুলোর বিবেচনায়। গত শতকের ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে অনার্সের পাট চুকিয়ে ঢাকায় এসে স্নাতকোত্তর শ্রেণির দ্বিতীয় অর্থাৎ শেষ পর্বে ভর্তি হয়েছিলাম। কার্জন হলই আমার ঠিকানা। আবাসস্থল জগন্নাথ হল। আমাদের ক্লাস হতো কার্জন হল ক্যাম্পাসে। সকালবেলায় থিওরি বা তত্ত্বীয় ক্লাস, বিকেলে প্র্যাকটিক্যাল। প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস অবশ্য প্রতিদিন থাকত না, সেজন্য বিকেলে কিছুটা অবসর মিলত। সেই সময়ে যাওয়া হতো নিউমার্কেটে, কয়েকজন দলবেঁধে। তাই কলাভবনে তেমন একটা যাওয়া হতো না। মাঝেমধ্যে যেতাম অবশ্য পাবলিক লাইব্রেরির পাঠকক্ষে। সেখানে পদার্থবিদ্যার কিছু পাঠ্যবই ছিল। কার্জন হলের বিজ্ঞানের লাইব্রেরিতে গিয়ে স্লিপ দিলেই উত্তর আসত-প্রার্থিত বই ইস্যু হয়ে গেছে আগেই, এখনো ফেরত আসেনি। বই পাওয়া যেত না। বইয়ের দোকানেও নয়। সেজন্য পাবলিক লাইব্রেরির অল্প কয়েকটি বই-ই ছিল ভরসা।

ইতোমধ্যে লেখালেখি এবং নতুন পরিচয়ের সূত্রে কলাভবনের কয়েকজনের সঙ্গে কিছুটা হৃদ্যতাও গড়ে উঠেছিল। তাছাড়া, লাইব্রেরি ভবনের উত্তর পাশে শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনও ছিল একটা ভালো আকর্ষণের জায়গা। সেখানে তরুণ কবি ও লেখকেরা তখন আড়া দিতেন। কারো না কারো সঙ্গে দেখা হয়েই যেত। অতএব সারাদিন যেখানে থাকি না কেন, দিনে অন্তত একবার শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে ঢুঁ মারা আমাদের নিত্যকার অভ্যেসে পরিণত হয়েছিল। নানারকম আলাপের মধ্যে বাংলা বিভাগের বন্ধুদের কাছে তাদের প্রিয় শিক্ষকদের সম্পর্কে অনেক কথা শুনতাম। মুনীর চৌধুরী তো তখনই কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। তার পড়ানোর অনুকরণীয় গুণের জন্য। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সম্পর্কে তখন শুনেছিলামÑ তিনি বিভাগের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন এবং অন্যদের চেয়ে কম বয়সে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন (মাত্র ২৫ বছর বয়সে)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সাহেবের সঙ্গে কখনো দেখা হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। তেমন কিছু আমার স্মৃতিতে নেই।
১৯৬৯ সালের ৩ জুন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দেন। এই সময়ে তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের কথা আমার মনে আছে, কারণ সে দিনটি কখনো ভুলে যাওয়ার মতো নয়। এই দিনটিতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ প্রফেসর মুহম্মদ আবদুল হাই ঢাকায় এক রহস্যময় ট্রেন দুর্ঘটনায় মৃত্যুমুখে পতিত হন।
সেদিন বিকেলে চট্টগ্রামে ফিরিঙ্গিবাজারস্থ আর্ট প্রেসে গিয়েছিলাম আমি। ‘বইঘর’-এর স্বত্বাধিকারী সৈয়দ মোহাম্মদ শফির সঙ্গে দেখা করতে। এই সময়ে ঢাকা থেকে একটি টেলিফোন এল। শফি ভাই টেলিফোন ঘরে কথা বললেন। তার মুখে বিষাদের ছায়া। কাছে এসে খুবই অনুচ্চকণ্ঠে বললেন, ‘হাই স্যার মারা গেছেন। গোরা এইমাত্র ফোন করে জানাল। গোরা মানে এখলাস ভাই।’ একটু পর শফি ভাই বললেন, ‘চলুন, আনিসুজ্জামান স্যারের সঙ্গে দেখা করে আসি। উনি তো এখন এখানে।’
শফি ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর গাড়িতে করে আনিস স্যারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম তার আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু রেলওয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এ এফ এম আবদুল জলিল সাহেবের বাসায়। আনিস স্যার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস-কোয়ার্টারে যাওয়ার আগে সেই বাসাতেই থাকছিলেন। সম্ভবত সেদিনই অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সঙ্গে আমার প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ ও পরিচয়। তবে প্রথম সাক্ষাৎ থেকেই তিনি আমাকে এমনভাবে গ্রহণ করেছিলেন যেন আমি তার সরাসরি ও প্রিয় ছাত্রদের একজন এবং দীর্ঘকালের চেনা।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ১৯৬৯ সালের ৩ জুন থেকে ১৯৮৫ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। এই সময়ে চট্টগ্রাম বিভাগের বাংলা বিভাগের তৎকালীন অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসানকে কেন্দ্র করে সাহিত্যবিষয়ক আলোচনার একটি বলয় তৈরি হয়েছিল। তাঁর বাসায় তখন অনেকেই যেতেন। সেখানে এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন সাহিত্য-সংস্কৃতিবিষয়ক অনুষ্ঠানে প্রায়ই দেখা হতো। এভাবেই তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ক্রমশ বাড়তে থাকে। আমার কখনো মনেই হতো না যে তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক নন।
১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথমদিকে বাংলা একাডেমির চাকরি নিয়ে আমি ঢাকায় চলে আসি। এরপর মুক্তিযুদ্ধকালে আনিস স্যারের সঙ্গে দেখা হয় প্রথমে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় ও পরে কলকাতায়। পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (ইংরেজিতে রচিত) বাংলা অনুবাদের চ‚ড়ান্ত রূপদানের কাজে তার নেতৃত্বে অংশ নিয়েছিলাম। এই অনুবাদকর্মের সঙ্গে আরো সংশ্লিষ্ট ছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক আহমেদ হুমায়ুন, জাতীয় সংসদে বিতর্ক-সম্পাদক ও বিশিষ্ট অনুবাদক নেয়ামাল বাসির, গল্পকার বশীর আলহেলাল, সুদক্ষ অনুবাদক হাবীব-উল-আলম প্রমুখ। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান কাজটি তত্ত্ববধান করেছিলেন এবং অত্যন্ত যত্ন ও পরিশ্রমের সঙ্গে অনুবাদকর্মটি সম্পাদনা করে দিয়েছিলেন। সেই সময়ে একদিন তিনি আমাকে একান্তে বলেছিলেন, হুমায়ুন ও তোমার অনুবাদ ভালো হয়েছে। কেবল এইটুকুই। এরপর এ প্রসঙ্গে আর কোনোদিন কোনো কথা বলেননি। আমার মনে হয়, এটিই তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। সুমিত উচ্চারণে নিজের মনের ভাবটি প্রকাশ করা। উচ্ছ্বাস বা বাহুল্য নৈবচ।
দ্বিতীয়বার অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ হয় বাংলা একাডেমির বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ২য় খণ্ডের (২০০৮ সালের জুন মাসে প্রকাশিত) মুদ্রণ পর্যায়ের সম্পাদনাকালে। বইটির প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯৮৭। পরবর্তীকালে দ্বিতীয় খণ্ডের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করার জন্য নির্দিষ্ট লেখকদের প্রবন্ধসমূহ সংগৃহীত হলেও সেটি প্রকাশিত হতে বিলম্ব ঘটে। অবশেষে সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ একাডেমির মহাপরিচালক থাকার সময়, দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর পর, সেটি মুদ্রণের চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ শুরু হয়। পাঁচ খণ্ডে প্রকাশিতব্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থটির প্রধান সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। দ্বিতীয় খণ্ডের মুদ্রণ সম্পাদনা কাজে আমাকে সম্পাদনা সহযোগী নিযুক্ত করা হয়। সপ্তাহের নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন আনিস স্যার ও আমি এ কাজটি করতাম। এ সময় আমি স্যারের নির্দেশে প্রতিটি কাজ করেছি। তখন দেখেছি কী অসাধারণ নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজটি তিনি করতেন। তখন তাঁর কাছ থেকে কত কিছুই না শিখেছি। মনে পড়ছে তাঁর লেখা মুনীর চৌধুরী বইটি পড়তে গিয়ে চোখ অশ্রুসজল হয়েছে বারবার। তিনি আমাদের মধ্যে যতদিন থাকবেন, ততদিন তার মানবিক গুণ ও হৃদয়ের সুবাসে আমরা নিরন্তর আমোদিত হব নিঃসন্দেহে।