মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় সচেতনতা

আগের সংবাদ

বিজয়ী ট্রাম্পের আরো অনাচারী হওয়ার সম্ভাবনা

পরের সংবাদ

বই, বইমেলা

মজিবর রহমান

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০ , ৫:৫৪ অপরাহ্ণ

বইমেলার রূপকার হিসেবে সরদার জয়েনউদ্দীনের নাম সবার আগে আসে। গ্রন্থপ্রেমী এই মানুষটি বইমেলার আয়োজনকে জ্ঞান প্রসারের আন্দোলন মনে করতেন এবং সেই আন্দোলনকে তৃণমূলে ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট ছিলেন। ন্যাশনাল বুক সেন্টার অব পাকিস্তানে কর্মরত থাকা অবস্থায় তারই উদ্যোগে ১৯৬৪ সালে ঢাকায় প্রথম আয়োজিত হয়েছিল বইমেলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার ভবনে। ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জেও তিনি এ ধরনের একটি বইমেলার আয়োজন করেন নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সহায়তায়।
স্বাধীনতার পর জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক নিযুক্ত হলে সরদার জয়েনউদ্দীনের সুযোগ প্রসারিত হয়। স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি আর কালবিলম্ব করেননি। ১৯৭২ সালকে ইউনেস্কো গ্রন্থবর্ষ ঘোষণা করে। এ উপলক্ষে সরদার জয়েনউদ্দীন তার প্রতিষ্ঠান জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে বাংলা একাডেমিতে আয়োজন করেন আন্তর্জাতিক বইমেলার। এ সময় একাডেমির দেয়ালের বাইরে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রগতি প্রকাশনীর কিছু বই নিয়ে পসরা সাজান স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের রুহুল আমিন নিজামি। পরদিন যোগ দেন মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা ও বর্ণমিছিলের তাজুল ইসলাম। [তথ্যসূত্র : প্রথম আলো, ৩১ জানুয়ারি ২০২০]। বইমেলার সূত্রসন্ধানী আলোচনায় চিত্তরঞ্জন সাহার নামটি আগে আসে আমাদের প্রকাশনা জগতে দীর্ঘ সময়জুড়ে তার মূল্যবান অবদানের জন্য। তবে সরদার জয়েনউদ্দীনকে কখনো ভুললে চলবে না।
কালক্রমে ঢাকার এই বইমেলা রূপান্তরিত হয় বাংলা একাডেমির একুশে বইমেলায়। বাংলা একাডেমি এর আয়োজক। দিন দিন এই মেলা প্রসারিত হয়ে আজকের দিনে মহিরুহের রূপ ধারণ করেছে। বাংলা একাডেমি চত্বরে এখন আর স্থান সংকুলান না হওয়ায় বইমেলা প্রসারিত হয়েছে পার্শ্ববর্তী সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অবধি। সেই উদ্যানটিও এবার পূর্ণ হয়ে গেছে প্যাভিলিয়ন আর স্টলে। অজস্র বই সেখানে। বিক্রেতার পাশাপাশি দর্শনার্থী ও ক্রেতার কমতি নেই। প্যাভিলিয়ন ও স্টল মালিকদের কারো কারো অসন্তুষ্টি থাকলেও বলতেই হবে এবারের মেলা অনেক গোছালো ও ঘোরাফেরায় আরামদায়ক। স্বাধীনতা স্তম্ভের লেকপাড় পর্যন্ত মেলা প্রসারিত। বেচাবিক্রি বিবেচনায় লেকপাড়ের প্রান্তদেশে অবস্থান নিয়ে কোনো কোনো বিক্রেতার কিছুটা অসন্তোষ থাকলেও সার্বিক বিবেচনায় সে জায়গাটিই বরং দৃষ্টিনন্দন বেশি। খোলামেলা পরিবেশে মুগ্ধ হওয়ার মতো।
বাংলাদেশের এই একুশে গ্রন্থমেলা আন্তর্জাতিক পরিসরে বেশ খ্যাতি কুড়িয়েছে। একে যদি আমরা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য জীবনদানের মাহাত্ম্যের প্রকাশ বলি তাতে অত্যুক্তি হবে না। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের আবেগের মেলা এটি।
বইয়ের পসার সাজানোর এমন আসর কেবল ঢাকায় নয়, সর্বত্রই দৃশ্যমান হওয়া উচিত। বইমেলার স্বপ্নদ্রষ্টা সরদার জয়েনউদ্দীন সে রকমটিই চেয়েছিলেন। কাজও শুরু করেছিলেন ঢাকার বাইরে এর বিস্তারের জন্য। ১৯৭৮ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদ থেকে দুঃখজনকভাবে অব্যাহতি প্রাপ্তির পর তার স্বপ্ন অধরা থেকে যায়।
সরদার জয়েনউদ্দীন ১৯৭২ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের টিপিক্যাল প্যারাডক্স হচ্ছে যে যাদের বই কেনার পয়সা আছে, তাদের বই পড়ার ইচ্ছে নেই। যাদের বই পড়ার চাহিদা আছে, তাদের বই কেনার ক্ষমতা নেই।’ ৪৮ বছর পরও একই বাস্তবতা বিরাজমান দেশে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরং পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আগে বিবাহের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে বই উপহার দেয়ার রেওয়াজ ছিল। শহর তো বটেই, গ্রামাঞ্চলেও কিছুটা লেখাপড়া জানা পরিবারে উপহার হিসেবে বইয়ের দেখা মিলত। এসব বইয়ের অধিকাংশ ছিল কথাসাহিত্য, বিশেষ করে জনপ্রিয় উপন্যাস। এখন কালেভদ্রে উপহার সামগ্রী হিসেবে বইয়ের দেখা মেলে, তবে সেগুলোর সবই প্রায় ধর্মীয় পুস্তকাদি।
বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার বেশ উন্নতি হয়েছে ইতোমধ্যে। ভোগের মাত্রা বেড়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বেড়েছে অপচয় ও বিলাসব্যসন ব্যয়। কিন্তু বইয়ের পেছনে ব্যয় বাড়েনি সে তুলনায় মোটেও। পরিবার প্রধান এ নিয়ে ভাবছেনই না। অথচ সন্তান-সন্ততিদের সঠিক পথে রাখার কী মোক্ষম প্রতিষেধকই না এই বই! এ কথার পুনরোল্লেখ নিষ্প্রয়োজন যে বই মানুষকে মানুষ করে, বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করে সন্তানকে। অভিভাবকরা বোঝেন হয়তো সবই, কিন্তু বই কেনার ব্যাপারে পকেটে হাত দিতে চান না কিংবা উৎসাহিত করেন না তাদের। সবাই জানি, বিরূপ পরিপার্শ্বের ভেতর এ যুগের সন্তানরা বড় হচ্ছে। খেলার মাঠ নেই, নেই সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ। পরিবেশগত কারণে বখে যাওয়ার শঙ্কা আছে। আবার গৃহকোণে বন্দি থেকে ভুগতে পারে নিঃসঙ্গতার জ্বালায়। এ অবস্থায় পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নির্ভার হতে পারতেন অভিভাবকরা। দুঃখের বিষয় সে পথে যাচ্ছেন না তারা।
বইমেলার চিত্র অনেকটা ভিন্ন ধাঁচের। অভিভাবকরা চান বা না চান, নবীনদের আনাগোনাই সেখানে বেশি। নবীন ক্রেতা, নবীন লেখক ও লেখক হয়ে উঠতে ইচ্ছুকদের ব্যাপক উপস্থিতি চোখে পড়ে মেলায়। নবীনের উপস্থিতি অবশ্যই ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক। তবে লেখক হয়ে ওঠার আগেই অনেকের টাকার বিনিময়ে বই প্রকাশের আগ্রহ পীড়াদায়ক। প্রকাশকদের একাংশ এর সুযোগ নিচ্ছেন, অতিরিক্ত টাকা আদায় করে বই ছেপে দিচ্ছেন বিক্রির দায়িত্ব না নিয়ে। মান বিচার তো করছেনই না। এ রকম প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে, যা কাম্য নয় কোনোমতেই। শোনা যায়, অনেক নামিদামি প্রকাশকও লোভে পড়ে এ কাজে জড়িয়ে পড়ছেন। প্রকৃতই লেখক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা যাদের আছে তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টা না হয় মেনে নেয়া যায়, কিন্তু যাদের সম্ভাবনা নেই আদৌ তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে বই ছেপে লাভবান হওয়া অন্যায়।
বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে উজ্জ্বল-অনুজ্জ্বল দুই রকম বৈশিষ্ট্যই দৃশ্যমান। উজ্জ্বলতার দিক হলো প্রকাশিত বইয়ের অঙ্গসৌষ্ঠব। কাগজ, ছাপা, বাঁধাই, প্রচ্ছদ বেশ আকর্ষণীয়। আর অনুজ্জ্বল দিক হলো ভুলের সমারোহ। বানান, বাক্যসহ ভুলের অন্ত নেই একেকটিতে। তথ্যগত ভুলও আছে। এর প্রধান কারণ হাতেগোনা কয়েকজন প্রকাশক বাদে বাকিদের কোনো সম্পাদক বা সম্পাদকীয় বোর্ড নেই, নেই প্রুফ দেখাসহ বিশেষায়িত কাজের জন্য আলাদা লোকবল। এটি যে কত বড় ধরনের দুর্বলতা তা মাথায় নেই তাদের অথবা থাকলেও তারা বিষয়টি গ্রাহ্যের মধ্যে নেন না। পাঠকের কাছে একেকটি বই মানে একেকটি প্রামাণ্য দলিল এ কথা কে বোঝাবে তাদের?
বাংলা একাডেমির একুশে গ্রন্থমেলা নিঃসন্দেহে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে সাহিত্যের পরিপুষ্টি সাধনে। একে ঘিরে লেখক তৈরি হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে পাঠক। মেলা উপলক্ষে প্রকাশিত হয়ে চলেছে হরেক রকমের অজস্র বই, তাতে আমাদের সাহিত্যের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হচ্ছে। দেশের ভাবমূর্তিও বাড়ছে। ঢাকার এই মেলা ক্রমে আরো সমৃদ্ধ হোক, সবার প্রত্যাশা তা-ই। ইন্টারনেটের এই যুগে যেখানে নতুন প্রজন্ম প্রিন্ট কপির পরিবর্তে কম্পিউটার-মোবাইলের স্ক্রিন ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে এবং সবকিছুর সংক্ষিপ্ত রূপ খুঁজছে সেখানে এ ধরনের মেলার আবশ্যকীয়তা অশেষ। সাহিত্যের জন্য বইয়ের বিকল্প নেই এই স্লোগানটিই উচ্চকিত হচ্ছে যেন সব আড়ম্বরের মধ্য দিয়ে। এতটা আড়ম্বরপূর্ণ সম্ভব না হলেও কম আড়ম্বরের মেলা হোক দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে, স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায়। সেটিই এ মুহূর্তে কাম্য।
প্রকাশনার নানা সীমাবদ্ধতার কথা বলছিলাম। মুদ্রণপ্রমাদ, বাক্যবিন্যাসসহ বিবিধ ভুলে জরাগ্রস্ত থাকে কোনো কোনো বই। থাকে তথ্যবিভ্রাট। ক্লাসিকগুলোর দশা আরো করুণ। আদিরূপের সঙ্গে বর্তমান রূপ মেলালে প্রকৃতটিকে চেনাই যায় না অনেক ক্ষেত্রে। সম্পাদনার অভাব, অসতর্কতা ও তাড়াহুড়ার কারণে এমনটি ঘটছে। মেলায় বই প্রকাশ নিয়ে একটা স্থূল প্রতিযোগিতা আছে আমাদের প্রকাশকদের ভেতর। তাড়াহুড়ার কারণে অনেক বই নষ্ট হচ্ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশের প্রকাশনা শিল্পের একটা বড় অংশ জরাগ্রস্ততায় আক্রান্ত। এর প্রতিকার দরকার সৌকর্যের স্বার্থে। সংখ্যা নয়, মানবিচার জরুরি হয়ে উঠছে এ সময়ে। সীমাবদ্ধতা কীভাবে উতরানো যায় তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা ভাববেন আশা করি, ভাবতে অনুরোধ করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। আমরা আমজনতা বিষয়টি নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হতে পারি। তাতে যদি জরাগ্রস্ত প্রকাশকরা শোধরান ভালো।

মজিবর রহমান : কলাম লেখক।
ই-মেইল : [email protected]