আমাদের শিক্ষক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

আগের সংবাদ

শ্রদ্ধাভাজন আপনজন

পরের সংবাদ

তিনি আমাদেরই লোক

সেলিনা হোসেন

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০ , ৭:৪৭ অপরাহ্ণ

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে ৮৪তম জন্মদিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করি। আমাদের সমাজ ও সমকাল উভয়ের জন্যই আনিসুজ্জামানকে বড়বেশি প্রয়োজন। এ বয়সে তিনি তারুণ্যের আলোকচ্ছটায় দীপ্যমান! সেই আলোর স্পর্শেই নিজেদের আলোকিত করে নিতে চায় তরুণ প্রজন্ম। যে মানুষ তাঁর জীবনব্যাপী সাধনায় এই দেশ ও জাতির জন্য অনন্য অবদান রেখে আমাদের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছেন, সেই অর্জনকে স্থায়ী করে রাখার দায়িত্ব তো তরুণ প্রজন্মেরই। না হলে ক্ষতি হবে তাদেরই, যারা ঐতিহ্যের বিনির্মাণে ইতিহাসকে ধরে রাখতে পারে না। আনিসুজ্জামানের জীবনকে এজন্যই গভীর যত্ন ও মনোযোগসহকারে পাঠ করা প্রয়োজন। শুধু বিদ্যাচর্চা নয়, সমাজের অন্যায়-অবিচার রুখতে তিনি সমকালের প্রতিবাদ-প্রতিরোধে যুক্ত হয়েছেন। সময়ের শুভ ও কল্যাণের জায়গাকে ধারণ করেছেন। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের বিকাশকে গতি দিয়েছেন। গণসচেতনতাকে শ্রদ্ধা করেছেন। জ্ঞানের চর্চায় শিক্ষার ক্ষেত্রকে আলোকিত করেছেন।
আনিসুজ্জামান একজন পূর্ণ আধুনিক মানুষ। আধুনিকতার প্রতিটি বিষয় তাঁর চরিত্রের ভেতরে গভীরভাবে বিরাজিত। তিনি মুক্তচিন্তার মানুষ; সংস্কৃতির বহুত্ববাদে বিশ্বাসী, অসাম্প্রদায়িক, নিজের ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, প্রগতিশীল চিন্তায় স্নাত। এমন আধুনিক চিন্তার মানুষ সমাজ-পরিমণ্ডলে খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। যে কেউ তাঁর কাছে আধুনিকতার পাঠ গ্রহণ করতে পারে। এর জন্য শ্রেণিকক্ষের দরকার হয় না। তার লেখা, বলা এবং আচরণের দিকে চোখ খুলে রাখলেই শেখা হয়ে যায়।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ইতিহাসের মানুষ। একুশ এবং একাত্তরের মতো জাতীয় ঘটনাকে তিনি নিজের কর্মে এবং সৃজনে ধারণ করেছেন।
১৯৫২ সালে সংঘটিত ভাষা আন্দোলনে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারি প্রকাশে তিনি। সম্পৃক্ত ছিলেন কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, “কিন্তু তার আগেই সেই অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটে গেছে ভাষা আন্দোলন। পেনসিলে লেখা হয়ে গেছে। ‘অমর একুশে’ কবিতা, ছাপাও হয়ে গেছে বোধহয় ফজলুল হক হল বার্ষিকীতে। সেই থেকে মাথায় ঘুরছে একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলনের পরিকল্পনা। আমিনুল ইসলাম প্রচ্ছদ করেছেন। মুর্তজা বশীরের লেখা ছাড়াও স্কেচ যাচ্ছে। কোনোমতে কাগজের দামটা জোগাড় হয়েছে, বাকিতে তৈরি হচ্ছে ব্লক, বাকিতে ছাপা হচ্ছে প্রেসে। আবদুল্লাহ আল মুতীর লেখা বেনামিতে সম্পাদকীয় মুখবন্ধ হিসেবে ছাপা হলো। উৎসর্গপত্রটি হাসান একবার লেখেন, আমি একবার। চ‚ড়ান্ত রূপটা যখন পছন্দ হলো, হাসান স্থির করলেন, আমার হাতের লেখাটা বøক করেই ছাপা হবে বইতে। তা-ই হলো।” এভাবে তিনি তরুণ বয়স থেকেই দেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতি বুঝেছেন। বুঝেছেন গভীর এবং নির্ভুলভাবে।
১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের সামরিক সরকার বেতার-টেলিভিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার বন্ধ করে দিয়েছিল। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে সুশীল সমাজ। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বিবৃতি সংগ্রহের উদযোগী ছিলেন। ১৯৬৮ সালে তিনি ‘রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামে প্রায় চারশ পৃষ্ঠার প্রবন্ধ সংকলন সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন। সে সময়ে এ বইয়ের প্রকাশ ছিল একটি সময়োপযোগী দুঃসাহসী উদ্যোগ। ইতিহাসের পক্ষে তিনি নিজের ভ‚মিকাকে আগাগোড়াই বলিষ্ঠ রেখেছেন। ১৯৭১। বাঙালি জাতির জীবনে এক শ্রেষ্ঠ সময়। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আগরতলা হয়ে কলকাতায় যান। তাঁর ছাত্র ড. মাহবুবুল হক লিখেছেন, ‘একাত্তরের জুন মাসের ৪-৫ তারিখের দিকে আমিও আগরতলায় পৌঁছাই। সেখানে স্যারকে দেখে আমি অবাক হয়ে যাই।

তিনি সেখানে সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করছেন। এমনকি যে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে আগরতলায় পৌঁছেছেন সেটিও মুক্তিযুদ্ধের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। আগরতলায় ক্র্যাফটস হোস্টেলে থাকার সময়ে এবং কর্তাবাড়ি ক্যাম্প পরিচালনার কাজে মাঝেমধ্যেই সে গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছি।’
তিনি কলকাতায় এসে প্রবাসী সরকারের পরিকল্পনা সেলের সদস্য হিসেবে ছয় মাস দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযোদ্ধা মাহমুদ আল জামান লিখেছেন, এই সময় আনিসুজ্জামান শুধু বাংলাদেশের শিক্ষকদের সংগঠিত করেননি, বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সংগ্রহের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। মুজিবনগর সরকারের প্ল্যানিং সেলের সদস্য হয়ে কত ধরনের কাজেই না ব্যাপৃত হয়েছিলেন। তিনি এই সময়ে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকেও নানা বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের সংবিধানের বাংলা ভাষ্য রচনার প্রধান দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সাবলীল ভাষায় রচিত সংবিধান সবার কাছে যে বোধগম্য হয়ে উঠেছিল, সে ভাষার উদাহরণ এমন (২) জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।
লক্ষণীয় যে, সংবিধানে সাধুরীতির ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। মনে হয় সাধুরীতি ব্যবহারের কারণে জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিলে আমাদের ভাষার উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ গণপরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দ্বারা প্রণীত সংবিধান গৃহীত হয়। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সংবিধান বলবৎ হয়।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ১৯৭২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে রিডার পদে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে তিনি অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।
মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান প্রসঙ্গ ধরেই আনা যায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা। দেশের সুশীল সমাজ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ যুদ্ধাপরাধী হিসেবে গোলাম আযমের বিচারের জন্য গণআদালতের কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই আদালতে বিচার চলাকালে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগনামা পাঠ করেছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। এই ভ‚মিকার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। দেশদ্রোহিতার মামলা দায়ের হয়েছিল। জনগণ, গণআন্দোলন, গণআদালত ইত্যাদি শব্দের বহুবচনজ্ঞাপক ‘গণ’ প্রত্যয়টিকে তিনি নিজের মধ্যে ধারণ করেছিলেন। গণমানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তিনি সর্বদাই একাত্ম থেকেছেন। প্রাবন্ধিক গোলাম মুস্তাফা তার একটি লেখায় বলেছেন, “১৯৭১ সালের ১৫ই মার্চ চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে শিল্পী-সাহিত্যিকদের উদ্যোগে একটি জনসভা হয়েছিল।” সে সভায় চলমান আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেছিলেন, “আজ যে আন্দোলন শুরু হয়েছে তাতে জনগণ আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছেন। জনগণের প্রতি আমাদের আবেদন, আমরা আপনাদের হাত ধরে চলতে চাই, আপনারা আমাদের সঙ্গে নিন।”
এভাবে তিনি নিজেকে জনগণের একজন করে তুলেছেন। বিভিন্ন সময় তিনি তাঁর বক্তৃতায়, সাক্ষাৎকারে অকপটে বলেছেন দেশের সব গণআন্দোলনে বুদ্ধিজীবীরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। স্পষ্টত বোঝা যায় যে জনবিচ্ছিন্ন হওয়া তাঁর জীবনের দর্শন ছিল না।
এখানে একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে চাই। ২৮ ডিসেম্বর ২০১১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার দ্বিতীয় কন্যার জামাতা সুমন হায়দার চৌধুরী। সুমন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর পুত্র। স্যারকে সমবেদনা জানাতে তাঁর কন্যা শুচিতার বাড়িতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই শোকসন্তপ্ত মুহূর্তে একদিন তার বাড়িতে অনেকের সঙ্গে আনোয়ার আর আমি উপস্থিত ছিলাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন সহকর্মীদের কেউ কেউ তাঁর বাড়িতে এসেছিলেন। তিনি তাঁদের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে বললেন, তাঁর সময়ে চট্টগ্রাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতেন, এমন এক প্রহরী সমবেদনা জানিয়ে তাকে ফোন করেছেন। ১৯৮৫ সালে স্যার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আসেন। একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রহরী তাঁকে স্মরণ করেছেন এই বলে তিনি স্বস্তি পেয়েছেন। সেদিন তার দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয়েছিল এই ফোন মৃত্যুশোকে তাঁকে গভীর সান্ত¡না দিয়েছে। দেশের সরকারপ্রধান থেকে একজন সাধারণ মানুষ ব্যবধান অনেক। কিন্তু এই ঘটনা থেকে স্যার সব মানুষের কাছে কতটা ভালোবাসার এবং শ্রদ্ধার সেটা যেমন জানা হয়, তেমনি সাধারণ মানুষের প্রতি স্যারের টান কতটা প্রবল তাও আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়।
একুশ আর একাত্তর ইতিহাসের এক আশ্চর্য মিল। এ দুটো শব্দই বাংলা বর্ণমালার ‘এ’ বর্ণ দিয়ে শুরু। স্বরবর্ণের ‘আ’ অক্ষর দিয়ে লিখিত হয়েছে আনিসুজ্জামানের নাম। তিনি ইতিহাসের দুটি সময় প্রবাহকে নিজের জীবনে ছুঁতে পেরেছেন। দুই সময়ে সক্রিয় থেকে সময়ের মানুষ হয়েছেন। বস্তুত সময়কে তিনি কখনও ছেড়ে যাননি। সময়ের স্বাভাবিক চলাতেও তিনি সমান সক্রিয় থেকেছেন। সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখার জন্য তাঁর চেষ্টা প্রশ্নহীন। বিভিন্ন আলোচনা সভা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে সুস্থ, নির্বিরোধ করে রাখার উপাদান জোগায়। সেইসব সমাবেশে তাঁর মুক্ত কথামালা সামগ্রিকভাবে মানবিক ভাবনার শুভ ও কল্যাণের দিকটিই উজ্জ্বল করে তোলে। অসাম্প্রদায়িক মানবিক বোধে উজ্জীবিত অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এ সময়ের একজন দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী মানুষ। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার ডিগ্রি প্রাপ্তি একজন গবেষকের সাধনার স্বীকৃতি শুধু নয়, তা সেই মানুষটির বহুমাত্রিক জ্ঞানেরও স্বীকৃতি। শুধু পুঁথিগত বিদ্যা দিয়ে কেউ বড় হতে পারেন না, যদি না তার সঙ্গে মানুষের কল্যাণচিন্তাকে জাগিয়ে তোলার নানামুখী চেষ্টায় তিনি সক্রিয় থাকেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এই ধরনের মানুষ।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৬ সালে তিনি বাংলা সম্মান পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন। এই পরীক্ষায় কলা অনুষদে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক অর্জন করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে বাংলা একাডেমি থেকে পিএইচডি গবেষক হিসেবে বৃত্তি পান। একই বছরে পিএইচডি গবেষণার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ১৯৬২ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই। এরই মধ্যে ১৯৫৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৪-৬৫ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো ছিলেন। ১৯৭৪-৭৫ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ বিভাগে ফেলো হিসেবে গবেষণা করেন। ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি আমন্ত্রিত হন। ২০০৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে অবসরগ্রহণ করেন। বর্তমানে একই বিভাগে প্রফেসর ইমেরিটাস পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন।
তাঁর পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল ইংরেজ আমলের বাংলা সাহিত্য বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারা (১৭৫৭-১৯১৮)। এই গবেষণার জন্য তিনি ব্যয় করেছেন তিন বছর। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬০। ১৯৬৪ সালে গবেষণাগ্রন্থটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক লেখকসংঘ প্রকাশনী, ঢাকা। বইয়ের নামকরণ করেন মুসলিম মানস ও বাংলাসাহিত্য।
(এখানে একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে চাই। ১৯৬৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় রাজশাহী নিউমার্কেটের ‘বইপত্র’ নামক একটি দোকান থেকে আমি বইটি কিনি। তখন পর্যন্ত আমি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে সামনাসামনি দেখিনি। এখনো বইটি আমার কাছে আছে। ১৯৬৬ থেকে ২০১২ দীর্ঘ ছেচল্লিশ বছর। জীবনের জল অনেক গড়িয়েছে। এই সময়ের মধ্যে দশ-বারোটি বাড়িতে থেকেছি। কিন্তু বইটি হারাইনি। শুধু নরম হয়ে গেছে।
পৃষ্ঠা আলগা হয়েছে মাত্র। এই বইয়ের বিভিন্ন অংশ পড়ার সময় বাংলা অনার্সের ছাত্রী আমি বিস্ময়ে স্যারের বিশ্লেষণাত্মক বাক্যের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ভাবতাম, একটি নতুন বিষয় স্যার আমাদের সামনে এনেছেন। তিনিই বুঝি প্রথম, যিনি সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের অবদানকে ভিন্ন দৃষ্টিতে পরিমাপ করার পথ খুলে দিলেন।)।
এ বইয়ের অবতরণিকা অংশে তিনি লিখেছেন, ‘মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্য হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের অবদানে সমৃদ্ধ। এর তুলনায় আধুনিক বাংলাসাহিত্যের ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানের পশ্চাৎপদতা বিস্ময়কর। বাংলাসাহিত্যের উৎসাহী পাঠকমাত্রই লক্ষ করেছেন যে, ১৮০০ থেকে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অর্থাৎ আধুনিক বাংলাসাহিত্যের প্রস্তুতিপর্বে বাঙালি মুসলমান সম্পূর্ণরূপে নিষ্ক্রিয়। অথচ তাদের সাহিত্যানুরাগ বা সৃষ্টিক্ষমতা যে লোপ পায়নি তার প্রমাণ আরবি-ফারসি শব্দবহুল কাব্যধারার মধ্যে পাওয়া যায়। এই রীতির কাব্য অবশ্য রসে-রূপে বিচিত্র নয়, দৃষ্টিভঙ্গির পরিচ্ছন্নতাও সেখানে অনুপস্থিত। বাংলাসাহিত্যে মুসলিম-সাধনার ইতিহাসে এই কাব্যধারা মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের মধ্যে ঐতিহাসিক সূত্র রক্ষা করেছে মাত্র।
এভাবে বাঙালি মুসলমানের সৃষ্টিশীলতাকে তিনি নির্মোহ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তরুণ বয়সে তাঁর লেখা থেকে পাওয়া এই স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি নিজের ভেতরের বোধকে গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত সহায়ক ছিল। এজন্য তিনি আমার শ্রদ্ধেয়।
ড. আহমদ শরীফ এই বইটি সম্পর্কে লিখেছেন, “এ এমন একটি বই, যা একবার পড়ে ফেলে রাখার মতো নয়, বারবার পড়ার প্রয়োজন এবং প্রতিবারেই নতুন নতুন তথ্য ও তত্তে¡র উদ্ভাস ঘটে এবং চিন্তার উদ্দীপন হয়। তিনি এই বইয়ে পেয়েছেন লেখকের সুষ্ঠু চিন্তার এবং নিরপেক্ষ ও পরিচ্ছন্ন উদার দৃষ্টির প্রসূন।” আরেকজন গবেষকের পর্যবেক্ষণ আনিসুজ্জামানের গবেষণাকাজের গভীরতা মূল্যায়ন করে। ফরাসি ভাষার অধ্যাপক ফ্রাঁস ভট্টাচার্য লিখেছেন : Professor Anisuzzaman has all the qualities of a great man and a great scholar শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লিনটন বি সিলি লিখেছেন : As impressive as he is as a truly good human being, Anis bhai is equally impressive and respected as a productive and wide ranging scholar..
দেশ-বিদেশের বিদ্বজ্জন তাঁর মানবিক বোধ ও পাণ্ডিত্যকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখেছেন। এই বিশিষ্টতায় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান নন্দিত এবং বরণীয়।
বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে তাঁর বইয়ের সংখ্যা অনেক। প্রবন্ধ ও গবেষণাগ্রন্থের সংখ্যা ষোলো। তিনি শহীদ মুনীর চৌধুরী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মোতাহের হোসেন চৌধুরীর জীবনী লিখেছেন। তাঁর প্রকাশিত স্মৃতিকথার সংখ্যা দুই। আমার একাত্তর এবং কাল নিরবধি গ্রন্থদ্বয়কে বলা যায় সময়ের দলিল। তিনি অনুবাদ করেছেন দুটি নাটক। অস্কার ওয়াইল্ডের অ্যান আইডিয়াল হাজব্যান্ড-এর অনুবাদ করেছেন ‘আদর্শ স্বামী’ নামে। আলেকসেই আরবুঝভের স্তারোমোদোনাইয়া কোমেদিয়া নাটকের অনুবাদ করেছেন ‘পুরনো পালা’ শিরোনামে।
তাঁর শিশুতোষ বইয়ের সংখ্যা দুটি। একটি জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জীবনী। অপরটির নাম কতকাল ধরে। এছাড়া ভাষা নিয়ে ছোটদের জন্য লেখা তাঁর একটি চমৎকার বই কথার কথা।
তিনি সম্পাদনা করেছেন সাঁইত্রিশটি বই। মুহম্মদ আবদুল হাই সহযোগে সম্পাদনা করেছেন বিদ্যাসাগর-রচনাসংগ্রহ ও দীনবন্ধু-রচনাসংগ্রহ। চার খণ্ডে সম্পাদনা করেছেন মুনীর চৌধুরী রচনাবলি। এমন আরো উল্লেখ করা যায়। এছাড়াও কোনো কোনো সম্পাদিত বইয়ের সঙ্গে তিনি যুক্ত হয়েছেন। যেমন, বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত নজরুল রচনাবলি। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কাজের পরিসর অনেক বড়। তিনি এখনো অনেক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বলা যায় তাঁর মনন সর্বভুক, তার চিন্তা নৈর্ব্যক্তিক, তাঁর কর্ম পরিমাপহীন। তিনি সেই মানুষ, যিনি বাংলাদেশকে সুখী-সমৃদ্ধ দেখতে চান।